একটি নদী এবং কিছু স্বপ্ন নন্দিতা ভট্টাচার্য্য

একটি নদী এবং কিছু স্বপ্ন
         নন্দিতা ভট্টাচার্য্য
       ও নদী, তোমার কি মজা। শুধুই পথ চলা আর দুনিয়া দেখে বেড়ানো। চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, শুধু কুলকুল করে গান গেয়ে বেড়ানো। নদীর পারে বসে চোখ জুড়িয়ে যায়, মন জুড়িয়ে যায় বাসুদেবের। কত কথা বলে নদীর সঙ্গে। নিজের সুখ দুঃখের কথা। নদীর সুখ দুঃখের কথাও শোনে।
নদীর আবার সুখ দুঃখ কি! অজন্তা ভেবে পায়না।
'সেকি গো সুখ-দুঃখ আছে না! নদীর তো বয়ে যেতেই আনন্দ। কিন্তু এখন বছরের বেশিরভাগ সময়ই জল থাকে না । কতো আবর্জনা জমে আছে তার বুকের মধ্যে। সে কষ্ট নয় বুঝি?'
কি জানি বাবা! অজন্তা ঘরের লোকের মনের নাগাল পায়না সবসময়। মানুষটা বরাবরই একটু অন্যরকম। কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় যখন তখন। আবার কখনো ভালবাসার নদীতে স্নান করিয়ে দেয় অজন্তাকে। বলে, 'তোমায় দেখেই সূর্য মন্দিরের চিত্র আঁকা হয়েছিল। তোমাকে দেখেই যুগে যুগে কতো প্রেমিক পাগল হয়েছে। তুমি কি জানো অজিন, কতো সুন্দর তুমি!'
অজন্তা লজ্জা পায়। অজন্তা ভালোবাসায় গলতে থাকে। মুখ লুকায় মানুষটার বুকে।
' কি যে বলো যা তা! বুঝি না বাপু তোমার কথা।' সত্যিই অজন্তা বোঝে না সব কথা। কত কি জানে মানুষটা। কতো  সুন্দর সুন্দর কথা বলে। ও শুধু হাঁ করে শোনে আর মুগ্ধ হয়। এমনটি আর কার আছে ঘর আলো করা মনের মানুষ।
           কিন্তু ঘর আলো করার জন্য বাড়ি ঘরে থাকে কই বাসুদেব? মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় অজন্তার। মানুষটার কোনো কাজেই মন লাগে না। সংসারটা কি করে চলবে কোনো চিন্তাই নেই। এতো উদাসীন হলে চলে! সারাদিন নদীর পারে বসে কোন স্বপ্ন সাজায় কে জানে।
         বোঝে বাসুদেব।এটা বোঝে যে অজন্তা চায়  সেও অন্যদের মতো সকাল বিকাল কাজে যাক। গৃহস্থালিতে মন দিক। কিন্তু কি করবে সে! কতবার কতো কাজে ঢুকলো আর ছাড়লো। ওই নদী তাকে কিছু করতে দিলে তো!
         সেই ছোটোবেলা থেকেই নদীর সঙ্গে মিতালী বাসুদেবের। আর কোনো বন্ধু-বান্ধব ছিল না বিশেষ। তার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। অরূপের সঙ্গে তাও কিছু মেলামেশা ছিল স্কুল জীবনে। অরূপ হয়তো কিছুটা বুঝতে পারতো ওকে।
অরূপ বলতো,' কি তুই এতো ভাবিস নদীর পারে বসে?' বলতো,'বাসু, তোর নদী তোকে ডোবাবে একদিন দেখিস।'
সেও কতো বছর হল। অরূপের বাবা বাড়িঘর বিক্রি করে এখান থেকে চলে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়নি।
          'কিগো, তুমি নাকি আমাকে ডোবাবে?' হাহাহা করে হাসে বাসু। 'আমায় ভাসাইলিরে, আমায় ডুবাইলিরে...' বাসুদেবের কন্ঠ ভেসে বেড়ায়। 'ওই পাগলা খেপেছে' প্রতিবেশীরা বলাবলি করে। অজন্তার বুকটা শিরশির করে একটু কষ্ট একটু আনন্দ নিয়ে। ও জানে বাসুকে অন্যরা বোঝেনা। কিন্তু কবে যে মানুষটা ঘরমুখো হবে, অজন্তার কথা ভাববে শুধু কে জানে। স্বপ্ন স্বপ্ন করেই গেল শুধু। তাই নিয়েই তো সবাই হাসাহাসি করে। করুক গে! অজন্তার তাতে দুঃখ নেই।
