বীরেন মুখার্জীর কবিতা || আপাত স্মৃতিবিদ্যা



---------- Forwarded message ---------
From: dristi editor <editordristi94@gmail.com>
Date: Mon, 5 Oct 2020, 1:51 pm
Subject: Poem_Biren Mukherjee
To: <boibari15@gmail.com>


বীরেন মুখার্জীর কবিতা
আপাত স্মৃতিবিদ্যা


স্মৃতিরা মূলত ভবিষ্যতের সাঁকো...

একটি সরল রেখা- উড়ছে তৃষ্ণামাতাল, হাবাগোবা; বিপুল অন্ধকারে পিঠ ঠেকিয়ে দৌড়াচ্ছে জনপদ; তার পাশ দিয়েই হেঁটে চলেছে কৌতূহল ও যুক্তির ইতিহাস!

বহুবছর ধরেই এ-ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছেন যিনি, ভাবছেন শয়নকক্ষের বাতিগুলো নিভে গেলে নামিয়ে দেবেন রকমারি ডিম উন্মুক্ত সার্কাসের কেন্দ্রস্থলে- কৌশলগুলো সকলে অবগত, ভানে ও প্রজ্ঞায় কেউ কাউকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার করছেন; প্রকারান্তরে ক্যাঙ্গারু স্বভাব গ্যালারিস্থিত চোখে স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে।
 
জনপদে ধুলোঋতু, উড়ছে উৎসবের আমেজ; কেউ কেউ বিশ্বস্ত দিনের খোঁজে চালাচ্ছেন অপার অনুশীলন; অথচ দিগি¦দিক খালি করা সহস্রাধিক প্রশ্নভারে নির্বিকার তোমার মিথ্যে  সাঁকোর ধারণা কিছুতেই স্থায়ী ভিত্তি পাচ্ছে না।  




অগণন বৃষ্টির ভেতর

অগণন বৃষ্টির ভেতর লুকিয়ে পড়বে অপঠিত গ্রন্থগুলো; পরচর্চা সিকেয় তুলে বহু শতাব্দী ধরে ঝুলতে থাকবে বিচিত্র রঙ; বর্ণ-অন্ধ জিজ্ঞাসার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে অবসন্ন, ঠোঁটলাল টিয়েগুলোও হারিয়ে ফেলবে আজন্ম কৌত‚হল! অথচ, লোভাতুর আঙুলগুলো তখনও ভেসে বেড়াবে না-দেখা আঙুরপাতায়!

এভাবে ভেসে থাকব, বহুকাল- গীত হতে থাকবে প্রকাশ্যে, স্বরের নতুনত্ব; কখনও হাঁটতে হাঁটতে, পথিমধ্যে অনুমোদন পেয়ে যাবে সূর্য ফোটার দিন। আপাতদৃশ্যের ভেতর উড়ে যাবে সাবলীল আড়াল! দেখতে পাবে ঝুলে আছে অস্তিত্ব, অপসৃয়মান দিগন্তরেখায়-

তোমাকে ভাবতে থাকা রাত্রিশেষে যদি না আসে প্রত্যুষ, হিরন্ময় সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তবুও রূপকথার কোনও বাঁকে অপেক্ষা ফুটে থাকবে লাল ও নীল- অগণন;




বিষণ্ন নোলক

মধুচক্র; মৌমাছি বসবে ফুলে, কিন্তু-
তার আগে কেন হলুদ শর্ষের মাঠে
সাজাও গো মেয়ে তুমি - অচেনা অক্ষর?

মানো কিম্বা না-ই মানো- আমিও বিস্ময়,
অজানায় বসি, যতিচিহ্নরা যেমন
সারি সারি বসে যায় জীবনের ডানে!

যত্নে রাখো, জেগে থাকা স্ফূর্তির ভেতর
রাখো কম্পিত মননে- পুনঃপাঠ্যক্রমে;
অথবা, গুপ্ত ঋতুর সুরেলা আঁচলে;

আমাকেই রাখো মেয়ে- ভিন্ন রূপে;
কলা ও বিজ্ঞানে, রাখো আলোকরেখায়
কেশনদী ছুঁয়ে থাকা- নিজস্ব সৌরভে;

শতাব্দীর ঘুম থেকে জেগে ওঠো মেয়ে
একান্ত প্রজ্ঞায় আছি- বিষণ্ন নোলক!





