এক সংসারী কবিতার ঘর ঘরানা ও আত্মরতি || হারাধন বৈরাগী
কবি দেবাশ্রীতার চৌধুরীর কবিতা পাঠ করে মনে হল,এপারে দহন,ওপারে শান্তি,এই বুঝি তাঁর কবিতার আত্মার রসুইঘর। সেখান থেকেই বুঝি জেগে ওঠে তাঁর কবিতা।তাই কবিকে দেখেও বুঝা যায় না তার ভেতরের রন্ধনশালা।এ যেন অনেকটা সুচ্যেং টাকল হাতে জুম্মবি।ধারে ঘরিতে কাটাকাটি। বস্তুত এ বলার জন্যই বলা,কাউকে বুঝানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা।আসলে কবিতা কি বলে বুঝানো যায়?ধরা যায় তাকে?বহিরঙ্গে একটা ছবি আঁকলেও তাকে কি আঁকা যায়।কবির অবস্থান কি জানা যায় তার কবিতায়।কবিতার কি কোন মুখ আছে?শরীর আছে?যে বললেই আমি তাকে ঘোমটা খুলে দেখিয়ে দেবো।এমন হাজারো প্রশ্ন আমাকে রাতদিন খুবলে খায়?তাই কবিতা আলোচনা,পাণ্ডিত্যের ধ্বজ্জা উড়ানো মনে হয় আমার মুর্খামি?তবু যেন একটা ফ্লেভার, একটা ফ্লেভার বের করে আনতে পারি কবির বোধের ঘ্রাণের।
কবি দেবাশ্রীতার সাথে আমার কি দেখা হয়েছে?মনে করতে পারিনা। কিন্তু মনে হয় কোথায় দেখেছি তাঁরে।আবছায়ার মতো যেন কবি দেবাশ্রীতা।এমন ছায়া অনুসঙ্গই বুঝি তুলে ধরতে পারি দেবাশ্রীতার,তাঁর কবিতার।কবিকে সরাসরি চিনতে হয়না।কবিকে চেনা যায় তাঁর লেখায়,তাঁর কবিতায়।কবিতাই বুঝি কবির আত্মাকে চিনিয়ে দেয়।কবির অবস্থান,ভেতরে বাইরে আকাশে বাতাসে ভূমিতে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি কিংবা কোন কৌণিক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে দেখছেন তিনি তার অসুখ বা আত্মদহনের উপসর্গগুলি।
একজন সংসার-নারীর ভেতরের দ্বন্দ্ব কিংবা বিবিধ অবস্থান থেকে অবজারভেশনের শ্বাসাঘাত যেন তাঁর কবিতা।আবাহন কালের এক সংসারী নারীর আত্মবেদনার বাঙ্ময় অভিব্যক্তি যেন তাঁর কবিতা।এও যেন শেষ নয়।চলছে চলবে। ইতিহাসের মতো,ঢেউ ভেঙে ঢেউ,ঢেউ এক নুতন। সৌরমণ্ডল থেকে পৃথিবী, ক্রমশ দূরে চলে যাওয়ার মতোই যেন কবিতারও পথ।কবি যখন বলেন,-"
“একা একা একা/
উল্টোদিকে ফিরে থাকা/
নিজের সাথে দেখা
দূরে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে
ওড়নাতে মুখ ঢাকা
সে কোন জন ! আমি নাকি
আমার ছায়া তা কি...” (ফেরা)
আসলে তাই,সে কোন জন?সংসার গড়ে নারীপুরুষ,শুরুতে সে জানে না,বুঝে না যে এখানে সং-সাজাই সার আর কিছু নয়,আর কিছু নয়। অবশেষে নিজেকে চেনা যায় না একটা উদালবৃক্ষের মতো। এযাবতকালের নারী , ঘর,স্বামী-সন্তান নিয়ে চোখ বাঁধা কুইস্যার পেঁড়ালের মহিশ-মর্দিনী যেন ,পুরুষতন্ত্রের চলৎশক্তির কাছে বাঁধা ।এমন একটা বোধ অবোধের আলো-ছায়াশরীরই বুঝি বিড়বিড়িয়ে তুলে এনেছেন কবিতায়।তবে তার বেদনা,দ্রোহ সবই কর্তব্যকর্ম বজায় রেখে সংসারের দায়-দায়িত্ব-বোধকে মেনে নিয়েই যেন তার দ্রোহ।ধারণ!ধারণের পর যেন আর ধারণ থাকে না!তাঁর কবিতায় যেন বাস করে দ্বৈতসত্তার দ্বন্দ্ববুড়ি।
“একটি স্বপ্ন বুকের ভেতর গুমরে মরে
আরেকটি সে ঘুরে বেড়ায় ভর দুপুরে...” (স্বপ্ন)
অথবা
“খণ্ড খণ্ড টুকরোগুলো/জুড়ে জুড়ে অবিকল
চিত্র ক্যানভাসে)আবার টুকরো টুকরো
ছড়িয়ে ছত্রখান ।/ফের জুড়তে বসা
এ কেমন খেলা !” (খেলা)
ভাঙা গড়া করতে করতে ,ছত্রখান হতে হতে অবশেষে যেন মাটির ডেলা।সং-সার সংসার তো যেন এরকমই ।কবি বলেন,-
“...নিজেকে মনে হয়
যেন একটি মাটির স্তূপ
দূর থেকে দেখি কেউ খানিকটা নিয়ে গেলো,
আধখানা রইলো পড়ে
বিষাদগ্রস্ত আমি কোনখানা
তাই অবোধ্য ! ...........
কর্ষণে উৎপাদনেও সম্মতির
অপেক্ষা আছে কি ?” (মাটি)
নারী-মুক্তি।আসলে মুক্তি বলে কিছু আছে?নিখাদ বিয়োগ বলে কিছু আছে?সবই তো যেন,যোগ-বিয়োগ,গুণ-ভাগ!ফের তো সেই তুষানল!স্বপ্ন আছে বলেই যেন বেঁচে থাকা।
“...ইচ্ছেরা সব যা ছুটে যা
প্রখর আলোর বাঁধন মুক্তির
আনন্দে ঘুরে আয় এঘর ওঘর
ভোরের আলোর কাছে ডানা দুটি
রেখে ফিরিস,
তোর খাঁচাতেই তুই । (ইচ্ছে)
খাঁচা ভাঙা কি সহজ এতোই সহজ!ভাঙলেই কী , আর না-ভাঙলেই বা কী ?তাই কি কবি বলে ফেলেন? এঁকে ফেলেন সং-সাজার রসুইবাটি!
“দেশলাইয়ের বাক্সটি জানে
বারুদবুকে বেঁচে থাকার মহিমা
জ্বালায় জ্বলে যাওয়া আছে
তবু পুড়তে চাওয়া অপরিসীম...
পুড়বে জেনেও ঝাঁপ আগুনে
জ্বলে পুড়েই সুখ । (পতঙ্গ)
কিংবা
“এমন তো কথা ছিলো না
নিজস্ব নদীটি কারো কাছে
সমর্পিত হবে !...