              আজ কটা দিন ধরেই বৃষ্টি পড়ছে মুষলধারে। বিরামহীন বৃষ্টি। জল আর জল চারিদিকে। নদীও ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বাসুদেবের আনন্দ আর ধরে না। কতদিন বাদে নদীর কষ্ট কমল। নদী সুখের মুখ দেখল। উপচে পরছে নদীর যৌবন, নদীর সুখ। অহংকারী যুবতীর মতো শরীরে ঢেউ তুলে চলেছে নদী।
             গত দু'বছরই অনাবৃষ্টি ছিল। মাঠ ঘাটের মত নদীরও শীর্ণ রূপ দেখে বাসুদেবের বুকটা হাহাকার করত। এবারে সাম্পান চলছে বুকের ভিতর। কি আনন্দ! মানুষটার আনন্দ দেখে অজন্তার বুকটা হু হু করে আজকাল। ইদানীং বাড়িতে থাকতেই চায়না। নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই। রাতবিরেতেও ঘরে ফেরেনা প্রতিদিন। কিছু জানতে চাইলেই এক কথা। 
'জানো, কী সুন্দর স্বপ্নটা! নদীর সঙ্গে না থাকলে এতো সুন্দর স্বপ্নটা সত্যি হবে না গো। আমি এই স্বপ্নটা নিয়েই তো কাজ করছি। একবার কাজটা শেষ করি, তারপর দেখবে আর কারো কোনো কষ্ট থাকবে না। তোমারও না।নদী সবার দুঃখ মুছে দেবে। আর কটা দিন একটু ধৈর্য ধরো অজিন।'
            অজন্তার চোখ ভাসে, বুক ভাসে। আর কতদিন অপেক্ষা করবে ও।আর কতো ধৈর্য রাখা যায়।একা একা ভাল লাগে না কিছুই। শূন্য ঘর, শূন্য কোল, শূণ্য বুক - শুধু অপেক্ষা। এবার ভাঁড়ারও তলানিতে এসে ঠেকেছে। শেষ যে কাজটা ছাড়লো বাসু তা প্রায় চার মাস হয়ে গেছে।
          এবার শক্ত হতে হবে - ভাবে অজন্তা। একটা শিশু বাড়িতে থাকলে বাসুকে আটকে রাখা যাবে হয়তো। এবার আর এড়িয়ে যেতে দেবে না বাসুকে। আগেও বলেছে অজন্তা, কিন্তু বাসু রাজি হয়নি। প্রতিবারই একই উত্তর,' সময় হয়নি'। এবার আর ওর কোনো কথাই শুনবে না অজন্তা।
             দু'দিন বাদে আজ ফিরল বাসুদেব। উস্কোখুস্কো ক্লান্ত চেহারা। অজন্তা যত্নে স্নান করায়, পাশে বসে খাওয়ায় মানুষটাকে। বলে, 'তুমি আর আমাকে ভালোবাসো না - শুধু নদী আর নদী। আমার সতীন নিয়ে ঘর করতে আর ভালো লাগে না গো।' 
হাহাহা করে হাসে বাসুদেব। জড়িয়ে ধরে অজন্তাকে।
'তুমি তো জানো অজিন আমি আর নদী মিলে স্বপ্ন সাজাই। সেগুলোই তো আমরা পৌঁছে দেবো সবার কাছে'।
'আজ আমার সঙ্গে স্বপ্ন সাজাতে হবে তোমাকে'- অজন্তার উষ্ণ আলিঙ্গনে গভীরতায় ডুবতে থাকে বাসুদেব।
           ছলাৎ  ছলাৎ - নদীর পার ভাঙ্গে। ফুঁসে উঠেছে নদী। কতদিনের জমে থাকা রাগ। বাসুদেব মান ভাঙ্গায় নদীর- 'এতো রাগ কেন গো?
      ও অভিমানিনী,
       কেন তুমি মান করো 
          দিবস রজনী
            ও অভিমানিনী...'
বাসুর সুরে উত্তাল হয় নদীর অভিমান। নদীর তীরে জায়গায় জায়গায় কত মানুষের আনাগোনা, হাট বাজার, নৌকা পারাপার। মানুষ দেখে আলুথালু লোকটিকে। কি সুরেলা কন্ঠ! তার গান শোনে আর 'আহা' করে সবাই।
' কাদের বাড়ির ছেলে গো! একটু জল খাবে বাবা?'  ‌ হাসে স্বপ্নের সওদাগর। 'নাগো মাসি , স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছি । কাজ শেষ হলে বাড়ি ফিরেই খাবো।'
 এ কেমন পাগল ! আহারে! মায়েদের প্রাণ পোড়ে।
              পুড়ছে অজন্তার মন । সুখবরটা শুনিয়ে ঘরবন্দী করে ফেলবে ভেবেছিল, তার আগেই মানুষটা হারিয়ে গেল। এখন অজন্তা নদীর পারে বসে থাকে। ঢেউ গোনে। কান পেতে রাখে - হারানো সুর কখন ফিরে আসবে কে জানে। অজন্তা স্বপ্ন সাজায় নদীর পারে বসে। তিনজনের সুখের সংসারের স্বপ্ন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