হারাধন বৈরাগী||মন্ত্রকবির কবিতা: পাঠ ও অনুভব||

হারাধন বৈরাগী

||মন্ত্রকবির কবিতা: পাঠ ও অনুভব||
বাংলা সাহিত্যভুবনে ‘মন্ত্রকবি’ মিলনকান্তি দত্ত এক অনন্য সাধনাক্ষেত্র। তিনি একাধারে পণ্ডিত, প্রাবন্ধিক, কবি, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী ও কথান্যাসিক। তিনি সহজ জীবনমানুষের গীতকৃতক ,নাথধর্মদর্শন গবেষক। তাঁর কবিতা শুধুই শিল্প নয়—এক আত্মানুসন্ধান, ধ্যান আর অন্তর্জাগরণের পথ। কবির কবিতা হলো সাধনা ও অন্তর্লৌকিক জাগরণ। কেউ কেউ তাঁকে ‘সন্তকবি’ বলেন, আমার কাছে তিনি ‘মন্ত্রকবি’। এমনকি তিনি নিজেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ‘মন্ত্রকবি’ পরিচয়ে।

তিনি শব্দকে ব্যবহার করেন না, শব্দের মধ্যেই বসবাস করেন। শব্দকে ভাঙেন, গড়েন, টঙ্কার দেন। তাঁর কবিতায় ভাষা বৈষ্ণব জপমালার মতো—আমি বলি, খুমবতাং বা রাংবতাংয়ের মতো। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে অনুভূত হয় এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুরণন। এই কারণেই তাঁর কবিতা পাঠ সবসময় অনুভবের বিষয় হয়ে ওঠে।

কবিতার মন্ত্রধর্মী গঠন ও ধ্বনিগত পুনরাবৃত্তি পাঠককে এক ধ্যানাবস্থায় নিয়ে যায়—যেখানে অর্থের চেয়ে ধ্বনি, যুক্তির চেয়ে অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ। কখনো লোকমন্ত্রের সুর, কখনো প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের নিগূঢ় উচ্চারণ ধ্বনিত।তাঁর কবিসত্তায় গভীরভাবে প্রোথিত ত্রিপুরার জল, হাওয়া, মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও স্থানিক চেতনা। পাহাড়, জুমক্ষেত, বনভূমি, বাঁশ, নদী—এসব তাঁর কবিতায় পটভূমি ও জীবন্ত প্রতীক। প্রকৃতি তাঁর কাছে দেবতা; মানুষ ও প্রকৃতি মিলেমিশে এক অন্তরঙ্গ সহাবস্থান। মিথ, লোকবিশ্বাস ও সময় তাঁর কবিতায় একত্রে মিলেমিশে যায়। সময়, নিঃসঙ্গতা, সংকট ও অস্তিত্বপ্রশ্ন প্রকাশ পায় প্রতীকের ভিতর দিয়ে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘অন্তর্লৌকিক বাস্তবতা’—আর দৃশ্যমান জগতের বাইরে গিয়েও স্পর্শ করে সত্যকে। এই জগতে রয়েছে গভীর নিঃসঙ্গতা, তপস্যা ও আত্মমগ্নতা—সময়, মৃত্যু ও শূন্যতার ধ্যানময় উপলব্ধি। এই শূন্যতা হতাশার নয়, পূর্ণতার দিকে যাত্রা।

সর্বোপরি, সাধক‑চেতনার ভিতর দিয়ে তাঁর কবিতা রূপান্তরিত হয় মন্ত্রে, ভাষা পরিণত হয় ধ্যানে, আর জীবন হয়ে ওঠে অন্তহীন অনুসন্ধান। পাঠক ধীরে ধীরে প্রবেশ করে এক অন্তর্জাগতিক নীরবতায়—যেখানে অনুভবের সহস্রদল পদ্মে লুকিয়ে থাকে মুক্তির ইঙ্গিত—চিদাত্মা।

কবিতায় শব্দ তাঁর কাছে বাহনও, শক্তিও। অনেক সময় অর্থ গৌণ হয়ে যায়; ধ্বনি ও অনুরণনই মুখ্য হয়ে ওঠে। এই দিকটি তাঁর কবিতাকে সাধারণ সাহিত্য থেকে আলাদা করে। প্রাচীনতা ও যাপিতসময় এখানে পাশাপাশি সহাবস্থান করে। একই সঙ্গে তাঁর কবিতা সৃষ্টি করে শরীরী অভিজ্ঞতা। নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু, শূন্যতা—এসব বিষয় তাঁর কবিতায় লাভ করে দার্শনিক ও অস্তিত্ববাদী মাত্রা।

