বোধিচক্রে বোধিসত্ত্ব || হারাধন বৈরাগী
কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাস ও হৃদয়পুর।মধুমঙ্গলকে বাদ দিয়ে হৃদয়পুরকে ভাবা যায় না।কবি যেনো হৃদয়পুরের হৃদপিন্ড।কবি যেনো মধু,হৃদয়পুরের মধু,এ এক অসম্ভব সমমেল!এক দুই নয়, অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ কবির। যেনো এক কাব্যমালা।এ যেনো এক মধুপ ফালা ফালা করে লিখে চলেছে হৃদয়পুরের সময়যন্ত্রণার লিপিমালা,যাপনের রজ মাখা ধারাজলের কাব্যগাঁথা,অন্ত্যজ-মানুষের অমিয়-কান্নাজল।যা পাঠকের হৃদয়কে ফালা ফালা করে।মানুষের বোধির কাছে কবির সংপ্রশ্ন পাঠককে হিমায়িত করে তুলে।অতীন্দ্রিয় ফাঁস,এমন এক ফাঁস,যে ফাঁস চর্মচোখে দেখা যায় না,অনুভবেও বুঝা যায় না,যা এক বোধাতীত ফাঁস,ইন্দ্রিয়াতীত ফাঁস;যা বুঝা যায় কেবল বোধিচক্র ভেদ করে।যখন কবি বলেন,-
"সীমান্তগ্রাম থেকে উঠে আসে একটি নিঃশ্বাসঃ/আমাকে ডাকে, আমাদের ডাকে/আমাদের তোমাদের ডেকে নিয়ে যায় পায়ে পায়ে পুরোনো পথে/অসামান্য আলোকপ্রভার থেকে শত শত মাইলের/নাগাল পেরিয়ে প্রথম কান্নার দেশে/
প্রথম কান্নার দেশে কোনও স্মৃতি জেগে থাকে না কি?/প্রথম কান্নার দেশে পথিকের গমন নিষিদ্ধ কি?/--খা খা শূন্যতা, অতলান্ত অন্ধকার,/হিম অনুভব ভিন্ন আর কিছু নাই?/
আর কিছু থাকে না কি জঠরের স্মৃতি বিষয়ক?/
আর কিছু থাকে না কি জরায়ুর কান্না বিষয়ক?/
আর কিছু থাকে না কি স্তন্যধারা, লজ্জা বিষয়ক?/-----/মানুষকি এতখানি ইতিহাসবিস্মৃত।/মানুষ কি পশুদের মতোই এক বিধ্বস্ত প্রজাতি!/
তবে কি প্রকৃত গমন বলে আমরা যা জেনেছি,তা আত্মহনন?/তবে কি প্রকৃত নিষ্ঠা বলে আমরা যা দেখেছি,তা পাপানুসন্ধান?/তবে কি প্রকৃত শিক্ষা বলে আমরা যা শিখেছি,তা মিথ্যা বুনিয়াদ?/---/তবে কি মানুষ শব্দটিকে অভিধান থেকে কেটে দেওয়া যাবে?"(মানবজীবন)।এ যেন মানবজীবনের ষঠচক্রভেদ।যেন ষঠচক্রভেদ করে সহস্রায় গমন কিংবা লক্ষকোটি যোনীচক্রভেদ শেষে যে জীবন,যে জীবনে গমন করেও গুহ্যপ্রদেশের শঙ্খিনীর স্বভাব পরিত্যাগ করে উঠতে পারেনি আজও সহস্রার মানুষ।কবি বুঝি অসহায়ের মতো,সেই বোধির কাছেই নিয়ে যান পাঠককে।
কবি বিস্ময়াবিমূঢ়, যখন দেখেন, মানুষের সামনে সুষম যাপনের যাবতীয় ফর্দ স্তরে স্তরে সাজানো,অথচ এ এক ধাঁধার মতো পলে পলে মানবতাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।কবি এমন জীবন-ধাঁধার জ্যামিতি পরিমিতি ভেদ করে ফেলেছেন,আর জীবনের ভালোবাসাকে নিংড়ে দিয়ে সবহারানো মানুষের বেদনায় কাতর হয়ে ,তাদের জীবন-ধাঁধার ফাঁদ থেকে বের হওয়ার মন্ত্রজল উচ্চারণ করে চলেছেন। অবশেষে সত্যদ্রষ্টা কবি যেনো এক দর্শনে উপনিত করেন পাঠককে।কবি যখন বলেন,-
