দেওনদ || হারাধন বৈরাগী
উত্তরপূর্বভারতের অষ্টমতনয়া ছোট্ট ত্রিপুরা ,বন-জঙ্গল-ঢাকা পাহাড়-নদী সংকুল ।সবকটি নদীই প্রায় উত্তর ও পশ্চিম বাহিনী।জুরি লঙ্গাই দেও মনু ধলাই খোয়াই হাওড়া বুড়িমা মুহুরী ফেনী---ইত্যাদি অনেক ছোট বড় নদীর সমাহার এখানে।তন্নধ্য দেওনদীর দৈর্ঘ্য উৎস থেকে মোহনা অবধি প্রায় ৯৮ কিমি।
দেওনদ ত্রিপুরার সর্বোচ্চপাহাড় জম্পুই থেকে উৎপন্ন হয়ে পাহাড় টিলা ডিঙ্গিয়ে দেওভ্যালি নামক এক বিস্তীর্ন উপত্যকা গঠন করে কালাপানি আনন্দসাগর ,আনন্দবাজার ,গছিরামপাড়া ,বুড়িঘাট ,আদিবাসী ,দশদা, বড়হলদি ,সাতনালা ,কাঞ্চনপুর ,লালজুরি ,মাছমারা, পেচারতল, -----ইত্যাদি জনপদকে ছুয়ে অবশেষে কুমারঘাটের হালাইমুড়ায় মনুনদীতে নিস্পন্ন হয়েছে।
অতীতে দেওনদের পরিসর ছিল অনেক কম।কিন্তু নাব্যতা ছিল বেশী।দেওভ্যালীর মানুষের যাতায়াত ও মালপরিবহনের অন্যতম মাধ্যমছিলো এই নদী।বিশেষ করে আনন্দবাজার গসিরামপাড়া,দশদা, কাঞ্চনপুর ,মাছমারা পেচারতল ও কুমার ঘাটের মধ্যে যাতায়াত ও মালপরিবহন সম্পন্ন হতো এই নদীপথেই।চাকমা জনজাতিরা বিংশশতকের গোড়ায় এখানে এসে প্রথম দেখেছিলো দেওউপত্যকা প্রায় ফাঁকা।আর শীতকালে নদীর চড়ায় শুকরের পাকাল দেখেএই নদীর নাম তারা দিয়েছিলো দেরগাঙ।অপরদিকে চাকমাদের পাশাপাশি বাবুজয় রিয়াং ও রামবাহাদুর রিয়াং চৌধুরীর নেতৃত্বে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে ব্রু জনজাতির পাড়া।অবশেষে গতশতকের চারের দশকের শেষ দিকে বাঙালিররা সস্তিসমিতি গঠন করে এখানে এসে এই নদীর তীরধরে বসতিস্থাপন করেছিলো।আর পাহাড় ও সমতলের সঙ্গমে বাড়ছিল জনকল্লোল।গড়ে উঠেছিল পাহাড়ি বাঙ্গালী মিলেমিশে আনন্দবাজার গসিরামপাড়া দশদা বড়হলদি সাতনালা কাঞ্চনপুর শিবনগর লালজুরি ----ইত্যাদি জনপদ।
এই দেওনদের সাথে জড়িয়ে আছে কত লোকগাঁথা মিথ।পুরাকালে এখানে নাকি কালাপাহাড় নামে এক রাজা ছিল। রাজার এক উপাস্যদেবতার নাম ছিল দেও।তিনি প্রতিদিন এই নদের জল দিয়ে তার আরাধ্যদেবতা দেওয়ের পূজো দিতেন। এই থেকে নদের নাম হয় নাকি -দেওনদ।
যতদূর জানা যায়, পুরাকালে লঙ্গাই, জুরী ,দেও ,মনুনদীর উপত্যকাঅঞ্চল ত্রিপুরার রাজাদের অধিকারে ছিলো না।এই অঞ্চল বিশেষত দেওভ্যালি অঞ্চল ছিল হালাম বা কুকিদের মুক্তাঞ্চল,।আসামের মহারাজ রৌদ্রসিংহের রাজধূত কটকি রত্নকদলি ও অর্জুনদাশ বৈরাগী আজ থেকে প্রায় সোয়াতিনশো বছর আগে যখন ত্রিপুরায় এসেছিলেন এই দেওভ্যালী ছুয়েই তারা রাঙামাটি রত্নমানিক্যের রাজসভায় গিয়েছিলেন।