কবি সমর চক্রবর্তী || হারাধন বৈরাগী
কবি সমর চক্রবর্তী।জন্ম ১৯৫২,২৬শে ডিসেম্বর। তাঁর যাপনকেন্দ্রিক শহর ধর্মনগর। ছোটবেলা থেকেই তাঁর কবিতায় হাতেকড়ি।তিনি ত্রিপুরার সত্তর দশকের কবিদের অন্যতম।সাম্যবাদী চেতনায় বিশ্বাসী কবি যখনই মানবতার অবক্ষয় দেখেছেন তিনি গর্জে উঠেছেন তাঁর স্বভাবোচিত ভঙ্গিমায়।তার চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দ্রোহবীজ। বামপন্থী চেতনায় জাড়িত হলেও বামাবর্তের অবক্ষয়েও তার প্রতিবাদ ধ্বণিত হয়েছে অহরহ।তাঁর শ্রেণীচেতনা আসলে মানবতার মূর্তপ্রতীক। তিনি সবকিছুর উপরে মানবতার জয় গান গেয়েছেন,যা প্রবলভাবে আমাদের নাড়িয়ে যায়।জীবনকে তিনি দেখেছেন পলে পলে জীবনের নেশা পান করে।অন্ত্যজশ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে।এই অবধি তার তিনটি কাব্যগ্রন্থ -খাকি পোষাক ছিঁড়ে কবিতার খাতা,বরফিকাটা খিড়কি ও জীবন বড়ো নেশা হে! পাশাপাশি তাঁর লোকসংস্কৃতি বিষয়ক কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধও আছে।এই প্রবন্ধগুলি তার শ্রেণীচেতনাকে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দেয় তাঁর কবিতার সত্ত্বা ও কবির চৈতন্যকল্পদ্রুম। তাঁর প্রবন্ধগুলি হল-উৎসবের উৎসে, লোকসংস্কৃতি লোকপার্বণ,কুঁড়িপাতার লোকজীবন।এগুলি থেকে কবি সমর চক্রবর্তীকে আলাদা করা যায় না।আলাদা করা যায় না তাঁর কবি সত্ত্বাকে। তাঁর কবিতা ত্রিপুরার গ্রামজীবন, চাবাগানের শ্রমিক ও তাদের মূলজকেন্দ্রিক।মূলজের টানে কবি নিজেই জড়িয়ে গেছেন মূলজের ভেতরে।তাই তিনি স্বমহিমায় বলতে পারেন_জীবন বড়ো নেশা হে।এই বলার মাঝেই তাকে চিহ্নিত করা যায়।জীবন সত্যি বড়ো নেশা যেন!
শিকার -১
জীবন বড়ো নেশা হে!
হাডবাড করে টানে-,
ঝিঁঝির কান্না আর
রোদের মাঠের ঘূর্ণি তুলে
খেদা করে নিয়ে যায়,
খোলা বুক ভরে ওঠে
আকুল উচ্ছাসে!
কিন্তু তুমি কে বটে
ক্ষমতা অসীমের আশ্চর্য শরীর?
গাঢ় আলিঙ্গনে ,
পূর্ণপাত্র নিঃশেষ করার পরও
যেভাবে জেগে থাকে ঘোর,
মুহুর্তের নিভৃতি পেতে
টেনে নিয়ে যায় সমূলে!
অসীমান্তিক হে আমার
অপার অবয়ব!এই চরাচরে
তুমি দৃশ্য হও।নেশায় প্রতিশ্রুত,
পায়ে মাটি মাখা আমি এক তুচ্ছ মানুষ!
বারবার বিফলতার পরেও তুমি দেখো
জীবন শিকারের আগে আমি যেন বিদ্ধ না হই।
অশ্বক্ষুরের দূরন্ত আস্ফালনে
যেখান থেকে প্রথম
অভিবাসন শুরু হয়েছিল
বারবার আবাদের শেষে
নারীর শরীর থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল
শষ্যের ঘ্রাণ!হে জীবন!
সে রুদ্ধগান নিয়ে আমি আজ-
তুমি বাড়াও!বাড়াও অপার তৃষ্ণা আমার।
এই জলে ,আকাশে,অরণ্যের আশ্চর্য পুলক
আমাকে শিহরিত ও উদ্ভাসিত করে।
বিগত কয়েক পুরুষ ধরে চাবাগানের শ্রমিক বিশেষ করে যাদের আমরা বাগানিয়া বলে ডাকি,যাদের এখন চাজনজাতি অভিধায় ভূষিত করেছি ,বিশেষত তোড়িয়া,ভর,রিকিয়াসন,ছত্রি,কুরসি,কোল,নুনিয়া,করম,খান্দাইত,খারিয়াকন্দ,বাউরি,ভূমিজ,বাগদি,ওরাওঁ, সাঁওতাল, রাজবংশী ,মুন্ডা ইত্যাদি পদবীধারী লোকেরা যারা আড়কাঠিদের ফাঁদে পড়ে নিজেদের অজান্তেই শিকার হয়ে গেছে ,এই সব নিম্নবর্গীয় মানুষদের অন্তর বেদনাই এই কবিতার অন্তরজাল রূপে দীপ্যমান।এইসব মানুষদের জীবনে প্রথম স্থান পরিবর্তন ভাষা পরিবর্তন,পেশাপরিবর্তন,ধর্মপরিবর্তন , সংস্কৃতি পরিবর্তন , শুরু থেকে এই অবধি তাদের মূলজ উৎপাটনের নিগঢ়ে এই কবিতাটির কান্নামাদল আমাদের রুধিরাক্ত করে।তাদের জীবনের শূন্যতার ক্রন্দনধ্বণি কবিতাটির ছত্রে ছত্রে টেনে নিয়ে যায় পাঠককে এক চুম্বকীয় আবেশে।তাদের জীবন অসীম বঞ্চনার নিগঢ়ে শূন্যতা শুধু শূন্যতা।শূন্যজীবনে পূর্ণতা আনে নেশা।জীবনটা যেন তাদের একদিকে নেশার পূর্ণ কুম্ভ।অন্যদিকে মনুষ্যতের অচলায়তনে জীবনের নেশাপাত্র যেন তাদের হাডবাড করে টানে ।প্রকৃতিমানব প্রকৃতির ইঙ্গিতের অমোঘ টান ঝিঁঝির কান্না আর রোদের মাঠের ঘূর্ণি তোলে তাদের টেনে নিয়ে যায় জীবন শিকারের দিকে।হাডবাড করে টেনে নিয়ে যায়।ঝিঝির কান্না আর রোদের মাঠ যেন তাদের জীবন লাভের নেশার আশ্চর্য দ্যোতক হয়ে ওঠে।খোলাবুক ,শেকড়হীন সম্বলহীন নিশ্ব বা শূন্যবুকে তখন আশার সঞ্চার হয়।জঙ্গলে ঝিঁঝির কান্না আর রোদের মাঠ যেন তাদের জীবন শূন্য মরুবুকে মরুদ্যান সৃষ্টি করে ।নাপাওয়া জীবনের নেশায় মত্ত সেই অন্ত্যজ মানুষরা জীবনের টানে কিংবা কোন অসীমান্তিক অভিলষিত জীবনের লক্ষ্যে আকুল উচ্ছাসে ছুটে চলে কেরিকাঁটা পথে।একবার হলেও সে জীবন নামক অসম্ভব অমিয়সুধা পান করতে চায় নিজের জীবন শিকারের আগে।এই জীবন শিকার যেন আর কিছুই নয়।এই চলিত জগদ্দল জীবন নামক চরম নাগপাশ থেকে মুক্তির আস্বাদ।ঝিঁঝির কান্নার মতো তাদের যে জীবন তা-ই জীবন শিকারের জন্য তাদের বুকে রোদের মাঠের মতো ঘূর্ণী তুলে।কিন্তু তার পরও জীবন অধরাই থেকে যায়।কবিও তাদের একজন হয়ে উঠেন।কবিকে বাগানীয়া থেকে আলাদা করা যায় না।তাই তিনি বলতে পারেন
"জীবন বড়ো নেশা হে!
হাডবাড করে টানে-,
ঝিঁঝির কান্না আর
রোদের মাঠের ঘূর্ণি তুলে
খেদা করে নিয়ে যায়,
খোলা বুক ভরে ওঠে
আকুল উচ্ছাসে!"
পরক্ষণেই তার ঘোর কেটে যায়, তিনি বলেন
"কিন্তু তুমি কে বটে
ক্ষমতা অসীমের আশ্চর্য শরীর?
গাঢ় আলিঙ্গনে ,
পূর্ণপাত্র নিঃশেষ করার পরও
যেভাবে জেগে থাকে ঘোর,
মুহুর্তের নিভৃতি পেতে
টেনে নিয়ে যায় সমূলে!"
