অভিনব আঙ্গিক ও ভাবনার উপন্যাস ‘জোব মুখুজ্যে বাক্যালাপ’ # শ্যামল ভট্টাচার্য

অভিনব আঙ্গিক ও ভাবনার উপন্যাস ‘জোব মুখুজ্যে বাক্যালাপ’ # শ্যামল ভট্টাচার্য
 
রামকুমার মুখোপাধ্যায় (জন্ম ৮ মার্চ ১৯৫৬) আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক। তাঁর লেখা গল্প পড়ছি আমি প্রায় তিন দশক ধরে। তাঁর গল্পের বই 'মাদলে নতুন বোল', 'রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের ছোটগল্প', 'পরিক্রমা', 'শাঁখা', ‘প্রিয়াঙ্কার ছেলেই’ এবং 'গল্পসমগ্র'  ও 'বাংলার এম এ' নামক গল্প সংকলনটি ছাড়াও আমি তাঁর লেখা ‘দুখে কেওড়া’, ‘ভবদীয় নঙ্গরচন্দ্র’, ‘ধনপতির সিংহলযাত্রা’-র মতো বেশ কয়েকটি উপন্যাস পড়েছি।
বিগত শতাব্দীর সাতের দশকের শেষে লিখতে আসা অন্য কয়েকজন শ্রদ্ধেয় লেখকের মতোই জীবনের যে গল্প রামকুমার বলতে চান, তা বাণিজ্যিক সাহিত্যপত্র নির্দেশিত পাঠকের ইচ্ছাপূরণের কাহিনি নয়। তাঁর আখ্যান বিন্যাসে সামাজিক অন্তঃস্বরের উপস্থিতি বিশেষভাবে টের পাওয়া যায়। তিনি কখনও জনসাধারণের অতৃপ্ত কামের 'উইশ ফুলফিলমেন্ট' করার স্বার্থে নিটোল গল্প লেখেন না, নিজস্ব সময় ও পরিসরকে বিশ্লেষণ করেন বহমান জীবনের গভীরে ডুব দিয়ে ডুবুরির মতো উদ্ভাসের আলোয়। এই উদ্ভাস আমাদের মতো কিছু পাঠককে বারবার আলোকিত করে। বিদগ্ধ ও সমাজসচেতন এই লেখক আখ্যানকে শুধুই কাহিনি মনে করেন না, নির্মিতি প্রকরণের গুরুত্ব মেনে নিয়ে তিনি নিজস্ব 'এস্থেটিক ডিলাইট' সৃষ্টির নেশায় নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। এভাবে চলমান জীবন প্রতিনিয়ত যে অজস্র সম্ভার রচনা করছে, সেই রচনাকে তিনি শিল্পের নিজস্ব বিন্যাসে রূপান্তরিত করতে থাকেন। বুদ্ধিমত্তায় দীপ্ত এই কথাশিল্পীর বুনন এত সূক্ষ্ম যে দু-দশকেরও আগে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো অগ্রজ মহারথী লিখেছিলেন, ' রামকুমার মুখোপাধ্যায় গল্প লেখেন না। পড়ে মনে হয়, তিনি ফেবল লিখছেন। ঈশপস ফেবল নয়। এ যে রামকুমার্স ফেবল। অব্যর্থ, অমোঘ অথচ সরল'।কার্নিভালের আবহ তৈরি করেন। বিশেষ থেকে নির্বিশেষ নয়, বরং নির্বিশেষ থেকে বিশেষের দিকে ফোকাস করেন।
আমরা জানি, কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে আধেয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, আধারও প্রায় ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। আধার ও আধেয়ের যথাযথ মিথস্ক্রিয়াতেই তৈরি হয় আধুনিক আখ্যান। ধরন আলাদা হলেও রামকুমারের প্রতিটি গল্প ও  উপন্যাসে  কাহিনি আধার হিসেবে ব্যবহৃত, গভীরতর কোনও সামাজিক অভিজ্ঞতা বা অনুভবের আকল্পকে ধারণ করার খাতিরেই তিনি শুধু কাহিনিকে ব্যবহার করেছেন, তাই প্রতিটি পাঠকৃতির অভিজ্ঞান পার্থক্য-প্রতীতির উপর নির্ভরশীল। 
