রবীন্দ্র-গান নিয়ে জল্পনা|| মীনাক্ষী ভট্টাচার্য

রবীন্দ্র-গান নিয়ে জল্পনা 
———————————————
      মীনাক্ষী ভট্টাচার্য 
———————————————

  রবীন্দ্রনাথের গান যখন আমরা শুনি কিংবা গাই তখন গানটি রচনার প্রেক্ষাপটটি জানবার জন্য 
আমাদের মন কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কারণ গানটির সৃজন মুহূর্তের কথা জানা থাকলে গানটি আমাদের অনুভবে নতুন করে ধরা দেয়।তাই প্রশ্ন জাগে মনে — কবিগুরু গানটি কবে , কোথায় লিখেছিলেন কিংবা কোন্ বিশেষ ঘটনার অভিঘাত কবি-মনকে আলোড়িত করেছিল —ইত্যাদি। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় , প্রশান্তকুমার পাল প্রমুখ রবীন্দ্র জীবনীকারগণের লেখা থেকে, রবীন্দ্র- সান্নিধ্য ধন্য সহচরদের ও স্বজনদের প্রত্যক্ষ স্মৃতিকথা থেকে আবার কখনো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের
“ জীবনস্মৃতি” জাতীয় আত্মকথা থেকে আমরা বহু গানের সৃজন মুহূর্তের কথা জানতে পারি।এইসব অমূল্য তথ্য জেনে আমরা সমৃদ্ধ হই। 
       
           ইদানীংকালে কয়েকটি 
রবীন্দ্র - গান নিয়ে জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে দেখে ব্যথিত চিত্তে এ নিবন্ধ লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। এখানে একটি গানের প্রসঙ্গ বিশদে উত্থাপন করা গেল। যে গানটির প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হচ্ছে —প্রথমে সেই গানটি নীচে উল্লেখ করা গেল ——-
আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥
যাব না গো যাব না যে ,
রইনু পড়ে ঘরের মাঝে —-
এই নিরালার রব আপন কোণে।
যাব না এই মাতাল সমীরণে ॥
আমার এ ঘর বহু যতন করে 
ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।
আমারে যে জাগতে হবে , 
কী জানি সে আসবে কবে 
যদি আমায় পড়ে তাহার মনে 
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে।”

                  এই গানটিকে নিয়ে যে জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কে সরাসরি একটি নিবন্ধের কিছু অংশ উদ্ধৃতি হিসেবে তুলে ধরছি :—
“ একটি রেওয়াজ চালু হয়েছে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে ভাষ্যপাঠ করা।••• বিতন্ডা সৃষ্টি হয়েছে হালের কিছু ভাষ্যকারের ব্যাখ্যায়।তাঁরা মনে করছেন, এই গান রচিত হয়েছিল কবির ছোটো ছেলে শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুকে স্মরণ করে। শমীর মৃত্যু হয় ৭ অগ্রহায়ণ , ১৩১৪ , ২৪ নভেম্বর ১৯০৭ ।•••
গানটির পান্ডুলিপিতে রচনার সময় নির্দিষ্ট আছে, অতএব এই ক্ষেত্রে বিতন্ডার কোনো অবকাশ নেই। 
২২ চৈত্র ১৩২০, রবিবার, অর্থাৎ ৫ এপ্রিল, ১৯১৪ । রচনার স্থান শান্তিনিকেতন । ••• 
তাহলে কেন আধুনিক ভাষ্যকর্তাদের শমীর প্রসঙ্গ আনা? “
    ( বিষয় : রবীন্দ্রনাথ / নিত্যপ্রিয়           ঘোষের প্রবন্ধসংগ্রহ ৩ )

             তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রায় সাড়ে ছয় বছর পরে গানটি লেখা হয়েছে।তাই,
শমীর মৃত্যুর সঙ্গে কোনোভাবেই 
‘ আজ জ্যোৎস্নারাতে’ গানটিকে জড়ানোর কোনো প্রামান্য যুক্তিনির্ভর
কারণই প্রদর্শিত হয় নি বলে এই নিবন্ধকারের মনে হচ্ছে। উপরন্তু গানটি লেখার সময় কবির মনে শমীর মৃত্যুর অনুষঙ্গ আসার কোনো কারণ খুঁজে না পাওয়া যাওয়ায় গানটির সাথে শমীর মৃত্যুর একাত্মতার ধারণা গ্রহণযোগ্য না হবারই কথা।
              এখানে গানটির একটি কলিতে কবিগুরু বলেছেন——
“ আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে।”
এই বাক্যটির মানে কোনো কোনো ভাষ্যকার এভাবে করেছেন যে— কবি শমীর জন্য অপেক্ষারত। সেজন্য তিনি বাইরে যান নি। যদি শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে গানটি রচিত হত —তবে এটা মনে করাই যেতো যে, গানটি শমীর স্মৃতিতে রচিত। কিন্তু গানটি শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বহু বছর পর লেখা এবং যে সময়ে কবিগুরু এই গানটি লিখেছিলেন, সেই সময়ে রচিত অন্যান্য গানগুলোর মর্মকথা আলোচনা করলে বোঝা যাবে যে, সেসব কোনো গানেই মৃত্যুর কোনো অনুষঙ্গ নেই।
             ১৩২০ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে কবি ২৪ টি গান রচনা করেন। তারমধ্যে আলোচ্য গানটি তো আছেই এবং সেই একই দিনে রবীন্দ্রনাথ আরেকটি গান রচনা করেন- যার প্রথম দুটো চরণ হচ্ছে :-
 “ বলো তো এইবারের  মতো 
প্রভু, তোমার আঙিনাতে তুলি আমার ফসল যত।”
                এই দুটো গানের বাণী লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, একটি চৈত্র মাসের দিনের বেলার এবং অপরটি রাত্রিবেলার গান। দিনের ফসল, মাথার বোঝা এবার প্রভুর পায়ে নিবেদন করছেন কবি। অপর গানে কবি বলেছেন যে, বসন্তের মাতাল সমীরণে জ্যোৎস্নারাতে সবাই বনে গেছে প্রকৃতির অপরূপ শোভা উপভোগ করবার জন্য । কিন্তু কবির কাজ শেষ হয় নি। তাই তিনি ঘরে থেকে গিয়েছেন। 
এখানে নিত্যপ্রিয় ঘোষের “ প্রবন্ধসংগ্রহ , বিষয় : রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থখানি থেকে  কিছু কথা উদ্ধৃত করা গেল।    “ আমরা দেখে নিতে পারি সেই চৈত্র মাসে কবির লেখা গানগুলোর মর্ম।••• অধিকাংশ গানে আক্ষেপ, জীবনদেবতার সাথে বিচ্ছেদ আর তার সাথে মিলনের আকাঙ্ক্ষা, মিলনের আনন্দ।অবসর আর কর্তব্য। এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব  রবীন্দ্রনাথের জীবনের চিরকালীন দ্বন্দ্ব। ‘ আজ জ্যোৎস্নারাতে’ কোনো নতুন দ্বন্দ্বের কথা বলে না।” 
     তাহলে এটা বলা যেতেই পারে যে,
ভাষ্যকারগণের  উল্লেখিত গানের কলিটির ব্যাখ্যা সম্ভবত সঠিক নয়।
              এবারে উল্লেখ করা হচ্ছে 
‘ আজ জ্যোৎস্নারাতে’ গানটির সৃজন মুহূর্তের কথা। সেদিনের স্মৃতি- রোমন্থন পাওয়া যাচ্ছে দুজন 
রবীন্দ্র - সহচরের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতিকথায়।
প্রথমে পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকারের লেখা “ রবীন্দ্রগানের অন্তরালে” শীর্ষক গ্রন্থটি থেকে উল্লেখ করা গেল এই গানটির জন্মকথা।
“ আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে “ গানটির স্মৃতিচারণা করেছেন রবীন্দ্রানুরাগী সাংবাদিক-সমালোচক অমল হোম তাঁর ‘ পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথ’ বইখানিতে।••• তিনি আর চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন কয়েকটা দিন গুরুদেবের সান্নিধ্যলাভের আশায়। ••• দুই প্রিয়জনকে কাছে পেয়ে রবীন্দ্রনাথও ভীষণ খুশি।কবি তখন থাকতেন দেবেন্দ্রনাথের তৈরী শান্তিনিকেতনের আদিভবনে, একতলায়। অমল হোমদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ওই বাড়িরই দোতলায়। একদিন ( ৫ এপ্রিল ১৯১৪) রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে , গুরুদেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাঁরা শুয়ে পড়লেন নিজেদের ঘরে।
সেদিন ছিল জ্যোৎস্নাভরা বসন্তকাল। আশ্রমের আশেপাশের গ্রামের অনেকেই গিয়েছেন পারুলডাঙ্গার বনে নাটক দেখতে।কিন্তু অমল আর চারুবাবু আলসেমি করে গেলেন না। মাঝরাতে দুজনেরই ঘুম ভেঙ্গে গেল এক অস্পষ্ট গানের সুরে। দরজা খুলে দেখলেন বসন্ত- জ্যোৎস্নায় শান্তিনিকেতনের দিগন্তবিস্তৃত খোলা প্রান্তর প্লাবিত। ••• জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া বাড়ির সামনের উঠোনে গুরুদেব পায়চারি করছেন আর গুণাগুণ করে গাইছেন সদ্য রচিত গান — “ আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে।”
দুজনে চুপি চুপি নীচে নেমে এসে কবির পিছনে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে শুনলেন অপূর্ব এক গানের জন্মকাহিনী। অমল হোমের উপলব্ধিতে    “ ••• সুরের নীহারিকাপুন্জ থেকে বেরিয়ে এল একটি পরিপূর্ণ জ্যোতির্ময় নক্ষত্র।”
        এবারে “ আজ জ্যোৎস্নারাতে” গানটি রচনার সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে অপর একজন রবীন্দ্র-সহচর তথা অধ্যাপক ও সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা “ রবীন্দ্র পরিচয়” শীর্ষক স্মৃতি রোমন্থনমূলক প্রবন্ধ থেকে নীচের অংশটি :— 
“ কোনো এক উৎসব উপলক্ষ্যে আমরা বহু লোক বোলপুর
গিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত ‘ রাজা’নাটক অভিনয় উপলক্ষ্যে।বসন্তকাল, জ্যোৎস্না রাত্রি । যত স্ত্রীলোক ও পুরুষ এসেছিলেন তাঁদের  প্রায় সকলেই পারুলডাঙ্গা নামক এক রম্য বনে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
কেবল আমি যাই নি রাত জাগবার ভয়ে। ••• গভীর রাত্রি। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল যেন শান্তিনিকেতনের নীচেরতলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদুমধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, কবিগুরু জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুণগুণ করে গান গাইছেন। আমি খালি পায়ে ধীরে ধীরে নীচে নেমে গেলাম। আমি গুরুদেবের কাছে গেলাম কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ্য করলেন না। আপনমনে যেমন
গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। গান গাইছিলেন খুব মৃদুস্বরে। আমি পিছনে পিছনে বেড়াতে বেড়াতে গানের কথা ধরবার চেষ্টা করতে লাগলাম। তিনি গাইছিলেন — “ আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে।”
উপরের বিস্তারিত আলোচনা শেষে একথা প্রমাণিত যে, রবীন্দ্র-অনুরাগী ও রবীন্দ্র - সহচর অমল হোম এবং 
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়- দুজনই ছিলেন এই গানের জন্মলগ্নের নির্ভরযোগ্য সাক্ষী। তাঁদের কারুর স্মৃতিতেই এই গানের ক্ষেত্রে শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রসঙ্গ নেই। 
তাই মনে হয়, “আজ জ্যোৎস্নারাতে” গানটির সাথে শমীর মৃত্যুকে জড়ানো রীতিমতো কষ্টকল্পিত একটা প্রচেষ্টা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