কত খড়কুটো ভেসে আসে
কিছু তুলে আনা আর
কিছু ফেলে দেওয়া যায় ভেসে ।
শুধু নিজস্ব নদীটি নিজেরই থাকে
অতি সঙ্গোপনে ।" (কথা ছিলো না)
যেন এক চিরকালীন অবগুণ্ঠনবতী নারীর অবয়ব আঁকেন কবি। আঁকেন অবগুণ্ঠিতার আত্মদহনের চোরাবালি।যেখানে প্রবেশ সহজ।প্রস্থান জটিল,যেন অভিমুন্য সে নারী,কবি তাই কি বলেন
“... কে তুমি ঘোমটার আড়ালে ?
ক্ষুধার অন্ন সন্ধানে আর কোন
পথ ছিল না বাকি;
তবে কেন দরদর আঁখিধারা
থরথর কম্পন !
কোন লাজে মুখ ঢাকো অবগুণ্ঠনবতী
এ তোমার নয়
যারা দিয়েছিল অঙ্গীকার অন্ন বস্ত্রের
জেনো শুধু এ লজ্জা তাদের । " (লজ্জা)
জটিল কথাটি খুব সহজভাবে বলতে পারেন কবি। কিন্তু এর ভেতর যেন আফিমের নেশা।এ যেন- যতদূর যাই ততদূর কেটে খায় নেশার করাত!ফের ফিরে আসা তবু উৎসের কাছে।আসা কি যায়?উৎস কি আর উৎস থাকে?
দেবাশ্রীতার কবিতায় নারীর শাশ্বত হয়তো শাশ্বত নয়,এমন এক যন্ত্রনার চিরন্তন কায়া বুঝি ফুঠে ওঠে। নারীসত্তাকে তুলে আনেন তার নিজস্ব ঘরানায়,নিজের মতো করে,স্বভাবজ ভঙ্গিমায়।তাঁর কবিতার অন্তর, পুরুষ তান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দ্রোহ হলেও,এ যেন দ্রোহ নয়,একটা ফ্যাসন, নীরবে গলায় ধারণ করে নারী।যেন আগুনে ফুটে ঠিকই, ফুটতে ফুটতে রন্ধন হয় খিঁচুড়ি।এই খিঁচুড়িও যেন শিল্পিত হয়ে ওঠে তার কবিতায়।ছাঁইয়ের ভেতর দহন-অঙ্গার! তিনি বলেন,-
"মোবাইলে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ছাড়া
আর কোনোকিছু টানে না
আঙুল ঘুরে ঘুরে টনটন করে
তবুও আশা সেই শ্রেষ্ঠ শাড়িটা একদিন
পেয়ে যাব,শুধু আমার জন্য যার জন্ম
কৌরবসভায় লাঞ্ছনার দাগে আঁকা জমি
পাতালপ্রবেশের চওড়া পাড়ে উজ্জ্বল রঙ্গিন
সেই শাড়ি গমক্ষেত থেকে রঙ নিয়ে বুনেছে
আখের ডগায় আঁচলে আকাশের তারার ফোঁটা
একটি মেয়েলী কবিতায় শাড়ির কথাই আঁকা থাক
পৃথিবীর কথা বলে যেতে হয় ভাঁজে ভাঁজে
একটি মেয়েদের কবিতায়.."(মেয়েলি কবিতা)
আগুন!আগুন! আগুন জ্বলে ওঠে কি নিভে যায় সূতো বাঁধা সংসারে।ফুল বেলপাতার ফাঁকে প্রজাপতি উড়ে উড়ে তবে কি শেষে প্রজাপতি কোন উদোম পাহাড়ের উপত্যকায় একদিন বুঝি হিম শীতল হয়ে আসে ‘যদিদং হৃদয়ং তব/তদিদং হৃদয়ং মম’..!
।তখন কি বেনোজল এসে অচেনা করে দের নয়ানজুলির মাঠ? টের পাই কবির সখেদ উচ্চার ,এক অনির্বচনীয় মর্মবেদনার তটে নিয়ে যায় আমাদের। চোখ বাঁধা সারি যেন!ফের বিকেন্দ্রিত আত্মার ঘরে ফেরার বিলাপ যেন।তবে কি ধরেই নেবো,এ কবির উচাটন।এ কোন উচাটন?বেহুলা চাই না,তবু বেহুলা ধারণ করে নারী হৃদ-মাঝে।এই তবে কি নারী-মুক্তি!কবি বলেন,-
"উপত্যকায় বসে ডিঙিতে ভাসা/নিজের শব নিজেই দেখি/ফুল মালা চন্দন চর্চিত সজ্জিত,/
অগ্নির লেলিহান শিখায় সমর্পিত নয়/তাপহীন শ্যামল বনচ্ছায়ায়/নরম সূর্য বড়ো স্নিগ্ধ শান্ত/
কোলাহল এখানে বারণ।/
যুগান্তের পর নিজ দেহ দৃশ্যমাণ/যেন ভালোবাসছি ...ভালোবাসি/এই হাত এই পা এই চোখ/
আমারই তো ছিল!/শুধু বারবার খুঁজে যাই নিরুদ্দেশ হৃদয়খানি/
কোনো লখিন্দর অথবা সত্যবাণ/কী দিতে পারে খুঁজে?/যদি অপারগ ...তবে ভেসে যাক/
দেহ-ভেসে যাক...ভেসে যাক…" (বেহুলার ভেলা)
ষোলকলা হয়ে ফুটে যে ফুল।পাপড়ি মেলে। বিহঙ্গ উড়ে,উড়ে প্রজাপতি,মৌপাখি,মৌসুমি বাতাস এসে নেড়ে যায় বাগান।কোনো এক দূরতম প্রান্ত থেকে বেজে ওঠে বিষের বাঁশী।তখন কি আর রাধা প্রেম যমুনা না গিয়ে পারে?তারপর,যমুনায় গিয়ে ভালবাসার কলাফুলে হাবুডুবু খেতে খেতে, সমর্পিত নারী-বেদনার এক চির-আর্তি যেন ফুটে ওঠে কবিতার মর্মে।এ যেন নারী-বেদনার এক চিরচেনা পথ।চির-নারী-হৃদয়ের বেদনার আর্য-নামাবলি!এ যেন নুতন নয়, পুরোনো ও নয়।।তবু জিনেটিক কোডে বহমান,ধারণ -বিষ,ধারণ-ভালোবাসা।যেখান থেকে মুক্তি নেই।বর্জন নয়,গ্রহনই যেন পরিণতি।যেন স্বেচ্ছা নির্বাসন।বর্জন নয় ধারণই কি তবে সার!ধারণে ধারণে,তুমি নারী।তাই যেন চলে প্রস্তুতি।যে প্রস্তুতি ষোলকলা।দূর থেকে কাছে,কাছে থেকে দূর,এ যেন এক দ্বান্দ্বিক উচাটন।নারী বুঝি তাই নারী!যত কাছে যাই ততই বুঝি দূর!
