কবি সন্দীপ সাহু মুখোমুখি কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর

কবি সন্দীপ সাহু 
মুখোমুখি 
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর 

পরিচিতি


সন্দীপ সাহু। আজন্ম শিক্ষাব্রতী। জাতির মেরুদণ্ড নির্মাণ তার ব্রত। বিশেষত সাহিত্য, গান ও খেলাধূলায় মনোযোগী ছাত্র। কাব্য সাহিত্যের সাথে সাথে গদ্য সাহিত্যেও মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন। সাম্যবাদী জীবন দর্শনে লালিত মন। বাম ছাত্র আন্দোলন থেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতির আঙিনায় স্বমহিমায় তিনি। কাঁটাতারের বাধা মুক্ত একটা মানুষের পৃথিবী এমন স্বপ্নে জারিত মননে তার বাস। গোটা পৃথিবীটাই তার নিজের দেশ।
জন্ম ৫ জুন ১৯৭১ ,,,,,,,? মেদিনীপুরের পল্লিনিকেতন বামুনবাড়ে। প্রথাগত শিক্ষায় বিশ্বাসী নন যদিও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন। প্রথম কবিতার প্রকাশ হয়েছিল ১৯৮৫ তে। তারপর থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে নানা দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকায় লিখে চলেছেন। মূলত কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন। ছোটগল্পও লিখেছেন। সংখ্যায় তা কম।
বিভিন্ন আঞ্চলিক সংবাদপত্রে এবং একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে কিছুকাল কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। একাধিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত।স্রোত (ত্রিপুরা, সহসম্পাদক),পথ, অকেন্দ্রিক, সুঝদ্ধি, রোদ্দুর। এছাড়াও নিজের সম্পাদনা ও দায়িত্বে "নব জীজ্ঞাসা" পত্রিকা প্রকাশ করেন।
বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা থেকে শতাধিক স্মারক সাহিত্য সম্মাননা পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গাঙচিল(বাংলাদেশ) কর্তৃক বর্ষসেরা পুরস্কার, ত্রিপুরার স্রোত পত্রিকা থেকে "স্রোতস্মারক" পুরস্কার, দুর্গাপুরের "শিল্প ও সাহিত্য " পত্রিকা থেকে "কারমাটাড় পুরস্কার", পুরুলিয়ার "শঙ্খচিল"পত্রিকা থেকে "শঙ্খচিল সাহিত্য পুরস্কার"।
গাঙচিল -এর হাওয়া জেলার  সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন।



প্রশ্ন :১

প্রতিটি শুরুরও শুরু থাকে সেই শুরুর দিনগুলো শুনবো? 

অনেক দিন আগে কথা। ১৯৮৫ তে বিদ্যালয় পত্রিকায় প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়। সেই সময় স্থানীয় এক সিপিএম কর্মীকে খুব শ্রদ্ধা করতাম। মাঝে মাঝে তাঁর কাছ থেকে  বিপ্লব, মার্কস,লেনিনের গল্প শুনতাম।উনি সুকান্ত নজরুলের কবিতা মুখস্থ বলে যেতে পারতেন। খুব প্রভাবিত ছিলাম। তার মাধ্যমেই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কার্যকলাপের সঙ্গে পরিচিতি। জ্যোতি বসু ছিলেন আমার কাছে কিংবদন্তি নেতা। এই সময় যি কিছু লিখেছি অপটু হাতে, তার প্রায় সবই এই প্রভাবে। আজ সবটা মনে নেই। যেটুকু আবছা মনে আছে। সেটুকুই বললাম।


প্রশ্ন :২

পারিবারিক কোন চাপিয়ে দেওয়া ছিলো না নিজস্ব নির্বাচন এই শিল্পকে আপন করে নেওয়ার সময় ছিলো?