"সুষম তালিকাপ্রধান জীবনের নষ্টতম একঘেঁয়েমির থেকে/যে পারে উদাস থেকে মূর্খ বা উদাসীন উন্মাদের মতো/একরোখা বিদ্রোহী হতে-/আমি তাকে প্রথম বৃষ্টির মতো লজ্জা আভরণে/একান্ত সত্তার কাছে দিতে পারি যথার্থ আশ্রয়।/
তারপর মৃত্যু আসে পানীয় পেয়ালা থেকে/বিনিময় হয় অন্যতম সুধাসঙ্কলন--/মৃত্যু যে এমন মুখর, এতখানি ঘরোয়াও হতে জানে/মানুষ জানেনা,কেবল,সারাটি জীবন ধরে জানবার বৃথা চেষ্টা করে।"(মৃত্যু বিষয়ক)
কবির বিশ্বাস, মানুষ যখন নিগূঢ় সত্য জেনে যায়।তখন সে নির্মোহ হয়ে যায়।তার লোভ থাকে না,লালসা থাকে না। মৃত্যু দূত ও তখন তার কাছে গোলাপ হয়ে ফুটে ওঠে। মানুষ হয়ে হঠে মানুষ। মানুষ হয়ে ওঠে এক আলোক-প্রভ।আলোর দূত। মানুষের মাঝে আর ভেদাভেদ থাকে না।আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে মানুষের মানুষ।কবি বলেন,-"সর্ববিদ জানা হয়ে গেলে প্রকৃত মানুষ মূক হয়ে যায়/নির্মোকের তত্ত্বজ্ঞানে অকারণ জয়লিপ্সা নেই/মধ্যমা তর্জনী ঘিরে কোন স্বপ্ন অযাযিত হিংস্র হয় না/
এবং মানুষের গৃহে মৃত্যুদূত গোলাপের হাসি নিয়ে আসে/এবং মানুষের বুকে জগদ্দল আর কোন পাথরই থাকে না/সীমাহীন উদাসীন মানুষ আলোর মতো সাবলীল হয়/
----/এই পৃথিবীর তাবৎ মানুষ যদি নির্মোহ বনে যায়/লতা-পাখি-মেঘেদের সাথে অহঙ্কারহীন মনুষ্যসমাজ/একাকার সমাপন্ন হবে,প্রভেদবিহীন।"
(সামাজিক)
আসলে মন-ই তো কুরুক্ষেত্র! মন-ইতো রজ্জু থেকে সর্প হয়ে যায়,মনই তো কখনও বাঘ কখনো হাতি কখনও গোলাপ ।কবির আক্ষেপ জীবন যেখানে এতো উজ্জ্বলের মন্ত্র ,তবু মানুষ অমানুষের কাছেই সমর্পণ করে নিজেকে।ষাড় কেঁপে ওঠে।কালোর কাছে হেরে বসে থাকে মানুষের সহোদর!আর প্রজন্মের ধারাক্রমে এ যেন ধারাপাত হয়ে চলে।কবি বলেন,-"মন বুঝি কুরুক্ষেত্র, মৃত্যু মাড়িয়ে হেঁটে যায় রোজ"
মানুষের মন মরে গেলে/ ভালোবাসা ফিরে গেলে অনাদি আঁধারে) অচেনা প্রবৃত্তি ভয়াবহ খেলা শুরু করে।/কখনো কোথাও যদি চিরহরিতের দেশে আলো কিংবা/হিংসাহীন স্বপ্ন জেগে ওঠে/আমার প্রাণেতে বাজে,/বেজে ওঠে/অনন্ত ঝু-ম-ঝু-মি"
বস্তুত লোভের চেয়ে ভয়ঙ্কর ধ্বংস আর নেই/
