কবি ও গল্পকার সৈকত মজুমদারের গল্পগ্রন্থ || হারাধন বৈরাগী
"ক্ষণিকের অতিথি"।জ্ঞান বীক্ষণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ২০১৯ বইমেলায়। বিনিময় ১১১ টাকা।আমি গল্পকার নই।সমালোচক নই। গল্পকার আলোচনার জন্য বলেছেন।গল্পের হৃদয় থেকে যতটুকু উপলব্দি করতে পেরেছি তাই আমার মতো করে পরিবেশন করছি।
মোট বারোটি গল্প নিয়ে গ্রন্থের কলেবর।প্রথম গল্পটি নাম 'আত্মগোপন'।।গল্পের শুরু নিম্ন আদালতে ফাঁসির কয়েদি অভিজিতের সাথে কেন্দ্রীয় কারাগারের সৎ ও দয়ালু জেলারের সংলাপের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে।
-স্যার আমি কি আপনার সাথে মিথ্যে বলছি?জীবনের অন্তিমলগ্নে কেউ কি মিথ্যে কথা বলে?বিশ্বাস করুন, আমার কেউ নেই। পৃথিবীতে আমি ভীষণ একা!--বলতে বলতে অভিজিত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
-এখন থেকে একুশ দিনের মধ্যে তোমার ফাঁসি কার্যকর হবে,তাই আমি বলছিলাম কি--তুমি যদি চাও--তোমার হয়ে কাউকে আদালতে পাঠাবো--
-হাস্যোজ্জ্বল --অভিজিৎ বলছে,না স্যার --জীবন ভিক্ষা চাইনা!আমি তো এমন সাজাই চেয়েছি--যাতে আর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে থাকতে না হয়।
এইভাবে কথোপকথন চলতে চলতে-- একদিন জেলার অভিজিতের হাত ধরে বলছে,বাবা, তোমার বন্ধুকে কেন খুন করেছো,--এত করে বলছি অথচ তুমি---
এমন প্রেক্ষাপটে অভিজিৎ বলে,তার একমাত্র বোন মহিলা হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করতো।একদিন বোন সীমা তার কাছে টাকা নিতে আসে।হাতে তখন টাকা না থাকায় বোন সীমাকে ঘরে থাকতে বলে সে কাজে চলে যায়।বলে যায় ফিরে এসে দেবে।আর অভিজিতের অনুপস্থিতির সুযোগে তার বন্ধু রোহিত এসে তাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। অভিজিৎ বিকালে বাড়ি এসে দেখে একটি চিরকুট লিখে তার বোন আত্মহত্যা করেছে।এই ঘটনা অভিজিতের সহজ সরল মনকে দুমড়েমুচড়ে দেয়,সে এতই মর্মাহত হয় যে পৃথিবীকে তার অসম্ভব নিষ্ঠুর মনে হয়,সে আর বাঁচতে চায় না,সে বোনের আত্মার শান্তির জন্য প্রকাশ্যে বন্ধু রোহিতকে হত্যা করে জেলে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে যখন জেলার তাকে প্রশ্ন করে,এতোদিন --বললে তোমার কেউ নেই!তাহলে বোন এল কোথা থেকে?------
অভিজিৎ তখন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে -আসল কথাটা বলে।তারা একটা দলে কাজ করত।তার এক কাছের বন্ধু ছিল সুমন।একদিন সে সহসা তিনতলা থেকে পড়ে যায়।তাকে হাসপাতালে নিয়ে এলে মৃত্যু শয্যায় শুয়ে সুমন তার অনাথ বোন সীমাকে তার হাতে সঁপে দেয়।আর অভিজিৎ নিজের কাছে রাখা নিরাপদ নয় ভেবে তাকে হোস্টেলে রেখে পড়াতে থাকে।
জেলার তখন অবাক হয়ে বলে,--কেন অকালে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানালে বুঝিনা--তাও--যদি নিজের বোন হতো--।এই প্রেক্ষাপটে অভিজিৎ একটি কবিতা আওড়ায় -"পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি---" ছেলেটিকে শুরু থেকেই জেলারের নিরাপরাধ মনে হয়েছে।তাই চোখের সামনে বিনাবিচারে তার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু ছেলেটি তাকে সহযোগিতা করছে না।
অভিজিতের মুখে এমন সংলাপে জেলারের মনে প্রশ্ন জাগে সত্যিই কি অভিজিৎ অনাথ? ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করার জন্য তার মায়ের একটি আবেদন পত্র জমা পড়ে। নির্ধারিত দিনে এক বৃদ্ধা তার সাথে এসে দেখা করে। মহিলা তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে যখন বলে-'বাবা তুমি কি আমার হারিয়ে যাওয়া অভি?'তখন সে জিজ্ঞেস করে তার ছেলে অভির চেহেরা কি তার মতো দেখতে? মহিলা বলে-' হ্যাঁ বাবা তোমার মতো দেখতে । তবে---আমার অভি এমন-- কাজ করবে না।অভি কখনো খুন করবে না।
এমন প্রেক্ষাপটে অভিজিৎ তার মায়ের বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখতে নিজেকে মৃত্যুর কাছে সমর্পণে অবিচল থাকে।।আর তাই মায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে সে একটি মিথ্যা গল্প বলে।অভিজিৎ বলে যে সে তার ছেলে অভিকে চিনতো,সে তার সাথেই থাকতো। কবিতা বলতো। খুব দয়ালু ছিল ।সে একটি মহান কাজ করেছে।একটি ছেলেকে রেলের নিচে চাপা পড়া থেকে বাঁচাতে গিয়ে সে মৃত্যু বরণ করেছে।ছেলেটি বেঁচেছে।