তুমি কে? এই 'তুমি' অবশ্যই তাদের জীবনদেবতা।তাদের টেনে নিয়ে যায় এই মানুষজনদের জীবনের দিকে।এক গাঢ় আলিঙ্গন,যে আলিঙ্গন তাদের জীবন লাভের আশায় বারবার নিঃশেষ করে দেয়।জীবন লাভের আশায় তারা সর্বস্ব সমর্পন করে নেশার কাছে। সমর্পনের শেষে সব কিছু উজাড় হয়ে গেলেও জীবন শিকারের নেশা কাটে না।ঘোর থেকে যায়।এই ঘোরই তাদের জীবনলাভের আরেকটা মাইলফলক হয়ে যায়।এই জীবন থেকে মুক্তি লাভের জন্য আরও তারা যেন মরীয়া হয়ে ওঠে।
আবার এও হতে পারে,তাদের জীবনের পাত্রে আর কিছু যেন অবশিষ্ট থাকে না।পাত্র শূন্যতার মদিরায় ভরা।চুমুকে চুমুকে নিঃশেষ করলেও যে পাত্র শেষ হয় না।এমন ঘোরের মাঝেই যাদের জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ।তাই পুরোজীবন,জনুক্রম তাদের ঘোরের মধ্যেই জেগে থাকে।চুমুকে চুমুকে পানের আধার হয়ে ওঠে তাদের জীবন।মনে হয় জীবনই যেন নেশার আধার।আর এই নেশাই যেন তাদের নেশার মতো বারবার টেনে নিয়ে যায় জীবনের নেশায়।জীবন লাভের কিংবা জীবন শিকারের নেশাকে অমোঘ করে তুলে।জীবনের জন্যেই নেশা।মাঝে মাঝে হতাস হয়ে জীবন শিকারের নেশা থেকে যেন তার পরিসমাপ্তি চায়।সেই সন্ধিক্ষণে তারা আত্ম সমর্পন করে জাগতিক নেশার কাছে। কারণ তারা বুঝে তাদের জীবন লাভের আশা মরুমায়া মাত্র।পরক্ষণেই যেন তারা ফের জেগে ওঠে জীবনের নেশায়-তারা বুক বাঁধে আশায়,জীবন শিকারের আগে যেন তারা নিঃশ্ব হয়ে না যায়।
"অসীমান্তিক হে আমার
অপার অবয়ব!এই চরাচরে
তুমি দৃশ্য হও।নেশায় প্রতিশ্রুত,
পায়ে মাটি মাখা আমি এক তুচ্ছ মানুষ!
বারবার বিফলতার পরেও তুমি দেখো
জীবন শিকারের আগে আমি যেন বিদ্ধ না হই।
এখানে এই জীবন যেন তাদের পথচলতি জীবনের অসিমান্তিক অবয়ব।এই চরাচর জুড়ে তার অবয়ব যেন বহুধা বিস্তৃত। কিন্তু সে তো এক তুচ্ছ মানবমাত্র। কিন্তু সে কথার লোক কাজের লোক যার ভেতর বাইর সমান।তাকে ফকফকা দেখা যায় আপাদমস্তক।সে সাধারণ হলেও জীবননেশায় প্রতিস্রুত।সে এক বন্ডেড শ্রমিক।সে জীবনের শুরু থেকে এই অবধি এক বারংবার বিফল হওয়া মানব।যার পঞ্জিতে সফলতা নেই।সফলতা যার নেই তার বিফলতাও নেই।তাই জীবনদেবতা যেন তার কাছে প্রতিস্রুত ,জীবন শিকারের আগে পর্যন্ত সে কখনও বিদ্ধ বা রুদ্ধ হবে না।এই প্রতিশ্রুতিই বুঝি তাকে বারংবার জীবন শিকার কিংবা জীবনের নাগপাশ থেকে মুক্তি লাভের চেতনার দিকে টেনে নিয়ে যায়।জীবনের দরজায় ঠোকা দেওয়ার জন্য বারবার সে নেশাঘোর হয়ে ওঠে।জীবনশিকারের সম্ভব অসম্ভব একাগ্রতা নিয়ে ছুটে চলে সে অমোঘ জীবনচরের দিকে। নিরবধি।এর চেয়ে বড় শিকারি আর কাকে বলা যাবে।তাই কবি বলেন
অশ্বক্ষুরের দূরন্ত আস্ফালনে
যেখান থেকে প্রথম
অভিবাসন শুরু হয়েছিল
বারবার আবাদের শেষে
নারীর শরীর থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল
শষ্যের ঘ্রাণ!হে জীবন!
সে রুদ্ধগান নিয়ে আমি আজ-
তুমি বাড়াও!বাড়াও অপার তৃষ্ণা আমার।
এই জলে ,আকাশে,অরণ্যের আশ্চর্য পুলক
আমাকে শিহরিত ও উদ্ভাসিত করে।
তাদের জীবনের জন্ম হয়ে ছিল যেন অশ্বক্ষুরের আস্ফালনের মতো।যেখানে থেমে থাকা নেই।একের পর এক দূরন্ত অভিবাসনের তাণ্ডবদৌড়ে তাদের ভালবাসার শরীর থেকে স্বপ্নের শরীর থেকে যেন মুছে গেছে শষ্য বা জীবন নামক নারীর ঘ্রাণ।যখনই কোথাও তারা একটা শান্তির নীড় আর মোটা ভাকাপড়ের আশায় থিতু হতে চেয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে চেয়েছে অন্য সাধারণের মতো,তখনই তথাকথিত সুসভ্য মানুষদের শোষণ ও শাসনের নাগপাশে জর্জরিত ও অত্যাচারিত হয়ে বারংবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। উপড়ে গেছে তাদের শেকড়।এখন যেন তারা হারেমের খাঁজাউদ্দিন সকলে।হারেম প্রহড়ায় তারা দিবানিশি ঘামরক্ত ঝরাচ্ছে। কিন্তু জীবনের পরাগ ছোঁয়ে দেখার ক্ষমতা নেই।আর তারা জীবনের নেশায় শষ্যশ্যামলা অন্নপূর্ণা আঘ্রানের আশায় জীবন হরিণীর পেছনে ছুটে চলা নিষাদ যেন।জীবন দেবতা অথবা সভ্যমানুষরা যেন তাদের ঠোটের সামনে জীবন নারীর বরশির চীপ নিয়ে লোভায়।ধরা অধরা।আর তারাও যেন শিকারের নেশায় ছুটে চলা শিকারি জীবনের পিছু পিছু।চারিদিক যেন রুদ্ধ আর সেই রুদ্ধজীবনের আঁধারে তাদের অপার তৃষ্ণা যেন আরও বেড়ে যায়।ঝিঁঝির ডাকের মতো প্রকৃতির পুলকে। আবার তারা শিকারী অবয়বে ছুটে চলে নেশার মতো জীবনের পিছু পিছু।
অথচ অপার শষ্যশ্যামলা ,অপার জীবন্ত অরণ্যপুলকের মাঝে তারা জেগে আছে দিবানিশি। কিন্তু সে পুলক অনুভব করার ছূয়ে দেখার সময় বা অধিকার তাদের নেই।আর জীবনযুদ্ধে তার ক্লান্ত হলেও জন্ম থেকে এই অবধি ছুটে ছলেছে জীবনলাভের নেশার ঘোরে। পুলক তার চারিদিকে, চারদিকে অপার অনুভব ছড়িয়ে ছিটিয়ে।এ তাকে উদ্দিপিত করে আর সে তাকে ধরার জন্য অনবরত ছুটে চলা এক আশ্চর্য শিকারি।এক জীবনজুয়াড়ি।কবিতাটি নেশাতুর করে তুলে পাঠককে।
কবির আরও কিছু কবিতা দেখি
রাশ
তবুও কোমর তাঁতে ফুটে ওঠে
সরীসৃপ শরীর।
মৃদঙ্গে সুর বাঁধে
ঋতুস্নানের গানে।
তবুও খইয়ের মুখের মতো পথ
উষ্ণ নরম!
