তরুণ কবি জয়ন্ত শীলের কাব্যগ্রন্থ ||হারাধন বৈরাগী



তরুণ কবি জয়ন্ত শীলের কাব্যগ্রন্থ ||হারাধন বৈরাগী

"গোমতীর সামনের সন্ধ্যাকে"

গোমতী একটি নদীর নাম।নদী একটি জীবনের নাম। নদী একটি স্বপ্নের নাম‌ও।সভ্যতার ক্ষারপানি ধুয়ে নিয়ে যায় যে, সেওতো  নদী।নদী আবার দুঃখের নাম,নদী আবার সুখের‌ও নাম।আর নদীর পাড়ে আলো ফুটে ,নদীর পাড়েই সন্ধ্যা নামে।নদী সাক্ষী থাকে উল্থানের।নদী সাক্ষী থাকে পতনের।নদীর ভেতরে দাঁড়িয়ে নদীর দৃশ্য এক, ,বাইরে দাঁড়িয়ে আরেক।নদীকে ভালোবেসে জীবন চেনা যায়,জীবনকে ভালোবেসে নদী চেনা যায়।নদীতে আত্মহত্যা করে মৃত্যুকে জানা যায়।নদীযে কী তা বুঝে একমাত্র ভুক্তভোগী।নদী তন্মাত্র।নদী কাল,নদী মহাকাল!নদী কাল কিংবা মহাকালের হা-করা মুখ।নদী আবার ধরিত্রী কিংবা আকাশ।নদী আদি মাতা গোমতী!নদীর কথা বলে শেষ করা যাবে না।নদীর রূপ স্পোরাডিক কিংবা কিউবিক কিংবা সরূপ অরূপ। কাব্যগ্রন্থটি পড়ে মনে হল,কবি নদীভোরের ছবি দেখতে দেখতে সহসা দাঁড়িয়ে পড়েছেন নদীসন্ধ্যা-করালবদনীর মুখোমুখি।যেখানে ভোর থেকে সমস্ত দিনের আলো কিংবা দিনের সকল পজিটিভ তন্মাত্র ঢুকে যাচ্ছে একে একে।করালবদনা হয়ে উঠছে নদী। হতচকিত হয়ে উঠেছেন কবি।গো মানে জল কিংবা পৃথিবী=গো+মতুপ+ঈ =গোমতী।জলের ধারা বহন করে যে।সেই অর্থে জীবনের ধারা বহন করে যে ,সেই তো গোমতী।কবির চোখে গোমতীর সন্ধ্যা।এই সন্ধ্যা চোখে মেখে নদীর বুক আঁকেন কবি, জীবনের বুক আঁকেন কবি।যে বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে তুঁতপোকার মতো জীবনের ধারা যেন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে লড়াইয়ে ক্ষারপানি!এই থেকে উত্তরণের নমুনার দিশার দিকেই বুঝি কবির দ্রোহ ফুটে উঠে।এমন বিসর্পিল বলয়ে মানুষের যখন শ্বাস ঘনীভূত হয়,তখন কবি রুধিরাক্ত হন। মনুষ্যত্বের কোন পরিমাপ হয়না,তাই কবি শ্লেষের সুরেই বুঝি বলেন।আর তুঁতপোকার মতো তাতালে কবির নাভিশ্বাস ওঠে।তাই কবি বলেন,-"বুকে এক তুঁত পোকা বাসা বেঁধেছে /নতুন পৃথিবীর খোঁজে।/ সুড়ঙ্গের মতো গলি, ছাগলছানার ডাক,/ রাবার গাছের ল্যাটেক্সে মাছির আত্মহত্যায় - /এ পৃথিবী বহুদিন ঋণী।/ তাই চোখে এক কাপ মনুষ্যত্ব ঢেলে /নতুন পৃথিবী খুঁজে।/---/ 
তুঁত পোকা সুতো দিয়ে ব্রিজ তৈরি করছে /
ফুসফুস থেকে হৃৎপিণ্ডে, /পৃথিবী খুঁজতে যাবে বলে। /আমি অজ্ঞান হবার আগে/ 
দুই বক্ষদেশ ছিঁড়ে দেখি/ পৃথিবী খোঁজার কাজ ঠিকঠাক মতো চলছে কি না।"(নুতন পৃথিবীর খোঁজে)