যখন কবি বলেন,-
"শেষতম হুইসেল বাঁশির সুরে ডাক দিলে/পৃথিবীর গভীরতম প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হয়/বৃন্দাবনের নীলযমুনায় আর গোমতীর/স্রোতে বয়ে চলে অচিন প্রেমগাথা মালা/যে মেয়েটি চোখ বুজলে বৃষ্টির ফোঁটা /কাঁদে,সূর্যের আলোয় হাসে চরাচর /
জনশূন্য রাজপথ আর রাজসভা একাকার/সে হলুদরাঙা করতলে প্রেম আঁকড়ে/কুটনো কুটে মশলা পেষে প্রস্তুতি জড়ো/করে অগ্নিপরীক্ষায় ।অবেলায় রোদমাখা/জলপাই তেলের ,মাষকলাইয়ের বড়ির-/নির্ভুল অঙ্কের সিঁড়িভাঙ্গা এক দুই তিন.../পদাবলী থেকে পদানত কাছাকাছি এসে/নৈকট্য দূরত্বের হাত ধরে ডাক দিয়ে যায়।"(প্রস্তুতি)।
অবশেষে নারী-যন্ত্রণার চিরন্তনী রূপবুঝি বাঙ্ময় হয়ে ধরা দেয় তার নিজস্ব আঙিনায়।যেখানে রাজপথের হাতছানির আড়ালে মরুভূমির মরীচিকা,খুবলে খায় নারীর রজ-গন্ধ-মজ্জা।যেন ভাতের শূন্যতার মতো চাঁদ রুটি হয়ে নেমে আসে থালায়। নুতন নয়,পুরোনো নয়,,শূন্য-মদিরায়। যখন কবি বলেন,-
"ধান্যপূর্নিমার ব্রতের পুকুরের জলের ঢেউ/
আলোড়ন তোলে রাজপথের হুতাশে/ভাতের থালায় টান পড়লে রান্নাঘর/নেমে আসে হলুদ মাখা হাত ধরে পথে/ভাতের থালার শূন্যতা চাঁদকে/ রুটির বিকল্প বানায় শূন্য ধানের ডোলে"!/
(ভাত)
অসম্ভব মন ছুঁয়ে যায়।এরপর অভিমান ছাড়া কিছুই আসেনা।কত বড়ো ঝক্কিও সামলে নেয় নারী শুধু অভিমানকে আঁকড়ে ধরে।যুদ্ধ নয়,এক পেলব অভিমান মাত্র।এও কি তবে নারী আত্মার নাগপাশ নয়,নারী হওয়ার বিষধারণ নয়। অভিমান মাত্র।এও যেন সেই অমোঘ বন্ধন আর দাসত্বকে ধারণ করার চিরাচরিত বেদনা যেন, চাপা আগুনের ধিকি ধিকির বাইরে অভিমানের খোলস জড়ানো।এর বেশি নয় কমও নয়।একেই তো বলে নারী। হিমশীতল উপত্যকা।এরপরও বুঝি নারী কামনা করে একটু ভালবাসার উষ্ণতা।যখন কবি বলেন,-
"অভিমান প্রগাঢ় হলে শব্দেরা মূক হয়/অমাবস্যার অন্ধকার গভীর হয়ে ওঠে/নয়নতারা ফুলেরা মুখ লুকায়/রাতচরা পাখিরা কর্কশ সুরে গান গায়/
অভিমান প্রগাঢ় হলে হাওয়ায় বিষাদ গন্ধ/
অভিমান প্রগাঢ় হলে শব্দেরা খোঁজে অন্ত্যমিল।"(অভিমান)
এক চরম শব্দ ব্যবহারে কবি যেন পৌঁছে দেন নারীর এক রাস্ট্রহীন রাষ্ট্রে,যারপর চিরন্তনী নারী সত্তার বেদনা নেই। কিছুই নেই। অসম্ভব ভাবায় কবির বেদনার মর্মন্তুদ শব্দানুকৃতি।কবি বলেন,-
"স্যুপের বৌলের টাটকা বিপ্লব/ডেজার্ট-এ পৌঁছে নেতিয়ে যায়/ঠিক যেমন বয়ঃসন্ধির যৌবন/
এসে ঠাঁই নেয় ধূপ অগুরু ফুলের/সাজিতে ,ভাটায় স্রোতহীন মোহনার /বিগত পূর্ণতা ও রিক্ততার মত।"(ভাটা)
দেবাশ্রীতার কবিতা নারীর চিরকালিন মর্ম-বেদনার কোলাজ যেন।আপাত স্থির, কিন্তু ভেতরে যেন জোয়ার ভাটার হুতাসন নিয়ে জেগে থাকে নারী,অচঞ্চল।যখন কবি বলেন,-
"সুরমা একটি নদীর নাম.. মেয়েটির নাম সুরমা, দু'জনই উচ্ছল উদ্দাম আবার স্তব্ধ রহস্যময়।
জোয়ার ভাঁটায় ভিন্নরূপ,তাই মননবসতের কথারা অগোচরে বয়ে যায় তিরতির করে।তাদের সব গোপন কথারা থাকে পথের বাঁকে, আলমারির তাকে পাতা কাগজের নীচে.. তোষকের ভাঁজে--তৃতীয়ের হাতে ইতিহাস হয়ে যেতে পারতো।"( অন্তহীন পরিযান-এক-১)
অথবা,
"আমি একলা পথটির নাম রেখেছি কমলিনী/
যদিও এপথে কোন পদ্মপুকুর নেই/পথটি অহর্নিশ ইশারায় ডাকে উন্মোচণে।
কবচকুন্ডলে অক্ষত কুমারী মাতৃত্ব/
জন্মের দায় ভাসমান স্রোতস্বিনীর কোলে/তাদের ইতিকথায় বারবার পদ্মগন্ধা/প্রবাহিনী আর রাজনন্দিনীর অশ্রুধারা/সতীত্বের কথামালা গাঁথা/
দৃষ্টিপাতে অসহনীয় অসততা/তবে ঢেকে রাখো সে চোখের তারা আবরণে/জানতে চেওনা দীর্ঘ উপেক্ষার কথকতা/এপথ এড়িয়ে অন্যপথে চল কমলিনী/এপথে ভ্রমরেরা ভ্রমরেরা/
ফুলে ফুলে বিষ ঢেলে যায়।"/(অন্তহীন পরিযান-২)
নারী নয়,পুরুষ নয়, মানুষ মাত্রেই ভেতরে দহন থাকে।এই দহন বহুমাত্রিক হতে পারে।পুরুষ তার জিনেটিক কোডে চিরকাল ধারণ করেছে অবলা নারীকে। কিন্তু এই অবলা বাইরে, ভেতরে নয়।ভেতরে তার কাম ক্রোধ,লোভ ও বোধ পুরুষের মতোই।বুকফাটে মুখ ফাটে না,এমন অলঙ্কারে নারীকে করেছে সালঙ্কারা,রহস্যময়ী।এমন এক ব্যাধকলাক্রান্ত নারীর জুম-বেদনাই বুঝি খুলে ধরেছেন কবি, দেবাশ্রীতা।তাই তিনি বলেন,মেলে ধরেন,নুতন নয় পুরোনো নয় চিরকালিন এক বেদনার ঝাঁপী।যেখান থেকে উত্তরণ চায় নারী।যে উত্তরণ নারী,নারীত্বকে ধারণ করেই চায়।কবি বলেন,-