রাত্রির রাস ফেলে গেছে
কিশোরী।অরণ্যগানে।
কুয়াশায় ডুবা পথ,
আর কতদূর-
বিনিদ্র চোখের পাতা
ভারী হয়ে আসে।
ইনিয়ে বিনিয়ে চলা এই
সমর্পণ রেখা-
ভগ্ন আসর থেকে
তার পদচিহ্ন আঁকা।
লেবর! লেবর!লেবর যাদের জীবনের পরিচয়।যাদের মূলজ বা শেকড় উপড়ে গেছে জীবন থেকে জীবনের সন্ধানে তারা সরীসৃপ ছাড়া কী হতে পারে! তবুও মাঝেমধ্যে অরণ্যের গানে তারা উৎসব কিংবা পার্বনে মৃদঙ্গে সুর তুলে।এই সুর যেন জীবনমৃদঙ্গে তান তুলার মতো।একটু ফুরসৎ জীবনের আস্বাদনকে নিঃশ্বেষে পান করতে চায়।এ পান যেন অনাস্বাদিত!এতসবের পরেও ঋতুস্নানের গানে স্নান করতে চায় তারা।তখনও খইয়ের মুখের মতো ধবধবে সাদা সরল তাদের জীবনের মুখাবয়ব ফুটে ওঠে।হয়তো কোন কিশোরী তখন রাত্রির সেই অনাস্বাদিত রাশ ফেলে ছুটে গেছে অরণ্যগানে।কিংবা হয়তো এমনও হতে পারে তাদের ভুখা জীবনে রাশের মতো আনন্দঘন মুহূর্তগুলি কবেই হারিয়ে গেছে অথবা জীবনের রাস উপভোগ করার মতো জীবনের অনুভব তাদের কাছ থেকে কবেই হারিয়ে গেছে জীবনসংগ্রামের অমোঘ ঘর্ষণে।তবুও এমন উৎসবে তাদের তাদের জীবন আস্বাদনের মুখাভয়ব ফুটে ওঠে খইয়ের মুখের মতো।এ তাদের সরল নিঃস্পাপ জীবনের প্রতীক যেন।
মাঝেমধ্যে তাদের মধ্যে হতাশা এসে গ্রাস করে।তাই পথ কুশয়াশাডুবা।বিনিদ্র চোখের পাতা।আর কতদূর গেলে পেতে পারে জীবনের পাড়।ক্লান্তিতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।মনে হয় এই জীবন যেন তারা ইনিয়ে বিনিয়ে শুধু তথাকথিত সভ্যজনের কাছে সমর্পনের মধ্য দিয়েই ছুটে চলেছে ।আর কত সমর্পন করবে জীবনের জন্য জীবন। নিঃশেষে নিংড়ে চুমুকে চুমুকে পান করবে জীবনের জন্য জীবনের মদ।এই জীবন দিয়ে জীবন লাভের তৃষ্ণা যেন সেই জীবনের শুরু থেকেই।এ জীবন যেন তাদের জীবন শুরুর ভাঙাজীবনের আসর থেকেই শুরু হয়েছে।
সিঁথি
জন্ম ও মৃত্যু জড়িয়ে
আমি উৎসমুখ খুঁজি।
আমি কিছুই
অতিক্রম করতে পারিনা-
জলে আকাশে
যেখানে হাত রাখি
নখরে কর্ষিত হয়
শুধু তলপেট শরীর।
এখানেও সেইসব মানুষদের জীবনহাহাকার যেন মদের গ্লাসের মতো টুংটাং করে বেজে ওঠে।
সেই শুরু থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম
জন্ম-মৃত্যুর দরিয়া ধরে তারা ছুটে চলা জীবন জুয়াড়ি যেন।জীবন শিকারের নেশায় জীবন শিকার আর হয় না।প্রতিবার প্রকৃতির পুলকে আশা জাগে কিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়।জীবনের শুরুতে সাময়িক পুলকের মতো যে জীবনের আস্বাদন তারা লাভ করেছিল,বারংবার
তারা এই বদ্ধজীবনেও ঋতুস্নানের মাধ্যমে সময়দোলকে ভেসে চলছে সামনের দিকে।জীবন শিকারের নেশার মতো অমোঘ শক্তি তাদের টেনে নিয়ে যায় আশার আশায়।পেছন মনের মুখরে ভাসে ঠিকই কিন্তু ফেরা যায় না, তাই যেখান থেকে আসা সেখানে ফেরা সম্ভব নয় জেনেই সেই জীবনে ফিরে যাবার আশায় ভাটির দিকে যেতে যেতে তারা শেকড়ের অনুসন্ধান করে । কিন্তু জলে স্থলে যেখানে আশায় আশায় হাত রাখে বারংবার সভ্যসমাজের নখে ফালাফালা হয় তাদের তলপেটই শুধু।তাদের আর জীবনের উৎসমুখের মতো নন্দিত জীবনে ফেরা হয়ে ওঠে না।এই তলপেট হতে পারে তাদের প্রতি সভ্যসমাজের অমানুষসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি।হয়তো মানুষ নয় তারা কিংবা তাঁদের নারীর প্রতি লোভের ইঙ্গিত।কিংবা তাদের পেটের ক্ষুধার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ।
রাতের পয়ার
শীতের রাতের একাকিত্বে
ডুবে আছে সুদীর্ঘ রাত।
মুহুর্তগুলো পাক খায়
বিনিদ্র লাচারি ও পয়ারে।
যেন কেউ চায়,এই শুন্যতায়
দুবাহুর আবেগে আবেশে জড়ায়;
অন্ধকার ডুবে যায় কবোষ্ণ আরামে।
নারী ও সন্তানের কোলাহলে ঘেরা
আলোর রাত্রির মতো আবরণহীন
আমাকে জড়িয়ে ধরে না কেউ!
ঘাগড়ার ঘোর লাগা
ভাসানের সুর তোলে শুধু
চলে যায় দূরে,আরো দূরে-
অপূর্ন কথার মতো পাড় ভাঙে ঢেউ।
বাগানীয়া ছিন্নমূল মানুষের জীবন সভ্যসমাজ থেকে দূরে রাতের একাকিত্বে ঢাকা।এ রাত শেষ হয় না।হবে না বুঝি কোনদিন।জীবন নয় তবু জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন ঘুমহীন, জীবনের হারানো গল্পগাঁথা আর গানের পয়ারে ডুবে থাকতে চায়।জীবন আছে জীবন নেই।গল্প আছে গল্প নেই ।গান আছে গান নেই। এই সব মুহূর্তে মনে হয় তাদের জীবন শুরুর মুক্তজীবনের আস্বাদ এসে যেন দুবাহু তুলে আবেগে জড়িয়ে ধরে।আর এক লহমায় অনির্বচনীয় আমেজ এসে যেন মন ও শরীরে দোলা দেয়।এক অসম্ভব সম্ভব পুলকে পুলকিত হয়ে ওঠে সাময়িক তারা। তখন বর্তমান জীবনের অসীম অন্ধকার হারিয়ে যায় কবোষ্ণ আরামে।আসলে জীবন শুরুর স্মৃতিচারণই বুঝি বারংবার সামান্য ফুরসতে এসে মনে ভিড় করে আর স্বপ্নের মতো জীবনের স্বপ্ন রচনা করে। কিন্তু তাদের খেদ জীবনের মতো মুক্তির আস্বাদের মতো কিংবা আলোর রাত্রির মতো নারী ও সন্তানের কোলাহলপূর্ণ স্বাভিমান নিয়ে সভ্যজনের মতো জীবন আসে না তাদের কাছে। এইসব প্রান্তজ মানুষদের জীবনের শূন্যতাকে যেন সকলেই আবেগের আবেশে জড়াতে চায়।ভালোলাগার আবেগে জড়াতে চায়। ভালো বাসা নিয়ে কাছে আসে না কেই। সাময়িক তাদের আবেগে আবেশমথিত করতে চায় সভ্য মানুষ অসভ্যের মতো।তাদের জীবনের অন্ধকার আরও অন্ধকারের মতো নেমে আসে সাময়িক কবোষ্ণ আরামে।হয়তো বা লুন্ঠিত যায় তাদের নারীর অলঙ্কার।কবির ইঙ্গিত কি তবে আমাদের সভ্য সমাজের কলঙ্কিত অন্ধকারের দিকে!পরক্ষণেই কবি ইঙ্গিত করেন, তাদের কেউ নারী ও সন্তানের কোলাহলে ভরা আলোর রাত্রির মতো প্রকাশ্য জড়িয়ে ধরে না।এখানে আলোর রাত্রির মতো কেউ জড়িয়ে ধরছে না।এখানে অসম্ভব খেদ।এ যেন বন্যেরা বনে সুন্দর।এই বনের ভেতর থেকে আলো তথা সভ্যতার আলোকে নিয়ে আসার মতো ভালোবাসার হাত কেউ তাদের দিকে এগিয়ে দেয় না ।প্রয়োজনের প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করা হয়। মানুষের মতো নয়।কারোর সাহসও যেন নেই প্রকাশ্য আলোয় তাদের দিকে কেউ ভালোবাসার হাতবাড়ায়।সভ্যসমাজের ভালবাসার কপটতার দিকেই বুঝি কবি ইঙ্গিত করেন ।আর ইঙ্গিতে ইঙ্গিতে নিয়ে যান আমাদের বনজ খেটে খাওয়া মানুষদের মর্মবেদনার কাছে।এ আমাদের প্রয়োজন সারার মেকি ভোগবাদী স্বভাবের দিকেই তীব্র চাবুক যেন!এ তাদের ঘাগড়ার ঘোরলাগা শূন্যতার শরীরী ভাষার প্রতি তাড়িত হওয়া সভ্যসমাজের লালায়িত লোভের কদর্যতার প্রতিই বুঝি আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।শূন্য জীবনেও আপাদমস্তক অন্ধকারে ডুবে থাকা জীবন নিংড়ে যারা শেষটুকু নিখাদভালবাসায় ঢেলে দিয়ে সভ্যমানুষের সঙ্গ পেতে যায,তাদের মতো অধিকারে পৃথিবীর আলোবাতাস ভোগ করতে চায় কিংবা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে,এই সম্ভব অসম্ভব সত্য প্রতিষ্টা করার লড়াইয়ে জীবন নিঃশেষে নিংড়ে দিয়েও প্রতিষ্ঠা খরতে যে তারাও মানুষ। কিন্তু বারবার সভ্যসমাজের লালাভরা শূন্যগর্ভ ভালোবাসায় তারা যেন আরও নিস্ব হয়ে যায়।তারা আরও দূরে চলে যায় সব কিছু হারিয়ে।জীবনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।আশা পূরণ হয় না। তাই অপূর্ণকথার মতো পাড় ভাঙে ঢেউ।জীবনের ঢেউ নিরন্তর--!
শিকার-৩
মেয়েটি আমাকে বিশ্বাস করেছিল,
না,তার সহজাত ভঙ্গিমায়
আমার কোমর ধরে পায়ে পায়ে নেচেছিল
জুমুরের তালে-
আমি জানি না।
জানা অজানার শঙ্কায়,দোল খেতে খেতে
গেয়ে উঠেছিল সে ধিকিধিকি সুর।
কুথা ঘুরিস তুই?
বৃষ্টি হলো,মাটি ভিজলো
বীজ ফেললি কই?
চূড়ান্ত প্রশ্নের মতো এই শিহরণ!
শাল-করমের আসর ফেলে ডেকে নিয়ে যায়-
হে অপ্রতিরোধ্য আবেশ!
তুমি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে
আমাকে সহমর্মিতা শেখাও।
আমাকে নির্দেশ করো,
কোথায় লুকিয়ে থাকা সুখ
বৃষ্টির মতো,নির্ভরতার মতো
গণ্ডি ভেঙে টেনে নিয়ে যায়।
প্রথম স্তবকে মেয়েটির মাঝে সত্যিই কী কোন শঙ্কা ছিল।মনে হয় না। এখানেও মেয়েটির নিঃশর্ত সমর্পন শুন্যতার শেষ বিন্দুটুকু দিয়ে।প্রাণঢেলে জীবনের ঝুমুরের তালে উৎসবের আসরে নেচে উঠেছে মেয়েটি আশঙ্কার কোন খাদ নেই।ভালোবাসার কোন খাদ নেই।ফুলের মতো সবুজপত্রের মতো নিখাদ সেই সমর্পন।আশঙ্কার দোলাচল সেই বাবুটির কাছে।হিসেবনিকেশের সকল কুৎকাঠি সভ্যতার প্রলুব্ধ চোখের কাছে।
মেয়েটির স্বগোক্তি
বৃষ্টি হলো,মাটি ভিজলো
বীজ ফেললি কই?