কবি আমাদের দৃশ্যত মেকি আয়োজন কিংবা অন্তরশূন্য ডামাডোলের বড়াইতে অসম্ভব ব্যাতিত হন,তাই বলেন-"সামনে ছিলো নানান ট্রফি, অবনী/ ঘোষের লিভার কিউব, কেরোসিন তেল।/ 
পঞ্চায়েতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অর্জুন/ 
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সনজিৎ দাসের বাড়ি।/ 
আমিও ' থ ' হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। /
সাতটি মহাদেশ আর পাঁচটি মহাসমুদ্রের সাথে /
স্বপ্ন মিশিয়ে মা কাঁথা সেলাই করে।"( অতঃপর)

কবি মনে করেন নদীবাহিত জীবনের ভেতরে বাইরে জঞ্জাল, মানুষের অমানবিকতা কিভাবে মানবতার গলায় ফাঁস ঢেলে শ্বাস রুদ্ধ করছে নদী-জীবনের।আর তার দৃশ্য চোখে দেখে কবি অসম্ভব ব্যথিত হন।দমবন্ধ প্রতিবাদ ধ্বণিত হয় কবির চেতনায়। ।-"জম্পুই এখন কুয়াশাভেজা মাঠ,/তার পাদদেশে ঘাসের শিশিরে/ প্রণয়জাতকের গায়ে লেগে থাকে কাঁচা রক্ত।/ /আগ্নেয় বিমর্ষতায় তাই মাঝে মাঝে /গ্রিকবীরদের মতো জেগে ওঠে মুহুরী।/ চোখের আবর্জনার স্তূপের পাশে দাঁড়ালে 
সূর্য থেকে ঝরে পড়ে কালি।"(রাতজাগা পাখি )
  
এই যখন অবস্থা।যেখানে মানুষের মানবতা বিষ-বাষ্পে জর্জরিত,তখন মানুষের সন্তান যারা ভাবী  প্রজন্ম,দেশের ভবিষ্যৎ।দেশগড়ার,সভ্যতার আলোর হাতিয়ার ,তাদের ভবিষ্যৎ জীবন যৌবন কিংবা মূল্যবোধ তৈরীর কথা ভেবে অসম্ভব ব্যাথিত বুঝি কবি। তিনি ভাবেন এমন পরিবেশে কি করে নিজের উত্তরাধিকারকে অসিমান্তিক সূর্যবলয়ের প্রতিনিধি করার প্রত্যাশা করতে পারেন।কবিকে অসম্ভব আক্ষেপ আর অভিমান তাড়িত করে ।আর এক ঝাঁক অভিমান ঢেলে দেন বিষন্ন সন্ধ্যামুখি গোমতীর জলে। তিনি বলেন- "এখনও অক্ষর জ্ঞান কিছুই শেখা হয়নি/ 
শব্দার্থ জানা হয়নি তোমার চোখের পাতার,/ 
ঢাকের দামামা আওয়াজে /
রাইমা-সাইমার মিলনস্থল থেকে শোনা যায় কান্না।/ গোমতী নদীর মাঝি যখন নদীতে ভাটিয়ালি সুর/ তোলে /তার পালে লাগে - /দীর্ঘদেহি পুরুষের সেই দীর্ঘশ্বাস। /এখনও বর্ণমালা শেখা হয়নি/ তোমার দূরত্ব মাপি আলোকবর্ষের এককে। /তুমি জানো না - /
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী /
শূন্য থালা হাতে বসে আছে পথের ধারে, /
আগমনীর বার্তা দেবে বলে!/ 
একটু একটু করে আমার সমস্ত আবেগ /
জমিয়ে রেখেছি নদীর মোহনায়, /যেমন করে শিশিরবিন্দু বুকে আগলে রাখে ঘাস,/ লতাপাতা। /
সমস্ত দুঃখগুলো আমার বুকের মধ্যে /
এখন গোমতীর তীরে কাশফুল দোলে /
তাদের সামনে একবুক প্রেম নিয়ে /
একা বসে থাকি। /
হঠাৎ মনে পরে যায় /একটি নিঃসঙ্গ শালিকের করুন মৃত্যু ! /সেই কী করুন... /
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করে কুকুর।/(আগমনী)