আসলে এই কথা বলে সে তার বৃদ্ধা মায়ের গর্বে খুচা দিয়ে তাঁকে বাঁচাতে চেয়েছে।সে তার মায়ের এতদিনের বিশ্বাসকে খুন করতে চায় নি।এমন সংকটে মায়ের বিশ্বাসকে খুন করার চেয়ে অভিজিৎ নিজের মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে।
অবশেষে তার মা নিরুৎসাহ হয়ে ফিরে গেলে নির্ধারিত ফাঁসির দিনে যখন জেলার তাকে স্নান সেরে গীতা পাঠ শুনতে বলে তখন গীতাপাঠের মাহাত্ব্য তার কাছে অসার লাগে।আর সে জেলারের নির্দেশ অমান্য করে আওড়ায় গীতাসার-"যা হয়েছে ভালোই হয়েছে----"
গল্পটির পটভূমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে পরিণতির দিকে গেছে।পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে গল্পের উত্তেজনা লেখক ধরে রাখতে পেরেছেন। আত্মগোপন' নামকরণ একদম মানানসই মনে হয়েছে আমার।
লেখকের দ্বিতীয় গল্প "ওরা আসবে তো--"
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজু ও পারুল ক্লাসমেট। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে ।একদিন বিকেল বেলা নিজের ঘরে আয়নার সামনে বসে পারুল চোখ বোজে আইলাইনার লাগাচ্ছে।এমন সময় রাজু সন্তর্পনে তার পিছনে এসে দাঁড়ায়।আর পারুল চোখ খুলতেই দেখে আয়নাতে রাজু হাসছে। হঠাৎ পারুল রাজুকে দেখে অবাক হয় !চটজলদি দাঁড়িয়ে হাসি মুখেই বলে' তুমি!'রাজু বলে সে সারপ্রাইজ দিতে এসেছে।তারা নিজেদের পড়াশোনার খবর নেয়।এমন সময় পারুলের বাবা ঘরে কে এসেছে জানতে চাইলে,পারুল বলে,তার ক্লাসমিট।আর এতেই রাজু অসম্ভব আহত হয় ,এই ভেবে যে কেন পারুল তার বাবার কাছে বন্ধু পরিচয় দেয়নি।তার ধারণা হয় পারুল তাকে ভালো বাসে না।সে অভিমান করে পারুলের বাড়ি থেকে চলে আসে।আর আসতে আসতে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে পারুল তবে কি তাকে ভালো বাসে না? একাদশ দ্বাদশ এই সময়টুকু পারুলের সাথে কখনও বটতলায়, কখনও সে তাকে সাইকেলে লিভ দিয়ে কাটিয়েছে।
এসব তবে কী শুধু ক্লাসমিট ভেবে?-- এই দ্বন্দ্বকে ঘিরেই গল্প পরিণতির দিকে গেছে।পরদিন প্রাইভেট থেকে ফেরার পথে পারুলের পথ আটকিয়ে রাজু জানতে চায় সে তাকে কী ভালোবাসে?কিন্তু পারুল বলে সে তাকে বন্ধুর মতোই ভালোবাসে।এর বেশী কিছু নয়।এতে নাছোড়বান্দা রাজু অসম্ভব আহত হয়ে বলে সে আর প্রাইভেটে যাবে না,আর পরীক্ষাও দেবে না।পারুল বলে এটা রাজুর ব্যক্তিগত ব্যাপার।এতে তার কিছু যায় আসে না।রাজু হতাস হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।জীবনকে গড্ডালিকা প্রবাহে ছুঁড়ে দেয়।পারুল পড়াশোনা করে নার্সের চাকরি পায়।রাজু জীবনজুয়ায় শেষমেশ ড্রাইভার হয়।একবিকেলে অতর্কিত এক ঝড়ের কবলে পড়ে উদয়পুরে পারুল গাড়িতে বসা রাজুর মনিবের কাছে লিভ চাইলে রাজু ও পারুল ঝড়ের অন্ধকারে পরস্পরকে চিনতে পারে না।তবে রাজুর সন্দেহ হলে পারুলের ঠিকানা জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারে সে পারুলই।রাজু তখন পারুলের সাথে আগবাড়িয়ে কথায় বাড়াবাড়ি করলে অপ্রস্তুত পারুল গাড়ি থেকে নেমে যেতে চায়।তখনও সে রাজুকে চিনতে পারেনি।সহসা রাজু হ্যাণ্ড ব্রেক কষলে পারুল উলটে পড়ে সামনের সিটের হেলানের ফাঁকে।এমন প্রেক্ষাপটে রাজু আর পারুলের চোখাচোখি হয়, রাজু ও পারুল পরস্পরকে চিনতে পারে,আর চেয়ে থাকে একে অপরের দিকে নটরাজ মূর্তির মতো।
পারুলের বাড়ির সামনে এলে গাড়ি থেকে নেমে পারুল রাজুকে একটি বিয়ের খাম দিয়ে বিদায় নেয়। বাড়িতে এসে রাজু দেখে অরুপের সাথে পারুলের বিয়ে।এ সে মেনে নিতে পারে না। অরুপের ছবি সে দাঁতে কাটে।পারুলের ছবিতে চুমু খেয়ে বলে না,পারুল তুমি কারো হতে পারো না।আমি তা মেনে নেবো না।বিয়ের দিনে দেখা যায় বিয়ের লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে অরূপ কিন্তু আসছে না। সবাই ঘরে বাইরে পায়চারি করতে থাকে।এমন প্রেক্ষাপটে পারুলের বাবা লগ্ন পেরোনোর হতাশায় মেয়েকে জিজ্ঞেস করে ওরা আসবে তো!