এতো সত্যি চূড়ান্ত প্রশ্ন আমাদের সভ্যসমাজের মুখোসের দিকে।যে প্রশ্নের পরে আর প্রশ্ন হয় না।এ প্রশ্নের উত্তরের শব্দ থাকে না।এই প্রশ্ন শুধু আমাদের শাল-করমের আসরের বহিরঙ্গ থেকে অন্তরঙ্গের ও অন্তরে টেনে নিয়ে যায়,যেখানে শশরীরে যাওয়া যায় না।এ আমাদের চৈতন্যলোকের পথ।মৃণ্ময় থেকে চিণ্ময়ে নিয়ে যায়।যেখানে শব্দ হয় না।শব্দের কুয়াশা ঝড়ে পড়ে।
তারপর আমাদের চৈতন্য লোক থেকে উঠে আসে বোধের হাহাকার।হে অপ্রতিরোধ্য আবেশ।জীবন শিকারের নেশা।হে জীবনের নেশা,তুমি আমাকে সহমর্মিতা শেখাও জীবন ও মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে।হাহাকার ওঠে বিদ্যুতের শকে মতো যেন।আমাদের শিখিয়ে দেয়,উপলদ্ধি করিয়ে দেয় কোথায় বৃষ্টির মতো ভালবাসা।স্বতস্ফুর্ত হোমের অগ্নির মতো পরশ। কোথায় পারস্পারিক ভালোবাসার নির্ভরতা।চেতনার ভেতর পরমানু বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে যেন। এখানে মনে হয় মেয়েটি যেন আলোকিত জীবনের মানে হয়ে ওঠেছে!যে জীবনে তারা আছে সে তারা জীবন দিয়ে জেনেছে তা জীবন নয়।তা হল জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের অসহনীয় শূন্যতা।এই শূন্যতা দিয়েই যেন মেয়েটি শঙ্কা আশঙ্কার দোলাচলের বাইরে এসে বাবুটির কাছে সমর্পণ করেছে নিখাদ ভালোবাসার অন্তরা।
জন্ম
খেলা জমেছে বাবুলোক
হাততালি দে জোরে,
সাপটা এখন উঠে আসবে
মাথায় মণি পরে।
অন্ধকারে ঝাঁপির ভেতর
সাপটা একা ঘোরে,
ক্ষিধের জ্বালায় নিজের লেজ
নিজেই গিলে মরে।
এই কবিতায় একটি সাপের খেলার রূপকের আড়ালে কবি আমাদের অন্তর্লোকের আলোকশিখা জ্বালোনোর দিকেই বুঝি টেনে নিয়ে যান।একটা সাপকে সাপুড়ের হাতে অসম্ভব শ্বাপদের মতোই জনসমক্ষে আবির্ভূত করানো হয়।সাপটিও যেন সাপের মতোই মণিখচিত রূপেই ফুঁসে উঠে।যেন মনে হয় সর্প সর্পই। কিন্তু আমরা তার কারান্তরাল বন্দীজীবনের বেদনা অনুভব করতে পারি না।আমরা দেখিনা আসলে বন্দী জীবনে সে বাইরে মণিময় দেখা গেলেও ডুরাসাপ যে।তেমনি সেই সব সর্বহারাদের মর্মবেদনা আমরা দেখি না।তাদের বহিরাঙ্গিক জীবনের রঙ্গরস দেখেই তাদের বাহবা দিতে থাকি।আসলে সেইসব প্রান্তিক মানুষজন সেই বন্দী সাপের মতোই আমাদের সুসভ্য মানুষ নামক সাপুড়েদের হাতে বন্দী যেন!
মানুষ হলেও তাদের পশুজীবন কবিকে অসম্ভব বিচলিত করে। হাহাকার করে ওঠে তার হৃদয়। পাগলাকুকুরের মতো নিজের লেজ নিজেই গিলে খায়।প্রান্তজনদের অন্তরলোকে পরিব্রাজক কবি অসম্ভব ভালোবাসায় সভ্যসমাজের এক অসম্ভব ক্ষয়রোগের দিকেই পাঠককে টেনে নিয়ে যান অসম্ভব জীবনের নেশায়।কবি যেন নিজেই মনে হয় জীবন শিকারে নেমেছেন।বিদ্ধ করতে চান বারংবার জীবনের শিকার।
জীবন নেশা
চিতায় দু'বোতল মদ ঢেলে
বিকাশ চিৎকার করে-
নে হারু!
খা!খা!
তারপর রাতভর শুধু
মদের আলাপ।
ভোরে চান করে অশৌচ মা
ঢোঙায় মদ ঢেলে ডাকে-
আয় আয়, আয় আয় হারু!
কা-কা করে
পাখশাটে নেমে আসে কাক
জীবন নেশায়!
এই কবিতা যেন বাগানীয়া কিংবা অন্ত্যজশ্রেণীর কিংবা খেটে খাওয়া মানুষের জীবন ঠিকুজি ।জীবনের ব্যবচ্ছেদ টেবিল মনে হয়।জীবন খোঁজের নেশা।তাদের জীবনকে শল্যচিকিৎসকের মতো ব্যবচ্ছেদ করে দেয় আমাদের কাছে।জীবনের নেশায় ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে তারা মদ গিলে।মদ তাদের যাপনের শ্বাস প্রশ্বাস হয়ে ওঠে।নেশাই যেন তাদের জীবন ও জীবনের এপাড় অপাড়ের বেতরণী হয়ে ওঠে।এর বাইরে জীবনের অন্যকোন সংজ্ঞা তারা কল্পনা করতে পারে না।কবির অন্ত্যজ মানুষদের নিয়ে এমন জীবন চিত্রকল্প পাঠককেও জীবন পানের নেশার মতো টেনে নিয়ে যায় এক চরম মুহুর্তে। নর-নারীর তুরীয় মুহূর্তে যেন।জনুক্রমে ভেসে ওঠে হারু ও হারুর মা। আদর্শ দুঃসহ বাগানীয়া জীবন।হারু আর হারুর মা যেন তাদের জীবন নামক বিশ্বাস কিংবা অস্তিত্বের দ্যোতক হয়ে ওঠে।আয় আয় হারু খা খা।বিশ্বাসের কাকও তখন যেন বাধ্য হয় নেমে আসে জীবনের ভোগ খেতে!!
শিকার -৪
বাঁশের ডগায় রিয়া বেঁধে
নেমে আসে সোনার দুপুর।
মাতাল হাওয়ায় ওঠে তোর
স্তনদ্বয়ের উড়ে যাওয়া সুর।
আমরা কিছু চাইতে আসিনি,
থাকতেও আসিনি,
চৈত্রের উঠোনে জল ঢেলে শুধু
উড়াব কার্পাসের ফুল।
ধানের গোছার মতো তোর চুল!
লাঙ্গির কলসের মতো কোমর!
সব সব-
আমাদের খালি করে দিয়ে
উড়ে যায় সব।
সারাদিন-
ক্লান্তিহীন-
আগুন-জলে ডুবে যেতে যেতে
আমরা সাক্ষী হয়ে যাই!
সর্বাঙ্গী!
তোর লাল-হলুদ রিয়ার।
বাগানীয়া কিংবা জনজাতি মানুষের জীবন কেবল মৈথুন হাড়ভাঙা খাটুনি আর মদের নেশায় অবসর বিনোদনে কাটে ।এর বাইরে চাওয়া পাওয়ার যেন তারা কেউ নয়।তারা দীর্ঘপথের টানে এর বাইরে চাওয়ার কিছু আছে বলে জানে না।এখানে বাঁশের ডগায় রিয়া বেঁধে নেমে আসা সোনার দুপুর তাদের ম'কারান্ত জীবনকেই জীবনের সার বলে জানে যেন তারা। এর বাইরে আরেকটি ইঙ্গিতও বুঝি দেয় আমাদের,যেন তাদের মৈথুনেও স্বাধীনতা নেই।বাঁশের ডগায় রিয়া যেন গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেলের মতো।হলেও হতে পারে।আর চৈত্রের উঠোনে জল ঢালা তো তাদের জীবনের বেঁচে থাকার চরম অবস্থা কিংবা অভিমানকেও হয়ত বুঝায়।কার্পাস উড়ানো তো স্বপ্ন উড়ানোও।তবে মনে হয় এক গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে যেন তাদের আর কিছুই নেই।আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে -এই সামিয়ানার ভেতরেই বুঝি তাদের জীবনের বোধ।হয়তো।তারা এর বাইরে যেন কিছুই চাইতে আসেনি।এ তো চৈত্রের দুপুরের মতো পোড় খাওয়া মানুষের ক্লান্ত জীবনের চরম অভিমান।তাদের নারীর ধানের গোছার মতো চুল।লাঙ্গির কলসের মতো কোমর।নারী শরীরের বাইরে যেন তাদের কামনা কিছু নেই।কিংবা নারী শরীর যেন তাদের ক্ষুধার আশ্রয় হয়ে ওঠে।নারীর শরীরকেই তারা ক্ষধার তুরীয় মুহূর্তে ধানের গোছা কিংবা লাঙ্গির মতো জীবন ঐশ্বর্য ভাবে।জীবন ভাবে । বেঁচে থাকা ভাবে।এখানে এমন জীবন দেখে কবির বিলাপ ও আক্ষেপ পাঠুককেও যেন তাদের মতো জীবনের নেশায় নেশাতুর করে তুলে।এও বুঝি তাদের অসম্ভব জীবন শিকারের অভিমান।আবার কবি বলেন খালি করে দিয়ে উড়ে যায় সব।নারীর শরীর কিংবা মকারান্তের নাগপাশে অবশেষে তাদের আর কিছুই থাকে না।এক লহমার তুরীয়ানন্দে সব তাদের শেষ হয়ে যায়।জীবন লাভের নেশায় ছুটে যেতে যেতে ঘাটে ঘাটে যেন তাদের নাও ডুবে যায় হায়!