তারা বর্তমান মিজোরাম ও আসামের সীমান্তধরে লঙ্গাইনদী অতিক্রম করে দামছড়া হয়ে কাঞ্চনপুর মহকুমার লালজুরি ও মাছমারার মাঝামাঝি কোথাও দেওনদে নেমে বাঁশের ছরঙ্গায় করে ,মনুনদীতে গিয়ে উজানবেয়ে লংতরাই আঠারোমুড়া পাহাড়কে বায়ে ফেলে ,বড়মুড়া পাহাড় হয়ে দক্ষিনামুখে কোন সংক্ষিপ্তপথ ধরে উদয়পুরে গিয়েছিলেন।তাদের বর্ণনা থেকে দেওভ্যালি অঞ্চলে প্রবেশের আগে হালাম ও কুকিজাতির অবস্থানের সাক্ষ্য মেলে ।আসামের রাজদূতদ্বয় এইনদীর নাম দিয়েছিলেন- দেওপানি।
এই থেকে দেওনদকে নিয়ে একটি হালাম উপকথা আছে।এই উপকথা থেকে বুঝা যায় দেওভ্যালি অঞ্চল সূদুর অতীতে হালাম জনজাতির মুক্তাঞ্চল ছিল। লোককথাটি এরকম।পুরাকালে লঙ্গাই দেও ও মনু একই গ্রামের যুবক যুবতি ছিল।তাদের পৈতৃকগ্রাম দক্ষিনে বর্তমান জম্পুই ও শাখানপাহাড়ের সংযোজক স্থলে অবস্থিত ছিলো।লঙ্গাই ও দেও ছিল ছেলে, মনু ছিল মেয়ে।লঙ্গাই ও দেওয়ের পিতা ছিলেন খুবই গরীব ,আর মনুর পিতা ছিলেন খুব ধনী।তিনি আবার গায়ের গালিম বা চৌধুরী।তিনি অসম্ভব তন্ত্রমন্ত্র জানতেন।
একই গ্রামের ছেলে মেয়ে ও সমবয়সী হওয়ার মনু দেও ও লঙ্গাই একসাথে খেলাধূলা করতে করতে বড়ো হচ্ছিল।ক্রমে তারা যৌবনে পদার্পন করলে লঙ্গাই ও দেওয়ের সাথে মনুর গভীর প্রেম ও ভালবাসা গড়ে ওঠে।কিন্তু দুজনের সাথেই মনুর গভীর প্রেমের সম্পর্ক হওয়ার সে কাকে বিয়ে করবে এই নিয়ে দেও ও লঙ্গাই’র মাঝে একসময় চরম বিবাদ বাদে।এই বিবাদের কথা কানাঘুসো হতে হতে একসময় মনুর বাবার কানে পৌছলে তিনি খুব রাগান্বিত হন।,দেও ও লঙ্গাই খুবই গরীব বলে তিনি তাদের কারোর সাথেই মনুকে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না,বরং তিনি প্রতিবেশী গ্রামের ধনীবাবার ছেলে ধলাই বা দেলুয়াইয়ের সাথে মনুর বিয়ে ঠিক করলেন।এদিকে মনু লঙ্গাই ও দেও এই বিয়ে মেনে নিতে পারছিল না।এদিকে মনু তার দুজন ভালবাসার মানুষের কাকে বিয়ে করবে তাও ঠিক করে উঠতে পারছিলো না।তাই তারা গোপনে পারস্পরিক শলাপরামর্শ করে একটি সমঝোতায় পৌছায়।স্থির হয়,তারা একটি শর্ত পালনের মাধ্যমে এর মিমাংসা করবে।শর্তটি ছিল এই রকম, ধলাইর সাথে বিয়ের দিনের আগের শেষরাতে ,প্রথম মোরগবাঙের সাথে সাথে ,তিনজন আলাদা আলাদা ভাবে ঘর থেকে পালিয়ে উত্তরাভিমুখে যাত্রা করবে,আর যার সাথে প্রভাত হওয়ার আগে প্রথম মনুর সাক্ষাত হবে তাকেই সে মাল্যদান করবে।উভয়ই অবশেষে এই শর্তটি মেনে নেয়।