শূন্যতাকে তিনি ভয় করেন না; বরং পূর্ণতার পথে এক ধাপ হিসেবে দেখেন। তাঁর কবিতায় ত্রিপুরার জনজাতি সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মিথ একাকার হয়ে বিশ্বজনীন ব্যঞ্জনা লাভ করে। তাঁর কাছে কবিতা এক ধ্যানপথ। পাঠক যখন তাঁর কবিতায় প্রবেশ করে, তা শুধু পাঠ ছাড়াও—এক ধরনের অন্তর্জাগরণের সাধনা হয়ে ওঠে। তাঁকে বুঝতে হলে প্রয়োজন আধ্যাত্মিক, লোকজ ও অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়।

এবার দেখা যাক কবির কিছু কবিতা–

“মাটি টেনে পিঁড়ি /পেতে বসেছি/

গাছের পাতায় /পিণ্ডি করে রাখা /সেদ্ধ ধানফল/
আর চোখ থেকে/ গড়িয়ে নামা /লবণ মাখিয়ে/ তিন গেরাসে /মুখে তুলি /আকাঁড়া সংসার।/

ওগো তাণ্ডবের ধুলো/

দুপুরের খাওয়া/ হয়ে গেলে মনে হয়/ একটা দিন গেল,/শিব! শিব!” (আকাঁড়া)।

এই কবিতায় প্রকৃতি ও জীবনের মিলনস্থলে মানুষ নিজেই নিজের আসন তৈরি করেছে। অন্ন এখানে দেবতার নৈবেদ্য নয়, প্রকৃতির সরাসরি দান। লবণ স্বাদ, দুঃখই যেন জীবনস্বাদ। সংসারকে ভোগ নয়, আত্মস্থ করা। দৈনন্দিন জীবন শিবতাণ্ডবের মতো‌ই যেন আধ্যাত্মিক চেতনায় ভরা। অন্ন–অশ্রু–দেহ মিলেই তন্ত্রসাধনা। এর ভেতরে আধ্যাত্মিক ও অস্তিত্ববাদী সুরটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
—---------------------------------
“গুরু, চণ্ডালীর গৃহে আজ /তোমার অন্নপাক/

চলিতের পাতে পড়ুক/ সাধুর ব্যঞ্জন/

বঙ্গালরাগের ভাত /শরীর বাজাক/

ইচ্ছেমতো পদ্ম দেব, /যদি রাখো বজ্রের পতন।/

ওগো অনুত্তরস্বামী, ঘ্রাণযোনি /ফুল ঝরে যাক/

চাওনি? তবে শহিদ হও/

আমি তোমার ভাষাইস্টিশন।”(রাগ বঙ্গাল)।

পবিত্রতা–অপবিত্রতার ভাঙন। ঈশ্বরও চণ্ডালের ঘরে এক হয়ে যান। উঁচু–নিচুর মিশ্রণে তৈরি হয় ব্যঞ্জন; ভাষা ও সমাজের ভাঙনও তাতে প্রতিফলিত। ‘বঙ্গালরাগের ভাত শরীর বাজাক’—শরীর যেন বাদ্যযন্ত্র, ভাত খাওয়াও এক সংগীত। ‘শহিদ হও’—প্রেমের ভাষার জন্য আত্মবলিদান।ধর্ম, ভাষা আর দেহ হয়ে যায় একাকার।
—-----------------------------
“উত্তরবাহিনী গঙ্গা থেকে গা ধুয়ে উঠছে/ তীর্থবেশ্যা তখন/

চিতার কয়লায় দাঁত মেজে হাসছিল/ হরিশ্চন্দ্রের ঘাটচাঁড়াল/

মগ্নগমনের জবাকুসুম সংকাশ চারদিকে/ এই দিনমুখ/

তালুব্রহ্ম লেলিয়ে দিয়েছে জ্বর আর/ তাতিয়ে দিচ্ছে রসাতল/

কতোক্ষণ আর চোখ উল্টিয়ে দেখা যায় /নিজের কপাল/

ইতিমধ্যে কে আমার মাথার চাতালে/ রেখে গেল দুটো বিরাট শ্রীফল”(সিদ্ধাসন)