গল্পের শুরু থেকে শেষ পাঠককে টানটান উত্তেজনায় পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যায়। আফসোস থেকে যায় কিন্তু পরিণতি কি, পাঠক বুঝতে পারে।রাজুর একতরফা ভালোবাসা বেলেল্লাপনা ছাড়া কিছুই নয় ।পারুলকে কোন দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু রাজুর একতরফা বেলেল্লাপনার স্বীকার পারুল।রাজু নিজের জীবন নিজেই খেলো।আবার তার কারণে পারুলের সুন্দর জীবনে অমানিশা নেমে এলো।রাজুদের কারণে এরকম অনেক পারুলের জীবন নষ্ট হয়।এই দিক দিয়ে গল্পটি উতরেছে অবশ্যই। কিন্তু একটা জায়গায় খটকা লাগলো,রাজু পারুলকে মনে প্রাণে সাথী হিসাবে চেয়েছে, কিন্তু পারুল চেয়েছে কেবল বন্ধুত্ব। তবে গাড়িতে মুখোমুখি দুজনে নটরাজ মূর্তির মতো চেয়ে থাকলো কেন?"চার বছর পর একে অপরকে দেখে চেয়ে থাকলো নটরাজ মূর্তির মতো। আদিত্য ওদের প্রেমে ভঙ্গ দিয়ে বলে অনেক হল--"বুঝা গেলো না। রাজু পারুলকে ভালোবাসে কিন্তু পারুল নয়,রাজুকে পারুল বিবাহের নিমন্ত্রণপত্র দেওয়া পর্যন্ত বিষয়টা পরিস্কার । কিন্তু গাড়িতে সহসা দুজনকে রাধামন ধনপুদির মতো দেখানোর প্রয়োজন ছিল কী?
তৃতীয় গল্প "বাসিফুল"
অমিত ও তরু ।স্কুলবেলা থেকে কলেজবেলার এক ব্যার্থ প্রেমের গল্প।মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে।বন্ধুদের সাথে মার্কসিট আনতে স্কুলে গেছে অমিত।ক্লাস নাইনের রুমের জানালা দিয়ে একটি মেয়ের মুখ ।মেয়েটি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে।মেয়েটির ঝলকরূপে অমিত প্রেমে পড়ে যায়।সে একাদশ শ্রেণীতে এই স্কুলেই ভর্তি হয়।মেয়েটির সাথে চোখাচোখি হয়।লাজুক হাসি বিনিময় হয়।পরে সে তার বন্ধু রূপনের কাছে জানতে পারে মেয়েটি তার একবছর সিনিয়র দাদা পার্থের মাসতুতো বোন।
নবীনবরণ উৎসবে তরু অমিতের কপালে চন্দন ফোঁটা দেয়।সে অসম্ভব অনুভূতি। কিন্তু সে মুখফোটে তরুকে কিছু বলতে পারে না।তারপর স্কুলে আসার পথে রোজ ক্যামটিলা দেখা হত,ক্রমে তাদের মাঝে একটা নিবিড় ভালবাসা গড়ে ওঠে।এমন আবহে তরুর মাসতুতো ভাই শাঁসিয়ে যায় অমিতকে।টেস্ট পরীক্ষার পর তরুকে আর দেখা যায় না।তার নিজেরও পরীক্ষা পড়ায় মন বসে না।অমিত তরুকে তার মাসির বাড়ির কাছে গিয়ে খোঁজে কিন্তু দেখা পায় না।পরে সে বিলোনিয়া ভাড়া বাড়িতে চলে যায়। কিছু দিন তাদের আর দেখা হয় না।অমিত মানসিক যন্তরণায় ভোগে।একদিন গাঁয়ে আসলে তরুর সহপাঠী তন্ময় বলে তরু প্রেগন্যান্ট।ওদিন রাতে দুচোখ সে বোজতে পারে না।পরদিন অমিত তরুর বাড়ি মাইছড়ায় যায়।তরুর সাথে দেখা হয় একটা অঙ্গনয়াড়ি কেন্দ্রের পাশে।তাদের বাড়ি যায়। পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে তরুর তলপেট নিরিক্ষণ করে।অমিতের ভেতর অসম্ভব মানসিক দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করে পাঠক।অমিতের অনেক কথা বলার ,বলতে পারছে না মুখ ফুটে।তরুরও।অমিত যখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।একদিন সহপাঠী অনিন্দিতার জন্মদিনে ফের দেখা তরুর সাথে।এই থেকে ফের অমিতের মনে তরুকে প্রথম দেখার স্মৃতি জেগে ওঠে। কিন্তু অমিত তার মনের ভালোবাসার কথা তরুকে মুখ ফোঁটে বলতে পারে না।তরু মুখিয়ে থাকে।তরু ধৈর্য্য না ধরতে পেরে তার জীবনের ঘটনা অমিতকে পত্রের মাধ্যমে খুলে বলে। নিজের অজান্তেই তার মাসতুতো ভাই তার সর্বনাশ করেছে।তরু ভেবেছে,অমিত এবার তার পত্রের উত্তর দিয়ে ভালোবাসার শেষ কথা জানাবে। কিন্তু তরুর জীবনের কথা জানার পরে তরুর প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা বেড়ে গেলেও অমিত তার মতামত জানায়নি।অন্য সাধারণ ছেলের মতোই সে পরিবার সমাজ ও কলঙ্কের ভয়ে এরিয়ে যায় তরুকে।একদিন অমিত তার কর্মস্থল ফুলবাগানে একটি বাসি গাঁদাফুলকে হাতদিয়ে স্পর্শ করতে গেলে পেছন থেকে তরু বাধা দিয়ে বলে ছুঁয়ো না ওঠা বাসিফুল।মধু নেই।এই বলে সেখানে থেকে দৌঁড়ে চলে আসে।এই হল গল্পের কঙ্কাল।বাস্তব অনুষঙ্গ মনে হল।তরুর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা, পরিবার পরিজনের কাছে না বলতে পারা বেদনা পাঠকের মনে হাহাকার তুলে। পাশাপাশি অমিত কলঙ্কভয়ে ভালোবাসাকে স্বীকার করতে না পারা একই মুদ্রার দুই পিঠ মনে হল।গল্পটি বর্তমান সমাজ দর্পন।নারী ও পুরুষের হৃদয় দর্পন। ভালো লেগেছে।