"শীতের কমলালেবুর কোয়ার মত/টসটসে নারীদের পুরুষেরা ভালোবাসে/জম্পুই হিলে জমাট বরফ কখনো দেখনি/হৃতকাম শীতার্ত রাত হাত ধরে নিয়ে গেছে/ছাংগুলেকের জমাট শৈত্যে।/
মেয়েদের কাম নেই ,না আছে শরীর।/
নারীও কামনা করে এপোলোর মত পুরুষ শরীর/
শুধু সেকথা বলতে নেই, ঝর্ণার মত নদীর বুকে/
ঝাঁপিয়ে পড়োনা তুমি। তাদের সঙ্গমস্থলে চাঁদ/
আলো দেয়,পাথরেরা ঘিরে থাকে পাহারায়/
ইচ্ছে মত পথ বদলে সতেজ পুরুষ পাহাড়ের/
হাত ধরাধরি করে গতি বাড়ায়/
তাহাদের মতো তুমি ও কী পারো নারী?/
নুপুর বাজে তোমার পায়ে আমি আছি কাছাকাছি/
শৃঙ্খলিত ধাতব ঝনঝনানি নিয়ে/
ঝর্ণার নাচ আর তোমার নাচ উত্তর মেরু থেকে/
দক্ষিণ মেরুর ব্যবধানে ও মিল খুঁজে ফেরে।/
বিষন্ন কুয়াশার চাদরে ঢেকে সেসব কথারা/
পৌষ সংক্রান্তির সূর্য আলপনায় লিখে/
চেয়ে থাকে অনিমেষে উত্তরায়ণের পথে।("অন্তহীন পরিযাণ--দুই-১)
"শ্মশানে শবের মুখাগ্নির সময়/নারীর চোখে দু' ফোঁটা নগ্নজল/সমস্ত ইতিহাস ওই দু'ফোঁটায়/
উন্মুক্ত করে কী লাভ!/আগুন নেভাতে অপরিহার্য ছিল একঝাঁক বৃষ্টিপাত।/(অন্তহীন পরিযাণ--দুই-২)
সময়ের তালে এগিয়ে যেতে নারী বোহেমিয়ান হতে চায় ।কবি হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিতে চান সংঘবদ্ধ নারীকে।।এই পর্যন্ত যা হয়েছে। নারীবাদী নারী,যেন দুয়েক ফোটা বৃষ্টি,সময়ের সাথে এখনও খাপছাড়া অগোছালো।তাই আরো গোছালো রণতেজে ঝাঁপিয়ে পড়ুক নারী । তাই তিনি বলেন,-
"মুহুর্তের কাছে বাজি রেখে সময়, সামনে চলো।/
আমি রাজি যদি হাত বাড়াও।/যতটা ছড়িয়েছিলাম/ঠিক ততটুকু হয়নি গোছানো/
বন্ধ তালায় নিখোঁজ কুলুপ/ছত্রভঙ্গ চালচিত্র, ভাঙ্গা টুকরো সহ বদ্ধ ঘরে…"
(অন্তহীন পরিযাণ--দুই-৩)
নারীসম্ভারের আলোবুঝি ফুটে ওটে সময়ের রেড়ির আগুনের মাঝে।সমান সমান পুরুষের পাশের ত্রিভুজে।অনেক পথক্লান্ত লড়াই সংগ্রামের শেষে নারী বুঝি উপনীত হয় লেডের আলোয়।দ্বান্দ্বিক দর্শনেই বুঝি নারী মুক্তির আল্টিমেটাম খুঁজে পান কবি।কবিতার কি কোন আল্টিমেটাম থাকে? কোথায় যেন বাজে! যখন
বলেন,-
"প্ল্যানেটোরিয়ামে কৃত্রিম রাতের আকাশে/
মিষ্টি নারীকন্ঠ/অবিরত কথা বলে চলে/
বিশুদ্ধ যৌনতা মেশানো অ্যাকসেন্টে,/
একচুলও কাঁপে না গলা এদিক -সেদিক।/
মুগ্ধতার আবেশে কোনো কথাই/বোধয় শোনা হয়নি কারোই/অন্তত আমার তো হয়নি।/
শেষমেশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত/স্তব্ধ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর/একটি কথা বারবার অনুরণিত হতে থাকে/'ছায়াপথে তীব্র সংঘর্ষে/
এক একটি সৃষ্টি'/সংঘর্ষ সৃষ্টির মূল কথা...!!/
অতএব সৃষ্টির মূল কথা সংঘর্ষ…"(এতএব)
যেন প্রবল বন্যার বার্তা।পেছন থেকে এগিয়ে এসে নারী বুঝি অগ্রগামিনী,সে আর শ্মশান কুণ্ডে ভৈরবী সাধিকা নয়,সে যেন শ্মশান ছাই দিয়ে ভস্ম করে যেতে চায় এযাবৎ সকল ক্রীতদাসী, সকল প্রভু।দেবজ্ঞানে যাকে এত কাল পূজাপাঠ।তাকে পরশুরামের মতো নিধন করে ঘোষণা করতে চায় সকল দুঃখের অবসাদ।দূর্গাশক্তির আবাহন বুঝি। কবি যখন বলেন,-
আমি শুধু পৃথিবীর বুকে/ছড়িয়ে চলি নাভিকুন্ডের ছাই।/
ডোমের মৃন্ময় কলস জলশূন্য/
ত্রিভুবনের পথে পথে ফোটে/মৃত্তিকার বুকে মৈথিলীর মত/আগুনফুল। দু'ফোঁটা লাভার/
স্রোতে হাজার বছরের ক্ষত।/
তাই বিক্ষত হোক পরশুরামের কুঠারে,/পুনঃপৌণিক আক্রান্ত ধরিত্রী/
নিঃক্ষত্রিয় হোক আরও একবার।(পরশুরামের কুঠার)
ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে হতে পুরুষের পৌরষে অসম্ভব ধিক্কার ঢেলে দেন কবি।এমন বলয়ে নারীশক্তিকে তুলে আনেন,যেখানে রাধা ঘিরে বাজতে থাকে বুঝি সামগান,যে গানে পুরুষের ক্ষাত্রতেজ ভাসমান,বন্যাকবলিত যেন পুরুষশক্তি।শূন্যতার হাহাকার,নারীরূপ তার।যেখানে আবহমান কালের তার নিজস্ব পাখিদের শূন্যভূমি।ডানার ছটফট।অভিমানের তারণায় সে খাবি খায়।খেতে খেতে ডুবে যায় পুরুষ মৃতপাখিদের মতো। তাই কবি বুঝি বলেন,ক্ষাত্রতেজে,লক্ষীবাইর মতো,-
"আকুল সন্ধ্যায় বহতা নদীর পারে /মৃদু গুঞ্জনে শোনা যায় সামগান/যারা শোনে তারা ঘরছাড়া হয়,/মধুরা নারীর আঁচলের সুগন্ধে/আবছায়া এক শাপগ্ৰস্ত পুরুষ/পৌরুষহারা মোহদৃষ্টিপাত শুধু/
