ছড়া কাহিনি :এক ছড়ার নাম- ফুলছড়ি || দেবোপম রায়

ছড়া কাহিনি :এক ছড়ার নাম- ফুলছড়ি  || দেবোপম রায় 


     ফুলছড়ি এক ছোট্ট ছড়া 
     এখন প্রায় একাই থাকে ।
      বসন্তে ও আসে না বাহার 
      তার নিঃস্ব রিক্ত বুকে ।
    সত্যি ফুলছড়ি ছড়ার শরীরে যেন এখন অকাল বার্ধক্য ।অথচ আমার যৌবনে যখন নাটকের রিহার্সালের জন্য ফুলছড়ি-মায়াছড়ি সড়কে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তখন ও দেখেছি ফুলছড়ি ছড়ার রূপবাহার ।
      রূপে গুণে একসময় সে ছিল এলাকার চোখের মণি ।নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে এসে কমলপুর আমবাসা প্রধান সড়কটি পার হয়ে সে মেতে ছিল নদী সঙ্গমে ।ধলাই নদীর বুকে ঠাঁই নিয়ে শেষ করেছিল তার স্বপ্নের দৌড় ।
     বড়মুড়া পাহাড়ের বুক চিরে জলের ঝর্ণা ধারা নিয়ে শুরু তার স্বপ্নের দৌড়ের ।স্বচ্ছ জলধারা আর ঘি-রঙা বালিরাশি বয়ে বেড়ানো রূপবতী ছড়া ফুলছড়ি ।একটা সময় উৎপত্তি থেকে শুরু করে আঁকা বাঁকা তার চলার পথের দুপাশে অসংখ্য বুনো ফুলগাছ জন্মাত ।তাদের ঝরা ফুল স্বচ্ছ জলধারায় ভাসিয়ে সেজে উঠত সে ।খোঁপায় বনফুলের মালা পরা চঞ্চল মেয়ের মতো ।অপরূপ সাজে সেজে তার নদী সঙ্গমে ছুটে চলা ।কমলপুর শহরে ঢুকে শিমূলতলা বাজারের প্রধান সড়ক পার হয়ে সে ছুঁয়েছে ধলাই নদীর বুক ।যে শিমূলতলা বাজার পেরিয়ে তার নদী সঙ্গম সে শিমূলতলা বাজারের নাম পরিবর্তন হয়ে হলো ফুলছড়ি বাজার ।এখানেই তার নামের সার্থকতা ।     
     নাম তার ফুলছড়ি ।তার ফুলসজ্জার রূপ না তার বুকের ফুলেল বালিরাশির রূপ দেখে এরকম নাম হয়েছে কে জানে!নামকরণের কারণ নিয়ে তার তত মাথা ব্যথা ও ছিল না ।ওই নামেই সে গরবিনী ।তাকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ দেখে ভীষণ তৃপ্তিতে ভরে উঠত তার বুক ।তার স্বচ্ছ জল অনেক মানুষের পানীয় জলের উৎস ।তার বুকের ঘি-রঙা বালি রাশি যেন সোনার কণা ।সে যেন এক সোনার খনি ।বিল্ডিং তৈরির কাজে তার বালিরাশির কি কদর ।বাঁকে বাঁকে মানুষ তার বুক থেকে বালি তোলার কাজে ব্যস্ত থাকত ।তার বালি,রাশি স্পর্শ করে তৃপ্ত বিস্মিত মানুষের চোখ যেন জিজ্ঞাসা করত-কোথা থেকে তুমি এই অমৃত রাশি নিয়ে আস ফুলছড়ি?কিভাবে বয়ে আন তুমি এই পাক মুক্ত বালিকণা?তোমার আশে পাশে তো আরও কত ছড়া রয়েছে কই তাদের বুকে তো নেই এমন অমৃতকণা!শুধুমাত্র তার আশেপাশেই নয় সারা কমলপুর মহকুমাু জুড়েই তো রয়েছে আরও অনেক ছড়া যেমন- দুরাই ছড়া, বিলাসছড়া মরাছড়া কত কত ছড়া কোন ছড়ার বালিরই তো এতো কদর ছিল না তার বালির মতো ।তার বালির কদর সুদূর আমবাসা মহকুমাতেও ছিল ।এখান থেকে তার বালি কমলপুরের সীমানা ছাড়িয়ে পৌছে যেত আমবাসা মহকুমাতে ।তার প্রতি মানুষের এই ভালোবাসা খুব ভালো লাগত তার ।একটা সময় মানুষের এই ভালোবাসা যেন উন্মাদনায় পর্যবসিত হলো ।দিন রাত মানুষ বৈধ অথবা অবৈধ পথে ঝাঁপিয়ে পড়ল কোদাল হাতে তার বুকের বালি তুলতে ।তখন তার মনে হত তার বুকের অমৃতকণা দিয়ে সে যাদের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে, সেই তারা ভীষণ নির্দয় এবং নির্মমভাবে প্রতিনিয়ত তার বুককে ক্ষতবিক্ষত করে চলছে ।


