ভট্টকবি হেমেন্দ্র নাথ বাউল || মণ্টু দাস
ভারত ও বাংলাদেশ এই দুই দেশের জীবিত প্রবীন ভট্টকবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হেমেন্দ্র নাথ বাউল---যিনি একাধারে ভট্টকবি, তর্জা গানের বিখ্যাত শিল্পী, সংগীত রচয়িতা, পদ্মাপুরাণের গুর্মি, সুরকার,বাউল ও অসংখ্য দেহতত্ত্ব গানের শ্রষ্টা এবং সমজদার সমাজ কর্মী। সেই সাথে ভেষজ বিদ্যায় অভিজ্ঞ এক কবিরাজ। প্রচারের ডামাঢোলের সম্পুর্ন বাইরে থাকা এই সব্যসাচী মানুষটি সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। কখনো প্রচারের আলোয় নিজেকে নিয়ে আসতে চান না। এক আত্মমগ্ন চিন্তাশীল প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি। একজন শ্রষ্টা হিসেবে প্রখর সচেতন থাকলেও অহংকার তাঁর ব্যক্তিত্বকে খাটো করতে পারেনি। তাঁর নিজের কথায় --'আমি আমার সৃষ্টির মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই।'
এখনো তিনি ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের অবিভক্ত শ্রীহট্ট জেলার নানা অঞ্চলে তর্জা গানের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন। প্রশ্নবানে বিপক্ষকে তুমুল ভাবে বিদ্ধ করেন। মঞ্চে বেহালা হাতে তাঁকে এক অসম সাহসী যোদ্ধা রূপে দেখা যায়---যা বাস্তবের হেমেন্দ্র নাথ বাউল এর থেকে এক ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। হিন্দু - মুসলিম শাস্ত্র ও দর্শন সম্পর্কে অসাধারন বোদ্ধা এক পণ্ডিত মানুষ তিনি। তাঁর গানে বিমুগ্ধ হাজার হাজার দর্শক শ্রোতারা আত্মহারা হয়ে করতালিতে যখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলে তখন বোঝা যায় লোক গান বাংলার পল্লী গাঁয়ের মানুষের হৃদয়ে কতখানি স্থান দখল করে আছে!
তিনি অসংখ্য ভট্টকবিতা রচনা করেন। কবিতা ছাপিয়ে তিনি বিংশ শতকের সত্তর -আশী ও নব্বইয়ের দশকে কাঞ্চনপুর, ধর্মনগর ও কৈলাসহরের বাজারে বাজারে মাইক লাগিয়ে সুর করে গাইতেন ও কবিতা বিক্রি করতেন। শত শত শ্রোতা বিমুগ্ধ হয়ে এই কবিতাগুলো ক্রয় করতেন। তিন -চার দশক পূর্বের ছাপানো কবিতা গুলো আমাদের অনুরোধে একটি বস্তা থেকে বের করে হাতে দেন। সময় কম থাকায় সবগুলো দেখার সুযোগ হয়নি। স্বল্প সময়ে আমরা তিনটি কবিতা পেয়েছি। ১.'পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধের সাথে আঠারো বৎসরের মেয়ের বিয়ে,পরে বিষ দিয়ে স্বামী হত্যা।' ২.'শ্বশুর পুত্রবধুকে জোরে ধর্ষণ,পরে মামলা দায়ের।' ৩.'জনপ্রিয় কবিতা'।