কথ্যরূপে ঝরো

রঞ্জক রহস্য মেখে ঝুলে আছে- বিনীত বিকাল;

শাওন আসমান, জমকালো দৃশ্য চিরে অকস্মাৎ
চোখে পড়ল- ষড়যন্ত্র থেকে ধীরে নেমে আসছে মর্ম,
মন্দাক্রান্তা ঘোরে কৃতিত্ব বিছিয়ে রাখা- দূরটব;

নিঃসঙ্গ চক্রবূহে তবুও ক্ষরণ ঢালছে কারা?

যদিও মানিয়ে নিয়েছি- পীতচোখ, প্রবল তাচ্ছিল্য
বিপন্ন হতে হতে অনুবাদও করেছি আশ্বাস কিরণ;
কিছু নিচুস্বরের গান, যাকে কেউ সঙ্গীত বলছি না
শুনতে পাও কী- মাত্রাহীন চিৎকারে
ভরে যাচ্ছে উঠোন ও খোলেন!

পুঞ্জীভূত মেঘদল ছেড়ে, এবার তো কথ্যরূপে ঝরো!




চলে যাওয়া ভালো

সহাস্য মুখে চলে যাওয়া ভালো, অনুতাপহীন-

কিঞ্চিত আলস্য ঢেলে রতিপুলকের স্রোতে
যেমন চলে যায় জুলাইয়ের পলাতক রোদ;

চলে যাওয়াই খাঁটি- নিঃসঙ্গ চক্রান্ত ছেঁটে,
চলে যাওয়াই খাঁটি- আকাক্সক্ষা মাড়িয়ে, হেঁটে!

যেমন চলে যাচ্ছে- সুন্দরের মহিমা, সু-বোধ
ক্রমোত্থিত আঁধারের গহ্বরে- অজানায়!

বিশীর্ণ অনুভব আর স্তব্ধতায় অভিমান ঢেলে,
বরং চলে যাওয়াই ভালো- অগ্যস্ত যাত্রায়!




উপসংহার  

সময়ের খরস্রোতে কেঁপে ওঠে নদী; ততক্ষণে অন্ধ আমি- নাম-ধাম-কীর্তি ভুলে যাওয়া প্রেমিক প্রাক্তন। তোমারই নির্লিপ্তির হাওয়ায় ভেসে পৌঁছে গেছি অজানা নগর; সেখানেই বিচরণ করছি আর প্রসারণশীল দৃষ্টিতে দেখছি- ‘ভালোবাসা’ নিলামে তুলেছে ছদ্মপ্রেমিকের দল; নাম ও দামের হল্লা চড়িয়ে আমারই হৃদয়জোড়া আগুনে ঝলসে নিচ্ছে অন্যের ভবিষ্যত! কাঙালের মতো, এখনও বেঁচে আছি বলেই শুনতে পাচ্ছি সেই দহনরাগিনী-

এভাবেই, একদিন তুমিও বাড়াবে নিলামের সর্বজনীন শোভা; হয়তো বা, বৃষ্টিসম্ভাবনার দোহাই দিয়ে শূন্যলোকে উড়িয়ে দেবে মেঘের পালক; মৃত নদীর চিকচিক বালুরাশি ভেদ করে আমার দিকেই তেড়ে আসবে তীব্র হেমলক- পুনরায়; প্রশস্ত গৌরবের লোভে তখনও শেষ দৃশ্যের রাজসাক্ষী হতে হবে আমাকে-



অশ্রুগাথা

অপ্রচল পথ, সামনেই বাঁক, দক্ষিণায়ন;

বোশেখের বৃষ্টিতে উৎসারিত শব্দরাশি
সৃষ্টির সান্নিধ্যে এসে, তবুও আন্দোলিত খুব;
তুমি তো জানো-
লং শট: হাঁটা ছাড়া কোনও সম্বল থাকে না
ক্লোজ শট: দ্বন্দ্বসূত্র বড়াই করে ক্ষেত্র বিধানে;

অতএব দূরমেঘ, আলোর ভৈরবী হাতে-
সংগুপ্ত প্রাণের কাছে, হয়ে ওঠো, অনুগত!