 ‘আলোচ্য উপন্যাস ‘জোব মুখুজ্যে বাক্যালাপ’ ও তেমনই একটি ফেবল যেন। এই উপন্যাসের ‘জোব’ বা জোব চার্নক (১৬৩০-১৬৯২/১৬৯৩ ) ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন ইংরেজ প্রশাসক। কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র দেড় বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর কলকাতা ছেড়ে বাঁকুড়া জেলার বাড়িতে চলে যাওয়ায় তাঁর বেড়ে ওঠা গ্রাম্য পরিবেশে রাঢ় বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যে। ১৯৭৬ সালে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির (একটি আবাসিক কলেজ) থেকে ইংরেজিতে সাম্মানিক সহ বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. পাশ করার পর তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। তারপর কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কলকাতাতেই কাটিয়েছেন। কলকাতার সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ যাপনের প্রতীক হয়ে উঠেছে বর্তমান উপন্যাসের অন্যতম মূল চরিত্র রাম মুখুজ্যে, যিনি প্রায় জোব চার্নকের বয়সী। তিনি আরড়া গাঁয়ের কবিকঙ্কন  মুকুন্দ চক্রবর্তীর দোয়ার ছিলেন।  কবিকঙ্কন দেহ রাখার পর তিনি দেবী -চণ্ডীর পালা শোনাতেন।   একদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাঁচটা জাহাজ সুতোনুটির ঘাটে এসেছে। ভারী বৃষ্টিতে জল থইথই গঙ্গার পাড়। মুখুজ্যে জলে চরে বেড়ানো কইমাছ ধরে। কোম্পানির লোকেরা জাহাজ থেকে পাড়ে নামার অনুমতি চাইল। মুখুজ্যে হাত নেড়ে অনুমতি দিল। তারপর জাহাজ থেকে নেমে এক সাহেব তার টুপিতে করে করে কইমাছ ধরে মুখুজ্যের খালুইয়ে রাখে। তাতেই পরিচয় হয়, বন্ধুত্ব হয় মুখুজ্যের সঙ্গে জোবের- জোব চার্নকের। তারপর দু-বন্ধুতে নানা আলোচনা করে সুতোনুটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটিকে ধীরে ধীরে মহানগর করে তোলে। 
ঐতিহাসিকরাও  আগে জোব চার্ণককে  কলিকাতার (বর্তমানে কলকাতা) প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করতেন।   এই মতকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে ২০০৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ঘোষণা করে যে তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা উচিত নয়। আদালতের মতে খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলে বাসিন্দা থাকতে পারে। কলকাতার স্থানে 'একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র' বিদ্যমান ছিল। ঐতিহাসিকরা কালীঘাটে কালী মন্দিরের অস্তিত্বের পাশাপাশি এই এলাকার কালিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রও খুঁজে পেয়েছেন । এই অঞ্চলের প্রথম সাহিত্যিক রেফারেন্স পাওয়া যায় ১৪৯৫ সাল নাগাদ রচিত বিপ্রদাস পিপিলাই-এর বিখ্যাত রচনা মনসা মঙ্গল -এ ।১৫৯৬ সালে লেখা আবুল ফজলের আইন – ই - আকবরী’ গ্রন্থেও স্থানটির উল্লেখ রয়েছে। ১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারকে কলিকাতার জায়গিরদারি  প্রদান করেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা হয়েছে যে, তবে আধুনিক কলকাতার বিকাশের জন্য জোব চার্নকের পাশাপাশি আইর, গোল্ডসবরো, লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার (লক্ষীকান্ত রায় চৌধুরী), ইত্যাদিদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। 