এই বিষয়ে পারিবারিক চাপ ছিল উল্টো ভাবে। অর্থাৎ লেখালেখির ব্যাপারটা নিয়ে রীতিমতো মা বাবা থেকে শুরু করে সবাই ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করতো। নাম দিয়েছিল হবু রবীন্দ্রনাথ। ২০১৯ এ নোবেল প্রাইজ পাবেন।
ফলে লেখালেখি চলতো নিজস্ব তাগিদে আর ওই সিপিএম কাকুর উৎসাহে।
বন্ধু মহলেও আমার লেখালেখির কথা জানাতে ভয় পেয়েছি। গোপনেই চলছিল এই কাজ।



প্রশ্ন :৩

আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন?তখনকার বিশেষ স্মৃতি?

তেমন বিশেষ কিছু নেই। এস এফ আই করতাম। মহাবিদ্যালয়ে পত্রিকা উপ সমিতির সহসম্পাদ হিসেবে শেষ বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।


 প্রশ্ন :৪

এ অঞ্চলের সাহিত্যে ভিন্ন সুর আমরা অনুভব করছি।বৃহৎ বাংলার বাংলা সাহিত্যের সাথে সুর মিললেও তার আছে নিজস্ব স্বর।আপনি কেমন দেখেন?

সম্পূর্ণ সহমত। ভাষাতাত্ত্বিক ভাবেই আমরা পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। পাঁচটি অঞ্চলের বাঙালি নানান ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক পার্থক্যে বিভক্ত থাকলেও বৃহৎ বাংলার মূল সুরের সঙ্গে সবসময় একীভূত থেকেছে। এখন তো উন্নত প্রযুক্তির কারণে সারা বিশ্বের বাঙালি বাঙালি সংস্কৃতির সুরে বাঁধা।




প্রশ্ন :৫

একটি গ্রন্থ নির্মানে বইয়ের বিষয়ের সাথে প্রচ্ছদ কতটুকু একে অন্যের পরিপূরক?

প্রচ্ছদ নামকরণের মতোই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নামকরণ গ্রন্থ-বিষয় সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। আর প্রচ্ছদ সেই ইঙ্গিতকে শৈল্পিক ভাবে মূর্ত করে পাঠক-মননে। যা পঠককে দারুণ ভাবে গ্রন্থের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
তবে বর্তমানে অনেক সময় দেখা যায় নামকরণ ও প্রচ্ছদের সঙ্গে গ্রন্থের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খুব কম থাকে। ফলে পাঠক বিভ্রান্ত হয়। পাঠকের মানসিক প্রস্তুতি হোঁচট খায়। একটা মানসিক তৃপ্তি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। 


প্রশ্ন :৬

কোন পথে আমাদের সময়।কোন পরামর্শ কিংবা আমাদেরকে পথ বাৎলে দেবেন?


এই সময় নয় অনেক আগে থেকেই কবিতায় রহস্যময়তা তৈরী করার প্রবনতা থেকে কবিতা ঘন কুজ্ঝটিকায় আচ্ছন্ন। অনেক কবি এটিকেই আধুনিক কবিতার একমাত্র লক্ষণ মনে করেন।
ব্যাঞ্জনা কাব্যরস সৃষ্টিতে আজকের দিনে অপরিহার্য। তবে তার হবে ঢাকাই মসলিনের মতো। ঘন তমশার মতো নয়।

সেই দিক থেকে আমার বক্তব্য হলো ব্যঞ্জনা সুষমা লালিত্য আনুক, পাঠকের মেধার পরীক্ষা নিক;  পাঠককে হাজার দুয়ারির ভুলভুলাইয়ের মধ্যে না ফেলুক।

প্রশ্ন :৭

প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে কোন আক্ষেপ আছে?

কোনো আক্ষেভ নেই। প্রচণ্ড খুশি। আশার অতীত হিসেবে "স্রোত"পত্রিকা ও প্রকাশনসহ দেশ বিদেশের অনেক প্রকাশন ও পত্রিকা থেকে ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি। যা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে ও সাহিত্য খিদে বাড়িয়ে আমাকে আরো দায়িত্বশীল করেছে। এ জন্য সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।



প্রশ্ন :৮

কি রেখে যেতে চান?যা ১০০ বছর পর চর্চা হবে?