এই মোতাবেক নির্ধারিত রাতে প্রথম মোরগডাকের সাথে সাথেই মনু সকলের আগেই উত্তরাভিমুখে যাত্রা করে।এদিকে দেও কোনও রকমে একটি ধূতি আলগোছে কোমড়ে জড়িয়ে তারাহুরো করে সেও যাত্রা করে।লঙ্গাই ছিল বামনবংশীয়,তার ঘুম ভাঙে কিছুটা দেরিতে, আর সে ভালো করে ধূতি পড়ে মাথা আচড়ে বের হতে আরও দেরী করে ফেলে।এদিকে তারা তিনজনই উত্তর দিকে দ্রুত চলতে থাকে।এদিকে ভোর হবার আগেই মনুর সাথে বর্তমান কুমারঘাটের পাশে দেওয়ের দেখা হয়ে যায়।তাই মনুও শর্তানসারে দেওয়ের গলায় মালা পড়িয়ে দেয়।বিয়ে যখন হয় তখন সেখানে ঝোপের আড়ালে একটি তিতিরপাখি ঘুম থেকে জেগে উঠে ছিল।সে চোখ রগরাতে রগরাতে দেখতে পেল,মনু প্রবল উচ্ছাসে দেওয়ের গলায় বুনোফুলের মালা কী সুন্দর পড়িয়ে দিয়েছে।তাই সে তাদের অজান্তেই এই বিয়ের সাক্ষী হয়ে গেল।
এদিকে লঙ্গাইও দ্রুত ছুটে চলেছে উত্তর দিকে।ছুটতে ছুটতে ক্লান্তিতে তার পা জড়িয়ে আসছে।এদিকে ভোর হয়ে আসছে,কিন্তু মনুর দেখা নেই।ক্লান্তি আর হতাশায় সহসা সে উপরের দিকে তাকাতেই দেখে ভোরের রাঙা আলো সাঁতরে একটি তিতির পাখি পূর্বমুখি উড়ে যাচ্ছে।সহসা সে তিতিরকে হাত নেড়ে ডাকে ।তিতির লঙ্গাইকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করে ,কোথায় এত উদভ্রান্তের মতো ছুটে যাওয়া হচ্ছে?তখন সে তিতিরকে বলে,-তুমি কী মনুকে পথে পেয়েছো,আমি মনুকে বিয়ে করতে ছুটে চলেছি।তখন তিতির বলে,-মনুর সাথে খানিক্ষন আগে দেওয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।আমি তা সচক্ষে দেখেছি।এই কথা শুনামাত্র লঙ্গাই’র মন খারাপ হয়ে যায়, সে তখন মনের দুঃখে মাথা ঘুড়িয়ে আরও উত্তর দিকে চলে যায়।
এদিকে ভোরবেলা মনুর বাড়িতে হূলস্থুল কাণ্ড শুরু হয়েছে।সারাবাড়ি খুজেও মনুকে যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না,তখন দেও ও লঙ্গাইর ডাক পড়লো।দেখা গেল দেও, লঙ্গাইও বাড়িতে নেই।ব্যাপারটি আর কারোরই বুঝতে অসুবিধা হল না।ইতিমধ্যে ধলাইও বরযাত্রীসহ উপস্থিত মনুর বাড়ি।মনুর বাবা এমন পরিস্থিতিতে হবু জামাতাকে দেখে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন।আর তিনি একমনে একটি ঘরে ঢুকে দরজায় খিল এঁটে মন্ত্র জপতে লাগলেন মনুকে ফিরিয়ে আনার জন্য।কিন্তু তিনি অবশেষে পুরোপুরি ব্যর্থ হলেন।আর ধলাইও বরযাত্রীসহ অপমানে মনুর বাবার আদ্যশ্রাদ্ধ করতে করতে বাড়ি ফিরে গেলো।
অতীতে দেও উপত্যকার বাস্তুব্যতন্ত্র ছিল বৈচিত্র্যময় ও নিশি লাগা।পুরো উপত্যকাই ছিল প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানা ।বনে হাতি বাঘ ভল্লুক উল্লুক শুকর গণ্ডার বনবিড়াল শ্লথ বনরুই বনছাগল হরিন শজারু মহিস গব, উড়ন্তকাঠবেড়ালি নানাপ্রজাতির সাপ ব্যাঙ কীট পতঙ্গ মাছ বনমানুষ ----ইত্যাদির ছিল সমারোহ।দেওনদের বাস্তুতন্ত্রেও ছিল,বিভিন্ন প্রজাতির জলচর,উভচর -- বিবিধ প্রানীর প্রাচুর্য।।