অন্যান্য ঐতিহাসিক কর্তৃপক্ষ এখনও মনে করে যে: মূলতঃ জোব চার্নকের কল্পনা, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং তিনি যা সঠিক বলে মনে করেছিলেন তা বাস্তবায়নের ফলেই হুগলী নদীতীরের তিনটি ছোট গ্রাম ক্রমে ভারতের প্রধান শহরে পরিণত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাঙ্কাশায়ায়ের বাসিন্দা রিচার্ড চার্নকের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন এই জোব চার্নক। তাঁর বড় ভাই ছিলেন স্টিফেন চার্নক(১৬২৮ – ১৬৮০)।
জোব চার্নক এমনিতে খুব একটা মিশুকে ছিলেন না, কিন্তু তিনি ‘কোম্পানির প্রতি সর্বদা একজন বিশ্বস্ত মানুষ’ ছিলেন বলে তাঁর সেবাকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কাশিমবাজার তখন একটি চোরাচালানকারীদের আস্তানা হিসেবে কুখ্যাত ছিল। তাঁর ব্যবসায়িক দক্ষতার পাশাপাশি, জোব চার্নক কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে চোরাচালান বন্ধ করে তিনি যেমন কোম্পানির সম্মান অর্জন করেছিলেন, তেমনই অনেকের কাছে শত্রু হয়েছিলেন, যারা সারাজীবন ধরে তাঁকে অসম্মান করার জন্য নানারকম গুজব রটায়।
জোব চার্নক ১৬৮০ সালের ক্রিসমাস ডে -তে সমগ্র বঙ্গোপসাগর তটবর্তী এলাকায় কোম্পানির কাজকর্ম তদারকির নতুন পদ গ্রহণ করলে মাদ্রাজের প্রেসিডেন্ট স্ট্রেয়নশাম মাস্টার আপত্তি জানান। সেজন্যে কোম্পানির পরিচালকরা মাস্টারকে তাঁর হস্তক্ষেপের জন্য ভর্ৎসনা করেন। অবশ্য তাঁরা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির তত্ত্বাবধান থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে রাজি হন, ফলে চার্নকের হুগলিতে বাংলার শীর্ষ পদে পদোন্নতি পাওয়ার আশাভংগ হয়। কোম্পানি তখন উইলিয়াম হেজেসকে বঙ্গোপসাগর তটবর্তী এলাকায় কোম্পানির এজেন্ট এবং বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন।
হুগলিতে হেজেসের আগমনে চার্নক তাকে একজন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে পান। চার্নকের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করতে এবং তাদের চোরাচালান আবার শুরু করতে আগ্রহী কোম্পানির কর্মচারীদের ষড়যন্ত্রের ফলে কোম্পানির এই দুই প্রবীণ আধিকারিকের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বেড়ে যায়। হুগলি থেকে হেজেসের কর্মীরা স্থানীয় পণ্য চোরাচালান করে কাশিমবাজারে চার্নকের সহকর্মীদের কাজে বাঁধা দিতে থাকলে চার্নক আরও বিরক্ত হন। ১৬৮৪ সালে হতাশাগ্রস্ত পরিচালকরা মাদ্রাজের নতুন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম গাইফোর্ডকে আবার বাংলার তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন এবং হেজেসের  স্থানে জন বেয়ার্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।  