বাঁকে বাঁকে কামনার আধার/কমলা ঠোঁটের দংশনে আহত/ভ্রষ্টকাম বিফলতা অভিমান উদ্যত।/
পাখিদের মরে যাওয়া ডানার গান/জলজ হাওয়ার মতো রিক্ত হাতে/মালা গাঁথা আরক্ত সন্ধ্যায়/
অকাল ভোরে অবশেষ ছিঁড়ে যায়।"(সামগান)
সেও অভিমান।অভিমানে নিদারুণ স্লিম হয়ে নারীকে কি ফের চৈতন্য দেয় অন্ধকার-মেঘ।মনে হল এই বুঝি কবির কবিতার ঘর ও ঘরানা?কেননা কমলাঠোঁটের দংশন শেষে ধূপছায়া আঁচল লুটিয়ে শুয়ে থাকে অবশেষে সেই বিস্রস্ত নারী!তবে কি ঘুরেফিরে ফের নিজস্ব বলয়েই প্রশান্তি পেতে চায় সে!অভিমানে দগ্ধ হতে গিয়ে কি তবে নিজের আগুনেই দগ্ধ হয় নারী! তিনি বলেন,-
"শুয়ে আছে ধূপছায়া আঁচল লুটিয়ে/
যে অবেলার বিস্রস্ত নারী/ উদাসী শেষ দুপুরের মত,/তার শিথিল স্তনে নীরস ঠোঁটে/শ্রমণের মত আঁধবোজা চোখে/অলস স্মৃতিশূন্য নির্বাক অবয়বে/ধ্বস্তকাম নিরাশার আলস্য কথন,/
আসলে ভালো তো বাসেনি কখনো../এই অভিনয় এই আত্মরতির মুহুর্তের/অগোচরে এক নির্বেদ উদাসীনতায়/মরণঘুমের পরে আলোকিত সময়ের /নিষ্ঠুর কামনার বাঁকে বাঁকে লিখে রাখে/
আরেকটি গভীর নিস্ফল জীবন/করতলের লেখায় রেখায় আবছায়া ধূসর রঙে।"
(অবেলায়)
"নারী আর কেবল পুরুষের কামনার বস্তু কিংবা সন্তান উৎপাদনের কল হতে চায় না।পুরুষ যদিবা নারীকে এযাবত-নারীর মতো নয়, বন্ধুর মতো সমবোধে চাইতে পারে, তবে সে পেলেও পেতে পারে নারীর হৃদয়।তবে অবলা নয়,সবলা করেই এখন পেতে হবে নারীকে।এমন এক ক্ষাত্রপ্রেমে ভূষিত হতে চায় বুঝি নারী পুরুষের বাহুডোরে।এতকাল যে নারীকে পুরুষ জোছনারূপে কামনা করেছে,সেই কামনার আগুনে সে বুঝি,ক্লান্ত অবসন্ন!হয়তো তাই কবি বলেন,-
"না যদি দিতে পার নির্বাসনের দন্ড/তবে ভালোবাসো অপাপ চুম্বনে/আলিঙ্গনে অবরোধে নাপাপবোধে,/আলোকিত জ্যোৎস্নার মারণঅস্ত্রে/
চাঁদের মত টুকরো প্রেমে ফিরে আসা/যায়, বলো কতদিন আর!"(সমর্পণ)
নারীতো প্রথম শষ্যগর্ভিনী।পুরুষ শিকার করতো।নারী শষ্য ফলাতো।সেই থেকেই তো নারী আদি জননী।সে হৃদয়ে ধরে আছে অপাপবিদ্ধ ভালোবাসা।সেই ভালোবাসায় সৃষ্টি লগ্নের শষ্যাবর্ত।জুমের গাইরিঙের গান-সরল-সহজ আবহ,ভালোবাসার নৈঋতভূমি।নারী চায় ছায়াসুনিবিড় গৃহ-ডোর মাটি-প্রেম।যেখানে সম্পদের আধিপত্য নয়, মাটির কাছাকাছি আদম-ইভ ভালবাসা।আদি সাম্যবোধ,শষ্যাবর্ত-ভালবাসা।তাই হয়তো কবি বলেন,-
"ধানের খেতের পাশের টানানো দড়িতে/
শাড়ি সায়া ব্লাউজ সস্তায় কেনা লুঙ্গি/মাঝখানে ছোট নিমা সংসার দেখায়,/খানিক দূরে দু'টি ছোট ছাপড়ার/ছায়া জীবন দেখায়,/
একরাশ ভিজে চুলে গামছার জড়িয়ে থাকা/
সঙ্গম দেখায় ভালোবাসার সঙ্গতে,/
খড়ের চালের নন্দিত ধোঁয়া ভাতের গন্ধে/সুখ দেখায়,/তারপর জাম বাটির ডালভাত সোহাগ দেখাবে/আলপথে আলতা রাঙা পায়ে,/
ভরা ধানের শীষে সুখ লিখে দেবে তারা।"(সুখ)
জন্মদাগের জন্যই যেন নারী নারীলতারূপে পুরুষের বিলাসিতা, ভোগ্য হয়ে ওঠে।কবির খেদ যেন মুর্চ্ছনা তুলে। তিনি বলেন'-
"মুখ্য ভূমিকায় ছিল একটি জন্মদাগ/তার পরে আর কিছু নয়,/বড়ু চন্ডীদাস নীল যমুনায় ডুব দিয়ে/নীলাভ মনুষ্যেতর আর একরাশ/
সকাম যৌবন/বিপরীতে কীর্তনরত।/মধ্যবর্তীনির গৌরাঙ্গে নীল জন্মদাগ/স্থান দিয়ে প্রধানা রসিকায়,/নখের আঁচড়ে ঢেকে যায় সেই/নির্মোহ পুরুষের ধূলোখেলা/
জন্মের দাগ বয়ে ফেরে/অন্যপূর্বা এক নারীদেহ নারীমন।"(জন্মদাগ)
নারীর এযাবত ঘরোয়া বেদনার প্রতীক যেন।যা কিনা আবহমান কালের নারীলতার বেদনাপ্রেমের আধার হয়ে ওঠে,যেখান থেকে নারী ফিরতে চেয়েও ফিরতে পারে না।এক দমবন্ধ গ্রাসে ঘর করে নারী।যেন এক ধারাপাত জীবনকে আলিঙ্গন করেই, বেঁচে থাকতে হয় তাকে;যেন শুধু বাঁচার জন্যই বেঁচে থাকা!এক কৃত্রিম আঙ্গিনা সর্বদা ঘিরে থাকে তাকে।অবয়বে ধারণ করে অভিনয়-ভালোবাসা!স্পর্শ করে পাঠক-বুক।কবি বলেন,-
"কৃত্রিম শীতল কক্ষে নিজেকে/ ফর্মালিন দেওয়া মৃত মাছের মত লাগে,/ভাতের গরাসে সেই মৃতগন্ধ মেখে নিয়ে/মৃত্যুর দিকে যেতে গিয়ে যাইনা।/ ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাই গল্প করি ।/
শকুনের সন্ধানী দৃষ্টি অবশেষে/প্রীতিকনায় ঝিরঝিরে ইলশেগুঁড়ির মত /জীবনের তুমুল ধারাপাত বয়ে ফিরে যেতে /ভালোবাসা দিয়ে যায়।/ভালোবাসা কেড়ে নিতে জানতে হয়,/