মানুষ কিভাবে সভ্যতার নিভু নিভু পিলসুজ হয়ে ওঠে, আর সেই পিলসুজকে জ্বালিয়ে রাখতে ভাবীপ্রজন্ম ক্লেদ রক্ত রজ রসে মূর্ছনার মতো নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে কালানিপাত করে চলেছে ঝাড়ুদারের মতো।ঝাড়ু তো নয়,ছুরি হাতে নিয়ে। ছেলেটি বুঝে ঝাড়ু সেকেলে!।এই চিত্র‌ই বুঝি ফুটে উঠেছে কবির রিদমহীন কবিতায়।কবি বলেন-"আর দেরি না করে/ ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ছেলেটি ;/
থরে অভিনয় করা গাছগুলি দাঁড়িয়ে থাকে, /
ছেলেটি তাদের সামনে সেচ্ছাসেবকের মতো ছুটে/ যায়। /জমাটবাঁধা মরা রক্তের দলাগুলো টেনেহিঁচড়ে/ হাতের আঙুলে পেঁচিয়ে নেয়, /
ঝরাপাতা গুলো চেঁচিয়ে বলে -/যদি আমরা বেদুইন হতাম!/ নানা কৌশল করে গা থেকে ছাড়িয়ে নেয়/ একটু একটু করে চামড়া। /
এই দৃশ্যের কোনো দহন যন্ত্রণা নেই!/ 
বিচিত্র প্রদর্শনীর মতো সাদাটে রক্ত সংগ্রহ করে/ নেয় /একটি বাটিতে। /আমরা সামাজিক জীব, স্থবির চলচিত্র দেখি।/--কোনো গোপন দুঃখ নেই,/ 
সভ্যসমাজ এর নাম দেয়/ ল্যাটেক্স সংগ্রহ।"(ল্যাটেক্স সংগ্রহ)

সময়ের বেনো জলে ক্লান্ত কবি,সময়ের রেঙ তাঁর বুঝি গা-সহা হয়ে ওঠে।তাই শুরুতে যেমন ক্লান্তিকর মনে হয়েছিল।এখন তা, চোখে মনে ও শরীরে সর্বংসহা হয়ে ওঠে।ঘুরির আনন্দ নেই আর প্রজন্মের হাতে।শাসন নেই আর। তাই কাকের মতো হানাহানি‌ও বুঝি  এখন কবি ও তার সতীর্থদের কাছে সময়লিপি যেন এক শিল্পীত তুলির টান হয়ে ওঠে।কবি তা কোন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে দেখেন।আর নিজে আত্মহননের মতো দংশনে ক্রমশ কাতরাতে থাকেন।প্রলাপ করতে থাকেন।তার বেদনা পাঠককে রুধিরাক্ত করে। গোমতী'র আকাশে আর ভোরের আলো নেই।নেমে আসা সন্ধ্যাও কবির তখন বুঝি স্বপ্ননীল মনে হয়।যখন তিনি বলেন-"বিদীর্ণ বিকেল এখন ক্লান্ত হয়না/ আকাশের কাছে ঘুড়ি পাঠালে/ আকাশ ঘুমিয়ে পরে।/ গোমতীর সামনে সন্ধ্যাকে ভীষণ মানায়,/ রাস্তা দিয়ে পৃথিবীকে বেঁধে রাখি বলে /তেমাথার মোড়ে ট্রাফিক বসে না। /সময় - /সে আর আমাকে শাসন করে না। /বুকপকেটে কলমের পাশে/ খাম ভর্তি সময়গুলোকে কাক ঠোকরাতে এলে/ নদী শিল্পী হয়ে ওঠে।----"( গোমতীর সামনের সন্ধ্যাকে)

কবি অসম্ভব ব্যাথিত হন।নদীর পরতে পরতে ভেসে ওঠে বৃক্ষের ছায়া। বৃক্ষ তো জীবনের প্রতীক।কবির চোখে তবে কি সময়ের শৈশব ভেসে ওঠে!তিনি এগিয়ে গিয়ে তবে কি যে শবাধার দেখেন,একি তবে মৃতসময়ের বেনোজলের শবাধার।যেখানে বৃক্ষের ছায়াকে ভ্রম বলে মনে হয় তাঁর।হতাস হন কবি ।আর স্বপ্ননীল বৃক্ষ বা আসলছায়া শরীর থেকে খুলে সময়ের আলকাল্লা গায়ে জড়িয়ে বৈঠা হাতে ধরেন? মনে হয় তাই।আর আসল ছেড়ে নকলের সং দেখে নদী বুঝি উত্তাল হাওয়ায় মাথা কুটতে থাকে।কবি যখন বলেন-
"----নিস্তব্ধ গোমতীর জলে ভাসতে থাকে/ 
বিশাল বৃক্ষের ছায়া। /আমি তৎক্ষনাৎ ছুটে যাই - /
-----এক অদৃশ্য শবাধার। /-----ছায়াকে ছাঁড়িয়ে নিয়ে/ ছুঁড়ে ফেলি নদীর জলে। /
সে চিৎকার করতে থাকে, /
চারিদিকে হাহাকার --উঠে।/ অদূরে জলযুদ্ধে, /
একবার ডুব দিয়ে আমার দিকে /মীনচোখে চেয়ে দেখে ছায়া।/ নদী উত্তাল হয়, /মাতাল হয়ে উঠে।---"(ছায়া)