চতুর্থ গল্প 'ক্ষণিকের অতিথি।'গল্পটির শুরু বিলোনিয়া কলেজে পাঠরত অজয় ও তিথির মধ্যে।দুজনের চকিত দেখা থেকে প্রেম মুকুলিত।প্রথম দেখাতেই তিথি অজয়কে অনুরোধ করে তার সাইকেলটি সাইকেলস্ট্যান্ডের ভেতর থেকে বের করে দিতে।এমন আবহে তারা পারস্পরিক প্রেমে আকৃষ্ট হয়।তারপর একদিন তিথি অমিতের ঘরে নোট আনতে গেলে সে দেখে আয়নার সামনে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে অমিত তিথির নাম ধরে বলছে, আমি তোমায় ভালোবাসি তিথি।এমন দৃশ্যে তিথি, অমিত লজ্জা পাবে ভেবে তাকে বুঝতে না দিয়ে দরজা থেকে ফিরে আসে।বাড়ি এসে বিছানায় বালিশবুকে চেপে অজয়কে ভাবতে থাকে।পরদিন কলেজ পথে তিথি অকারণে হাসলে অজয় যখন জিজ্ঞেস করে সে হাসছে কেন?তখন তিথি বলে অজয়ের আয়নার সামনের কথা ।এ শুনে অজয় হাসতে হাসতে সাইকেল এলোমেলো চালাতে থাকে।আর বিপরীতে দিক থেকে আসা একটি ট্রাক তাকে চাপা দেয়। পথচারির সহায়তার হসপিটালে নিয়ে গেলে তিথি সেখানে সারারাত কাটায়। পরদিন অমিতের মা-ভাই আসে ।ডাক্তার বলে তার একটা পা কাটতে হবে।এ শুনে তিথি অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু পা-কেটে নিলে শেষ দেখা দেখে সে বাড়ি চলে আসে।আর দেখা করেনি তিথি।অমিত প্রতিক্ষার প্রহর গুনে।মাসেক পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফেরার পথে অমিত বন্ধুর মুখে জানতে পারে তিথি বিলোনিয়ায় নেই। পিতৃহীন অজয়ের মা মারা গেলে ভাইয়ের সংসারে সে অপাংক্তেয় হয়ে যায়। অবশেষে বাড়ি ছেড়ে মনুবাজারশেডে আশ্রয় নেয়।সে কবিতা লেখা শুরু করে।জীবনের বানে হারিয়ে যায় অজয়।একদিন বাসে করে শান্তির বাজার অবধি এলে ভাড়া না থাকায়, ড্রাইভার তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়।একটি পাকাবাড়ির গেইটের সামনে এসে বসে। হঠাৎ সে দেখে একটি ছেলের হাত ধরে স্কুলবাস থেকে তিথি নামছে।তখন অজয় খোঁচা দাড়ি গোঁফ নিয়ে কিছু একটা পড়তে থাকে।তিথি তাকে চিনতে পারেনি।অজয় জল চায়।তিথি জল আনতে গেলে একটি চিরকুট লিখে,তিথির ছেলের হাতে দিয়ে সেখান থেকে চলে আসে।এতে লেখা ভাবতে অবাক লাগে/তুমি এত স্বার্থপর তিথি/আজ স্বচক্ষে দেখলাম /মেয়েরা ক্ষণিকের অতিথি।" এই হল গল্প।গল্পটি ভালো লেগেছে।
পঞ্চম গল্প।'আবার যদি মুছে যায়'।গল্পটি অকালে বৈধব্যপ্রাপ্ত একটি মেয়ের জীবন যন্ত্রণা। সনাতনী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি রিমিতার বাবা।সদ্য মা-হারা স্কুলপাঠরত রিমিতাকে পণ দিয়ে পাত্রস্থ করেন বৃদ্ধ বাবা।
মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পারলেই যেন তার দুঃশ্চিন্তার অবসান।দ্বিরাগমনে এসেই জামাতা অসুস্থ হয়ে মারা যায় হাসপাতাল।ব্লাডক্যান্সারের রোগী।রোগ গোপন করে পন নিয়ে বিয়ে করে।এই টাকায় যদি রোগমুক্ত হওয়া যায় ভেবে।চলিত সমাজ মানষিকতা।ছেলে পন নেয় বাঁচার আশায়।পিতা বিয়ে দেন মেয়েকে তার অবর্তমানে সুখি গৃহকোণ দেওয়ার আশায়। সাধারণত সকল বাবারাই তা চান।গল্পের ঘটনা পাত্রপাত্রীর চরিত্র অর্থনীতি চলিত সমাজদর্পন।স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ের জীবনে সমাজের ভ্রুকুটি নেমে আসে।মেয়েটি অন্য মেয়ের মতোই সংসারে খাটতে থাকে।এমন প্রেক্ষাপটে মেয়েটির তুতো দেবর তাকে ভালোবাসে।দেবর তাকে বিয়ে করে তাদের পরিবারের পূর্বভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। কিন্তু পরিবার এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার তাকে স্বামীখাকি রাক্ষসি ও বৈধব্য দোষ দেখিয়ে সুমনের সাথে বিয়ে দিতে রাজী নয়।সমাজের এই কলুষের দিকে লেখক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।দেবর তাকে পরিবার বন্ধুবান্ধবের সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করে তাকে বিয়ে করে নুতন জীবন দান করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু দেখা যায় এমন আবহে রিমিতাও তার আত্মস্থ সামাজ মানষিকতা থেকে ,কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।কেননা রিমিতাও তো এই সমাজ রসেই জারিত।তাই গল্পের শেষে যখন দেখি সুমন তাকে বলছে ,"প্লিজ সময় নষ্ট করো না্ এভাবে,আজ দেড় বছর যাবৎ আমি তোমার অপেক্ষায়--শুধু একবার তুমি হ্যাঁ বলে দাও।তখন রিমিতা বলে আমার ভীষণ ভয় করে, তোমার হাতে সিঁথিতে সিঁদুর নিতে--আবার যদি মুছে যায়!"
