কবি রসরাজ নাথের কাব্যগ্রন্থ-"নিরন্ন দুপুর"||হারাধন বৈরাগী
এক শরাহত আত্মার লক্ষ্যভেদের কবিতা
কবি রসরাজ নাথের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয়েছে সম্প্রতি কুমারঘাটে।এর আগেই পরিচয় হয়েছিল তার লেখার সাথে।অবশ্য লেখার সাথে পরিচয় হলে কবির সাথে আর দরকার পড়ে না। 'অনার্য' নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী কণ্ঠস্বরের লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে আসছেন তিনি
১৯৯৬ থেকে। নভেম্বর ১৯৮৪ থেকে এটির পদযাত্রা শুরু।শুরুতে অবশ্য এটির প্রথম সংখ্যা সম্পাদনা করেন সুরজিৎ দেবনাথ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যা রসরাজ নাথ ও মিলনকান্তি দত্ত ।চতুর্থসংখ্যা সেলিম মুস্তাফা।এমন করেই আরও কয়েকটা সংখ্যা সম্পাদনা করেন প্রণব নাথ,নিয়তি দাস ও রত্নময় দে।আর তখন থেকেই তাঁর কবিতার সাথে আমার পরিচয়।সম্ভবত কবি সেলিম মুস্তাফা তখন সবেমাত্র কাঞ্চনপুর থেকে বদলি হয়ে যোগদান করেছেন
পানিসাগর গ্রামীন ব্যাঙ্কে।এমন একটা সময়ে সম্ভবত অনার্যের আত্মপ্রকাশ।সেই সময়ের বেশক'টি অনার্যসংখ্যা আমার সংরক্ষণে আছে। আমার মনে পড়ে যায় তখন আমি কৈলাশহর কলেছে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি। কবি বিশ্বজিৎ দেব আমাকে বলতেন,কবির নাম রসরাজ নাথ।সেই থেকেই কবি ও কবির কবিতা আমার মনে দাগ কেটে যাচ্ছে।১৯৯৬ থেকে এককভাবে রসরাজ নাথই সম্পাদনা করে আসছেন এই ব্যতিক্রমী লিটল ম্যাগাজিনটি।
তাঁর 'নিরন্নদুপুর' কাব্যগ্রন্থের কবিতার রচনাকাল ১৯৮৫ -১৯৯১। আমার বিশ্বাস কবি তৎকালীন জরুরীসময়ে অসম্ভবরকম অবগাহন করেছেন।সেই থেকেই হয়তো তিনি কবিতার বোধনপর্বে সাম্যবাদী চেতনার দ্বারা জারিত হয়ে থাকবেন।এই থেকে অবশ্যই ১৯৭৮ এ প্রথম বামক্ষমতাসীন হওয়ার এক অগ্রদূত সৈনিক হয়ে থাকবেন তিনিও।চোখের সামনে হয়তো দেখে থাকবেন, মানুষের বুকের কথার মুখ কিভাবে জরুরি অবস্থা টিপে ধরে।রাজনৈতিক অস্থিরতা,একই সাথে উদ্বাস্তু স্রোতের ফলে বাঙালি ও আদিবাসী জাতিসত্তার টানাপোড়েন, তথাকথিত ভূমিপুত্র কাল্টের উদ্ভব থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সৃষ্টি,বাঙালিমুক্ত স্বাধীন ত্রিপুরার স্বপ্ন, পাহাড়ের বুকে জলোচ্ছ্বাস,বিভেদের রাজনীতি,