১৬৮৫ সালের ২৮শে আগস্ট গাইফোর্ড মারা গেলে, জোব চার্নক আবার বঙ্গোপসাগরে কোম্পানির এজেন্ট এবং প্রধানের পদ গ্রহণ করেন। এই সময়ের মধ্যে বাণিজ্যের উপর বিধিনিষেধ, এবং বিশেষ করে মুঘল নবাব কর্তৃক ৩.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা নিয়ে একটি সংকট দেখা দেয়, নবাবের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে হিংস্র সংঘর্ষে। জোব চার্নক যখন তাঁর পদোন্নতির খবর পান, তখনও কাশিমবাজার অবরুদ্ধ ছিল এবং তিনি ১৬৮৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত হুগলিতে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কাশিমবাজার ছেড়ে যেতে পারেননি। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহ্ণের পর তিনি ১৬৮৬ সালের ২০ ডিসেম্বর তারিখে নবাবের সৈন্যদের ধাওয়া করে নদী থেকে ২৭ মাইল (৪৩ কিমি) দূরে সুতানুটিতে নামিয়ে দেন। ১৬৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সুতানুটি থেকে হিজলিতে যান সেখান থেকেই তিনি ১৬৮৭ সালের মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত নবাবের সৈন্যদের আক্রমণকে প্রতিহত করে রাখেন।১৬৮৭র নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি এবং নিরাপদ উত্তরণের আলোচনা সফল হওয়ার পর, তিনি আবার বাংলায় কোম্পানির সদর দপ্তর আবার সুতানুতিতে স্থানান্তরিত করেন।
সম্ভবত সুতানুটির এই অবরোধের সময়ই চার্নকের ভারতীয় স্ত্রী তার স্ত্রী মারিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁরা প্রায় পঁচিশ বছর একসঙ্গে  ছিলেন। তাঁদের এক ছেলে এবং তিন মেয়ে ছিল, যাঁরা পরে মাদ্রাজে ব্যাপটিজম গ্রহণ  করেছিলেন।  মারিয়াকে খ্রিস্টানদের মতোই কবর দেওয়া হয়েছিল,  হিন্দু হিসাবে দাহ করা হয়নি, কিন্তু চার্নক প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সুফি প্রথা মেনে তাঁর সমাধিতে একটি মোরগ বলি দিতেন। তিনি ব্যারাকপুরে তাঁর বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন যাতে তাঁর সমাধির কাছাকাছি হতে পারে বলেও বলা হয়।
তাঁর পুরানো প্রতিপক্ষ উইলিয়াম হেজেসের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও চার্নক মাদ্রাজে গিয়ে অনিচ্ছুক কাউন্সিল সভাপতিকে বোঝান যে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান আর নৌবহরের জন্য গভীর জলের নোঙ্গর ফেলার সুবিধা থাকায় সুতানুটিই বাংলায় সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য সর্বোত্তম স্থান। এভাবেই সম্পূর্ণরূপে তাঁর একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের কারণে কলকাতায় ভারতের ভবিষ্যত রাজধানী নির্বাচন হয়েছিল। 
মূলতঃ তাঁরই উদ্যোগে ১৬৯০ সালের মার্চ মাসে, কোম্পানি দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে বাংলায় সদর দপ্তর পুনঃস্থাপনের অনুমতি পায়। ১৬৯০এর ২৪শে আগস্ট চার্নক কলকাতায় তাঁর প্রধান কার্যালয় স্থাপনের জন্য ফিরে আসেন। ১৬৯১ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি বাংলার নবাব ইংরেজদের "তৃপ্তি সহকারে তাঁদের বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার" জন্য একটি রাজকীয় সনদ জারি করেন।  
১৬৯২ এর ২২শে জানুয়ারি কোম্পানির পরিচালকরা বাংলার সদর দপ্তরকে মাদ্রাজের কর্তৃত্বমুক্ত করেন। তারপর থেকে কলকাতার আকার আয়তন ও গুরুত্ব ক্রমে বাড়তে থাকে এবং একসময় ভারতের রাজধানী হয়ে ওঠে। 