সারাদিন অসম্ভব হাড়খাটুনী শেষে সাময়িক উন্মাদনায় সব ঢেলে দিয়ে যেন তাদের নারীর শরীরী বিভঙ্গকেই জীবন জয়ের জয় ভাবে তারা।তাদের জীবনের চরম সত্যকেই উচ্চে তুলে ধরে । আবার এখানে সভ্যসমাজের তাদের নারীর প্রতি লোভের কদর্যতার দিকেও বুঝি ইঙ্গিত করে আমাদের।কবির ভাষায় -আমরা স্বাক্ষী হয়ে যাই! /সর্বাঙ্গী!/তোর লাল-হলুদ রিয়ার।লাল হলুদ যেন তাদের জীবনের জীবন লাব ডাব!!
নিশানা
জানিনা
কেন এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা?
শষ্যের ঢেউয়ের মতো
ওরা উদ্দাম নাচে।
বর্নিল পাখির
কোমল পালক গুঁজে রাখে
ওরা বর্শার পিছে।
কবি অনিশ্চয়তায় মধ্যে যেন পড়ে যান।
এই মানুষদের জীবন সংকেত যেন অন্যরকম।শষ্যের ঢেউয়ের মতো উদ্দাম নাচ আর বর্নিল পাখির কোমল পালক গুঁজে রাখার মাঝেই বিশেষিত হয়ে যায় যেন।শষ্যের জন্যই যেন এরা।বর্নিল পাখির পালক তো স্বপ্ন।বর্শার পেছনে পালক গুঁজা তো এদের শষ্যময় জীবন শিকারের ইঙ্গিতবাহী মনে হয়।ওরা শুধু স্বপ্ন দেখে জীবনের।জীবন শিকারের।এ যেন আপ্রাণ চেষ্টা শিকার করার জন্য, পূর্ণ বিভূতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার।কবিতাটির চিত্রকল্প পাঠককে সর্বহারা তথা সেই সব বাগানীয়া মানুষের জীবনের জীবন শিকার কিংবা তাদের বিষাদময় জীবন থেকে মুক্তি লাভের একটি অসম্ভব স্থির কংবা গতিশীল জীবনশিকারীর কালান্তার ছবির ক্যানভাসের কাছে নিয়ে দাঁড় করায় যেন!
শিকার-৫
শর্মিলি চাঁদ শুয়ে থাকে
চায়ের টিলার বাঁকে
নারী যায় শিকার করতে
হাঁসুয়া কাঁধে কাপে।
চা-গাছের অন্ধকারে
লুকিয়ে আছে শিকার
না-বিঁধে ফিরলে ঘরে
মরণ হবে তুহার।
বাগিছার শ্রমিক। তাদের চা-জীবন।চা-পাতা তোলা নারীদের নিত্য কাজ।সংসারে নারী একটা বিরাট শক্তি হিসেবে কাজ করে।পরিবারের ভরণপোষণের এক মুখ্য অংশীদার এই নারী।সংসারে হাসি ফুটাতে গিয়ে চা-গাছের অন্ধকারেই তাদের জীবন চক্র শেষ হয়ে যায়।চা-গাছের নীচেই যেন তাদের নারীর জীবন বিঁধে আছে।তাই কবি অসম্ভব খেদের সাথে বলছেন,তাদের নারীরাও জীবন শিকারে পটু।এই শিকারের জন্য চা-গাছের অন্ধকারেই আদর্শ স্থান।তাই তাদের নারীদের যুদ্ধাবেশ হল হাঁসুয়া যেন।শর্মিলী চাঁদ যেন নারীদের জীবনের চাঁদ।এই চাঁদ শিকার না করতে পারলে তারা বাঁচবে না।শিকারের আগেই শিকার হয়ে যাবে।এখানে নারীরাই যে তাদের শ্রমশক্তির প্রবল অংশীদার তা ও যেন কবির ইঙ্গিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।এখানে বর্শা যেন অসম্ভব জীবন যুদ্ধ কিংবা জীবন শিকারের প্রতীক হয়ে অসম্ভব আবেদন সৃষ্টি করে পাঠকের মর্মমূলে।
উৎসর্গ
নিমাই সন্ন্যাস দেখে
মায়ের মতোই
কেঁদে ওঠে মৌ।
কই!
আমরা তো কোনো সন্তান
দেইনি বিসর্জনে?
তলে তলে শুরু হওয়া
আমাদের এই গৃহত্যাগ খেলা
মায়েরাই শুধু জানে
নিমাই সন্ন্যাসের মতো বা নিমাইর মতো জীবন আমরা চারপাশে দেখি।দেখে চোখের জল ছাড়ি।বিশেষ করে আমাদের মায়েরা খুব বেশী সমব্যাথি হয়ে ওঠে চোখের জল ধরে রাখতে পারে না।তখন কার সন্তান এ বিচারের উর্ধে চলে যায় ।এই দৃশ্যে আঁতকে উঠে আমরা ভাবি আমরা কী তবে কোন সন্তানকে নিমাইর মতো বিসর্জন করেছি।নারীমা একমাত্র জানেন তার সন্তান হারানোর ব্যাথা।একজন মা কখনো একজনের সন্তান থেকে আরেক জনের সন্তানকে আলাদা করে দেখতে পারেন না।এই কারণেই তারা মায়ের জাতি।এই সমব্যাথী হওয়ার যোগ্যতার জন্যই তিনি মাতা। জননী।তার কাছে সন্তানের জাত ধর্ম বিবেচিত হয় না। পাশাপাশি মায়েরও কোন জাত হয় না।তারা চিরকালই মা আর সন্তান।মা-ই
কেবল সন্তান হারানোর আগুন বুঝে।
আবার এও হতে পারে সর্বহারা মানুষেরা তাদের সন্তান শিক্ষা থেকে সর্বদা অবহেলিত।এ তো তাদের সন্তানের নিত্য বিসর্জন।এমন বিসর্জন দিতে দিতে তাদের আর বিসর্জনের কোন বোধ থাকে না। অপরদিকে সভ্যজনের সন্তান হারানোই হল নিমাই সন্ন্যাসের মতো এক একটি তুমুল ঘটনা। কিন্তু দেখা গেল নিমাই সন্ন্যাসের মতো কোন পালা দেখে মায়ের মতোই কেঁদে উঠেছে মউ।এ তো হবার কথা ছিল না!মা তো মা-ই।ধনী গরীব বড়জাত ছোটজাত বিচার করে মায়ের জন্ম হয় না।এই মা চিরন্তনী মা।মাতৃহৃদয়কে দাঁড়িপাল্লা য় ওজন করা যায় না।মা যদি এক ও অভিনশ্বর হন তবে মায়ের সন্তান তো তথাকথিত সভ্য ও অসভ্য সকলেই,তবে তারা সর্ববঞ্চিত অবহেলিত কেন?কই আমরা তো দেইনি কোনো সন্তান বিসর্জন?এই প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি পাঠককে অসম্ভব অববাহিকায় নিয়ে দাঁড় করায়!
মাতাল মাদল
লষ্ট হয় না
ই-বাগান
ই-টিলা।
ইখানে
চায়ের পাতার ফাঁকে ফাঁকে
মরদ মিলে।
পাতা উল্টাইলে
লাই।
সুরতিয়ার চান্দের পারা
বেটা হইছেঁ;
বাজা,মাদল বাজা!
ভালো কইরে লাচ।
উহ!
হাড়িয়ার মধ্যে নুন কেনে?
ঢাল!
আরো ঢাল!
রাইত ইকিবারে উল্টাই দে!
মাতাল মাদল তো তাদের জীবনের মাদল।মাদলের লয়তাল তাদের জীবনে লয়তাল নিয়ে আসে উৎসব কিংবা পরবে।এই মাদল যেন কখনও নষ্ট হয়ে যায় না।যাদের জীবন শূন্যতায় মোড়া মাদল ছাড়া তাদের ভ্যাকুয়াম পূর্ণ হবে কিসে?কবি তাদের একজনের মতো আক্ষেপ করেন।এই মাদল তাদের জীবনে চিরন্তন যেন।এ নষ্ট হয় না।তাদের জীবনের একমাত্র সার।এখানে চাবাগান,এই টিলার ভাঁজে তাদের নারীদের এত অপরূপা লাগে যে জীবনে মরদ বা পুরুষের অভাব হয়না। কিন্তু সুখ খুবই ক্ষণস্থায়ী।প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই সটকে পড়ে ওরা। একমাত্র নারীর দেহজ কামনার কাছেই সাময়িক তারা বশীভূত হয়।লালসাই এখানে তাদের ভালোবাসার মখমল জীবন।এখানে নারীরা সভ্যদের লালসার কাছে পরাভূত।তাদের সাথে ঘর করার জন্য এখানে কেউ আসে না।সংসার আলোর মতো আসে না।
সুরতিয়ার চাঁদের মতো ছেলে হয়েছে।আর তারা আনন্দে আত্মহারা।এই ছেলে নারীর পুরুষের উত্তরাধিকার নাকি বহিরাগত কারোর। এই প্রশ্নে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই।ছেলে জন্ম হয়েছে এটাই বড় কথা।আনন্দে আত্মহারা হয়ে মাদল বাজা।জীবনের আনন্দের সার মদ খা।কামনা জন্ম মৃত্যু বিবাহ এ যেন একই বোতলের মদ ।সন্তানের জন্ম হয়েছে।তাদের সংসারে আয়ের উৎস বেড়ে গেছে।এখন তারা জীবন শিকার করতে পারবে।এমন একটা উন্মাদনায় তাদের উত্তাল হয়ে ওঠা।এর বাইরে তাদের কোন জগৎ নেই। জীবন নেই যেন।এই জন্যই যেন তাদের জন্ম।এই জন্যই যেন তাদের বিদায়।সুরতিয়ার চান্দের মতো ছেলে,মাদল,হাড়িয়া -জন্ম কিংবা মৃত্যু।এই সব বাগানীয়া মানুষের জীবন দর্পন।জীবন মদ যেন!
