কবি সঞ্চালক নন্দিতা ভট্টাচার্য
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
প্রশ্ন :১
প্রতিটি শুরুরও শুরু থাকে সেই শুরুর দিনগুলো শুনবো?
উ: শুরুর শুরু, শেষের শেষ- সেগুলো না হয় তোলা থাক আজ -- মাঝামাঝি থাকি।
প্রশ্ন :২
পারিবারিক কোন চাপিয়ে দেওয়া ছিলো না নিজস্ব নির্বাচন এই শিল্পকে আপন করেনেওয়ার সময় ছিলো?
উ: একেবারেই না। ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়েছিল কবিতা বলা, নাচ ও নাটক করা। স্কুলে যাবার আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। স্কুলে আরো নিয়মিত হতে থাকলো । অল্পস্বল্প লেখালিখিও শুরু হলো। তবে তখন ছবি আঁকতাম খুব।এখন একেবারেই হয় না। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকে শুরু হলো সঞ্চালনার কাজ । ত্রিপুরায় এসে চাকরিতে যোগ দেবার পর থেকে ধীরে ধীরে এই কাজের সঙ্গে ভালবাসায় জড়িয়ে গেলাম। লেখালেখিসহ বাকি কাজগুলো চলছে কখনো ঢিমেতালে, কখনো একটু দ্রুত।
প্রশ্ন :৩
আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন?তখনকার বিশেষ স্মৃতি?
উ: কলেজ জীবনের গল্প আলাদা করে কি বলবো। আসলে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি- পুরোটা সময়ই এখন স্বপ্ন মনে হয়- একটা নিরবচ্ছিন্ন আনন্দধারা। পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা ,নাটক ,নাচ সব মিলিয়ে কি ভালো সময় কেটেছে সে বলার নয়। এখন মনে হয় প্রতিটি দিনই ছিল একটি কবিতা, একটি গান_ বড্ড মিস করি সেই দিনগুলো।
প্রশ্ন :৪
এ অঞ্চলের সাহিত্যে ভিন্ন সুর আমরা অনুভব করছি।বৃহৎ বাংলার বাংলা সাহিত্যের সাথে সুর মিললেও তার আছে নিজস্ব স্বর।আপনি কেমন দেখেন?
উঃ সাহিত্য সমাজের দর্পণ। সাহিত্যে আঞ্চলিক সুর তো থাকবেই এবং সেটা থাকা খুব দরকার। সেটা মোটেই অগৌরবের বিষয় নয়, বা তাতে আমি বিচ্ছিন্নতার দোষ ও দেখি না। প্রতিটি নিজস্ব স্বর মিলেই মূলধারাকে সমৃদ্ধ করে তোলে।
প্রশ্ন :৫
একটি গ্রন্থ নির্মানে বইয়ের বিষয়ের সাথে প্রচ্ছদ কতটুকু একে অন্যের পরিপূরক?
উঃ বইয়ের প্রচ্ছদ এবং বিষয় অবশ্যই একে অপরের পরিপূরক। একটি বই সম্পর্কে আমাদের প্রারম্ভিক আকর্ষণ প্রচ্ছদই জাগিয়ে তোলে। তার গুরুত্ব অস্বীকার করা অসম্ভব।
প্রশ্ন :৬
কোন পথে আমাদের সময়।কোন পরামর্শ কিংবা আমাদেরকে পথ বাৎলে দেবেন?
উঃ সময় তার নিজস্ব গতিতে চলছে। আমি মনে করি অগ্রগমন সবসময়ই ভালো। তবে হ্যাঁ, ফেলে আসা সময়ের জন্য আক্ষেপ করা আমাদের একটা সাধারণ অভ্যাস।
প্রশ্ন :৭
প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে কোন আক্ষেপ আছে?
উঃ কোন আক্ষেপ নেই। প্রাপ্তির আশা করলেই অপ্রাপ্তি হতাশ করে, দুঃখ দেয়। তাই ওপথে হাঁটিনা। এমনিতেই যা পাচ্ছি সেটাই অনেক।
প্রশ্ন :৮
কি রেখে যেতে চান?যা ১০০ বছর পর চর্চা হবে?