১৬৯২ সালের ১০ই জানুয়ারি জোব চার্নক কলকাতায় মারা যান। ১৬৯৫ সালে সেন্ট জন'স চার্চের কবরস্থানে চার্নকের সাধারণ কবরের উপরে তাঁর জামাতা এবং উত্তরাধিকারী আইর একটি সমাধি নির্মান করেন। এখন এটি একটি ঘোষিত জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ । 
এহেন জোব চার্নককে ‘জোব মুখুজ্যে বাক্যালাপ’ উপন্যাসে ফিরিয়ে এনে রামকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর ভাবনার আধার হিসেবে ব্যবহার করেন। খ্রিস্টিয় একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের নানা গভীরতর সামাজিক অভিজ্ঞতা বা অনুভবের আকল্পকে ধারণ করার খাতিরেই তিনি এই সময়ের কাহিনিকে নির্মান করেছেন অত্যন্ত সরস ভঙ্গীতে। যেমন, রাম মুখুজ্যে ও জোব চার্নক এখন আবার কলকাতাকে বদলে নতুন একটা রূপ দিতে চায়। সেই নব কলকাতায় বাস ও পাতাল রেল তুলে গোরুর গাড়ি চালানো হবে। ঘোড়দৌড়ের মাঠের গা ধরে ধান চাষ করা হবে আর নন্দনের মাথায় বীজতলা করা হবে। তাঁরা কিছু কাজের সূচনাও করে ফেলেন। 
কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় ভারতের সাহিত্য অকাদেমির সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ক্রমে পূর্ব ভারতের সচিব হিসেবে চৌদ্দ বছর ছিলেন, আর পরে তিনি সাহিত্য অকাদেমির বাংলা উপদেষ্টা বোর্ডের আহ্বায়ক হিসেবে বারবার উত্তর -পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গেছেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই উপন্যাসে তিনি জোব চার্নক আর রাম মুখুজ্যেকে জলপথে কলকাতা থেকে হলদিয়া সুন্দরবন হয়ে বাংলাদেশের মওলা বন্দর দিয়ে ক্রমে আসামের গুয়াহাটি ধুবড়ি হয়ে শদিয়া অঞ্চলে নিয়ে যান। আর তারপরই লকডাউন শুরু হয়ে যায়। সেখানে তাঁরা নৌকাহীন হয়ে পড়লে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে হেঁটে ফিরতে থাকেন, এভাবেই ধুবড়িতে রাম মুখুজ্যে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে একসময় প্রাণ হারান। কিন্তু সেখানে মঙ্গলকাব্যের চরিত্র নেতা ধোপানি তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে আনে। তারপর নিজের কাপড় কাঁচার কাঠের পাটা তাঁদেরকে দিয়ে দেয়। সেটি নিয়ে একা নৌকা চালিয়ে জোব রামকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই জোব কোভিডে আক্রান্ত হয়। কোভিডের টিকা আবিষ্কারের আগে সেই সময়ে তাঁরা যেভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখেন, রাম মুখুজ্যে নানা আয়ুর্বেদিক ঔষধ ও নানা শক্তিবর্ধক পথ্যের মাধ্যমে যেভাবে তাঁকে সারিয়ে তোলেন, তা ওই বিশ্বব্যাপী মহামারীর অনেক স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দেয়। আবার উপন্যাসে আমরা দেখি যে বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ ঠাকুর, গুডিভ ডাক্তার, ভোলা ময়রা ও টপ্পাগায়ক নিধুবাবু তাঁকে দেখতে আসেন। জোব সুস্থ হওয়ার পর লকডাউন উঠে গেলে তাঁরা আবার নৌকা ভ্রমণে বেরিয়ে কলকাতা থেকে নবদ্বীপ পর্যন্ত যান। কাটোয়া এবং