পার্বণ
দূরের মাঠে
আগুনের উত্তাপ নিতে নিতে
বাঁশ ফাটার সাথে
উঠে তুমুল কলরব!
তার থেকে আরো দূরে-
তীরের ডগায় উড়ে যাওয়া
ভালোবাসা-
তোমাকে বিদ্ধ করে ফিরে এলে
শুরু হয় আমাদের
পৌষ উৎসব।
পিঠেপুলির নরম উষ্ণতা
পাটি সাফটার অমোঘ বস্তার।
আরো কিছু
যা ছাড়া অপূর্ণ সব
আমাদের ঘরে,
আমাদের প্রাচীন কষ্টের মতো
কুয়াশা
এই ভোরের আগুনে
পুড়ে পুড়ে-
ঘুরে ঘুরে সবাই পরিক্রমা করে,
অদৃশ্য শিকারে।
এই বাগানীয়া মানুষেরা,সভ্যতার অকৃত্রিম পিলসুজেরা যেন জীবন থেকে দূরেই তাদের উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।এই পাওয়াঠুকুই তাদের জীবনে চরম ও পরম আনন্দ যেন জীবনে জীবন নিয়ে আসে। কিন্তু এই টুকু পেতে গিয়েই যেন তাদের আরো কিছু মহার্গ দিতে হয়।এ যেন তাদের শূন্যজীবনের একমাত্র অবলম্বন তাদের অকৃত্রিম ভালবাসা।এই ভালোবাসা যেন তাদের নিখাদ শ্রমশক্তি যা মালিকের মনবাঞ্ছা হতে হয়।তবেই তো তাদের জীবনে নেমে আসতে পারে একমাত্র প্রশান্তির উৎসব।তার পরেই তো তাদের জীবনের পৌষউৎসব।পিঠে পুলির নরম উষ্ণতা ও পাটি সাফটার অমোঘ বিস্তার।এর সাথে আরো কিছু এসে জোড়ে যায়,এ তাদের প্রাচীন কষ্টের মতো কুয়াশা।এ কুয়াশা তাদের অপূরর্ণতার কুয়াশা।আনন্দের মাঝেও অতীত এসে ভীড় করে বুঝি।তারা হয়তো তখন পেছনের দিকে তাকায়।রোমমন্থন করে সুদীর্ঘ অতীতের বঞ্চিত জীবন কিংবা জীবন শুরুর পূর্ণতা।তাদের ক্ষুধাকাতর অতীত জীবন কিংবা জীবনের সূচনা পর্বের সমৃদ্ধির কথা।যা তাদের চারপাশে ঘোরে।যেন সেই একই আদি কুয়াশা।এই থেকেই যেন তারা হর্ষবিষাদে আত্মহারা হয়ে ওঠে।জীবনকে এই একটিমাত্র পথেই সাময়িক যেন তারা বিদ্ধ করতে পারে।আর এই ক্ষণিক জীবনের অনেক দূরের স্বাদ থেকে হলেও নবজীবনের স্বপ্নে ফের জীবন শিকারের নেশায় বিচলিত হয়ে ওঠে।শুরু হয় ফের জীবন শিকারের ইঁদুর দৌঁড়।এ কুয়াশা যেন ভোরের আগুনে পুড়তে পুড়তে তাদের সাথে পরিক্রমা করে অদৃশ্য শিকারের নেশার দিকে।
বৃহৎ পাত্র
দুলে যাচ্ছে সময়ের দোলক,
একদিকে হ্যাঁ,অন্যদিকে না,
এই চাপান উতোরে
কবিকে বলে দিতে হয় না সে কোন দিকে-
মানুষের দিকে না ভোগের দিকে।
খাদ্যের অন্য কোনো ধর্ম নেই
শরীর ও মননের পূর্ণ পুষ্টি ছাড়া।
আজ উত্তরের নষ্টবাতাসে হুলিয়া-
রাজনৈতিক খাদ্য-তামাসা;
বারো ডালে তের বরণ ফুলের সমারোহ
বুকে আগলে,পরিশ্রমে
শ্রান্ত ক্লান্ত কবি
আরাধ্যের স্থানে এসে একসাথে বসে-
দিনান্তের আহারে।
অতিথি আপ্যায়নে
থালায় সাজানো মাংসের ফুল।
সময়ের দোলক দুলে ওঠা মানেই তো দেশকালের পরিবর্তনের দিকেই কবির ইঙ্গিত।একদল মানুষ এই ভুখামানুষদের পক্ষে যাচ্ছে।তাদের পক্ষে বাঁচাবাড়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে আন্দোলনে।আরেক পক্ষ এর বিরোধ্যে।তারা না চায় সভ্যতার এই পিলসুজেরা ঘুরে দাঁড়াক।এরকম পরিস্থিতিতে মানবতার জয়গানের জন্য সওয়াল করছেন কবি। তিনি জানেন তার আত্মার ডাক। কোনদিকে তিনি পা বাড়াবেন।কবি অবশ্যই ভোগবাদের বিপক্ষে । মানবতার পক্ষে। মানুষের জয়গানই তার গান।কবি তাই বলেন।খাদ্যের অন্যকোন ধর্ম নেই শরীর ও মননের পুষ্টি ছাড়া।কবি বলেন এমন সময়ে ভোগবাদের শরিক হয়ে উঠেছে উত্তরের কাণ্ডারীরা।ভুখামানুষের খাদ্য নিয়ে রাজনীতি ও চলছে।হুলিয়া জারি হয়েছে।খাদ্যের টোপ দেখিয়ে ভুলিয়ে সর্বহারাদের নিজেদের পক্ষে নিয়ে আখের ঘোচাতে ব্যাস্ত হয়ে উঠেছে তারা।ওরা এই সব মানুষদের খাদ্যের গ্যারেন্টি নিয়ে তামাশায় মেতে উঠেছে।বারো ডালে তেরো বরণ ফুলের সমারোহ বলতে কবি সেইসব অনাহার ক্লিষ্টমানুষজনের বারোমাসে তেরো পার্বণ তথা তাদের সর্বময় আলোকজীবনের দিকেই বুঝি ইঙ্গিত করেছেন?কিংবা তাদের জন্য ফুলে ফলে পুষ্পেভরা স্বপ্নের ঝাপির প্রতিস্রুত দায়িত্ব নিজ কাঁধে বহন করে আগলে রাখার লড়াইয়ে তাদের সাথে মিশে গেছেন, প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্তের কাছে কবি যেন শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে উঠেছেন।তবু তিনি হার মানতে রাজি নন।এই অবস্থায়ও তিনি এই অভুক্ত মানুষের পাশেই আছেন এবং তাঁদের একজন হয়ে তাদের সাথে একসাথে খেতে বসেছেন।এতো কবি যে মানুষের কিংবা সর্বহারার একমাত্র আপনজন তারই ইঙ্গিতবাহী মনে হয়।আর সর্বহারাজনও কবিকে পরিবেশন করেছে মাংসের ফুল।এ মাংসের ফুল যা সর্বহারাদের অন্তরের সর্বস্ব নিংড়ে দেওয়া ভালোবাসা।হৃদয় উজাড় করে দেওয়া ভালোবাসা।যা একমাত্র মনপ্রাণ ঢেলে হলেই কেউ উৎসর্গ করতে পারে।কবিতাটির নাম বৃহৎ পাত্র।বৃহৎ পাত্র সাঁওতাল ভাষায় "মারাং খাল"যাতে তারা তাদের পবিত্র উ্ৎসবে"ডাংরি জিল"বা গো-মাংসের ভোগ নিবেদন করে তাদের দেবতা "বোঙ্গা'র" কাছে।এ ভোগ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড়ো নিবেদন।বৃহৎ পাত্র বলতে এখানে সর্বহারার গণদেবতার প্রতিই আমাদের ইঙ্গিত করে।জনগনের বা মানবতার জয়ের দিকে দিক নির্দেশ করে।গো-মাংস তো নিষিদ্ধ মাংস।এই মাংসের গন্ধবাহী পাত্রের উল্লেখ করে কবি সম্ভবত জাতধর্মের রাজনৈতিক বিভাজনকামী শক্তির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ জায়মান সমাজের দিকেই হয়তো ইঙ্গিতে ইঙ্গিতে টেনে নিতে চেয়েছেন আমাদের!
বিনির্মাণ-২
রক্তে শিকারের নেশা
টেনে নিয়ে যায়-
সময়কে রুদ্ধ করে
জন-পরিবহনের প্রতিটি যানই
মনে হয় আমার অপেক্ষায়,
সার সার-
ঐ আকাশ অরণ্যভূমি
ইচ্ছা গমনের অমোঘ নির্দেশে
পথ আটকে দাঁড়ানো এক স্ফীত কলাগাছ।
আমি তীর ছুঁড়ে মারি।
স্বপ্নের মতো
বিদ্ধ হওয়া শিকার
থরথর করে কাঁপে,
যেন ক্ষুধা!