৮০র জুনের দাঙা-রক্তের হোলিখেলা-ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে সাতের দশকের কবিদের লেখালেখির ভোলবদল-কবি সৈনিকদের উচ্ছ্বাসের স্বপ্নভঙ্গ।হতাশা। আমার মনে হয়েছে,এমন খরজলে সরাসরি অবগাহন করেছেন কবি রসরাজ নাথ।আমার বিশ্বাস কবি অবশ্যই সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকেই কবিতায় হাত পাকাতে শুরু করেছেন,লিখে চলেছেন একে একে শরবিদ্ধ কবিতা।সাতের দশক পেরিয়ে আটের দশকে কবিরা স্বতন্ত্র একটা লক্ষ্যভেদের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন,এমন একটা সময় যখন,ভেতর থেকে কবিকে পথ নির্দেশনা দিতে থাকে কবিতা।এমন প্রেক্ষাপটে গ্রুপসেঞ্চুরির আবির্ভাব-শিল্পের স্বাধীনতার জন্য প্রতিবাদ। এই থেকে ব্যক্তিগত দহনের অঙ্গার,কবিকণ্ঠ বাক সর্বস্বতা ত্যাগ করে আত্মানুসন্ধানী,সংযমী মিতাচারী হয়ে ওঠেন।কবিরা বিড়বিড় করতে থাকেন অন্তর থেকে অন্তরালে।নিজের শরীর ও সত্তার ভেতর,আত্মার ভেতর খুঁজতে থাকেন সকল দহনের দানা।।এই প্রেক্ষাপটে ত্রিপুরার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টাতে থাকে, কর্পোরেট জগত শ্বাস ছাড়তে থাকে নিরন্ন মানুষের জীবন-পরিসরে। এই প্রেক্ষাপটে স্বপ্নভঙ্গ ও হতাশাগ্রস্ত যুবকদের কারো কারো মাঝে এসে লাগতে থাকে নকশাল বাড়ি তথা মাওবাদের অভিঘাত।চলে সরকারের দমন।এমন সময়ে হয়তো কবি নিজের আত্মার উপর বসে নিজেকে পেঁয়াজের খোসার মতো কাটছেন।রক্তের হোলি খেলায় আত্মাকে কচুকাটা করে চলেছেন কবি।বেনোজলের ব্যূহচক্র ভেদ করে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় আপ্রাণ মরিয়া হয়ে খুঁজে চলেছেন শিল্পের স্বাধীনতার মুখ,পাখির চোখের মতো কবিতার অভিমুখ। আমার মনে হয়েছে,চারদিকে তখন মানুষের কলোনীতে বিশ্বাস অবিশ্বাসের আবর্ত।এমন এক প্রেক্ষাপটে, ক্ষুধা,দারিদ্র্যের ক্রান্তিলগ্ন ছুঁয়ে দিশেহারা কবির দ্রোহ ফুটে উঠেছে তার এই 'নিরন্নদুপুর' কাব্যগ্রন্থে। পাহাড় তখন আর শান্তজলের সরোবর নয়,অন্ন,বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা,বাসস্থানের শূন্যতার চৌফলায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ।এই সময়ের কবিরা তখন নিজস্ব ধর্ম ,স্থানিক বিশ্বাস,ঐতিহ্য ভূগোল ,অর্থনীতি রাজনীতির ,সমাজনীতির বেদীমূলে নিমগ্ন হয়ে পুনরাবিষ্কারে রত হয়েছেন নিজেদের শেকড়।এই থেকে হাংরি আন্দোলনের অভিঘাত এসেও কারো কারো বুকে লাগতে শুরু করেছে।কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবে এই অভিঘাতে জারিতও হয়েছেন ।আর কবি রসরাজ নাথের কাব্যগ্রন্থ 'নিরন্ন দুপুর' পাঠ করে মনে হয়েছে কবি এই ধারার স্বতন্ত্রতায় নিজেকে আবিস্কার করতে চেয়েছেন।ওই পর্বের আত্মখননে তিনি সফলও হয়েছেন।নিজেকে চিহ্নিত করেছেন এক ব্যতিক্রমী রসরাজ হিসাবেই।সহজ সরল ঋজুবাক,অথচ অসম্ভব সময়ের অভিঘাত আফিমের মতো ধারণ করেছেন তাঁর কবিতার আত্মায়।।শব্দ ব্যবহারে সচেতন অসম্ভব মিতাচারী,এই কবি গভীর আত্মানুসন্ধানী। এবার দেখা যাক তাঁর কবিতাগুলি।
আপৎকালীন ভারতমাতার রূপকল্প অঙ্কন করতে গিয়ে কবির সহজ সরল ঋজু শ্লেষ অসম্ভব জার্ক এনে দেয় পাঠকের অনুভবে।কবির অনুভব দ্রোহ ও শ্লেষের একটা নুতন ঘরানার আলোছায়ায় পাঠককে আবিষ্ট করে নাড়িয়ে যায়,যখন কবি বলেন, তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিতে-"পায়ের উপর পা/মাথার 'পর পা/এই তো আমার জন্মভূমি-/ভারতবর্ষ মা।"(ভারতবর্ষ)।পাঠক কবির মৃদু উচ্চারের ভেতর,গভীরভাবে ভারতমাতার প্রতি তার সন্তানের মাতৃবোধের রুগ্নরূপটি অবলোকন করে।যা আলোড়িত করে পাঠককে।
হতাশা,যাপনের ক্ষারজলের ক্ষত কবি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন যেন জলতুলির মৃদু শ্লেষ ধ্বনি ও নৃত্যময় রহস্যের মতো।যখন তিনি বলেন,-
"চার দশকের খরার ভিতর স্বপ্ন বিছিয়ে গেল/
পঁয়ত্রিশ বসন্ত-আমার চারদিকে/প্রতিশ্রুতিময় দিন,রাত্রিময় রহস্য।"(আমি-১)।দিনে এক রাতে আরেক মুখ, পাঠকের অন্তরাত্মায় অসম্ভব বাজে।সেই সময়ের স্বপ্নসওদাগরদের মুখোশ ও মুখ পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সময়ের খরজলের অন্তর্দাহে আহিত হতাশাগ্রস্ত কবি যাপিত অনুভবে স্বাধীনতার অঙ্কন পাঠককে অসম্ভব নাড়িয়ে যায়।পাঠককে এক মনোজ্ঞ দর্শনের কাছে উপনীত করে। উপনীত করে জন্মহীন ,বর্ণহীন, গন্ধহীন, মেধাহীন শূন্যতার এক সম্ভব-অসম্ভব পরম ও চরম স্বাধীনতার কাছে,সাধকের তুরীয়ানন্দের কাছে ,তার জীবনানন্দের কাছে।কবি যখন বলেন,-"কবি, তুমি হয়ে উঠো/এই দীনতা ও শূন্যতার মাঝে/জন্মহীন, বর্ণহীন, স্বাধীন-"(রৌদ্রকঠিন)।
দেশ চালকেরা সাপুড়ের কিংবা বেদেনীর মতো যখন গণদেবতাকে মুখ ও মুখোশের সম্ভাষণের জালে ,কিংবা মানুষের জন্য তাদের ত্যাগ তিতিক্ষার ষোড়শকলা সম্ভারের ঝাঁপির তারিফে আবিষ্ট করে,কবির চোখে তাদের এই মেকি দরদ জলতুলির আঁচড়ের মতো ধরা পড়ে,- যখন কবি বলেন-"সবই ঠিকঠাক হয়/তবু তোমার শূন্য পাকস্থলী/ভরে ওঠে বিষ/আর আমি তখন সবুজ/ফসলের মাঠে নিরণ্ন দুপুরের/নীরব ছবি এঁকে চলি--"(ভারতবর্ষ)