এই কবিতাটিতে দেহ, মৃত্যু, কামনা আর আধ্যাত্মিকতা—সব‌ই যেন এক তন্ত্রচক্রের অংশ।শ্মশানই সত্য, ভেদাভেদ নেই।মানুষ নিজের নিয়তি বোঝার আগেই সাধনা ও অস্তিত্বের ভার তার উপর এসে পড়ে। সর্বোপরি মুক্তি ও পতন—দুটোই দেহের ভিতরেই নিহিত।
—-------------------
“মুখোমুখি দুইখানা পিঠ।/লাবণ্য এবং জীবন।/
মধ্যে একখানা পাণ্ডুলিপি/ এবং ধূসর।/
বাংলার কিছু দিনকানা পাখি/ এই ধূসরতা পাঠ করে বলে/ রাত্তিরে খুব ভালো চোখে দ্যাখে তারা।/
কে বা কাহারা যে তাহাদের/ নাম রেখেছিল পেঁচা।”(পেঁচা)

সত্য বুঝি সবসময় আলোর মধ্যে নেই,অন্ধকারেও এক বিশেষ দৃষ্টি জন্মায়।সৌন্দর্য ও জীবন আলাদা হলেও, তাদের মাঝখানে থাকা ধূসরতাই বুঝি প্রকৃত বাস্তব।সমাজ যাদের অবজ্ঞা করে, তারাই অনেক সময় হয়ে ওঠে সত্যের প্রকৃত পাঠক।
—--—---------------
“একটা নিবে যাওয়া মানুষকে জ্বালিয়ে /স্বয়ং ছাই হয় যে ইন্ধন/

সে নিজেই নিবে গেছে কতো আগে/ যখন গাছতলায় দাঁড়িয়ে/

উচ্চারণ করেছি, কাষ্ঠ!/

কী তার মানে? জানে গাছ, সে তো /কাঠের কোলাহল/

যেমন জানত নিমতলার ডোম,/রবীন্দ্রনাথকে/

দাহ করতে গিয়ে অনর্গল সে /কবিকে লাশ বলে গেল।(নিমতলার ডোম)

এই কবিতাটি মূলত আত্মদহন, অজ্ঞানতা ও ভাষার সীমাবদ্ধতার এক তীব্র প্রতীকী প্রকাশ। এখানে ‘ইন্ধন’ নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়—যে শক্তি অন্যকে জ্বালায়, তার নিজেরই নিঃশেষ ঘটে আগে।কবিতাটি আসলে মানুষের অনুভূতিহীনতা, অজ্ঞানতা এবং মহান সত্তাকে চিনতে না পারার বেদনাকে পাঠকের চোখে তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরে।যেখানে কবিও শেষ পর্যন্ত কেবল দাহ্য কাঠ বা লাশ হয়ে ওঠেন।
—------------------------
“লণ্ঠনে রোদ্দুর ভরে রাখি। পাওয়ারকাট/হলে রোদ্দুর ফুটিয়ে রাত্তিরে ভাত খাই।/

ভাতের গায়ের রং ফর্সা। অন্ধকারেও/ভাত খিদে দেখতে পায়। /মিলনপণ্ডিত বলেছেন ভাত মানে ভক্ত।/ ভক্ত থেকে ভত্ত, ভত্ত থেকে ভাত। তুমি /কার ভক্ত ভাই?/

যে আমাকে রচনা করে। যে আমাকে /খায়। এ দেশে/

জ্ঞানীর নাম ভিক্ষু। ভিক্ষার/ নাম মাধুকরী।পরান্নভোজীর/নাম মহারাজ।/অন্নউৎপাদকের/ নাম চাষা। যেহেতু/

পাকস্থলীর ভেতর দিয়ে হৃদয়ে যেতে হয়,/ হৃদয়ের ঠিক নীচে অন্নাশয়। এখানেও/

আছে একটা লণ্ঠন। তা-তে /রোজ ভাত ভরে রাখা চাই। সেই/ লন্ঠন জ্বালিয়ে লিখি, ভালোবাসা!/

ভা অর্থাৎ ভাত।ল /অর্থাৎ লবণ। বা /অর্থাৎ বাড়ি। সা /
অর্থাৎ সারাটা জীবন।”(ভাতের গায়ের রং ফর্সা)