এই থেকে একসময় বুঝি সর্বংসহা জীবনের‌ও ধৈর্য্য চ্যুতি ঘটে।ক্ষোভে নেচে ওঠে চরাচর।বুকে যাবতীয় ক্ষোভ দলা দলা জমা করে রুখে দাঁড়াতে চান কবি।এমন‌ই মনে হল কবিতাটি।চলুন এবার দেখি-"গোমতীর মস্ত হাওয়ার টানে/ 
ঘড়ির কাঁটায় কত যে মিনিট মরছে/ 
বর্ণনা সব শুনেছি।/ ছেঁড়া জুতোয় ফিতেটা বাঁধতে বাঁধতে/ বেঁধে নিই আকাশের বুকে জমা কালো রক্ত।/ সব নদীপথ বন্ধ হলো,/ তোমার আমার মাঝের যে দিনগুলো/ রাস্তা দিয়ে চলে গেছে /দুপাশে পাখির মতো, দুটো হাত দোলাতে/ দোলাতে, /আমি তাদের দেখে এসেছি /
আকাশের নীল গায়ে, /শপথের ইস্পাতে।(অ্যালজোলাম) /
 
অবশেষে সমস্তদিনের ক্লান্তি মাড়িয়ে ঝড়বৃষ্টি শেষে কবি বুঝি বুকভরা শ্বাসের পরিমণ্ডল দেখেন।সব কিছু ধোয়ামোছা শেষে নদীর বেনোজল ডুবে যায় সাগরে।নদীর নৌকো পালতুলে ভাটিয়ালি গান গায়।কবি তাই বুঝি বলেন-"তারপর হাত পা কেটে ছেড়ে দেওয়া হলো/ 
একটি নদীকে, /সে কোনো শব্দ করলো না, /
নিশ্চুপে বয়ে যায়।/ বাকলের গা থেকে নিজেদের /
আলগা করে নেয় তটের জিওল গাছগুলো। /
ব্যথার নিরেট গুলি জড়ো করে গুণতে গেলে /
চিৎকার করে বলে উঠে - মন্বন্তর।/ ঝড়িয়ে দেয় একটি একটি করে পাতা। /অনায়াসে নদীর জলে ভেসে যায়,/ কাউকে কিছু বলতে হয়না। /
মাঝে ঝুলে থাকে একটি/ পালতোলা নৌকা।"(একটি নদীর প্রতি )

কবি অবশেষে বুঝি আয়ামে নিঃশ্বাস নিতে নিতে ,একটি বেনোজল সময় হাতড়ে গিয়ে বিজয়ীর মতো পুরোটা সংগ্রামের তর্জমা করেন।আর একটা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করেন নিজেকে।এও যেন নিজের কাছে নিজের ছবি দর্শন।যা মিথস্ক্রিয়া থেকে প্রাপ্তি বলে মনে হয়। কিংবা স্বমেহন।আর বুঝতে পারেন কাণ্ডারি কারা। তাই তিনি অবলীলায় বলতে পারেন-"ম্যাচবক্সের ভিতর আমরা সবাই /
কাঠি। /পিতা ধৃতরাষ্ট্র, মা গান্ধারী,/ 
মাঝে মাঝে আমরা ফুলকি দিই।/ 
এযুগে বিদুর নেই — /বারুদে স্ফুলিঙ্গের ক্ষমতা কতটুকু/ কেউ জানে না।"(ম্যাচবক্স )

একটা জয়কে পরাজয় দিয়ে আঘাত করে পর্যুদস্ত করে দেওয়া কিংবা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দিকে‌ই কি কবি পাঠককের দৃষ্টির আলো ফেলতে চেয়েছেন।হয়তো তাই।নয়তো এতো ঝড়বৃষ্টি শেষে পালতোলা নৌকো,একটা ধারণায় পাঠককে উপগত করা, অর্থাৎ পরবর্তী কবিতাটিতে অবতরণের মানে বুঝা যায় না।যখন কবি বলেন-"এরপর আর বিলম্ব না করে /সজোরে ড্রাম পেটানো শুরু হল।/ অপহরণ করে আগেই দেশলাই বাক্সে/বন্দী করা হয়েছিলো তাদের রাণীকে। /দলিতদের মতো মৌমাছিগুলো জড়ো হয়,/ সংসার পাতে /অক্ষম ঔষধের বদনাম নেওয়া শুষ্ক কান্ডে। /হঠাৎ বন্দী রাণীর কথা মনে পড়লে/ মাতালের অস্থিরতা মাধুর্য হয়ে ওঠে,/ 
নিকোটিনের ধোঁয়ায় চাঁদের শরীর ছোঁয়ার মত/
আলতো আলতো করে ছুঁতে যাওয়া হয় তাদের/ শরীর। /অভিশপ্ত ফঁণা তুলে শুষে নেওয়া হয় /
তাদের সমস্ত মউ!"(অভিশপ্ত ফঁণা )