জীবনের ভাণ্ডারীর কাছে বিশ্বাস সমর্পণ করে হতাশাগ্রস্ত কবি নিজের শরীর ও আত্মার মাঝে রাতের পেঁচকের যন্ত্রণার নখর অনুভব করেন। যা গর্ভযন্ত্রণার মতো পাঠকের মনে হয়।কবি যখন বলেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায়,-"তীব্র যন্ত্রণাবিদ্ধ রাত/দু'টো হাত খোঁজে শরীর,/সারারাত বৈরীরা হাঁটে।/----/আমি রাতভর হাতড়ে বেড়াই আলোর দানা"(বিষ)
রক্তের হোলিখেলা দেখে কবির রুধিরাক্ত আক্ষেপ,-"রক্তের ব্যবহার জানা নেই বলে/তুমি কেঁপে উঠে নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়-"(বসন্ত উৎসবের আগে)।কবি দেখেন,এক ফোঁটা রক্ত কি অমূল্য, কিন্তু রক্তের অব্যবহার তাকে মর্মাহত করে। ফুঁসে উঠছে পাহাড়,রক্ত ঝরছে।অথচ কোন মহৎ উদ্দেশ্য পরিপূর্ণ হচ্ছে না।
এই থেকে হয়তো মর্মাহত কবি অসম্ভব অভিমানী হয়ে ওঠেন,নিঃশব্দ ও নিঃসঙ্গতাকেই জীবনের আলো ভেবে বরণ করতে চান-আর বলেন,-"আমার আছে/অন্ধকার সীমাহীন/হিম বাতাস/রাত ঝিঁঝিঁ পোকা, নিঃসঙ্গতা/নৈঃশব্দ্য/সব"(আছে)
ভালোবাসার শেষ থাকে না।কবির চোখে যে প্রেমের জলছবি অঙ্কিত,তা থেকে চিরবঞ্চিত কবির, মৃত্যুকেই কাম্য মনে হয়,বেদনার মদকে জীবন ভেবে পান করতে ইচ্ছে হয়।রাত্রিকেই জীবনের জীবন মনে হয়,আলো মনে হয়।তাই হয়তো তিনি বলেন,-"যাও, ফিরে যাও প্রেম,/আমি আজ রাত্রির কোলে দোল খাব-/আর আকাশের দিকে চেয়ে শুনবো/পাখিদের উড়তে না পারার গল্প;/
ফিরে যাও/ওই ঝাটিঙ্গা পাহাড়ে যাও,/
যাযাবর পাখিদের পুড়ে মরা দেখো।"(ফিরে যাও)
এখানে কি তৎকালীন মানুষের উদ্বাস্তু জীবনযন্ত্রণার ছায়াপাত অবলোকিত?যেখানে উদ্বাস্ত হয়ে এসেছিলেন কবি জঙ্গলের চাঁদের কাছে। ভালোবাসার ঘর বাঁধতে,ফুল ফুটাতে।কবি যখন বলেন,-
"অপ্রত্যাশিত ফুল ফুটেছিলো/অসুখী চাঁদের আলোয়-/ক্রমশঃ তার বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়লো/পৃথিবীর কঠোর জিজ্ঞাসায়।"(ক্রমশঃ)।পাঠককে অসম্ভব নাড়িয়ে যায়।
এখানেও দেখি কবি স্বপ্নভঙ্গে অসম্ভব আহত ।এখানে কি তবে ভুল বুঝাবুঝি,অকাম্য দাঙ্গার ছবি?এই সময়পর্বে প্রেম,দাঙ্গা,হত্যা,স্বপ্নভঙ্গ,যেন কবির কাছে,একই শরীরের,একই আত্মার মনে হয়েছে, অর্থাৎ যেন নিজেকে নিজেই ধর্ষণ ও মর্দন করে চলেছে আত্মা।তাই কি কবি বলেন,-"বুকে উচ্ছ্বাস নিয়ে গেলাম/তোমার কাছে-/তখনই ঝড় উঠল আকাশে/মাতাল ঝড় আমাকে ছুঁড়ে দিল সমুদ্রে।/