 ‘ভাত’  খাদ্য ছাড়াও, ভক্তি, জীবনধারণ ও অস্তিত্বের প্রতীক। জ্ঞান, ভিক্ষা, রাজত্ব—সবই শেষ পর্যন্ত অন্নের ওপর নির্ভরশীল, অথচ অন্ন উৎপাদক চাষা অবহেলিত।‘লণ্ঠন’ রূপকটি শরীর ও হৃদয়-ভেতরের জীবনীশক্তি, যা ভাত দ্বারা জ্বলে থাকে। শেষের শব্দভাঙনে ‘ভালোবাসা’কেও ভাত, লবণ, বাড়ি ও জীবন—এই মৌল-উপাদানের সাথে যুক্ত করেছে।জীবনের প্রাথমিক সত্য—অন্নই প্রেম, অন্নই অস্তিত্ব।
—----------------
“আমার জ্যাঠামশায়ের নাম, হরি/ আমার বাবার নাম, মদনমোহন/ আমার কাকার নাম, কানাইলাল/ আমার একমাত্র পিসির নাম,/ রাধা।/

আমি মিলনকান্তি দত্ত, শুধু এই বিষয়ে/ একটি কবিতার পিতা ও প্রেমিক।/

আমার জ্যাঠামশাই, বাবা ও কাকা/ আমাকে 'বাবা' বলে ডাকতেন /পিসি ডাকতেন না, একটা বাঁশির জন্য/ যেদিন তার বুকে মুখ লুকিয়ে/
কেঁদেছিলাম,/

তিনি ততোধিক লুকনো একটি চুমু/ থুতু লাগিয়ে সেঁটে দিয়েছিলেন/ আমার গালে, কিন্তু আমি খুব/বেজে উঠেছিলাম/

সেই বাজনার আজও একটাই নাম/
'রাধারমণ দত্ত'।(একটি মন্ত্রকবিতা)

পারিবারিক নামগুলি -হরি, মদনমোহন, কানাইলাল, রাধা –বৈষ্ণব ভাবধারার উত্তরাধিকার হয়ে আধ্যাত্মিক পরিচয়ে রূপ নিয়েছে। ‘বাঁশি’ ও ‘রাধা’ প্রেম-ভক্তির চূড়ান্ত প্রতীক। রক্তের সম্পর্ক থেকে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার, প্রেম থেকে ভক্তি, আর স্মৃতি থেকে চিরন্তন সংগীত।।  
—------------------
“গলায় সাপ ঝুলিয়ে দিয়ে বললে, বল্ /বাবার নাম?/

আমি বাপের নাম ভুলে যেতে যেতে দেখি /তোমার মুখটা অবিকল আমার বাবার মতো/

কে তুমি? আমার বাবা নও, তার বাবা নও /বলেছি, তুমি ঈশ্বর। বলেছি,/তোমার বাবা নেই।/

খুশি হয়েছিলে। আমার হাতে একটা /চক্চকে গান্ধির মাথা তুলে দিয়ে/ বললে, যাঃ/

স্বাধীনতা কিনে খা!”(মেকুরখাঙ)

‘বাবার নাম’ জিজ্ঞাসা করা মানে নিজের শিকড় ও পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করা। ভয়ের চাপে সেই পরিচয়ই ভেঙে যায়। ‘ঈশ্বর’ বলে যে সত্তাকে স্বীকার করা হয়, সে আসলে ক্ষমতার প্রতীক—যার কোনো শিকড় নেই।সে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে।শেষে ‘গান্ধির মাথা’ দিয়ে ‘স্বাধীনতা কিনে খা’ বলা—স্বাধীনতার বাণিজ্যিকীকরণ আর তার অবমূল্যায়নের সুতীব্রব্যঙ্গ।
—-----------------------
“আয় মন বেড়াতে যাবি, কোথাও তো নেই/

কল্পতরু মূল/
ধূলিকণার  থেকে তুলে আনা/ বিস্ফুলিঙ্গী ফুল/

উন্মার্গ ত্রিশূলগাছ পুঁতেছি পাষাণে,/ কাকমালা আকাশের লেহন যদি টানে/

তবে আয়,/এইখানে মহানির্বাণতন্ত্র রোড ধরে/

জোনাকির যোনিপ্রস্থ ফেটে/আলোর জঙ্ঘারা খেলা করে।/

এইখানে পতাকা ফুটে যে রাজনীতি ছড়ায়/ সিদ্ধমাংসে তার আবাহন/

বেড়াতে যাবি? তোর কানে কুমন্ত্র আমি,/

আয় মন।”(উন্মার্গ ত্রিশূলগাছ)