নাহলে দুঃখ হয়ে বর্জ্যপাত্রে কেঁদে ভাসায়।"(ধারাপাত)
নারী নীরবে ধারণ করে পুরুষের সব প্রতারণা।নারীকে বুঝি পিছিয়ে থাকা কোন প্রাণী ভাবে। কিন্তু নারী তো পুরুষের ভাবনার উপরে,সে ঘরোয়া জীবনের খিলকাঠি সব বুঝেও নীরবে ধারণ করে সকল বেদনা।নিরবতার ভেতরও আরেকটা হিসেবের দরজায় প্রস্তুতি নিতে দাড়িয়ে থাকে যেন তুষানলে ধিকিধিকি-নারী।পুরুষ হয়তো সেই চোরাবালি বুঝতে পারেনা।তাই কি কবি বলেন,-
"ততটা বোকা নই যতটা ভাবো/এই যে নিঝুম দুপুর সাজাও নানা ছুতোয়/তুমিও জান আমিও জানি এ মিথ্যা;/নৈঃশব্দ্য পিন পতনের শব্দও/দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে আনে/চায়ের কাপে তুলসী মধু গোলমরিচের/নেশা ধরিয়ে কী আড়াল কর!/থাইরয়েডের ওষুধ দিয়ে শুরু হয় দিন/
শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকি ওষুধে।/ততটা মদির না যতটা তুমি ভাবো/এই লুকোচুরি খেলা এই না ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা/কে বলেছে অগোচরে কী না হয়ে যায়!/এই দিন সেই দিন সব বোঝাপড়ার খেলা/
চিলেকোঠার দিনরাত নৈঃশব্দের দান/আঙুল ছুঁলে খেলায় বাদ পড়ার সময়/তোলা রয়েছে সব হিসেবের খাতায়/কুড়ি নম্বর পাতার তৃতীয় স্তবকে।/
চতুর্থ স্তবক শেষে পারিজাত বন!/তাই হবে! মাঝখানে থাক অজ্ঞাত কিছু/অসচেতন অবসরের ভুল ঠিক ভুল।"(চতুর্থ স্তবক)
এখানে যেন সেই ইশারা,- নারীর প্রস্তুতির রিহার্সাল বুঝি?,-
"রাত্রির আনত চোখে অপেক্ষা/
ঘূর্ণিঝড়ের/পেয়ালায় টুংটাং মদির শব্দ/
তুফানের গান/গজলের আদিম ইশারায়/
ইশক সুফিয়ানা…"/(মুহূর্ত)
জীবন-সায়াহ্নে এসেও বুঝি জীবনের দোলাচলের ইতি টানতে চায় সে,সেই এক অপাপবিদ্ধ প্রেমের শর্তে। সেই একেই তো তার আসক্তি।আর কিছু নয়,একটা ছোট্ট নিমা-সংসারের বেশী কিছু নয়,এতেই সে নারী,জীবন-তৃপ্তির ঢেকুর তুলে,শেষ করতে চায় জীবনের সকল লেনদেন,উচাটন।আর যে কিছুই চাইনা তার।মখমল নয়,আশ্বস্ত করে জীবনের প্রেম,অপাপ-চুম্বন-প্রতিস্রুতির পতাকা তুলে!কবি বলেন,-
"অঞ্জলি পেতে রেখেছি দাও সুখ,দাও প্রেম/
এই দেখো ,দু'হাতে যতটা ধরে -সব নিলাম/
পৃথিবীর হাহাকার দ্বেষ বিভেদ/বিতংসের মত ফুটে থাক/হৃদয়ের পরতে পরতে,/আচ্ছাদিত থাক তবে সুগন্ধি আতরে/আমাদের অন্তর্ভুক্ত বিপনন দূরে যাক/নীল সাগরের স্রোতের দোলায়/মুছে যাক দোলাচল।/
সেসব প্রাচীন কথা ভেসে যাক/জোয়ারের জলে/
সাগর থেকে মহাসাগরের প্রশান্ত গভীরে,/নাবিকের ভালোবাসা জোয়ারের জল/সেকথা বোঝেনি সুচারু নারীরা/ভালোবাসা হাতছানি দেয় প্রতিটি সায়াহ্নে/সায়ানাইড প্রেম একবার আসে/
মৃত্যুর চেয়েও মহান/কালিন্দীর বুকে ঝড় তোলে কালীয়নাগ।/
তারও পরে সপ্তডিঙা ভেসে চলে/
উজানী নগরে/বেসাতি মিথ্যে হলো প্রেমহীন বাসরে।(অন্তর্ভুক্ত)
নারী যে রূপেই থাকুক না কেন,ভেতরে তার অমলিন সত্তা বিধিনিষেধের বেড়াজালে গুমরে মরে। কিন্তু জৈবজীবনের রসায়ন কি এরাতে পারে নারী।আড়ালে ফুল ফুটে।ঝরে মরে যায় তুফানে। কিন্তু পুরষের নিয়ম-বজ্রের খাঁচার আবরণে বুঝি তাকে অনিচ্ছা সত্বেও দাঁড়িয়ে পড়তে হয়।এমন এক বেদনার নারীময় উপবন বুঝি আঁকেন দেবাশ্রীতা।তাই কি তিনি বলেন,-
"কচুপাতার জীবন রঙ ধরে জল পড়ে/ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ব্যাঙের ডাকে,/পুণ্যিমাসি আইবুড়ো যৌবন জুড়ায়/শীতল ডোবার নিষিদ্ধ শ্যাওলা দাগে /
অবশেষে মাঝনদীতে গা ধুয়ে/নিদাগ শরীর ফুলশয্যার খাটে।/
রসকলি গ্ৰামের পথে কৃষ্ণকথার/ঝাঁপি খুলে পথের বাঁকে মন ছড়ায়/মনপাগলের বেড়ার গায়ে ঘেঁটুফুলে/কোন জোনাকি নিশুতরাতে ফল ধরায়।/
ঝোলার খাঁজে জীবন বীমার কাগজ তোড়া/
জন্মবদল নিয়ন্ত্রণে আড়াল থেকে হাত বাড়ায়/
গোপনকথা বিজন ঘরে রাত গভীরে/ ফিসফিসায়।/মৃত সমুদ্রের বুকে অতন্দ্র পাহারায়/আভিজাত্য খিল তুলতে ভুল করায়।"
এ যেন নারীর বেদনার বেদানা।জীবন দরিয়ায় নারী শুরুতে যে ফুল নিয়ে কাটিয়েছে কটাদিন,সহসা অজান্তেই জীবন-বেদানা নিয়ে ডুবেছিল মদিরায়,সেই মদিরার নেশা বুঝি অবশেষে ছেড়ে যায় তাকে জীবনসায়াহ্নে।ফের তার মাঝে জেগে ওঠে বুঝি ডোরাফুল,আর এতকালের বেদনাকে ধারণ করেও আশার কাশফুল ফুটাতে চায় জীবনহীন জীবনের চকিত-আলোক স্পর্শ করতে আগুনশলাকার হুতাশনের মতো?