ভট্টকবিতা মূলত: একধরনের সংবাদ প্রতিবেদন। যে সময় সংবাদ পত্র ছিলনা, কিংবা রেডিও আবিষ্কার হয়নি তখন ভট্টকবিরা নানা ধরনের ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কবিতা লিখে জনপদে জনপদে প্রচার করতেন। এ বিষয়ে গবেষণায় দেখা গেছে এই সব বেশিরভাগ কবিতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। বরাকের ভাষা আন্দোলনের কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নানা কবিতায় উল্লিখিত বিবরনের সত্যতা প্রশ্নাতীত। এছাড়া 'চরগোলা এক্সোডাস' সহ নানা বিষয়ের কবিতা গুলো ইতিহাসের আকর হিসেবে গ্রহন করা হচ্ছে।
আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে ভট্টকবিদের সম্মানজনক উপস্থিত লক্ষ্য করা যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পূরানে শ্রীকৃষ্ণের উপনয়ন অনুষ্ঠানে ভট্টকবিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়------
'বসুদেবো দেবকী চ পুত্র কল্যানহেতবে।
নানা রত্নমনিং বস্ত্রং সুবর্নং রজতং তথা।।
মুক্তা মানিক্য হারঞ্চ মিষ্টান্নঞ্চ সুধোপমম।
ভট্যোভ্যো ব্রাহ্মণেভ্যশ্চ প্রদোদৌ সাদরংমুদা।।'
বাঙালীর জাতীয় কাব্য মনসামঙ্গলেও উল্লেখ রয়েছে। কোটিশ্বর পুত্র চন্দ্রধরের জন্য পাত্রীর সন্ধানে ভাট বা ভট্টকবিদের পাঠিয়েছিলেন ---
'
'দেশে দেশে ভট্ট পাঠাইয়া অনুচরে।
চান্দের বিয়ার সজ্জা করে কোটিশ্বরে।।'
এক সময় গোটা দেশ জুড়ে ভট্টকবিদের বিপুল প্রভাব ছিল। শ্রীহট্ট,বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরার নানা অঞ্চলে অসংখ্য ভট্টকবিদের দেখা পাওয়া যেতো। অযোদ্ধা ভট্ট,কমলাকান্ত ভট্ট মিরজান আলী,রাইমোহন নাথ উমেশ চন্দ্র নাথ,নিরঞ্জন নমঃ প্রমুখ কবিরা উল্লিখিত ভূখণ্ডে দাপটের সাথে এই সংগীত পরিবেশন করতেন। এই স্তরের প্রতিভাবান কবিদের অন্যতম হেমেন্দ্র নাথ বাউল।
১৯৫০ সালের মাঘ মাসে অবিভক্ত শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার জুরানগর গ্রামে কবির জন্ম। পিতা হরেকৃষ্ণ নাথ ও মাতা সুমতী দেবী। দেশভাগের কারনে তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ত্রিপুরার ধর্মনগরের তিলথৈ গ্রামে চলে আসেন। ওখান থেকে এক সময় কাঞ্চনপুর মহকুমার জয়শ্রী গ্রামে স্থায়ী বাড়ি গড়ে তোলেন।
গতকাল ২১ নভেম্বর দুপুর বেলা কবি দিব্যেন্দু নাথ ও আমি কবির কাঞ্চনপুর মহকুমার জয়শ্রী গ্রামস্থিত বাসভবনে যাই। আমাদের পেয়ে তিনি যার পর নাই খুশী হয়েছেন প্রবীন এই কবি। আমরা তাঁর দু একটি গান লিখে এনেছি। দেহ তত্ত্ব বিষয়ক একটি গানের কয়েকটি কলি তুলে ধরলাম। এ থেকে কবির প্রতিভার খানিকটা আভাস মিলবে।
'একটি তত্ত্ব কথা জানবো বলে
আশা করি মনেতে।
জিজ্ঞাসিগো দয়ালগুরু
তোমারি সাক্ষাতে।।
কোন সাগরের পেনা কৃষ্ণয়
পান করেছিলেন মধু।
বাবা হইয়া কেমন করে
বিয়া করলেন পুত্র বধু।।
নানা বিষয়ে সংগীত রচনা করে সুর দিয়ে গেয়েছেন কবি। বাউল, ধামাইল, পল্লী সংগীত,তর্জা ইত্যাদি। এখনি এগুলো সংগ্রহ করে বই আকারে ছাপানো আবশ্যক। নাহলে এই অমূল্য সৃষ্টি অযত্নে বিনষ্ট হয়ে যাবে।
-------------------------------'
0 মন্তব্যসমূহ