এ‌ই কবিতাটি আসলে প্রচলিত পথ ও নৈতিকতাকে ভেঙে এক বিপরীত যাত্রার আহ্বান । ‘ত্রিশূলগাছ’, ‘মহানির্বাণতন্ত্র’, ‘সিদ্ধমাংস’—এসব প্রতীক আসলে জীবনের গূঢ়, নিষিদ্ধ ও তান্ত্রিক স্তর।রাজনীতি, শরীর  আর আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণে এখানে এক ধরনের বিপজ্জনক আকর্ষণ তৈরি হয়, যা শেষপর্যন্ত ‘কুমন্ত্র’-এর মতো মনকে বিপথে ডাকে।কবিতাটি মানবমনের অন্ধকার, নিষিদ্ধ-আকাঙ্ক্ষা ও উল্টো পথে মুক্তির বিভ্রমকে প্রতীকী প্রকাশ করে।
—-------------------
“রবীন্দ্রনাথের চুলের সিঁথায় খানিকটা সিঁদুর চড়িয়ে দিয়েছি।/তারপর তার ছবির গোড়ায় ভেজা পেন্নাম থুয়ে/বললাম, তুমি আমার মা।/তিনি আমাকে কোলে উঠিয়ে জোব্বা তুলে দেখালেন দু'টি স্তন।/
দু'টি মধুপর্কের বাটিতে চুবানো বাংলা ও ইংরেজি গীতাঞ্জলি,/ আমি একটিতে মুখ রেখে অপরটি চটকে যাচ্ছি হাতের থাবায়,/ মা বললেন, ছাড় লাগছে!/
কামড়াস্ কেন ছেলে?(দুটি মধুপর্কের বাটি)

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে  মাতৃস্নেহের সঙ্গে একাত্ম করা।কবিতা ও গান হয়ে উঠেছে মধুপর্কের মতো অমৃত, যা পুষ্টি দেয় সন্তানকে। শেষে মা-সন্তানের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ফুটে উঠেছে—ভক্তি, প্রেম ও মাতৃত্বের মিশ্রণে। রবীন্দ্রনাথ এক চিরন্তন মাতৃসত্তা হয়ে উঠেছেন কবিতায়।এখানে কবি রাবীন্দ্রিক ধ্যানধারণাকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরে পাঠকের চেতনা নাড়িয়ে দিয়েছেন।
—------------------
“ঐং হ্রীং ক্লীং। না, আইনস্টাইনের/সাইকেল বাজেনি।তবে? /আঁশবঁটির পাশে কোলের সন্তানকে রেখে /দৌড় মেরে ছুটে যায় আযোনিস্তন্যের/ মনীষা। ডেকেছিল TIME? /তাকে ডেকেছিল SPACE? আসলে/ কেউ ডাকেনি। তৃণকাষ্ঠের চিতা,/ নিম্ফোম্যানিয়া। নিজেই নিজের/ কুপ্রস্তাব শুনে আপনি নাচে,/ আপনি নাচায়!/

অশান্ত মিলনকান্তিকে/ আঁশবঁটিটা চুমু খাচ্ছে বলে/মহানির্বাণতন্ত্ররোডে/ অদ্য red alert ।।”(তৃণকাষ্ঠের চিতা)

এটি বিশৃঙ্খলা, আত্মবিভাজন ও সময়চেতনার ভাঙনের তীব্র প্রকাশ।
তন্ত্রমন্ত্র, টাইম-স্পেস ও দেহজ কামনা মিশে তৈরি করে অস্থির দিশাহীনতা।
‘কেউ ডাকেনি’—একাকিত্ব ও অর্থহীনতার ইঙ্গিত।
নিজের প্রলোভনেই নিজে ভোগী—এই ভাঙনই তার নির্মম অস্তিত্ব।
—-------------------
“আমার মা অসুখে পড়ে প্রলাপ বকেন, জানিস্ /তোদের রবিঠাকুরের সঙ্গে আমার /বিয়ের আলাপ হয়েছিল।/

মরতে বসেছি,/লোকটা আজও আমাকে উদ্দেশ্য করে/গান শোনায়।)

যখন বলি, রবীন্দ্রনাথ আমার বাবা/মা প্রলাপ বন্ধ করে কেমন খাপছাড়া চোখে তাকান/তার চোখে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই /ভাষা সন্ত্রাস।(মাতৃকান্যাস)
  