যেন অতীতের শরীর নিয়ে উৎসবে
জড়ো হয় সবাই-
হিমের সন্ধ্যায় শুরু করে
এই আদিবাসী নাচ।
এমন একটা সময় আসে যখন সময় যেন তাদের স্বাগত জানায়। রক্ত কনিকা যেন তাদের আজন্ম জীবন শিকারীর নেশা জাড়িত ।একসময় একটা সন্ধিক্ষণ এসে উপস্থিত।এ যেন সময় বাধ্য হয়ে থেমে যায় তাদের সামনে।তারা যেন সফলতার চিঙ্কারি দেখে চোখের সামনে।তারা টের পায় জনপরিবহনের প্রতিটি যান যেন তাদের জন্য পথে অপেক্ষমান। অর্থাৎ এযাবৎকালের সব বঞ্চিত অধরা এসে চোখের সামনে থমকে দাঁড়ায়।পালাবার পথ নেই।আসলে প্রেক্ষাপট পাল্টে গিয়েছে। সর্বহারাদের হাতে এবার রাজক্ষমতার দাবার গুটি চলে যাবার উপক্রম হয়েছে।ফলে এই আকাশ বাতাস অরণ্য সব কিছু যেন এবার তাদের ইচ্ছা অনুসারে চলতে চাইছে।প্রকৃতি তাদের সাথে গমনের জন্য নাছোরবান্দা হয়ে যেন তাদের একা একা যেতে দিচ্ছে না।স্ফিত কলাগাছ শুভ চিহ্নের প্রতীক বুঝি।তাদের এযাবৎ কালের জীবনস্বপ্নের প্রতীক বলে প্রতীয়মান হয়।তারা তীর ছুঁড়ে মারে তাদের স্বপ্নের অধরা জীবন স্বপ্নের মতো যেন কেঁপে ওঠে।তারা টের পায় স্বপ্নের মতো কেঁপে উঠেছে হাতের নাগালের কাছে যেন জীবন নামক তাদের এযাবৎ কালের আরাধ্য শিকার!আর ক্ষুধার মতো অতীত নিয়ে সর্বান্তক্ষরণে জড়ো হয় সবাই উৎসবের অসম্ভব তাণ্ডবে। আদিবাসী নাচের ঘরাণায়।এবার নির্ঘাত বিদ্ধ হতে চলেছে শিকার।
মাতাল দুপুরে
আকাশ বিদ্ধকরা বৃক্ষকে দিলাম
শোক তাপে পূর্ণ এই শূন্যতা,
অনিচ্ছায় করে ফেলা যত ভুল।
তাকে দিলাম দুটি পাতা একটি কুঁড়ি
আর একটি সাদা চা-এর ফুল।
থানের পেছনে দেওয়া
এ সবুজ পাতার স্তুপ
বুকের ভারী কষ্টের মতো-
আমাদের অতীত!
রোজ সন্ধ্যায় ঝাড়ু দিতে নারীরা
কোমরে আঁচল গুঁজে
যেভাবে গেয়ে যায় গীত।
যদিও এ আমাকেই দেয়া!
বুক ভরে নিয়ে দাঁড়ানো
উদগত শস্যের ডালি।
জলভরা বাতাসে
তার চেয়ে আরও কিছু ওঠে-
ইচ্ছা-কামনা-সৃষ্টির সুখে
ঝরে পড়ে জীবন নেশার পাঁচালি।
অবশেষে বুঝি সর্বহারা বাগানীয় মানুষ হাফ ছাড়ে।তারা সমর্পন করে দেবতার পেছনের থানে তাদের এযাবাৎ কালের না পাওয়া যা কিছু শোক তাপ বেদনা ,যা কিছু শূন্যতা ,তাদের অনিচ্ছাকৃত করে ফেলা অতীতের ভুলগুলি।কারণ এদের তো একদিন আড়কাঠিরা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমন জীবন শূন্যতায় এনে ফেলেছিল।পুঞ্জিভূত সব বেদনা সমর্পন করে সেই অসম্ভব আত্মাকে যিনি তাদের জন্য অসম্ভকে সম্ভব করতে চলেছেন।যারা কিনা এতদিন সংগ্রাম করে শিকারের নেশায় ছুটে চলেছে সেই মুক্ত আকাশ লাভ করার জন্য, কিন্তু পেরে উঠেননি।আর এই অর্ঘ্য তারা যেন আর চিরাচরিত দেবতাকে দিচ্ছে না,দিচ্ছে থানের পেছনে যেখানে এতোদিন নিবেদন করেনি অর্ঘ্য।ব্যাতিক্রমী বলেই এ থানের পেছনে দেওয়া বুঝি?এর পেছনে কারণ,এ তাদের পেছনে ফেলে আসা নিষ্ঠুর অতীত।আর তাদের নারীরা যেভাবে রোজ কোমরে আঁচল জড়িয়ে ঝাড়ু দেয় সন্ধ্যায় ।সেই ঝাড়ু দেওয়ার মতো যেন জেঠিয়ে বিদেয় করতে চায় তাদের শোকের অতীত। পাশাপাশি তারা দিতে চায় তাদের এতদিনের আশা ও আকাঙ্ক্ষার মতো ভালোবাসা দুটি কুঁড়ি একটি পাতা ও একটি সাদা চাফুল।এ ফুল ভালোবাসা ও শান্তির প্রতীক।তারা শান্তিপূর্ণ জীবনে সকলের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের সুখসমৃদ্ধিতে অংশ গ্রহন করতে চায়।
আসলে এই যে অর্ঘ্য কাউকে দেওয়া নয়।এতো নিজেকেই দেওয়া। তুমি কাউকে সম্মান করতে পারলেই অন্যও তোমাকে করবে।এ যেন নিউটনের তৃতীয় সূত্র ছাড়া কিছু নয়। তুমি কিছু কাউকে দেওয়া মানেই তুমি কিছু পাওয়া কিংবা পূর্ণতা লাভ করা।এর ফলেই তাদের এতদিনের স্বপ্নশস্যের ঢালি হাতে নেওয়া।আর এতদিনকার লাঞ্ছনা বঞ্চনার জলভরা বাতাসের এপারে তখন আরও কিছু জাগে তাদের চেতনার খামারে,তারাও তখন ইচ্ছা কামনা ও সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ভুলে যেতে চায় তাদের প্রবঞ্চক অসম্ভব অতীত।
ভরাট
অজস্র কথার ফাঁকে
কোমরে হাত রাখে নারী-
সামলায় শরীরের ভার।
হাওয়া এসে বলে যায়
বিদায়ী সন্ধ্যার অগোচরে
আরও কিছু কথা ছিল তার।
ঘর বাড়ি ঝাঁট শেষে উঠোনে
পড়ে থাকে অসীম শূন্যতা!
প্রদীপের আলোয় কাঁপে কথা শিখা,
গলে গলে পড়ে নীরবতা।
নারীদের নিয়েও,তাদের খেটে খাওয়া জীবনের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অবশেষে যেন তাদের দাঁড়ানোর মতো একটা অবস্থা আসে।তারাও ঘুরে দাঁড়ানো শেখে।কবির কথায় তারা যেন শরীরের ভার সামলিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সময় যেন বলে যায় তাদের জন্য আরও কিছু করার রয়েছে। তাদের উঠে দাঁড়ানোর শেষে মনে হয় তবু তাদের সামনে রয়ে গেছে আরও অনেক বাধা বিপত্তি,শূন্যতা।তাদের জন্য কথা বার্তায় অনেক কিছু হলেও বাস্তবে তাদের জন্য কিছুই হয়নি। এখনও বাস্তবিক তারা শূন্যই রয়ে গেছে।সামনে তাদের স্বপ্নের আলোকশিখা জ্বলছে ঠিকই কিন্তু এখনও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও কিছু বাকী রয়ে গেছে।তাদের পক্ষে বলার জন্য যারা ,তারা যেন সবাই নির্বিকার হয়ে আছে।তাই গলে গলে পড়ে নীরবতার মতো উপমা বুঝি কবির।
শিকার-৮
শিকার গিঁথব বলে
নেশা করে বসে আছি,
দূরে দূরে সরে যায়
কালো ঝোপঝাড়।
আমি পা টিপে টিপে এগোই।
কাঁধ থেকে তুলে নেই কাঁড়।
এ জঙ্গল আমার
রক্তের মতো চেনা
আজ বিদ্ধ হবে অদৃশ্য শিকার।
জীবন শিকারের নেশায় সেই সব শিকারীমানুষ যেন অধীর অপেক্ষায়।সুযোগও এসে উপস্থিত।চোখের সামনে থেকে যেন এখন সরে যাচ্ছে সব বাধাবিপত্তি।তারা অতি সতর্কতার সাথে তারা এগোচ্ছে এখন। শিকারের জন্য নিঃশব্দ পায়ে ওৎপেতে তারা।একটু ভুল হলে সব শেষ হয়ে যাবে।অন্তিম মুহূর্ত এসে যেন উপস্থিত।তাই মোক্ষম আঘাতটা দেবার জন্য তারা যেন কাধ থেকে কাড় বা তীর নিয়েছে হাতে।এবার শিকার বিদ্ধ হওয়া অবশ্যম্ভাবী।তাদের মনে হয় এই জঙ্গল এই ভূমি সকলের অধিকারের মতো তাঁদেরও।এই পৃথিবী শুধু বিত্তবানদের নয় তাদেরও।
দেবতার নারী
রাতের ভোগ নিয়ে
সামনে এসে দাঁড়ায় দেবতার নারী,
নুতন শরীরে সেজে ওঠেন
দেব-জগন্নাথ।
আজ গর্ভগৃহে
অভিমেথনের
ষোলকলার মতো
ঢেউয়ে ঢেউয়ে আছড়ে পড়বে
সমুদ্র-বাতাস
দণ্ড হাতে পাণ্ডাদের ধাই কিরি করি
আর নৃপতির ঐশী নির্দেশে
প্রাঙ্গনে বেজে উঠবে ঢাক-
ঢোল
ভেতরে
চঞ্চল নূপুরের ধ্বনি
নিমকাষ্ঠের ঘ্রাণ একাকার হলে
সহসা,ডেকে ওঠে কাক!