আর একথা বলে রিমিতা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
চেনা গল্প হলেও ভালো হয়েছে। কিন্তু সংলাপ আমার কাছে কোথাও কোথাও বেজেছে।যেমন,রিমিতা যখন বলে তোমার হাতে সিঁদুর নিতে ভয় করে।রিমিতা হল গল্পে অপয়া নারী। সেই হিসাবে এই সংলাপ যেন সুমনের উপর অপয়ার ছাপ ফেলেছে।যদিও এ গল্পের অনুষঙ্গ নয়।রিমিতার মুখে এই সংলাপ যদি,আরেকটু ঘুরিয়ে বলা হতো যে ,ফের কপালে সিঁদুর মাখতে ভয় করে। তবেই বুঝি রিমিতার সংলাপ প্রাণবন্ত হতো। ভালো লেগেছে গল্পটি।
ষষ্ঠ গল্প ।'রহস্যজনক হত্যা'। একান্নবর্তী পরিবারে একটি ঠোঁটকাটা চারমাসের শিশু কুট্টির হারিয়ে যাওয়া ও পুকুরের অগভীর জলে ভাসমান তার লাস আবিষ্কার।পরিবারে বয়স্ক কর্তা।তার বিবাহিত দুই ছেলে, তিন নাতিন।কুট্টি ছোট ছেলের সন্তান।
শুরুতে ছেলেধরার ভয়,পরে পুকুরের জলে কুট্টিকে আবিস্কার।এই নিয়ে সন্ধ্যায় অসম্ভব সোরগোল, থানাপুলিশ। পোস্ট মর্টেমে পরিস্কার শ্বাসরোধ করে মৃত্যু।কে তার আততায়ী পুলিশ বের করতে পারে না।তবে পরিবারের দিকেই সন্দেহের বীজ যেন ঘণীভূত করে তুলেছেন লেখক।তবুও পুলিশ অনেক কেসের মতোই এই কেসের আসামী ধরতে ব্যার্থ হয়।গল্পের শেষ হত্যাকারী কে -এই প্রশ্ন চিহ্ন রেখেই শেষ হয়। গল্পটির আবহ ,সন্দেহ করেও মনে হল ,হল না সন্দেহের শেষ।পাঠকের কাছে প্রশ্ন থেকে যায় আসল আততায়ী কে?গল্পটি পড়ে মনে প্রশ্ন ওঠে লেখক আসলে অপরাধী চিহ্নত করতে চেয়েছেন নাকি পুলিশি ব্যার্থতা দেখাতে চেয়েছেন।নাকি উভয়ই? পাশাপাশি পরিবার থেকে কোন অভিযোগ না থাকায় পরিবারের দিকেই যেন অপরাধের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। আমার মনে হয়েছে অপরাধী পরিস্কার করলেই বুঝি গল্পটি আরো শক্তিশালী হতো।কিংবা এমন নাও হতে পারে।এই প্রশ্নবোধকেই হয়তো গল্পটির আত্মা।
সপ্তম গল্প "চিঠি" এক প্রেমের টানাপোড়েনের গল্প।প্রিয়া নাম্নী এক মেয়ের বাসিচিঠিকে কেন্দ্র করে গল্পটি পাকিয়ে তোলা হয়েছে।প্রিয়াকে পাওয়ার এষণায় ব্যর্থ হয়ে মদে আসক্ত যুবক বিনয় জলপিপাসায় ঘুম থেকে উঠে টিবিলের উপর থেকে প্রিয়ার বাসিচিঠি হাতে নিয়ে তাতে চোখ রাখে। প্রিয়া তার বয়ঃসন্ধি থেকে যৌবন অবধি তার জীবনকাহিনী লিখেছে চিঠিতে।এখানেই গল্পের শুরু।প্রিয়া বয়ঃসন্ধি অবধি মায়ের কঠোর শাসনে বড় হয়েছে।যখন সে ক্লাস সেভেনে পড়ে একটি ছেলে তার পিছু নেয়।ছেলেটটিকে সে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে । কিন্তু যখন চেয়েছে,ছেলেটি তাকে ঘৃণা করেছে।তারপর ক্লাস এইটে যখন পড়ে তখন জয়ন্ত নামের আরেক পেশায় ড্রাইভার যুবক প্রিয়ার জীবনে আসে।প্রিয়া তাকে ভালোবাসে। পরিবার মেনে নেয় না।চলে তার উপর মানসিক নির্যাতন।পড়ে বিয়েতে রাজি হলেও ছেলেটি একটি গাড়ি যৌতুক চায়।প্রিয়া এতে মারাত্মক মানসিক আঘাত পায়।বিয়ে ভেঙে দেয়। কিন্তু এতে পারিবারিক মানসিক নির্যাতন বেড়ে যায়।বোনের মতো আপনজনও তাকে নেক নজড়ে দেখে। চিঠিতে প্রিয়া তার শেষ প্রণয়প্রার্থী বিনয়কে তার বিগত জীবনের প্রেমের যাবতীয় আখ্যান খুলে ধরেছে।বিনয় ও ড্রাইভার।চিঠির বয়ানে বুঝা যায় প্রেমে বারবার ধোঁকা খাওয়া প্রিয়া তার জীবনের পূর্বকাহিনী জানাতে চায়।যাতে বিনয়কে তাকে ভালোবাসা থেকে ফেরাতে পারে।তার জীবনে ফের আর কোন সংঘাত না আসে। বিনয়কে প্রকারান্তরে সাবধান করে দিতে চায় যে প্রিয়া আর কাউকে বন্ধু ছাড়া পাশে চায় না।তাকে জেনে বুঝে যেন বিনয় তাকে ভালোবাসা ও জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার চিন্তা থেকে বিরত থাকে।।তাই গল্পে বিনয়ের সুরাপান প্রকারান্তরে ,প্রিয়া যে বারবার বিনয়ের ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তা বুঝা যায়।আর এতেই বুঝি বিনয় মদ ধরেছে।ভালোবাসায় পোড় খাওয়া মেয়ে এবার সতর্ক হয়েই বুঝি প্রেমের বাঁধন আর পড়তে চায় না।বিনয় কিন্তু প্রিয়াকে পেতে নাছোড়বান্দা।তাই সে ইতিমধ্যই একদিন প্রিয়ার বাড়ি গেছে।এতে প্রিয়া বাড়িতে অত্যাচারিত হয়েছে।গল্পটি অবশ্যই বিয়োগান্তক কিন্তু চিঠির শেষে বিনয়কে প্রিয়া লিখেছে,প্লিজ যা উত্তর দেবে ভেবে চিন্তে দেবে,মাতলামি করে না।প্রিয়া কি তবে বিনয়ের কাছে অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়েছে!?