অবশেষে বুঝি কবির বোধোদয় ঘটে। অসম্ভব রোদ মাড়িয়ে স্নেহের বাতি জ্বালায় যারা,তাদের মূল্যায়ন হয় না।তারা অবহেলিত হয়েই বিদায় নেয়।অথচ যারা কিছুই করল না তারাই সলতে নাড়ে।আগুন জ্বলে ওঠে।মায়ের কোল খালি হয়।নারীর ভালোবাসার ঘর ফাঁকা হয়।আগুনের ফুলকি দিয়ে যে বাহকেরা শান্তির নীড় তৈরী করেছিল।তারা বুঝি নিজে থেকেই অন্তরালে চলে যায়, অসম্ভব অভিমানে।যা পাঠককে বিমর্ষ করে তুলে।তাই কবি বলেন-"দুর্ভিক্ষের পর /
জাতি আলপথে দাঁড়িয়ে ধানের গন্ধ শুকে নেয়,/ 
স্বপ্নের ভিতর ফুটে উঠে স্নেহের মতো রোদ। /
দেশ শুধু চেয়েই থাকে। /রোদের কণাগুলো আমাদের জন্য আগুন আনে/ বিকেলে ছাই রেখে চলে যায়..../এরকম হবার কথা ছিলো না।/ 
--আক্রোশের মুখোমুখি হই, /---কাগজের অক্ষর ফুঁড়ে /সোজা হয়ে বসে, /দেশ ও জাতির দ্বন্দ্বে আমার দ্বারা /আমি খুন হই। /দেশ শুনে বলে উঠলো - আহারে! /সাদা পুটলির মতো বসে আছে /শবের মায়েরা, /আগুনের বৃষ্টি দিয়ে হেঁটে আসার পর /মানুষের আর খাবার রুচি থাকে না, /
আমি একা একা নিজেকে স্মরণ করি।"(গলন)

কবি জয়ন্ত শীল অসম্ভব তরুণ।সহজ সরল তাঁর কথা ও চিত্রকল্প।শুরু থেকে শেষ,এক একটি কবিতা পাঠককে টেনে নিয়ে যায় ভাসানের দিকে।পাঠক হিসেবে,আমাকে ছুঁয়ে গেছে কবিতা গুলি।তাঁর বলায় কোন দ্ধিধা কিংবা জড়তা নেই।সময়কে বুঝি বাল্টি করে স্নান করেছেন কবি। আমার তাই মনে হল। কিছু কিছু চিত্রকল্পে কবির অনুভূতি ও আঙুলকে তারিফ না করে পারা যায় না।যেমন ,-"ছেলেটি তাদের সামনে সেচ্ছাসেবকের মতো ছুটে"/"ফঁণা তুলে শুষে নেওয়া হয় /তাদের সমস্ত মউ!/"কিংবা "বারুদে স্ফুলিঙ্গের ক্ষমতা কতটুকু/ কেউ জানে না।"/"স্বপ্নের ভিতর ফুটে উঠে স্নেহের মতো রোদ।"/ "আগুনের বৃষ্টি দিয়ে হেঁটে আসার পর /মানুষের আর খাবার রুচি থাকে না,"

আমার মনে হল কবি অনেক সরাসরি প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন।আসলে তা নয়, তা নয়।এখানেই জয়ন্তের কবিতায় মোহমায়া।এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ।সবেমাত্র শুরু। প্রচ্ছদ ভিন্নরকম হলেও হতে পারতো। আমার বিশ্বাস কবি অসম্ভব পরিণত হয়ে উঠবেন একদিন। আমি তাঁর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।চরৈবেতি।

কাব্যগ্রন্থ: গোমতীর সামনের সন্ধ্যাকে
প্রকাশক-প্রীতম ভট্টাচার্য 
জ্ঞান বীক্ষণ প্রকাশনী(উদয়পুর)
প্রচ্ছদ - শারদ ভট্টাচার্য 
মূল্য - ৪০ টাকা 
মোবাইল -৯৪৮৫৩৩৩০০৪

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