হারাধন বৈরাগী || অপেক্ষা || অণুগল্প
আকাশে হজাগিরির চাঁদ। রোহিতা বহুক্ষণ ধরে গাইরিঙের সাংসিতে বসে আছে। সে খুব সেজেগুজে। রাইবেতের মতো শরীর, নারকেলের শাঁসের মতো দাঁত। গলায় খুমবতাং, হাতে মাথিয়া, কোমরে বাজুবন্দ, মুখমণ্ডল যেন রামকলার কচিপাতা।লাইরুপাতার উপর সাজানো আছে পান-খিলি আর খুমপুই। চোখ বারংবার ফিরছিল পথের দিকে—যেদিক দিয়ে আনন্দ আসার কথা। পাহাড়ি রাতের ফুলের মাদক গন্ধ ভেসে আসছিল বাতাসের শ্বাসে। ক্রমশ রোহিতার মনে জমে উঠছিল উদ্বেগ।
“আনন্দ এমন করে দেরি করে? কখনো নয়।”
গভীর রাত গড়িয়ে গেল। অপেক্ষার সাংসিতেই রোহিতা ঘুমিয়ে অচৈতন্য হলো। জঙ্গলে ধু-ধু ডাক, ঝিঝি পোকার আওয়াজ আরও ঘন হলো। অদূরে শুক্রাইছড়ার জলের শব্দ যেন হাহাকারে মিশে উঠল। রোহিতা বুঝতে পারল না—তার প্রতীক্ষার হৃদয়,আনন্দ ইতিমধ্যেই রক্তমাখা, পাহাড়ি শ্বাপদঝোপে লুটিয়ে পড়েছে। আর তার শ্বাস ততক্ষনে মিশে গেছে নিঃসীম আকাশে।
পরদিন ভোরে, জঙ্গলে কাঠকুটো কুড়োতে যাওয়া কয়েকজন গ্রামবাসী এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল—বিকৃত একটি খুলি আর হাঁটুর নীচের দুটি অঙ্গ।তার পাশে ছড়িয়ে আছে একটি ব্যাগ-ওয়ামুলকলজা, যার ভেতরে যেন নিঃশ্বাস ফেলছে চংপ্রেং, সুমু আর দাংদু। যেন মৃত্যুর পরও আনন্দ তার সুরগুলো আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
খবর যখন রোহিতার কানে পৌঁছাল, সবকিছু যেন থমকে গেল, চারপাশের বাতাস হয়ে গেল স্তব্ধ।কথা কিংবা কান্না—কিছুই এল না তার।সেই রাতভর শুকিয়ে যাওয়া পান-খিলি আর খুমপুইগুলো চুপচাপ সাংসি থেকে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।
এরপর থেকে শুক্রাইছড়ার পাড়ে যখনই সন্ধ্যা নামে—শোনা যায় চমপ্রেং, কখনও দাংদু কিংবা সুমুর ক্ষীণ সুর। কে বাজায়,—কেউ দেখে না।
—
0 মন্তব্যসমূহ