এই টানাপোড়েনই মনে হল গল্পের বিষয়।গল্পের প্লট ও উপস্থাপন ভালো হয়েছে।আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনারই প্রতিছবি মনে হল।
নবম গল্প।চেন্নাই টু গৌহাটি।গৌহাটির একটি সাধারণ ছেলে বিক্রম চেন্নাইতে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে একটি কোম্পানিতে যোগ দেয়।সেখানে পাশের কোম্পানিতে কর্মরত তার মতোই সে একটি সাধারণ মেয়ের প্রেমে পড়ে।তাকে জীবনসঙ্গী করবে ভাবে।সুপর্ণা ।সুপর্ণা ঘরোয়া মেয়ে। ভালোবাসার মেয়ে। কিন্তু সহসা তার কোম্পানীর মালিক গৌহাটির মিস্টার গগই সপরিবারে চেন্নাইতে এলে বিক্রমের ভালোবাসার অভিমুখ পাল্টে যায়।তার কর্মপটুতা লক্ষ্য করে গগই তাকে খুব পছন্দ করেন।।তাকে তিনি কোম্পানির সেলস এক্সিকিউটিভ করেন।এমন আবহে গগই তার মেয়ে চুমকিকে ছেলেটির সাথে চেন্নাই ঘুরতে দিলে সে তার অসম্ভব প্রেমে পড়ে যায়।এতে বিক্রমের স্বপ্ন বড় হতে থাকে।সে বড়লোক হওয়ার বাসনায় চুমকিকে বিয়ে করবে চিন্তা করে।সুপর্ণার ভালোবাসা তার কাছে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু সুপর্ণা তাকে পেতে চায়।সেলস এক্সিকিউটিভ হয়ে ভালো ছেলে বিক্রম বড়লোকের মদ ধরে। উশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে থাকে।সুপর্ণা তাকে বুঝিয়ে ফেরাতে চায়।চুমকির সাথে লেনাদেনার ছয়মাস পর সে ট্রেণে করে গৌহাটিতে চুমকির কাছে রওয়ানা করে।সুপর্ণার কাছ থেকে বিদায় বেলা তার মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।ক্ষণিকের জন্য সুপর্ণাকে ছেড়ে আসতে মন চায় না।ট্রেণে জার্নিকালে কম্পার্টমেন্টে এক সুন্দরীমহিলার ভালব্যবহারে সে আকৃষ্ট হয়।সুযোগ বুঝে তাকে জড়িয়ে ধরে বেলেল্লাপনা করে। মহিলা তাকে চপেটাঘাত করলে তার চৈতন্য ফেরে।এমন কাজের জন্য মানসিক অবসাদে ভোগে।সুপর্ণার কথা অসম্ভব মনে পড়ে।কিন্তু যখন গৌহাটি ট্রেণ থেকে নেমে চুমকিকে পায় ফের সুপর্ণাকে ভুলে বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়।আসলে বিক্রম যেন জলের মতো পাত্র আধারিত।যখন যে অবস্থায় থাকে সেই আকার প্রাপ্ত হয় সে।এ যেন অনেকটা গিরগিটির মতো রূপবদল মনে হয়।পাত্রভেদে মানবচরিত্রের বিশেষ করে বেশির ভাগ পুরুষের আকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত।জলের মতো। তাই বুঝি বার্তা দিতে চেয়েছেন লেখক।বেশ ভালো লেগেছে গল্পটি।তবে চেন্নাই টু গৌহাটি আসতে এতো রেল টানেল?যাই হোক জীবনের টানেল আছে গল্পটির মাঝে। ভালো লেগেছে।
দশম গল্প "রাত পৌনে বারোটা"।বন্ধুর বিবেকের গল্প।আমরা কথায় কথায় কাউকে বন্ধু বলে ফেলি। কিন্তু বন্ধু যে কি কজনা বুঝে।এ এক মর্মস্পর্শী গল্প মনে হল ।উত্তমপুরুষে গল্প পাকিয়ে তোলা হয়েছে।প্রধান চরিত্র মনে হল লেখক নিজেই।মা বাবা গিয়েছেন সীতাকুণ্ড পরিদর্শনে।বাড়িতে একা।একা একা রাত কাটাতে অস্বস্তি লাগছে তার।তাই তিনি বন্ধু শিবুর বাড়িতে যান।তাকে বাড়িতে পান না ।খানিকক্ষণ শিবুর মা-বাবার সাথে নিজের পিতা-মাতাকে সিতাকুন্ডে পাঠানোর সংবাদ ও কুশলাদি বিনিময়ের মাধ্যমে বন্ধুর জন্য অপেক্ষার কালপাত।তারপরও শিবু না আসায়,তার বাড়ি ফিরে আসা। গরুগুলি ঘরে তুলে ঘরে ঢুকে দেখেন শিবু টিভি দেখছে।সে খুব আনন্দিত।এই আবহে শিবু মাংস খেতে আবদার করলে তিনি মঞ্জুর করেন এবং তাকে কিছু টাকা দিয়ে বাজারে পাঠান।সুরাসক্ত শিবু মাংসের সাথে সুরাও নিয়ে আসে।শিবু রাতে সুরা পান করার পর বলে আজ শিবচতুর্দশী,এই উপলক্ষে বিরাট মেলা বসবে সে তাকে নিয়ে মেলায় যেতে চায়।এই প্রক্ষাপটে শিবু তার বোনজামাইর বাইক নিয়ে আসে দুজনে মিলে মেলায় যায়।রাতে হঠাৎ মেলা থেকে শিবু কোথায় উদাও হয়ে যায়। তিনি অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন।গভীর রাতে মদ ও গাঁজা খেয়ে শিবু ফিরে এসে বলে,এখনই বাড়ি ফিরবে।অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাতাল শিবুর সাথে তিনি ফিরতে বাধ্য হন।