উঃ একটা ভালো সময়। ভালোবাসার রঙে রঙিন একটা সময় যা ভবিষ্যতেও মানুষকে উদ্দীপিত করবে পরস্পরকে ভালবাসতে, শেখাবে সহমর্মিতা। আর এমন একটা সুন্দর সময় আমরা সবাই মিলেই সাজিয়ে তুলতে পারি।
প্রশ্ন :৯
নিরন্তর সাধনারও আপনার দীর্ঘ জার্নি।এত প্রাণ কি করে পান?
উঃ ভালোবাসা। সেটাই মূলধন।যে কাজগুলো করছি সেই কাজগুলোর প্রতি সর্বান্তকরণে আকর্ষণ অনুভব করি। তাই বারবার নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েও আবার জুড়ে যাই তাদের সঙ্গে।
প্রশ্ন :১০
তরুণদের জন্য কিছু বলবেন?
উঃ তোমরা অনেক এগিয়ে আছ আমাদের চেয়ে। তবুও বলি সুস্থ-স্বাভাবিক চিন্তায় প্রাণিত হও। ভালো কাজকে খোলা মনে প্রশংসা করো। দেখবে তোমার চারপাশটা ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে যাবে। একটু সময় লাগবে হয়তো, কিন্তু এভাবেই negative energy ক্রমশঃ দুর্বল হবে
প্রশ্ন :১১
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ কতটুকু প্রাসঙ্গিক?
উঃ রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিনরাত, ছয় ঋতু, বারো মাস। আমাদের শয়নে- স্বপনে, নিশীথে- জাগরণে সদা বিরাজমান আছেন, থাকবেন। তবে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর মতো করেই (অপরিবর্তিতভাবে) আগামী প্রজন্মের কাছে যেন পৌঁছে দিতে পারি তার দায়িত্ব অনেকটাই আমাদের।
প্রশ্ন:১২
দেশভাগের যন্ত্রণা একজন কবিকে পীড়িত করে।আপনার পরিবার কি এমন কোন পরিস্থিতির শিকার?
উঃ দেশভাগের যন্ত্রণা আরও বহু বছর থাকবে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের মনে। আমাদের পরিবার বেশ কয়েক generation ধরে আসামের বাসিন্দা। দেশভাগের ফলে ওপারে অনেক সম্পত্তি বাড়িঘর থেকে গেলেও একেবারে শরণার্থী হয়ে আসতে হয় নি। কিন্তু বহু আত্মীয়-স্বজন ,চেনা মানুষদের হৃদয়ের ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হতে দেখেছি যখন তখন । সেই ব্যথা অবশ্যই আমাকে পীড়িত করে।
প্রশ্ন :১৩
কী লিখি কেন লিখি?
উঃ একটা তাগিদ আসে ভেতর থেকে আর সেজন্যই কলম ধরা। আমি basically একটু introvert । হয়তো সে জন্য মনের কথা শেয়ার করার জন্য ছোটবেলাতেই কাগজ-কলম হাতে নিয়েছিলাম। আর এখন পরিণত বয়সে এসে পারিপার্শ্বিক অবস্থাও আমাকে বাধ্য করে লিখতে। অনেক সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে লেখার অনুরোধ আসে ,তা কখনো বিষয়ভিত্তিক হয় এবং সেভাবেই লিখতে হয়।
তবে হ্যাঁ-- কবিতা, গল্প ,নাটক- form যাই হোক না কেন- 'কী লিখি' সেটার উত্তর শেষ পর্যন্ত পাঠকরাই দেবেন।
প্রশ্ন:১৪
আপনার কবিতাসংকলনগুলোর নাম নির্মানের গোপন জিয়নকাটি কিরকম?
উঃ একটা প্রশ্ন থেকে রেহাই পাওয়া গেল (হাসি)। আমার লেখা গল্প, কবিতা ইত্যাদি বিভিন্ন বই ,পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমার কোন কবিতা সংকলন নেই।
প্রশ্ন :১৫
শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছায় একটি শিল্প রূপ পায়? নাকি আরো কোনো অতিভৌতিক কোন বিষয় প্রতিটি ছবির ঘরনা তৈরী করে?