এই কবিতায়  মায়ের প্রলাপ—রবীন্দ্র নাথের সাথে কল্পিত সম্পর্ক—স্মৃতি  আর সাংস্কৃতিক আইকনের মিশ্রণে এক বিভ্রান্তি । যখন কবি তাকে ‘বাবা’ বলেন, তখন ভাষা নিজের স্বাভাবিক অর্থ হারায় আর জন্ম নেয় ‘ভাষা সন্ত্রাস’। ভাষা আর সত্যকে ধারণ করতে পারে না।পরিচয় হয়ে ওঠে অনিশ্চিত ও আতঙ্কগ্রস্ত।

এই কবিতাগুচ্ছ মূলত ‘মন্ত্রমানুষ’ বা ‘সন্তমানুষ’য়ের এক কাব্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ—যেখানে জীবন, দেহ, খাদ্য, শ্মশান, ধর্ম, যৌনতা, ভাষা ও মিথ—সবকিছু তন্ত্রময় অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে মন্ত্রময় হয়ে উঠেছে। প্রচলিত নন্দনচেতনা ভেঙে এখানে নির্মিত হয়েছে আধ্যাত্মিক-দেহবাদী কবিতার এক নতুন ধারা, লোকায়ত তন্ত্র ও যাপন-সময়ের সংমিশ্রণে—ত্রিপুরার ভূগোল, জনজাতি বিশ্বাস ও সময়চেতন ভাষার এক গভীর সংলাপ: যা ভাত, লবণ, মাটি—প্রকৃতি ও জীবনের মৌলউপাদান, দেহসাধনা, পবিত্র–অপবিত্র ভেদবিলোপ, জীবন-মৃত্যুর ঐক্যচেতনা, মন্ত্রধর্মী খণ্ডিত ভাষা, লোকভাষা, তান্ত্রিক শব্দ ও আধুনিক পরিভাষার মিশ্রণ।

ঈশ্বর, রবীন্দ্রনাথ, ব্যক্তিগত স্মৃতি—সবই নতুন-পুরাণে রূপান্তরিত। তাঁর কবিতা রূঢ়, আচারভিত্তিক ও মন্ত্রময়। যাপন-সময়ের হলেও শিকড় গভীরভাবে লোকায়ত। ভাষা মৌলিক, চিত্রকল্প শক্তিশালী। তবে কখনও গূঢ়তা পাঠকের সঙ্গে দূরত্বও তৈরি করে।
মিলনকান্তি দত্ত বাংলা কবিতায় এক “লোকায়ত তন্ত্র-সময়ের কবি”—যেখানে ভূগোল, দেহ, ভাষা ও মিথ মিলিত হয়ে কবিতা হয়ে উঠেছে সাধনা।
তাঁর কবিতার যাত্রা—অন্ধকার, দেহ, অন্ন, শ্মশান ও ভাষার গহ্বর পেরিয়ে ধীরে ধীরে এক সূর্যোদয়মুখী উপলব্ধির দিকে। তিনি শব্দ ভাঙচুর করেন, গড়েন—তারপর দেহ, অন্ন ও শ্মশানের মধ্যে নিয়ে দাঁড় করান—সমতা, অস্তিত্ব ও মৌলিক সত্যের মুখোমুখি। অবশেষে উপলব্ধি—মানুষই মন্ত্র, দেহই মন্দির, অন্নই জীবন।

মিলনকান্তিকে বোঝা কঠিন—কারণ তিনি বাংলা কবিতার এক তন্ত্রপুরুষ, সন্তধারার পণ্ডিত। তার চেতনা তল-পরা-অপরাগামী, তিনি মরমী সাধক। তাঁকে বুঝতে হলে অন্তত জানা দরকার—ত্রিপুরার লোকজীবন ও সংস্কৃতি, তন্ত্রচেতনা—দেহ, মৃত্যু আর ভেদভাঙা, ভাষাভাঙা ও প্রতীক ব্যবহারের কৌশল। এই প্রস্তুতি থাকলে তাঁর কবিতা শুধু পড়া নয়—অনুভব করা যাবে অনেকটা সহজে। আমি কবির উত্তরোত্তর শক্তি কামনা করি। চরৈবেতি।
—----------------

#todaysbestphotography #highlight #followers #nonfollowers #viral Haradhan Bairagi Milan Kanti Datta

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