আমি -----ডুবতে ডুবতে দেখলাম/ দুটো লোমশ হাত ধ্বস্ত করছে/তোমার স্তন ও গ্রীবা-"(পতন)
কবির স্বপ্ন, ভালবাসার ঘর নির্মাণ।বিশ্বাসের ঘর বাঁধা।যার জন্য সমস্তই তিনি সমর্পণ করেছেন। কিন্তু তিনি আশাহত অসম্ভব ,রাজনীতির বেদেদের কাছে।যাদের কাছে তিনি নিজের বিশ্বাসের আত্মাকে সমর্পণ করেছিলেন।তাই তিনি বলেন,-
"হুজুরের কাছে পা থেকে মাথা/সমস্ত বন্ধক দিয়েছি-"
"গোখড়োর বিষের মতো অন্ধকার নেমেছে/বড়ো কঠোর-বড়ো কঠিন এই/রাতের বশ্যতা"
"আমার চারদিক ঘিরে থুবড়ে পড়ে/স্বপ্নদৃষ্ট নাগরিক সভ্যতা।"(এই রাত)
সেই সময়ের যন্ত্রণা,সময়ের ভয়াল অসুখ,গর্ভযন্ত্রণা কবিকে রুধিরাক্ত করে,পাঠক নড়ে ওঠে।মনে হয় সে রোগের জখম থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি সভ্যতা।যখন কবি বলেন,-
"ভোর হতে না হতে/ঘুম জড়সড় সমগ্র শহর/তারপর গ্রামেগঞ্জে ,তারও পর সারাদেশে//ছড়িয়ে পড়ে ধর্ষণ ওখুন/আততায়ী ফেরার-"(ভোর)।যা পাঠকের কাছে কালান্তক মনে হয়।
ত্রিপুরার তৎসময়ের আগুনদিনের এক অসম্ভব জল ছবি আঁকেন কবি চরম হতাশায়।এ এক অসম্ভব বোধ যা তাকে ক্ষতবিক্ষত করে।যে বোধের কাছে ঘৃণিতকেও প্রেমিক মনে হয়।যা পাঠককে মোহাবিষ্ট করে।
"বিশাল এই মিশ্র বসতি/দিগন্তবিস্তৃত যার প্রশান্ত শরীর-/এখন পশুকবলিত,/রক্তমাংসের নেশা এখানে শেকড় গেড়েছে-"
"আমার চাওয়া আর না-পাওয়ার মধ্যে/
কতখানি ফাঁক?কেন তাদের/ঘৃণা করতে পারি না,যাদের আমার/প্রকৃতই ঘৃণা করা উচিত?"(অন্ধ অন্ধকার)
একদার গাল ভরা চৈতন্য-নেতৃত্ব,কিংবা যারা একদিন,অধিকার,সমতা,শোষণহীনতার কথা বলেছিল,কবির চোখে যেন তারা সেই সময়ের জুম্মদা,যারা জুম্মবীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল স্যুচ্যেং টাকলের মতো। কিন্তু সময় হননের পর তাদের মুখ কবির কাছে যেন বমির মতো মনে হয় ।যখন কবি বলেন,-"আপনি শান্তির কথা বলেন,/ সংস্কৃতি প্রগতির কথা-/
আপনি বলতে পারেন আপনার রক্ষিতার কথা?"(তফাৎ)
খাদ্য,বস্ত্র,শিক্ষা,চিকিৎসা,বাসস্থানের জন্য যেখানে প্রয়োজন এক সুগভীর আত্মীয়তা,মন ও মগজে অর্ধনারীশ্বর ভাব,এ কবির হয়ত বিশ্বাস ও নিঃশ্বাস। কিন্তু ব্রজবুলির আবেশে সর্বস্ব নিবেদন করে ,শরাহত কবির হয়তো এমন উচ্চার,-