"পড়ন্ত বিকেলে ছায়ামুখে/বসে আছে নিভন্ত নারীরা/
তাদের দেহ নেই,মন নেই/নেই কোনো রোদের আলো/
জীবন ছুঁয়েছে কোনো একদিন/সেও গেছে আজ ধূসর হয়ে/
অশ্রু নয়,তাপ নয়.../নয় আর আশা.../
তবুও তাদের কাছে হঠাৎ আসে/ফুটন্ত সকাল,সাথে আনে/অগ্নিশলাকার জ্বলন্ত হুতাশ।(নৈমিত্তিক)
কবির দেখা এযাবত-কালীন পুরুষের প্রতীক যেন!যখন কবি বলেন,-
"মাছের দোকানে বঁটি নিয়ে বসে যে ছেলেটি/
তাকে আমি চিনি কিন্তু জানিনা/
একদিন জানতে চাইলাম.../সে নাকি রক্ত দেখলে ভয় পেত/শরীরে কাটাকুটি হলে জ্ঞান হারাতো/
বিগত রক্তের উত্সবে ঘাতকের ছুরিতে/রক্তগঙ্গা -স্রোতের সাথে ওর ভয় নিয়ে গেছে/
ধারালো বঁটিতে টুকরো টুকরো করে /অপারগতা আর অন্তর্গত আগুনের দাহ/নিঃশেষের খেলায় মেতে আনন্দ খোঁজে/ প্রতিনিয়ত অদৃশ্য শত্রুর অবয়বে।"
একি তবে চিরকালীন নারীর আধার?তার রহস্যময়ীরূপ!নারীঘরানা?কবি বলেন,-
"উলবোনার গল্পে নিষিদ্ধ মুহুর্তেরা সব
ছাদের আলসেয় অথবা চিলেকোঠায়
আত্মগোপনে কান খাড়া করে রেখেছে
বছর বিয়োনী ইচ্ছেজন্ম আর পুরুষখাকী
ছলাকলা কাঁটায় রেশমীসুতোয় পাকে পাকে
তর্জনীর প্যাঁচে গোপন অভিসার না ঈর্ষাতুর
বিমূর্ত কথারা মূর্ত হয় শীতল অপরাহ্নে।"
(কথার পরে কথা)
নারী-জীবন-সাইরেণ যেন!গতানুগতিক জীবনের তীব্র নিঃশ্বাসে রণক্লান্তনারীর চৈতন্যে কামনার চকিত বকুল মারিয়ে ছুটে যেতে চায় যেন এক বেয়াব্রু অশ্বারোহী! অবদমিত সুরাগের পথে প্রবেশ করে বুঝি কোন স্বপ্ন-অশ্বারোহী,মারিয়ে যায় খুড়ের নালে,এ বুঝি এক অসম্ভব শিহরণ! এ কোন ঘোড়া?কার ঘোড়া?এ ঘোড়া কি তবে,খুমপুই ফোটায় ,অন্তঃসলীলা প্রেমকে নদী করে দোষহীন-স্রোত!তাই বুঝি কবি বলেন,-'প্রেম যদি নদী হয় স্রোতের কি দোষ!" দেখা যাক কবিতাটি,-
"আমাদের সারমেয় জীবন এখানেই শুরু/
এখানেই শেষ।/কোন কোন চান্দ্ররাতে জন্মমাসে/
পরস্পরের যান্ত্রিক অনিচ্ছুক অন্তরঙ্গতা।/
তারপর এইখানে লিখে রেখে যাবে/যাবতীয় নির্মোহ বেদনার রাশি/ভালোবাসাহীন একেকটি নিঃশ্বাস,/কালো ধোঁয়ার জালে ঢেকে যাওয়া/
শরতের নির্মল আক্রান্ত মেঘের দল/বেঁচে থাকা গতানুগতিকতায় ধুঁকে ধুঁকে।/
প্রেম যদি নদী হয় স্রোতের কি দোষ!/মধ্যরাত ছড়ভাঙা বেহালার সুরে/কর্কশ সময়ের ইতিকথা এঁকে চলে,/দুঃসহ সময় পলে পলে ধীরে ধীরে/
সকালের নির্মম আলোয় পর্দা তুলে/হঠাত বেআবরু করে ছুটে গেল/এক তীব্র অশ্বারোহী তার ঘোড়ার/পায়ের নালে শব্দ ছাপ রেখে ক্ষণে ক্ষণে।"/(অনন্তশোকগাঁথা)
কিংবা
"একবিন্দু ভালোবাসা রেখেছি পাণপাত্রে/
কিছুটা পান্ডুলিপিতেও অপ্রকাশ্য/
কিছু তার লুকানো গভীরের গোপন খাতে"(থাক)
নারীর ঘরকন্নার শুয়ো-দুয়োরানীই যেন দেবাশ্রীতার কবিতা।নারী যেন ক্যানভাসে আঁকে কারন-বারিতে নিজেরই প্রতিকৃতি। পুরুষ-পতাকার তলে নারীর চন্দ্রকলারূপ,শৈল্পিক নারীকে কবির চেতনায় মনে হয় হরপ্পার বিষাদ-করোটি!এ যেন নারীর চিরচেনা ক্ষতবিক্ষত রূপ! কবি বলেন,-
"দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে/অসন্তোষের ঝড় সজ্জায় /শয্যায় পিকাসোর আঁকা প্রতিকৃতির/
দোদুল্যমানতা ,দেয়ালের হাঁ মুখ/পলেস্তারা খসায় ঝুরঝুরে/বালি মাটি সিমেন্ট গাঁথা/হরপ্পার বিষাদ করোটি ঠকঠক/ঠিকঠাক বলে যায়,/ঝলসানো আগুনে আধপোড়া/জীবনের খাতায় ছাপে ইতিহাস।/
এসব কথারা অবশেষে সকালে/এককাপ গরম চায়ে লীণ হয়ে/আত্মগোপন করে ডাইরীর পাতায়।"(ক্যানভাস)
কিংবা
"অগ্নিসম্ভূতার মত ছুটে আসে
জ্বলন্ত নারীদেহ
লজ্জা সম্ভ্রম বোধ বিষাদ
ভালোবাসা অগ্নির কাছে সঁপে
চীৎকার ঢেকে শীৎকারে।
তাহলে আগুনও কী পুরুষ!