আজ তা ভাবা যায় না।এমন বিরল বাস্তব্যতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মানুষেরই হাতে।বাস্তব্যতন্ত্র নস্ট হয়ে গেলে তার প্রভাব থেকে মানুষের নিস্তার নেই।মানুষ এসব কিছু জেনেও যেনো সে কালিদাস,নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরে নিজের অস্তিত্বের সংকট ডেকে আনছে। আজ থেকে ২৫ বছর আগেও জম্পুই পাহাড়ে গেলে দেখা যেতো চাক চাক প্রজাপতির সমাবেশ।আজ আর তা নেই।পাহাড়ের উচ্চতায় প্রজাপতির নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়া সন্দেহাতীতভাবে পরিবেশের পরিবর্তন ও বাস্তব্যসংকটের ইঙ্গিতবাহী।অতীতে দেওভ্যালির জলাশয়ে পর্যাপ্ত ভেটকি,পাবদামাছ পাওয়া যেতো,এখন আর তা নজড়ে পড়ে না।অনেকে বলেন জম্পুইপাহাড়ের সুন্দিবৃক্ষ নিধন পাহাড়ের বাস্তব্যপরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলেছে।তাপমাত্রার তারতম্যের কারনে কমলাফুলের পরাগসংযোগে সাহায্যকারী ও কমলাগাছের স্বাস্থ্য রক্ষাকারী বিবিধ কীটপতঙ্গের বিলুপ্তির কারনে কমলা উৎপাদনে সংকট ও কমলাগাছের মরক এসেছে।ফলে কমলার রানী জম্পুই এখন ভিখিরিনিতে পরিনত হয়েছে।মানুষ নামের সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান প্রানীর লোভের কাছে মেধা মার খাচ্ছে।পরিবেশ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।জঙ্গল ধ্বংসের দরুন মাটির জলধারন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।ফলে কখনও অতিবৃষ্টি ,কখনও অনাবৃষ্টি বাস্তব্যস্বাস্থ্যের প্রতিকূল হয়ে উঠেছে।অতিরিক্ত বৃক্ষনিধনের ফলে অতিবৃষ্টির জল মাটির আস্তরনের ক্ষয় করে পলিসহ জল বাহিত হয়ে দেওনদপথে নিম্নভূমি প্লাবিত করছে।নদের তীর ভাঙছে,বড়ো হচ্ছে নদ।ফলে মানুষের বাসভূমি প্লাবিত হচ্ছে।সাম্প্রতিক ২০১৮ ,জুলাইমাসের ভয়াবহ বন্যা এর উদাহরণ।
একদা দেওনদের জলে ছিল বিবিধ প্রজাতির মাছ যেমন-পাবদা,লাইড়া,চেলাপাতা,রানী,বোয়াল,ঘাগট লাসো,ইল কচ্ছপ---ইত্যাদি ।এখন এসব বিবিধ জলজ ও উভচর প্রানীর সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে।মৎস্যজীবীদের একদা জীবিকার উৎস ছিল এই নদের মাছ।এখন নদজলে মাছের আকাল মৎসজীবিকার উপর সংকট সৃষ্টি করেছে।মানুষের লোভের কাছে সব হেরে যাচ্ছে।সরাসরি বিষ ঢেলে মাছধরার প্রবনতা থেকে বিবিধ মীনপ্রজাতি ও জলজ প্রানী হারিয়ে যাচ্ছে।ছড়া নদ নালায় স্বর্নলতা কিংবা একরকম বনের বিষলতার নির্যাস ঢেলে মাছ শিকার জলজ বিচিত্রবিধ প্রজাতির বিলুপ্তির অন্যতম কারন।তাছাড়া, মাছধরার নিত্য নুতন পদ্ধতি,বিশেষ করে বিদ্যুৎ ছোবলে মাছধরার প্রবনতা বেড়ে গেছে।