ঊনত্রিশে জুলাই
(যে তুমি নীরবে রয়েছো, গভীরে)

তোমার দিকেই হেঁটে যায় প্রকল্পের সেমিনার;

টুং টাং শব্দে ভোর পাঁচটার ঘড়ি বলে জাগো;
বৃষ্টির মতো বিষণ্ন ঘুম টেবিলের পাশে রেখে
উড়ে যায় প্রতীক্ষার ঘ্রাণ- জলাশয় তীর্থে,
আর বিপুল উচ্চাশায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে
নির্বিরোধী চেতনার জ্যোতি;

তোমার দ্বিপক্ষীয় নীতি মানেই টলায়মান অস্থিরতা
চকমকি বদলের দৃশ্যে স্থির, খেলছো তরুণ খেলা
রাজপথে মাখন হয়ে যতই গলে পড়ুক
আর্দ্র মননের অযুত কর্মঘণ্টা-

তুমি আসছো, হাসছো, গড়িয়ে পড়ছো বহুজনে,
বিস্ময়কর ঋতুর পাটাতনে ফুটিয়ে তুলছো
প্রলোভনের নৈমিত্তিক আধার; অথচ
বিগত দিনের কথা এতটুকু ভাবছো না-





নির্মিতি

রূপ একটি নির্মাণ- লীলাক্রম অভিপ্রায়, রূপশ্রী একটি জ্যোতি- পরিশিষ্টে বিস্ময় জাগানিয়া; ধরো, এভাবেই প্রাণ পায়- ভাষা ও প্রসঙ্গ; আর অপ্রচল প্রকরণ সঙ্গী করে হেঁটে যেতে হয় আমাকে- পাখসাটে ঝরে পড়া বৃষ্টিময় দিনের সন্ধানে; হোক দুঃস্বপ্ন, আনুভূমিক কিংবা উলম্ব... তবুও-

হাঁটতে হাঁটতে দেখি- বৈশাখের মাঠে রৌদ্রচাঁপা রং, যার শরীর উত্থিত সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তে, ধরো, নদীও উড়ছে বেশুমার, এ-দৃশ্য নিশ্চিত পরাবাস্তব; অথচ কিছুতেই তুমি শুনতে পাও না লোকায়ত জীবনের এইসব গান; যার সুর জীবন্ত ও তীক্ষ্ণ। সুতরাং পরিপাটি আবালত্ব সরাও এবং দেখো, দেখারও আছে প্রয়োজন...

বস্তুত, কোনও দৃশ্যই রূপরসগন্ধহীন নয়, বিনির্মাণে যে-তীর্থে সাঁতরে চলেছি অবিরাম-


.....................................



বীরেন মুখার্জী
নব্বইয়ের সময়পর্বের বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র ধারার কবি। সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও তার বিচরণ সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ ও লোক-ঐতিহ্য বিষয়ের সৌখিন গবেষক। ২০১৮ সালে ‘ঘোর-দ্য ইনটেন্স অব লাইফ’ নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭টি। পেশায় গণমাধ্যমকর্মী।

কবিতাগ্রন্থ:
প্রণয়ের চিহ্নপর্ব (২০০৯), প্লানচেট ভোর কিংবা মাতাল বাতাস (২০১১), নৈঃশব্দ্যের ঘ্রাণ (২০১২), পালকের ঐশ্বর্য (২০১৩), মৌনতা (দীর্ঘ কবিতা ২০১৩), জলের কারুকাজ (২০১৪), হেমন্তের অর্কেস্ট্রা (২০১৬), গুচ্ছঘাসের অন্ধকার (২০১৭), জতুগৃহের ভস্ম (২০২০) এবং মায়া ও অশ্রুনিনাদ (২০২০)।

প্রবন্ধগ্রন্থ:
কবির অন্তর্লোক ও অন্যান্য প্রবন্ধ (প্রবন্ধ ২০১২), সাহিত্যের প্রতিপাঠ (প্রবন্ধ ২০১৪), কবিতার শক্তি (২০১৭), বাংলা কবিতায় ঐতিহ্য (সম্পাদনা ২০১৪) এবং সৈয়দ শামসুল হক : জলেশ্বরীর শুদ্ধ মনীষী (সম্পাদনা ২০১৭)।

ইতিহাস-ঐতিহ্যগ্রন্থ:
মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস মাগুরা জেলা (২০১৬)

গল্পগ্রন্থ:
পাগলী ও বুড়ো বটগাছ (২০১৬)

১৯৯৪ সাল থেকে সম্পাদনা করেন শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘দৃষ্টি’। এ পর্যন্ত ১৯ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১৮ ৮৪৬ ৮৬৭    
ইমেইল : biren_mj99@yahoo.com


স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র:
‘ঘোর- দ্য ইনটেন্স অব লাইফ’ (২০১৮)










--
Best Regards 
Editor Dristi
Dhaka
01718 846 867

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