"এক শরীরী আত্মার উল্থান ও পতনের মধ্যে/আমি সমস্ত বিষ/পান করে চলেছি;"
"আমরা পরস্পর নিশানা হয়ে আছি;"
"তুমি কি দিতে পারো জয়?/সন্নিকটে প্রেম,দিতে পারো/তোমার সত্য পরিচয়?"(এক শরীরী আত্মার)
আবার পাহাড় ও সমতলের এক অভিন্ন আত্মা ভাবনায় আহিত কবির কাছে,আদম ইভ,পুরুষ ও নারী ছাড়া আর কিছু নাই।পাহাড়ী নারীভাবনার প্রতি তথাকথিত হীনন্মন্যতা দেখে, আত্মার বিভাজন দেখে, তিনি শরাহত হন।জাম্পুই কিংবা লংতরাইর মতো নারীকে,তাদের প্রতি সভ্যসমাজের শরীরমনস্কতা দেখে তিনি অসম্ভব আহত হন।তাদের পাশে দাঁড়ান এক অভিন্ন চেতনায়, নতজানু হন বোধির কাছে। টের পাই তিনি যখন বলেন,-
"তোমার সোনালি শরীর বেয়ে/যে অন্ধকার নামে,তাকে/কী বল তুমি?বর্ষার ভরা নদী?আবাদী জমি?/
সতেজে নামতে থাক সিঁড়ি,কখনো/সতর্ক দৃষ্টি মেলে উপরে উঠে যাও-/কী চাও?কাকে চাও?"(নারী)
কবি অসম্ভব মুন্সিয়ানায় ,আঁকেন পাহাড়ের তন্ময়তা কাটিয়ে উঠা। কিন্তু ভুল সূর্যের দিকে গতি দেখে,আশাহত হন।কাঁথা মাটির পাত্রের জেগে ওঠা,চিত্রকল্প পাঠককে অসম্ভব ভাবায়।
"চটের কাঁথা মাটির বাসন-/ফুটছে এক আকাশ তন্ময়তা,/স্বপ্ন জাগে ,আবার হারায়/পাহাড়তলে-উপত্যকায়!"(আকাশ পাতাল)
ব্যবধান ব্যবধান-কবি রেখা আঁকেন ব্যবধানের ভাঁজের।
"ওরা উড়ায় যুদ্ধ জাহাজ/তুমি উড়াও ঘুড়ি,/পথের মানুষ পথেই থাকে/কুড়ায় পাথর নুড়ি!"(স্থিরচিত্র)
গোবিন্দ তেলির হত্যা,একটা প্রতিবাদের গলাকাটা।,বাম, বামের কন্ঠ হত্যার চোরাবালি আঁকেন কবি।তিনি অসহায় হয়ে ওঠেন।
"গোবিন্দ/----/অসহায় আমরাহাঁটু গেড়ে-/উপাসনা করি বাঁকা ঈশ্বরের,/আততায়ীর লালটুপির নিচে নৃশংস কালো মাথা-/ওদের তীক্ষ্ণ থাবায় ঝড়ে পড়ে/আরো কালো দিনের ইশারা,"(কালোদিনের কবিতা)
এই কবিতাটি ও একটি সময়ের রেখাচিত্র। কিন্তু কোথায় যেন সুকান্তে সুর,তবে কবির জলছবি নিজস্ব।
"ঘামঝরা দপুররোদের স্নানে/যারা চিহ্নিত করে মুক্তির আয়োজন,/মৃত্যুর মুখোমুখি তারা/আমি তাদের একজন।"(আমি-২)
আসলে এই বনভূমি,তথা ত্রিপুরার তথাকথিত ভূমিপুত্রও মহাভারতের সন্তান,ঊদ্বাস্তুরাও। কিন্তু কবি শরবিদ্ধ হন যখন দেখেন বিভেদ ভাইয়ে ভাইয়ে।
"নিটোল চাঁদের আলোয়/উদ্ভাসিত চারিদিক-/
তবু এক অন্ধকার/ঘিরে ধরে আমাকে-"
"আমি সনাক্ত করতে পারি না/মহাভারতের গর্ভজাত/এ কোন মুখ ও শরীর?আমার?না, তোমার?"(মহাভারতের)