এত সবুজ এত সবুজ পৃথিবীতে এত প্রাণের মহিমা/মানবিক পৃথিবীতে তবু মাঝেমধ্যে অমানবিক ষাঁড় ক্ষেপে ওঠে।(অবস্থান)
মানুষ কি তবে কবির অনুভবে বিষধর এখন? কেননা চারপাশ থেকে বিষ নিতে নিতে বিষধর হয়েও কিনা মানুষ নিকষ কালো কিংবা অসুখের মতো চরম বিপদের সামনে সে অসহায়!আর এই অসহায় কিংবা নিজেরই করা সর্বনাশ কিংবা অসুখ থেকে আয়ুধ নিয়ে আমাদের আগামী প্রজন্ম মাথা তুলে দাঁড়ায়।আর প্রগাঢ় হয়ে ওঠে সর্বনাশা আরেক সিঁড়ি।
"আমরা কি সাপের মতো মুখোশের কাছে/মারা যেতে থাকি!/অমাবস্যা কত দূরে!তবু আমাদের মন/নিকষ কালোর কাছে/অতি তীব্র অসুখের কাছে/হেরে বসে থাকে!/(মৃত্যু,ক্রমাগত)
" আমাদের সর্বনাশ থেকে মাথা তোলে আগামী প্রজন্ম--"(খোঁজ)
জীবনের নৈরাজ্য যেন লেগে আছে তৎসম থেকে তদ্ভব রূপে। স্বাধীনতা বুঝি পরাধীনতার তদ্ভবরূপমাত্র।পতাকাহীন জীবন।কবি বলেন,-
"নৈরাজ্য নন্দিত সভায় কামের প্রসন্নদ্যুতি,আকাড়া আগুন/তৎসম স্তন থেকে তদ্ভব যোনির অসমর্থিত দিকচক্রবালে/বিভূতির ভ্রম"(সম্ভাব্য চিঠি)
"দেখতে দেখতে আমার কাটল আগস্ট অনেক/
একদিনও ঘুম ভাঙে না সকালে/একদিনও একটা পতাকা বানাতে পারি না"(১৫আগস্টের কবিতা)
কবি বুঝি এক দর্শনে উপনিত করেন আমাদের,কবি বলেন,-"পৃথিবী ও রমনী সুন্দর/তার থেকে বেশি অর্থবান তোমার নিজস্ব লিপি/অশ্রুতপূর্ব এই সুইসাইডনোট-"(শোক)
কিংবা-
"স্নায়ুর যৌগিক সেতু সীমান্তের পাখি হয় যদি/
তৃষ্ণা-ক্রোধ-সজ্জা ভেঙে চোখের প্রত্যন্তে লেখে/যাপনের রূপ,সর্বনাম--"(দর্শন)
মানুষ তবে ফিরে যাচ্ছে, পুরাতন বোধের কাছে! চেতনা ও বিবেক তবে কি আত্মসমর্পণ করছে ধর্মের কাছে!কেউ কিংবা দলবদ্ধ কেউ কি তবে সেই বোধের দিকে পরিচালিত করছে আমাদের?কবির মনে এই বোধ যেন অসার কোনো তন্নাত্র! তাই তিনি বলেন,-
"সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছে অতি পুরাতন পুঁজি/সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে দৈবী সংসার/বন্ধন নামছে,মোহ নামছে খ্যাতি অখ্যাতির চণ্ডাল স্নেহ/চারদিক থেকে ভেসে আসছে নরম নিরঞ্জন/তার দেহগাত্রে সভ্যতাবয়সি দীর্ঘ জিজ্ঞাসা/অভিজ্ঞতার অসাড় তুচ্ছতা"(অ-সিঁড়ি অন্ধকার)
আর এই থেকেই বুঝি মানবতার কাছে তা প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ওঠে-কবি যখন বলেন,-
"অনিবার্য প্রসন্ন শব্দ সব কালি শুষে নিয়ে/বর্ণমালা হয়ে ওঠে-"(অনিন্দ্য উদাস)।
কবির মনে হয়,-এই বর্ণমালাগ্রথিত শব্দসম্ভার যেন মোহন বাঁশরী!