এই পদ্ধতিতে মীনবংশ ও অন্যান্য জলজপ্রানী ছানাপোনাসহ সমূলে বিনাশ হচ্ছে।যেমন দেওভ্যালিতে একসময় প্রচুর ভেটকিমাছ ছিল,আজ আর দেখা যায় না।ভেটকি মাছের মতো অনেক মাছের প্রজাতি এখন বিলুপ্তির মুখে।আগে শীতকালে নদীতে রনিপেতে মৎসজীবিরা মাছ ধরতো।এখন এই মাছের অভাবে মাছধরার সাবেকিপদ্ধতি প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সবুজবনের কাছে জীবনের ঊষালগ্ন থেকে প্রানীজগৎ গভীর ভাবে ঋণী।সবুজবন বৃষ্টির জল মূলরুম দ্বারা শোষন করে ভূগর্ভে পানীয় জলের যোগান সৃষ্টি করে।বৃষ্টি সরাসরি বনের উপর পড়লে মাটির আস্তরনের কোন ক্ষতি হয় না।ফলে অতিবৃষ্টি হলেও জল গাছপালা দ্বারা শোষিত হওয়ার ফলে ভূভাগ প্লাবিত হয় না।একটি গাছে প্রায় ৫০ভাগের উপরে জল থাকে।তীর বরাবর বৃক্ষ থাকলে নদনদী জলাধারের জল মূলোরোমদ্বারা শোষিত ও পরিস্রোত হয়ে উপত্যকায় পেয়জলের যোগান তৈরী করে।বন ,নদী বা জলাশয়ে জলের উষ্ণতা নিয়ত্রিত করে।দেখা গেছে কিছু কিছু মাছের প্রজনন জলের উষ্ণতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়,যেমন ট্রাউট সলমন ---ইত্যাদি প্রজাতির মাছ।সুতরাং বৃক্ষের সাথে পেয়জলের সম্পর্ক যেমন আছে তেমনি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ,এমন কী কিছু প্রজাতির ব্যাঙের জীবনচক্রের উপরও জলের উষ্ণতার তারতম্য প্রভাব বিস্তার করে।উদ্ভিদ ছাড়া জলের পরিশ্রবন সম্ভব নয়। বিভিন্ন জলজ ও স্থলজ প্রানীর স্বাস্থ্যও পরিস্রোত জলের উপর নির্ভরশীল।অপরিশোধিতজল প্রাণীজগতের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।বনের অভাবে একসময় শুখাভূমি ও মরুভূমি সৃষ্টি হয়।বর্তমানে বিশ্বের ৮৫% মানুষ পৃথিবীর অর্ধশুখা অঞ্চলে বসবাস করছে,আর ৭৮৩ মিলিয়ন মানুষ বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করতে পারছে না।সর্বোপরি প্রানীদের প্রয়োজন বিশুদ্ধ জল এবং বিভিন্ন প্রজাতির জীব যেমন বিবিধ প্রজাতির ব্যঙ-দূষিত জল তাদের বিলুপ্তির কারন।পরিস্রোত পানীয় জলের অভাব ও জল দূষনের জন্য-অংশত যতেচ্ছ্ পরিমাণে বৃক্ষনিধন দায়ী।গাছ মাটি থেকে জল গ্রহন করে,পরে এই জল বাতাসে অক্সিজেন ও জলীয় আদ্রতা বৃদ্ধি করে।বৃক্ষ জলীয়বাষ্প আকর্ষন করে অলকমেঘ তেরী করে যা বৃষ্টিপাত ঘটাতে সহায়তা করে।গাছ জল পরিস্রোতকরন ও ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিকজল ভাণ্ডার গড়ে তুলতে প্রাকৃতিক স্পঞ্জের মতো কাজ করে।গাছ আবার নদ নদী ও জলাশয়ে জলের বিশুদ্ধতার মান নির্নায়ক,যা আমাদের সাস্থ্য রক্ষা ও বাস্তুতন্ত্রের সাস্থ্য রক্ষা করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহন করে।