গালফোলা চৈতন্যদর্শন, স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের ব্রুইফাং থেকে ঝরে পড়া একটার পর একটা পচা ফল দেখে কবি স্বপ্নাহত।
তিনি টের পান রাতের গর্ভে জন্ম নিচ্ছে নিষ্ঠুর বিভীষিকা,কালো অধ্যায়!তাই হয়তো
তিনি বলেন,-
"ওরা বলেছিল আকাশ দেখাবে/পাখি নদী অরণ্য পাহাড়-/ওরা ছড়িয়ে দিয়ে ছিল বহু প্রতিশ্রুতি/যাতে আমরা নেশায় চুর হয়ে/শুয়ে থাকি সারারাত-/"
"ধলাই লংতরাই ফুঁসছে-/এক ভয়ঙ্কর দিনের মুখোমুখি হতে/আর বেশী বাকী নেই!"(ধলাই লংতরাই)
এই থেকে বিভীষিকাময় দিনে বলংবরকের রক্ত নেওয়ার গর্জন আর হত্যালীলার কদর্য রূপ দেখা,শোনা যায়- কবি বলেন,-
"রাত্রির নীরবতা ভেদ করে ঝরে পড়ে/শব্দ-বিস্ফোরণ-"
মায়েরা মরা স্তনে গুঁজে দেয়/সন্তানের মুখ-"(শব্দ বিস্ফোরণ)
চৈতন্যশাসন স্থাপন,ও স্বপ্ন ভঙ্গ বুঝি, এখানেও রসরাজ-তুলির টান-
"ওরা জয় করে নিয়েছে আকাশ ও মাটি,/জয় করেছে যুদ্ধের ঘোড়া,তাজা খুন-/
এখনো নুন আনতে পান্তা ফুরায়/আহ্ -কি দারুণ!"(স্বদেশ)
রাজধানীর কদর্যমুখ বুঝি এখানে দেখা যায়,পাঠককে টেনে নিয়ে যায় সেই দিনে চুম্বকের মতো।যখন বলেন'-
"এই রাজধানীর ফাঁক-ফোকড়ে/মা ও শিশুর সংসার/যেন বিশাল প্রাসাদ অট্টালিকাকে/লজ্জা জানাতে বর্ষার আকাশ বুকে ধরে আছে!"(রাজধানী)
এরপরও কবি স্বপ্ন আঁকেন,ঘর আঁকেন উঠোন,কথা বলার গাছ,গাছে গাছে কবিতার রোদ্দুর। জল জলা জঙ্গল ফুল ফলের গন্ধ।স্বপ্ন দেখেন, আঁকেন সদানন্দ পৃথিবী।আপাত সরল মনে হলেও চিত্রকল্পের ভেতর যেন সময়বিপ্লবের এক রহস্যঘন ছায়া সম্পাত ,যা পাঠককে চকিত করে হরিণীর মতো!কবি বলেন,-
"এমন একদিন আসবে/---গাছেরা কথা বলবে-/ফুল ও ফলের গন্ধে/ভরে যাবে দেশ-/সেদিন কবিতা হবে রোদ্দুর"(কবিতা হবে রোদ্দুর)
পরিশেষে বলব,তাঁর সম্পর্কে কবি অরুণ বণিকের ভাষ্য প্রণিধানযোগ্য।পাঠক বিবেচনা করবেন অবশ্যই।"কবিতা পড়েই চেনা যায় তাকে।রসরাজ যে তার অন্তরাত্মার ঋজুতাকে অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে কবিতার পরিমিত শরীরে।---তার হাতে রয়েছে লক্ষ্যকে বিদ্ধ করার স্থির প্রতিজ্ঞ এক অভ্রান্ত সরল শস্ত্র---।"
পরিশেষে বলবো,কবি রসরাজ নাথের কবিতা পাঠ করে এ আমার ব্যক্তিগত অনুভব,সকলের মনে এমন নাও হতে পারে।কবির জন্য আমার অফুরান শুভ কামনা রইল।
প্রচ্ছদ-সুভদ্রা সিংহ
অনার্য প্রকাশন,পানিসাগর,উত্তর ত্রিপুরা
পিন ৭৯৯২৬০
মোবাইল-9383028861
0 মন্তব্যসমূহ