নারীদেহ লোভনীয় তার কাছে
একটি রুদ্র পুংসত্ত্বা সহস্রবাহু!
চুম্বনে ধর্ষণে জর্জরিত অসহায় নারী /
আজীবন জ্বলে অঙ্গার হয়ে যায়।(দহনবেলা)
এও যেন পটে আঁকা জলতুলি,এক বনতট-নারী!নুতন নয়,পুরোনো নয়,বহতা নদী যেন!কবি বলেন,-
"এই নতুন আষাঢ়ের কুমারী জলের রাত/
যাপন হবে বছর পঁচিশ আগের সেই/হঠাত দৃষ্টিপাতের সাথে/
আর মাঝখানে ছুঁয়ে যাবে/আমাদের অকথিত নিশ্চুপ বিনিময়
বৃন্দাবনের পরে মথুরার কথার মত/হিরণ্যরেতা নদীর স্রোতে ভেসে যায়/শ্রাবণের অঝোর ধারায় বিগত মুহূর্ত।/
(মাথু্র)
কিংবা প্রতিবিম্বে আঁকা নারী,-
"আমার নদীটির এক পারে বৃষ্টি
আমার নদীটির অন্যপারে ঝকঝকে রোদ।
আমার নদীটির এপাশে হাতছানি দেয় সুখ
আমার নদীটির অপর পারে আদরে কাছে ডাকে মৃত্যু।
রোদেলা পারে ভাত উথলানো টগবগে গন্ধে জীবন ছড়ায় আলো আর কাছে ডাকে ।
অন্য পারে ঝাপসা হয়ে আসে যখন মুখ দেহ
লকলকে আগুন গন্ধে দু'হাতে
ডাকে ..আকুল ডাকে।(প্রতিবিম্ব)
"উপত্যকায় বসে ডিঙিতে ভাসা/নিজের শব নিজেই দেখি/ফুল মালা চন্দন চর্চিত সজ্জিত,/
অগ্নির লেলিহান শিখায় সমর্পিত নয়/তাপহীন শ্যামল বনচ্ছায়ায়/নরম সূর্য বড়ো স্নিগ্ধ শান্ত/
কোলাহল এখানে বারণ।)
যুগান্তের পর নিজ দেহ দৃশ্যমাণ/যেন ভালোবাসছি ...ভালোবাসি/এই হাত এই পা এই চোখ/আমার ই তো ছিল!/
শুধু বারবার খুঁজে যাই নিরুদ্দেশ হৃদয়খানি/
কোনো লখিন্দর অথবা সত্যবাণ/কী দিতে পারে খুঁজে?/যদি অপারগ ...তবে ভেসে যাক/
দেহ-ভেসে যাক...ভেসে যাক…"(বেহুলার ভেলা)
দেবাশ্রীতা পারেন,কত যে খুঁটিনাটি নারী-সুখ-দুখের পরত সাজাতে পারেন,পারেন নারীর নকসিকাঁথা-জীবন ফুটিয়ে তুলতে অসম্ভব মুন্সিয়ানায়। তিনি বলেন,-
"এই ধ্বস্ত জীবনে যত ভাঁজ আছে/ন্যাপথলিন আর শুকনো নিমপাতায়/সংরক্ষণ করা , তবুও পরতে পরতে/ফেঁসে যাওয়ার দাগ, রিফু, তালি/
মাঝখানে হঠাৎ একটা ছোট্ট সাঁকো/এপাশে প্রাণহীন আধুনিকতা/ওপাশে ভরপুর ভালোবাসার হাত।/ভরা কলসি ছলকে পড়ে ক্ষীনতনু/যুবতী শাঁখা সিঁদুরে,কঞ্চির ফাঁদে/ছেঁড়া টিউব শৈশব আগে পিছে/কলের জলের মিছিলে কোন্দলের/
বেসুরো সুর গলাগলি মিহিসুরে।/
দূরে কোথায় সংক্রান্তির কীর্তন/খোল করতালে হরিনাম ছড়ায়/গতরাতের টায়ার পোড়ানো ছাই/
পিকনিকের উচ্ছিষ্টের অবশেষ/নেড়ি কুকুরের লেজ গুটিয়ে ঝগড়া,/মাঝে একদল আচমকা হাসে অকারণ/আলপনায় জীবন লেখে আজীবন।"আলপনা"/
শেষ নেই।তবু যেন শেষ আছে।
এসবের অবসান চান কবি,নারীময় জীবন-পরিসরে থেকেই বুঝি আগামী ভোরের প্রতীক্ষা, দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বুঝি তিনি?,-
"শেষ হলো মাথুর কীর্তন/জমাজল বুকে ফিরে আসে/জীবন্ত তরুনী লাশের মত,/টিলার নীচে গুঁড়া গুঁড়া /ঘাসফুল শিশিরের কান্নার/
জলে দুই' পা ভিজিয়ে/প্রতীক্ষায় আগামীর ভোর।(প্রতীক্ষা)
কিংবা,-
"প্রান্তসীমায় সকালের সূর্য
কুয়াশার পর্দা গুটিয়ে আসবে…(প্রান্তসীমায়)
"জরায়ুতে ঘুম ভাঙে প্রবল হুতাশে..
আঠাছেঁড়া খোলা খামে শূন্যতার ডাকছাপ/
নতুন সিঁদুরে রাঙা হালখাতায় নতুনের ডাক"(অলীক পথ)।
"পরিশেষে বলবো,কবি দেবাশ্রীতার কবিতার ঘর-ঘরানা, আমার কাছে নারীবাদই মনে হয়েছে। কিন্তু তার নারীবাদ ঘর-সংসার,দায়-দায়িত্বকে অস্বীকার করে নয়। তিনি চান প্রথম চকিত চাউনির মতো প্রেমাস্পদের অপাপবিদ্ধ ভালোবাসা।এ পেলে তিনি রূপবান হতেও গররাজি নন!তবে তার কবিতায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মিহি-ছায়া-সম্পাত,কবিতার অন্তর-সুধায় বুঝি আঁচড় কেটেছে বলে মনে হল।এ আমার হলেও অনেকের মনে নাও হতে পারে।কবির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করছি।
চরৈবেতি —-----
0 মন্তব্যসমূহ