উঃ যে কোন শিল্পের প্রকাশে শিল্পীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই প্রধান। কিন্তু তার পরেও কিছু elements পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া করে সেটা আমরা সবাই কম বেশি উপলব্ধি করি।
প্রশ্ন :১৬
আপনার সাথে তেমন আড্ডা আমার নেই। আপনি আড্ডারু সে আমি জানি।আড্ডা কি শিল্প সৃষ্টির উৎস মনে করেন?
উঃ বাঙালি চিরকাল আড্ডাবাজ। সুনাম বলুন,দুর্নাম বলুন, বাঙালি এবং ফরাসিদের নাম আড্ডাবাজের তালিকায় শীর্ষে । আর ইতিহাস সাক্ষী এ সমস্ত আড্ডা থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাপের শিল্পী-সাহিত্যিক-কবিরা প্রকাশিত হয়েছেন। সুস্থ আড্ডা অবশ্যই সংস্কৃতি চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যান।
প্রশ্ন :১৭
কবিতা তো একটি স্বতন্ত্রশিল্প ছবিও স্বতন্ত্র। একটি রেখা একটি বিন্দু কিংবা তুলির কতটুকু স্বাধীনতা এই সমাজ এই সংবিধান আমাদেরকে দিয়েছে?যদিও বাকস্বাধীনতা যেখানে এসে থমকে যায় শিল্প কি তেমন কোন আটকে পড়ার সম্ভাবনায় দমে যায়?
উঃ সাংবিধানিক স্বাধীনতা যতই থাকুক কাজের ক্ষেত্রে প্রায়ই থমকে যেতে হয় কবি- সাহিত্যিক- শিল্পীদের এটাই সত্য। তবে পাশাপাশি শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাজে বাঁধনহারা স্বাধীনতা যেন শালীনতা বা মানবতার গণ্ডি ছাপিয়ে না যায় সেটাও লক্ষ্য রাখা দরকার।
প্রশ্ন :১৮
আপনার পারিবারিক পরিবেশ শিল্প ও শিল্পীর।এই সম্মেলন কেমন লাগে?
উঃ পরিবারের শৈল্পিক সম্মেলন বড় আনন্দের বিষয় ।ছোটবেলায় দাদা দিদিদের সঙ্গে শুরু হয়েছিল পথচলা। আর এখন ছেলেরা যখন গান করে, অভিনয় করে তখন এক অপরূপ ভালো লাগায় মন ভরে ওঠে।
প্রশ্ন :১৯
আপনার নিজস্ব ঘরনায় লৌকিক সংস্কৃতি কতটুকু আনতে পেরেছেন?আপনি কি সচেতনতার এই বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন?
উঃ মানুষের কথা, জীবনের কথা যদি সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় তবে সেখানে লৌকিক সংস্কৃতির ছাপ থাকবেই। সংস্কৃতি তো জীবন থেকে আলাদা নয় ।আমি সচেতন ভাবে তাকে ধরি না বা এড়িয়ে ও যাইনা। সে তার স্বাভাবিক প্রকৃতিতেই থাকে।
প্রশ্ন :২০
জীবন কেউ কেউ নেশা বলেন।কেউ কেউ উৎসব। কেউ কেউ একটি নাটক।আবার কারো কারো নিকট জীবনে কবিতাই জীবন।আপনি কোন নিজস্ব জীবনচেতনায় তাড়িত নিশ্চয়ই। ব্যাখ্যা চাই।
উঃ আমার কাছে জীবন শুধুই যাপন। আমি অসংখ্য মানুষকে দেখি প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে জেরবার হতে । তাদের কাছে জীবন কবিতা, নাটক , নেশা এ ধরনের চিন্তা অবান্তর। আমি নিজেকে তাদেরই একজন মনে করি । তবে যাপনের পাশাপাশি অবশ্যই জীবন কখনো কবিতা, কখনো গান, কখনো নাটক হয়ে ওঠে। সেটাই আমি উৎসবের মেজাজে সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেষ্টা করি।
১৫ :০৮:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