শূদ্র নারী
উত্তরাধিকার যাচ্ঞা করেছিল!
এই কবিতাটি অসম্ভব জার্ক এনে দেয় পাঠকের মনে।দেখি কি বলতে চেয়েছেন কবি।কে এই দেবতার নারী।কেনই বা দেবতার ভোগ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।এই নারীকি তবে সেইসব ছিন্নমূল বাগানীয়া বা তাদের মতো মানুষের ঘরণী!হয়তো তাই।যেখানে সেই সব মানুষের জীবন শিকার বা মুক্তির মুখ তাদের হাতের নাগালে চলে এসেছে।তাদের জন্য ,তাদের কথা বা তাদের অধিকার নিয়ে গনদেবতার আওয়াজ উঠেছে, শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেছে।এমন সময়কেই কবি এখানে ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে হল।আজ যেন জয়লাভের পর সেই সব মানুষের নারীরা বিজয়ের আনন্দে তাদের জন্য নুতন সাজে সেজে তাদের পুরুষকে নৈবদ্য দিতে উপস্থিত।কিংবা এমনও হতে পারে তাদের নারীরা বিজয়মাল্য দিতে চায় তাদের মুক্তির জন্য দায়ী সেই সব মেহনতি মানুষের গনদেবতাকে।কবি বলেন আজ যেন অভিমেথনের ষোলকলার মতো নারীপুরুষের মিলনের আতিসহ্যে সমুদ্রবাতাসের মতো উচ্ছাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে প্রতিটি ঘরে।মুক্তির আবেগে নারী ও পূরুষ মিলিত হবে মুক্তির স্বাদে।সেই সাথে দণ্ডহাতে পাণ্ডাদের ধাই কিরি কিরি চলবে ।এই পাণ্ডা হয়তো গনদেবতার সরকারের নিরাপত্তার লোক হতে পারে।আর দেবতার নিজের ইচ্ছাতেই তারা অর্থাৎ সেই সব মানুষের নিজের ইচ্ছাতেই চলবে তাদের নিজেদের শাসনে মুক্তির উচ্ছাসের মিলনমেলা।তাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে যেন চঞ্চল নূপুরের ধ্বণি বেজে উঠেছে।
কিন্তু মিলনের শেষে বা অভিমেথনের শেষে হঠাৎ করে যেন তাদের চোখের সামনে স্বপ্ন ভেঙে যায়।তারা দেখে তাদের স্বপ্ন যেন বাস্তবের ঘেরাকলে মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে।এখানে মনে হয় কবি বলতে চেয়েছেন যে কাণ্ডারীরা তাদের জন্য জীবন শিকার বা মুক্তির স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে বসেছিল,তারাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবের যাতাকলে তাদের স্বপ্নকে বেড়ি পরিয়ে দিতে বসেছে।আসলে কবি জগন্নাথ মন্দির ও দেবদাসী উপমার আড়ালে -সর্বহারা মানুষের বন্দীদশা ও মুক্তিলাভের এক বাঙ্ময় চিত্ররূপ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
এ যেন অনেকটা হাজার হাজার বছরের উচ্চবর্ণের নিষ্পেষণের যাতা কলে জর্জরিত সেই শূদ্রনারীর লুকায়িত বেদনা যেন।শূদ্রনারীর যেমন অধিকার নেই দেবতাকে ভোগ দেওয়ার সবই উচ্চবর্ণের অধিকারে তেমনি সর্বহারা মানুষেরও যেন তাদের জীবনের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার অধিকার নেই।কবি বুঝি অবশেষে বলতে চেয়েছেন। শেষপর্যন্ত সর্বহারাদের স্বপ্নের করিডর বাস্তবায়িত হলেও তাদের স্বপ্ন এখনও অধরাই রয়েগেছে।এ যেন অমিত সংগ্রামের শেষে স্বপ্নফল মুখে দেবার মুহূর্তে সব লন্ডভন্ড হওয়ার মতো।তাই কবি বলেন -নিমকাষ্ঠের ঘ্রাণ একাকার হলে/সহসা,ডেকে উঠে কাক!/শূদ্রনারী /উত্তরিধিকার যাচ্ঞা করেছিল!
রাজভিক্ষা
দুয়ারে এসে হাত পাতলো
ব্রহ্মপুত্র।
তাকে খালি হাতে ফেরানো যায় না।
এই যেমন তুইও হাত পেতেছিস
বারবার।
তোকে দেয়া হল
উদ্বাস্তু শিবির, ইঁদুর দৌঁড়,
স্বর্ণযুগের রগরগে আখ্যান!
গেরুয়া বসনে 'বুড়া লুইত'
ভিক্ষা মেগে যায়।
এই কবিতাটির মাঝে আমরা যেন পূর্বের কবিতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির জন্য সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঠিকই বাস্তবে তার পূর্ণ প্রতিফলন লক্ষিত হচ্ছে না।এ যেন কেউ ভিক্ষা মাগার মতো । এতদিনের অনধিকারের নির্যাতনে নিষ্পেষিত সে ,কিছু মেগেছে তো তাকে খালি হাতে ফেরানো যায় না।তাকে কিছু দিতেই হয়।বুড়া লুইত তো যেন হাজার হাজার বছর ধরে বঞ্চিত সেই সব সর্বহারা মানুষেরই রূপক মনে হয় ।এতো সরগরম ও শ্বাসপ্রশ্বাস শেষে তাকে দেওয়া হল, উদ্বাস্তু শিবির আর ইঁদুর দৌড়।তাকে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান তথা জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা তার এতো সবের পরও হল না ,নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ যেন।গেরুয়া তথা ভিখিরি বসনে আজও যেন সর্বহারা মানুষ সর্বহারাই রয়ে গেলে।এখানে কবির এক বিদ্রোপ লক্ষ্য করি আমরা গনদেবতাদের প্রতিষ্ঠিত জনগনের সরকারের প্রতি।কবি বলেন-গেরুয়া বসনে/'বুড়া লুইত ভিক্ষা মেগে যায়।
নিজেকে বাঁচাতে চেয়ে
নিজেকে বাঁচাতে চেয়ে
আমার লজ্জাহীন অহমিকা
ও এই বশ্যতা!
আমি তোমার কথা
ভাবিনি,পরিপূরক এই
তিক্ত শ্বাসপ্রশ্বাসে
জন্ম নেওয়া ফসলের উপর
খেলে যাওয়া বাতাস-
অবাক শিহরণ!
নিজেকে বাঁচাতে চেয়ে
আমার লজ্জাহীন গমন-
বাস্তুভিটেতে ছায়া ফেলে ঘুঘু।
এখানে সর্বহারাজনের মুক্তি যে ধরাছোঁয়ার বাইরে তার এক বাঙ্ময় রূপ যেন কবিতাটি। সর্বহারা মানুষ অসম্ভব খেদের সাথে বলছে তাদের চরম অভিব্যক্তি।তারা তাদের আশানুরূপ না পেয়েও শেষ পর্যন্ত গনদেবতার কাছে বশ্যতা শিকার করেছে।এ বশ্যতা যেন নির্লজ্জের মতো হলেও তা যেন তাদের তিক্ত শ্বাস প্রশ্বাসে জন্ম নেওয়া বা অসম্ভব সংগ্রামের ফসল ,এ তাদের অহমিকার মতো।মুক্তির আলোক ফুটে উঠেছে বা মুক্তির বাতাস বয়ে চলেছে তা যৎসামান্য হলেও তা তাদের কাছে এক অবাক করা শিহরণ যেন।
আর তাদের নিজেকে বাঁচাতে চেয়ে তাদের এই লজ্জাহীন গমন শেষপর্যন্ত তাদের মুক্তির ভিটেতে যেন ছায়া ফেলছে ঘুঘুর মতো।এই ঘুঘু যেন তাদের সাজানো স্বপ্নের পসরার মধ্যে তথাকথিত অতি গনদেবতাদের বা অতিকাণ্ডারী কিংবা প্রতিক্রিয়শীলদের অথবা প্রতিবিপ্লবীদের ছায়া কল্প !
মারাং বুরু
সমর!
মাঝে মাঝে দেখি আমার
মৃত্যুর মুখ
মাটি ও আকাশ জুড়ে
শুয়ে আছে সুখে!
সেই সব সর্বহারা মানুষের খেদোক্তি যেন।কবি যেন তাদের প্রতিনিধি এখানে।কবি যেন তাদের একমাত্র আত্মীয় বা আত্মজন যেকিনা তাদের দুঃখের কথা বেদনার কথা ফুকারিয়া বলতে পারে।তারা যেন খেদের সাথে বলছে,এত ঝড়বৃষ্টির পরও তারা হতাস হয়ে নিজের কাছেই যেন আত্মসমর্পণ করছে।তাই তারা বলছে -তাদের যেন এই নাগপাশ থেকে মুক্তির চেরাগ আর নেই। একমাত্র মৃত্যু ই যেন তাদেল মুক্তি দিতে পারে।তাই তারা খেদের সাথে বলছে এই মাটি আর আকাশ জুড়ে যেন একমাত্র তাদের মৃত্যুর মুখই দেখা যায়। মৃত্যুর মাঝেই যেন তাদের সুখ সমৃদ্ধি ও শান্তি লুকিয়ে রয়েছে।এই কবিতাটি সর্বহারা মানুষের বাস্তব জীবনের নিকষ যেন।
সর্বোপরি কবির এই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে মনে হয়েছে।এই সকল বাগানীয়া মানুষের জীবনের সাথে নিজের রক্ত মিশিয়ে ফেলেছেন কবি সমর।না হলে এই কবিতার শেষে বাগানী মানুষের সুখ দুঃখের সাথী হতে পারতেন না কবিতার এমন উচ্চারণে।
0 মন্তব্যসমূহ