"-----মানবিক শব্দে এত/ মোহন বাঁশরী কেন।"(শ্লোকের অধিক)
কিন্তু এই বাঁশরীর আওয়াজে বুদ হয়ে থাকা কবির দিকে যেন তেড়ে আসে খাড়া!আর এমন বাঁশরীময় নিরুপদ্রব অভ্যাসের জীবন ছেড়ে কবি পুনঃরায় ঢুকে যান সেই নিষিদ্ধ খাড়িতে যেখানে অরাজকতার চরম পর্যায় তুফান তুলে চলেছে।
"খাড়া ঝুলছে, চতুর্দিকে খাড়া ঝুলছে------/নিরুপদ্রবের অভ্যাসের নদী ছেড়ে/স্বভাবের নৌকো ঢুকে পড়েনিষিদ্ধ খাড়িতে/বাঘের হালুম আর কুমিরের হা-এর মাথায়--"(দিনলিপি)।রক্ত বীর্যে মেখে আছে যেনো এই খেলা,তাই নিরুপদ্রব জীবন শুরু হতেই ফের জ্বলে ওঠে সংহারময় জীবন।কবি বলেন,-
"রক্তের মধ্যে বীর্যের মধ্যে সে খেলার আবাহন/শেষ হতে হতে বেজে উঠছে শুরুর বাঁশি"(নিরন্তর)।আর একই অনুভবের বাজনা যেন বাজে এই লাইন গুলিতেও।এ যেন জ্বলতে জ্বলতে ফের আলো হয়ে ওঠা।কবি যখন বলেন,-
"মৃত্যুর সাথে হাঁটতে হাঁটতে /জীবনের সাথে দেখা হয়ে গেল"(পরিক্রমা)
"-এত ভালোবেসে আমাকে আগুন/ তুমি-ই জড়াও"(সঙ্গম)
"--উল্কাটি সৃজনসুন্দর-/
আমি তাকে ভালোবাসা ভাবি"(ভাব)।
পাঠক বার বার ঘুরেফিরে একই সময়-যাপনের যন্ত্রণার মাঝে যেনো ঢুকে যায়।কবি বলেন,-"তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি/অপেক্ষা এত মধুর।/বাস থেকে নেমে এল প্রেম/চুমু দিল,উঠে গেল ফের/মৃত্যুকে জড়িয়ে বুকে/ বাসস্টপে মন্দ লাগছে না।"(অপেক্ষা)
একটি হায়ের মুখ থেকে কবি যেন ফের জেগে ওঠেন অনাবিল জীবনের মোহে,আর ঘরের নিরুপদ্রব জীবনে ফিরে যান কিন্তু ফের ঘরের গেট থেকে যেনো পুনরায় ঢুকে যেতে থাকেন আরেকটি হা এর দিকে।কবি বলেন,
"বাড়ি ফিরে এলাম/বাড়ি ফিরতে পারলাম না"(দুর্ঘটনা)
"তুমি কোথায় তুমি কোথায়/লিঙ্গ ঘুরছে চতুর্দিকে"(দুর্ভাবনা)।কবির হতাশা পাঠকেও ঘিরে ধরে।শ্বাস বন্ধ করে দেয়।
বিপদের চরম সীমায় হতাশ মানুষ অবশেষে বাধ্য ও অসহায় হয়ে গতিহীনতার শিকারে পরিণত হয়,আর অবশেষে দুর্বলতার শিকারে পরিণত হয়ে নিজেকে ঈশ্বরে সমর্পণ করতে বাধ্য হয়।কেননা অগতির গতিই তো ঈশ্বর।
"কেউ ধান ভানিতেছে/কেহ ধানের থোড়ে দু-বাহু জড়াইয়া/রাধানাম জপিতেছে"(সাধন)।
ঘুরে ফিরে ফের সকলেই একই ডগমায় যেনো অবশেষে বাঁধা পড়ে যায়।
"আপনি দেখেছিলেন সুন্দর হাতের লেখা/আমি কারুকাজ,ব্রা/আপনি কি ততক্ষণে/কিশোর হয়ে ঢুকে পড়েছেন/আমাদের মধ্যে।"(বেলা)এ থেকে যেনো নিস্তার নেই।এযেনো,চিরন্তন এক সময়ভেলা যে ভেলায় ভেসে চলেছেন কবি,ভেসে চলেছে মানুষের বোধিসত্ত্ব।
||অতীন্দ্রিয় ফাঁস||মধুমঙ্গল বিশ্বাস
||প্রচ্ছদ||সুতপা নন্দী
||বিনিময়||১০০ টাকা
|প্রাপ্তিস্থান||অভিযান পাবলিশার্স
১০/২এ রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৯.
আলাপন-৯৪৭৭২৫১৪৪৯,৭৫৯৫০৬০৯৭৭
0 মন্তব্যসমূহ