মায়াছড়িতে তার তটভূমিতে ফুটে উঠেছে অপূর্ব মায়াময়  রূপ ।তার দুকূল জুড়ে এখানে গড়ে উঠেছে রামদুর্লভপুর চা বাগান ।অনেকটা জায়গা জুড়ে গড়ে উঠা চা বাগান তার তটভূমির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে অনেকখানি ।এই চা বাগান যা অনেকগুলো মানুষের জীবিকার উৎসভূমি, যা ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান, শুখা মরসুমে একটা সময় তার জলধারাই সেই চা বাগানে মৃতসঞ্জীবনীর কাজ করত ।তার যে জলধারায় চা বাগান প্রাণ ফিরে পেত, সেই চা বাগানে ব্যবহার করা আগাছা নাশক আবার বৃষ্টির জলে ধুয়ে তার জলধারাকে বিষাক্ত করে তুলত ।তার তীরে গড়ে ওঠা বসতিগুলো তো একটা সময়ে তার জলের উপরই অধিকাংশ নির্ভরশীল ছিল ।তার জলের উপর নির্ভর করে তাদের যে জীবনযাপন ছিল তার বিনিময়ে কি করেছে ওরা ?ওদের জীবনযাপনে উৎপন্ন গৃহস্থালির আবর্জনা নির্দ্বিধায় ছুড়ে দিয়েছে তার বুকে ।মৃত পশু পাখির দেহ তার জলে ফেলে দিয়ে দূষিত করে তুলেছে তার নির্মল জল ।মাছের লোভে বিষ মিশিয়েছে তার জলে ।প্রচন্ড রাগ হত তার ।রাগে ক্ষোভে দুঃখে দিনের পর দিন সে অপেক্ষা করে থাকত বর্ষার প্রতীক্ষায় ।ছড়া বলে কি তার রাগ দুঃখ অভিমান থাকতে নেই ।দাসীর মত সারা বছর সংসারে খেটে যাওয়া বউদের মতো নয় সে ।তাই বর্ষা এলেই বৃষ্টির জলধারা বুকে নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে তার মনের জ্বালা মেটাত সে ।তার পাড়ে সঞ্চয় করে রাখা বালি রাশিগুলো আবার জলের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যেত জ্বালা মেটাতে ।
অতিরিক্ত লোভে বিবেক বিসর্জিত মানুষগুলো তার দুই পাড়ের গাছগাছালি ঝোপঝাড় কেটে সাফ করে দিতে লাগল ।যার অনিবার্য পরিণাম তার দুই তীরের ভূমিক্ষয় ।ফলে তার স্বচ্ছ জলের রঙ পাল্টে ঘোলাটে আকার ধারণ করতে লাগল ।তার ঝকঝক করা গর্বের বালির গায়ে পলি জমতে শুরু করল ।বালির পরিমাণ কমে যেতে লাগল ।অথচ তাতে তাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই ।
      একসময় শরতে তার জলের নাব্যতা এতটা ছিল যে এলাকার অনেক ক্লাব যেমন লক্ষ্মীনারায়ণ ক্লাব, রোবাষ্ট ক্লাব, মায়াছড়ি ক্লাব তাদের প্রতিমা ওর বুকেই বিসর্জন করত ।এখন শরতে কোথাও তার নাব্যতা নেই ।সব হারিয়ে এখন সে ভীষণ রিক্ত ।বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অসহায় মায়ের চোখের মতো শুষ্ক চোখে সে এখন প্রতিমাদের ধলাই নদীর বুকে নিরঞ্জনে যেতে দেখে এক বুক ব্যর্থতা নিয়ে ।রবিঠাকুরের "অজয় নদী "তো তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করেছিল ।কিন্তু সে তো মানুষের কৃতকর্মের ফল ভোগ করে চলেছে ।তার বুকের বালির পরিমাণ ও গুণগত মান কমে যাওয়ায় মানুষেরা এখন ধলাই নদীর বালি দিয়ে নির্মাণ করতে শুরু করেছে ।ফলে ফুলছড়ির সেই আকর্ষণীয় রূপ এখন শুধুই অতীত ।শুকনো মরসুমে পায়ের পাতা ভেজার মতো জল ।তবু তার বুকে মাছ শিকার করার জন্য সাদা বক, মাছরাঙাদের ভীড় নেই ।বুকে তো তার মাছেদেরও ভীড় নেই ।ফলে মাছের জন্য তার বুকে আর আগের মতো জেলেদের আনাগোনা নেই ।ভীষণ, নিঃস্ব রিক্ত একা একা লাগে এখন ।কখনো মনে হয় সে যেন নির্বাসিতা জানকী ।
      কোথায় যেন হারিয়ে গেছে তার সেই সব সোনালি দিনগুলো ।বসন্তের এলোমেলো দখিনা বাতাস রাশি বয়ে আনে না তার বুকে ।তার বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ভারি করে তোলে বসন্ত বাতাস--হারিয়ে যাচ্ছি আমি ।কিন্তু কজন মানুষের কান আছে তা শোনার!এই ব্যর্থতা কি শুধুই তার!নাকি তার তীরে বসবাসকারী তাদেরও যারা জীবনযাপনের সমস্ত জঞ্জাল তার বুকে বা তার মতো ছড়াদের বিসর্জন দিয়ে এখন আত্ম বিসর্জনের পথে ।এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে এখন পথ চেয়ে থাকে প্রকৃতির দিন বদলের অপেক্ষায় ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