তারা দুর্ঘটনায় পড়ে।শিবু মারা যায়। তিনিও অসম্ভব ছুট পানচিৎকার দিয়ে কাঁদেন। কিন্তু পরক্ষণেই কি ভেবে লাস ফেলে বাড়ি চলে আসেন। কিন্তু দরজা খুলে চৌখাটে পা রাখতেই দেখেন মুখোমুখি শিবু।কাঁধে হাত রেখে তাকে বলছে -বেইমান--।তারপর সারারাত শিবুর উৎপাত।ঘুমুতে পারেন না । কখনও উঠোনে রক্ত। কখনও কুকুর----রূপে যেন শিবুর আবির্ভাব।পরদিন শিবুর লাস আবিষ্কার করে এলাকার লোক।তাকে একটি ছেলে ডেকে নিয়ে গিয়ে শিবুর লাস দেখায়। তিনি অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কিন্তু তিনি যে সাথে ছিলেন তা প্রকাশিত হয় না।আমার মনে হল শিবু নয়।কিংবা এই শিবুই যেন বন্ধুর বিবেক হয়ে বারংবার তাড়া করেছে তাকে। শিবুর মৃত্যুর পর গল্পটি লৌকিক থেকে অলৌকিক আবহে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।যা বাস্তব ঘটনা মনে হল। বন্ধুত্ব গল্পটি সময়ের রেঙ মনে হল। খুব ভালো লাগলো আমার।
একাদশ গল্প।ইম্পজিবল।
মিঠুন ও প্রিতম দুই গভীর বন্ধু। মিঠুন প্রিতম দুজনই বিবাহিত।প্রিতমের বউ সুজাতার সাথেও মিঠুনের গভীর বন্ধুত্ব ।তাদের মাঝে টেলিফোনে কথাবার্তা ও চ্যাটিং চলে হর্দম ।প্রিতমের মা সুজাতার শাশুড়ি সুজাতা ও মিঠুনের এমন হাই হেলো একদম পছন্দ করেন না। কিন্তু প্রিতমের এ নিয়ে কোন এলার্জি নেই। সুজাতার গর্ভে সন্তান আসে না।তাই প্রিতম সুজাতার প্রতি শিতিল উঠে দিন দিন।এ সুজাতার নজর এড়ায় না।এই নিয়ে প্রিতমের সাথে মনোমালিন্য হলে কদিন মিঠুনের সাথেও কথা বন্ধ রাখে সুজাতা। মিঠুন এতে মানসিক যন্ত্রনা অনুভব করে। একদিন সহসা সুজাতা মিঠুনকে ফোন করলে সে অসম্ভব উচ্ছসিত হয়ে ওঠে।এই আবহে মিঠুনের স্ত্রীর সাথে সুজাতার কথা হয়।সুজাতাকে ডাক্তারের কাছে যেতে পরামর্শ দেয় মিঠুনের স্ত্রী অদিতি।এর আগে অনেক বদ্যি ঠাকুর থানে গিয়েও ফল হয়নি। এরপরও শাশুড়ি তাকে কালিঘাটে নিয়ে যেতে চায়।যাই হোক অবশেষে প্রিতম তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।সেখানে পরীক্ষার পর দেখা যায় প্রিতমেরই সন্তান লাভের অক্ষমতা।এতে প্রিতম ডাক্তারে বলে ইম্পজিবল।এই আবহে প্রিতম টেস্টটিউব বেবীর জন্য ডাক্তারকে দশহাজার টাকা এডভান্স করে।
বাড়ি ফিরে তারা স্থির করে টেস্টটিউব বেবী নিতে গেলে অপরিচিত কারুর শুক্র নেবে না। জানাজানি হলে পারিবারিক সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে ভেবে তারা স্থির করে মিঠুনের দ্বারস্থ হবে তারা।
প্রিতম ও তার মা রথযাত্রা উপলক্ষে পুরীতে যায়।এই সুযোগে প্রিতমকে সুজাতা একান্তে ডাকে।পরে একদিন শাশুড়ি মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলে,প্রিতমের ওভারটাইম কাজের সুযোগে ডাক্তারের কাছে গিয়ে সুজাতা দশহাজার টাকা ফেরৎ চায় ।এই বলে যে সে অন্তঃস্বত্তা।ডাক্তার বলে ইমপজিবল।এই হল গল্প।গল্পের প্লট ভালো।নামের সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ পূর্ণ।সংস্কার কুসংস্কার থেকে চরিত্রের বেরিয়ে আসার অসম্ভব চেষ্টা লক্ষ্য করা যায় গল্পটিতে । এই সময়ের মনস্কতাও ফুটে উঠে এতে।আরেকদিকে চিরাচরিত সমাজমানস নারীর প্রতি সর্বদা গর্ভহীনতার সন্দেহ, তার এক ঝলক দেখা যায় এই গল্পে।প্রিতমের চরিত্র সংস্কারাচ্ছন্ন হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসার ও ক্ষমতা রাখে সে। মিঠুনের প্রতি তার বন্ধুত্বকে কুর্ণীশ করতে হয়।নুতনত্ব আছে।তবে শেষের দিকে গল্পটি এতো টানার দরকার ছিল না মনে হল। বিক্রম ও তার মায়ের পুরী যাত্রার সময়েই গল্পের পরিণতি -অর্থাৎ সুজাতার ডাক্তারের কাছে টাকা ফেরৎ চাওয়া শেষ হতে পারতো।গল্পটি পাঠক হিসেবে আমাকে ভাবান্তরে নিয়ে গেছে।