কাশিমবাজারেও যান। দেখা হয় অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য লৌকিক ও অলৌকিক চরিত্রের সঙ্গে। জোবের নাট্যভাবনায় গেরাসিম লেবেদেভ, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর থেকে শুরু করে গিরিশ ঘোষ নটী বিনোদিনী, তারাসুন্দরী দেবীদের পাশাপাশি দর্শক হিসেবে সাহিত্য সম্রাট বংকিমচন্দ্র, রামকৃষ্ণ পরমহংস, ফাদার লাফোঁ, এডুইন আর্নল্ড, কর্নেল অলকট, ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়িতে চেপে নিধুবাবু,  তাঁদের সঙ্গে রাম মুখুজ্যে ও জোব চার্নকের বার্তালাপে রচিত হয় বাংলা সাহিত্যে আনকোরা ভাব ও ভাবনা এবং অভিনব আঙ্গিকের একটি উপন্যাস 'জোব মুখুজ্যে বাক্যালাপ'। রাম মুখুজ্যে যেন বাংলা সাহিত্যে কমলাকান্তের যোগ্য উত্তরাধিকারী। তাঁর কলকাতার বাড়ির চৌবাচ্চায় পালিত কচ্ছপ ‘কুর্ম’, বেশকিছু ব্যাং, বটের আঠার মতো দুধ দেওয়া গোরুগুলি, প্যাঁচাগুলি, মেঘনার সেই কুমিরটি কিম্বা তাঁর বাড়ির উঠোনের কয়েত বেলগাছ, নানা ঔষধিবৃক্ষ ও গুল্মের চাষ ও সেগুলির ব্যবহার সম্পর্কে পড়তে পড়তে প্রক্রৃতিপাঠের পাশাপাশি বারবার বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন হয়। শুধু চিড়িয়াখানা থেকে বাঁশের নল দিয়ে রাম মুখুজ্যের বাড়িতে দুধ পাঠানোর জায়গাটা আরও কিছু শব্দপ্রয়োগে বিশ্বাসযোগ্য করতে হতো বলে মনে হয়। কারণ বাঁশের নলে যে অব্যবহৃত দুধটা থেকে যাবে সেটা কিন্তু নির্দিস্ট সময়ের পরে নষ্ট হয়ে যাবে। বেশ কিছু ছাপার ভুল চোখে পড়লেও বিষয় ও আঙ্গিকের অভিনবত্বের কারণে পাঠকের কোনও অসুবিধা হয় না। আমার বিশ্বাস, ফেবলসের আঙ্গিকে লেখা এই উপন্যাস পাঠক যতবার পড়বেন, ততবারই নতুন নতুন ব্যঞ্জনা খুঁজে পেয়ে ঋদ্ধ হবেন।          

তথ্যসূত্র
• HE Busteed Echoes from Old Calcutta (Calcutta) 1908
• ভবানী রায় চৌধুরী, মান্না পাবলিকেশনের বঙ্গীয় সাবর্ণ কথা কালীক্ষেত্র কালিকতা। আইএসবিএন  81-87648-36-8
• অজানা (1829)। বাংলার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্কেচ; প্রাচীনতম বন্দোবস্ত থেকে, ইংরেজদের দ্বারা সেই দেশের ভার্চুয়াল বিজয় পর্যন্ত, 1757 সালে । কলকাতা।
• ব্রুস (1810)। সম্মানিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস: রানী এলিজাবেথের সনদ দ্বারা তাদের প্রতিষ্ঠা থেকে, 1600 থেকে লন্ডনের ইউনিয়ন এবং ইংলিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি 1707-8, ভলিউম। আমি _ ব্ল্যাক, প্যারি এবং কিংসবেরি।
• ব্রুস (1810)। সম্মানিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস: রানী এলিজাবেথের সনদ দ্বারা তাদের প্রতিষ্ঠা থেকে, 1600 থেকে লন্ডনের ইউনিয়ন এবং ইংলিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি 1707-8, ভলিউম। ২ . লন্ডন, ব্ল্যাক, প্যারি এবং কিংসবেরি।
• Marshman, John Clark (1867). The History of India From the Earliest Period to the Close of Lord Dalhousie's Administration I. Longmans, Green.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