বনের আচ্ছাদন সরাসরি জলশোধনাগারের খরচ কমায়এবং জল থেকে পলি ও পানীয়জল শোধনে বিশেষ ভূমিকা নেয়।নদীর পাড়ে সবুজের সমারোহ নদীপাড়ের ক্ষয়রোধ ও জল পরিশোধন করে ভূগর্ভস্থ জলের যোগান বাড়ায়,যার প্রভাব সরাসরি ফসলের উপর পড়ে।বন থেকে মাছের খাদ্য বায়োমাস আসে।বনের সাথে মাছের বৃদ্ধি জড়িত।বিশ্বের প্রায় ৬%এর উপর প্রানীজপ্রোটিনের যোগান আসে প্রকৃতপক্ষে সাধুজলের মাছ থেকে।
নদীর সাথে মানুষের ত্রিকাল জড়িত,।দেওনদকে কেন্দ্র করে জাতিজনজাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার আচরণ জড়িত।,তাদের লোকসংস্কৃতি জড়িত।বনের সাথে নদনদী,বনের সাথে প্রানীর ,প্রানীর সাথে বন ও নদনদীর সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।নদনদী যেন জীবনের প্রবাহ।তাই নদনদীকে কেন্দ্র করে যেমন তিতাস একটি নদীর নাম,পদ্মা নদীর মাঝি’র মতো কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। নদনদী ও মানুষের জীবন অবিচ্ছেদ্য, তাই পৃথিবীর যত সভ্যতা তা প্রায় সবই নদী কিংবা নদমাতৃক।কালে কালে মানুষ নদনদীকে কেন্দ্র করে লোকগান লোকগাঁথা কতকিছু রচনা করেছে।ত্রিপুরার বিখ্যাত শিল্পি শচিন দেববর্মনের নদী কেন্দ্রীক একটি বিখ্যাত লোকগান হলো,-”তোরা কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া,আমার ভাইধনরে কইয়ো নাইর নিতো আইয়া”।নদনদী মানুষের পিতামাতার মতো।নদ বা নদীতীরের পলিগঠিত ভূমি যুগে যুগে সোনার ফসলের ভান্ডার।নদনদীর খালবাহিত জল শুষ্ক অঞ্চলে ফসলের প্রান।নদনদীর স্রোতধারার সাথে মানুষের জীবন ও সময় তুলনীয়।তাই আমাদের দেওনদকে বাঁচাতে হবে ,বাঁচাতে হবে বন।রক্ষা করতে হবে তার বাস্তব্যতন্ত্র।তবেই বাঁচবে দেওনদ ও তার বাস্তুতন্ত্র .বাঁচবে মানুষ ও বিচিত্রবিধ প্রানী ,বাঁচবে জনপদ।অন্যতায় নাব্যতাহীন দেওনদ বানের তোড়ে বাস্তব্যতন্ত্র করবে তছনছ।উদ্বাস্তু হবে মানুষ,ধ্বংস হবে বিবিধ প্রানী।পরিশোধিত জলের অভাবে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে,সংকটের মুখোমুখি হবে মানুষ প্রানী,সর্বোপরি ধ্বংস হবে বাস্তব্যতন্ত্র।তাই দেওভ্যালির বাস্তব্যস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য দেওনদকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে হবে জাতিজনজাতি সকলকে হাতে হাত ধরে,সর্বোপরি টেকসই বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।অন্যতায় যে দেওনদ ছিল একদিন দেওভ্যালির প্রান, সেই হবে আগামীর সংহারক।
*ঋণ:নিরঞ্জন চাকমা,কবি প্রাবন্ধিক ও লোকগল্প গবেষক।
0 মন্তব্যসমূহ