দ্বাদশ গল্প-"অনাথ"। অসম্ভব গরীব অথচ কুটির জ্যোতি প্রকল্প থেকে বঞ্চিত নরেন্দ্র মিস্ত্রীর ঘর আলো করে স্ত্রী কমলার গর্ভে সন্তান এসেছে।এত গরীব ঘরে বৃষ্টি পড়ে। টিপটিপ বৃষ্টির রাতে ঘরে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা নেই।বাজারে গিয়ে অভাবের জন্য কেউ বাকী দেয় না।সে বাধ্য হয়ে মোমবাতি নিয়ে আসে।বউ তাকে লোকে বাকি দেয় না বলে সন্দেহ করলে সে কথা ঘুরিয়ে বউকে আশ্বাস দেয় যে ছেলের নাম রাখার দিন কিছুই সাধআল্লাদ বাদ যাবে না। কিন্তু দেখা যায় নামের দিন শাশুড়ি ও শালা ছাড়া প্রতিবেশী কেউ আসেনি।গরীব বলে প্রতিবেশীরা আসে না।যাইহোক ছেলের নাম দৈবক্রমে হয় অনাথ।ছেলেটি অনেক কষ্টে যখন উনাউপাসে সিক্সে ওঠে তখন তার এক বোনের জন্ম হয়।এই বোনজন্ম মায়ের বুকে বুঝি হতাসা সৃষ্টি করে।মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় ছেলের প্রতি কমলার মমত্ব কমে যায়।সে অনাদরে শেষ পর্যন্ত পড়া ছেড়ে কাজের সন্ধানে ছুটে যেতে হয়।চায়ের দোকানে খাটুনিতে পায়ের গোড়ালি থেকে রক্ত ঝরলে অসহ্য হয়ে সে বাড়ি এসে মায়ের ভয়ে বিছানার নীচে লুকিয়ে থাকে।তাতেও রক্ষা না পেয়ে মায়ের অত্যাচারে বাড়ি থেকে ফের বেরোতে হয়।তারপর কিছুদিন মাতাবাড়ির সেডে থেকে প্রতিগাড়ি ১০ টাকার বিনিময়ে ধুয়ে স্বাধীন ভাবে রোজগার করে ।একদিন প্রতিবেশী পেয়ে মাকে টাকা পাঠায়।এতেও চলে না।গাড়ির এসিস্টেনিতে ঢুকে। অবশেষে টাকা চুরির মিথ্যে অপবাদ নিয়ে আগরতলা গিয়ে হোটেলে চাকরি নেয়। ইতিমধ্যে পিতার মৃত্যু হলে সংসারের দায়িত্ব,বোনের বিয়ে সব নিয়ে সে যখন পাগলপ্রায়,তখন সুযোগ পেয়ে একটি অন্ধমেয়ের জন্য চোখবিক্রি করে বোনের বিয়ে দেয়।বোনের বিয়ে হয়।সে তখন হাসপাতালের বেডে।যখন মা বোন জানতে পারে অনাথ আইজিএম হাসপাতালে।তখন তারা সেখানে ছুটে যায়।বোন অনু যখন বলে দাদা তুই এমন করলি কেন ?তখন সে বলে,এ না করলে ছোটবোনটা যে দেখতে পেতো না ,আর তোর বিয়ে! গল্পটির শেষে অনাথের ভালোবাসা জগতের বোনের ভালোবাসায় উত্তীর্ণ।অনাথ চরিত্র পাঠককে অসম্ভব আলোড়িত করে।গল্পটি মনে খুব দাগ কাটে।তবে অনাথের মায়ের এতো অমানবিক মুখ না দেখালেও গল্পের উদ্দেশ্য বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হতো না বলে বলে মনে হয়েছে।সর্বোপরি ভালো লেগেছে গল্পটি।
পরিশেষে বলবো।প্রতিটি গল্পের মাঝে টানটান উত্তেজনা আছে।দন্দ্ব আছে।সময়ের রেঙ তীব্রভাবে আছে।অসম্ভব বাস্তবের আলোআঁধারিতে ছাওয়া প্রতিটি গল্প।লেখকের কল্পনাকে কুর্ণীশ করতেই হয়।তবে আমার মনে হয়েছে এতো সুন্দর ও বাস্তব চরিত্র নিয়ে প্লট নিয়ে বলার অসম্ভব সত্ত্বা নিয়েও গল্পগুলির সংলাপ কোথাও কোথাও আমার কাছে ভারী মনে হয়েছে।অনেক কমকথায় এই অসম্ভব গল্পগুলি লিখতে পারতেন লেখক।আর গল্পকে উপসংহারে টেনে নিয়ে যেতে গিয়ে অনেক গল্পে কোথাও কোথাও আমার কাছে কিছু রিপোর্টিং এর মতো মনে হয়েছে।তবে সকলের কাছে এমন নাও মনে হতে পারে।আর কোথাও কোথাও লেখক নিজে বলে যেন গল্পের পাত্রপাত্রীর চরিত্র বুঝাতে চেয়েছেন। আমার তো মনে হয়,গল্পে চরিত্র নিজেই সংলাপ প্রেক্ষাপটের আলোছায়ায় নিজের রূপ পাঠকের কাছে তুলে ধরবে।আর গল্প ,যতটুকু জানি একটা কেন্দ্রকে ধরে চারদিকে ঘুরে।এই ঘুর্ণন কিছু কিছু গল্পের প্লট টেনে নেওয়ার জন্য বাধা পেয়েছে বলে মনে হল আমার।আর বেশির ভাগ গল্পে কোন না কোন ভাবে তত্ত্ব ও প্রবাদ জুড়ে দিয়েছেন লেখক। অনেক সংলাপ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারি মনে হয়েছে। সংলাপের শব্দ চয়ন ও প্লট বর্ণনায় আরেকটু যত্নবান হলে গল্পগুলি অনেকবেশী শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত হতো বলে মনে হয়েছে।তবে গল্পের শুরুতে বুঝা যায় না গল্পটি কোথায় গিয়ে শেষ হবে।এ লেখকের অসম্ভব গুন,মনে হল।পরিশেষে বলবো,গল্পগ্রন্থের নাম' ক্ষণিকের অতিথি'সত্যিই প্রতিটি গল্পই ক্ষণিকের অতিথি মনে হয়েছে।নামকরণ স্বার্থক।প্রচ্ছদ শারদ ভট্টাচার্য্য।ভালো লেগেছে।
এ সম্ভবত লেখকের প্রথম গল্প সংকলন।আগামী গল্পগ্রন্থে লেখক অবশ্যই অনেক বেশি যত্নবান হবেন এমন বিশ্বাসে জারিত হয়েছি আমি।
0 মন্তব্যসমূহ