এই বিষয়ে কিছু বলার মতো পর্যায়ে বা স্তরে পৌঁছাইনি বলেই মনে করি। কিছু বলাটা খুব স্পর্ধার বিষয় হয়ে যাবে।
তবে সাম্যবাদী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের কিছু সাহিত্যকর্ম রাখার চেষ্টা করছি। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনের জন-মনন তৈরির একমাত্র হাতিয়ার।
তবে তা একশ' বছর পরে কেউ পড়বে এ আশা করি না।
তাই যদি হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমি আমার কাজ ঠিক মতো করতে পারিনি। পঙ্গু সমাজ জন্ম দেওয়ায় আমারও কিছু ভূমিকা আছে।


প্রশ্ন :৯

নিরন্তর সাধনারও আপনার দীর্ঘ জার্নি।এত প্রাণ কি করে পান?

আগেই বলেছি আমি একজন সাম্যবাদী রাজনৈতিক কর্মী। স্বপ্ন সমাজ পরিবর্তন। শোষন থেকে সমাজ ও নিজেকে মুক্ত করা। এই দর্শনই আমাকে লড়াইতে নিয়ে চলে ও নিরন্তর প্রাণিত করে। চেষ্টা করবো এই প্রাণিত হাওয়ার বিষয়টি মৃত্যু পর্যন্ত আমার মধ্যে রাখার।



প্রশ্ন :১০

তরুণদের জন্য কিছু বলবেন?

যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই তারুন্যের বৈশিষ্ট।রাস্তায় নামার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যে প্রতিবাদকে ধ্বনিত করা। এই বিষয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের "আঠারো বছর বয়স" কবিতাটি প্রত্যেক তরুণ ও তরুণমনস্ক-কে পড়তে অনুরোধ করবো।


প্রশ্ন :১১

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

আমার প্রত্যহিক জীবন শুধু নয়, কলেজ জীবন থেকে আজ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ আমার মননে কয়েকটি কবিতা ও প্রবন্ধের জন্য শ্রদ্ধার আসনে আছেন।
" দুইবিঘা জমি", "ওরা কাজ করে", "এবার ফেরাও মোরে",
" আফ্রিকা","আরোগ্য" কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতা, "সভ্যতার সঙ্কট" ও শিক্ষা সংক্রান্ত প্রবন্ধ, "তোতা কাহিনি" এগুলোই মূলত আমাকে প্রভাবিত করে। আর নাইট ত্যাগ, রাখিবন্ধন-এর জন্যও শ্রদ্ধা করি। শেষ বয়সে নিজের ভাববাদী চিন্তা থেকে সরে সংগ্রামের যে ডাক দিয়েছিলেন তার জন্যও ওনাকে শ্রদ্ধা করি।
এইটুকই। কথাশিল্পী হিসেবে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মূন্সি প্রেমচন্দ আমায় ছেয়ে আছেন।




(১২)দেশভাগের যন্ত্রণা একজন কবিকে পীড়িত করে।আপনার পরিবার কি এমন কোন পরিস্থিতির শিকার?

আমি প্রত্যক্ষ ভাবে না হলেও, আমার মাসহ মামাবাড়ীর ভোগান্তির কথা শুনেছি। মা-এর যখন দেয় বছর বয়স দাদুকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। নানান প্রতিকুলতা সহ্য করতে হয়েছিল। সে সব আমাকে যন্ত্রণা দেয়। এই জন্য ২১/০২/২০ তে শহীদ উদ্যানে স্লোগানে ও একুশের চ্যনেলে বাইট দেওয়ার সময় বলেছিলাম সাবেক ভারত আমার মা। বাংলাদেশ পাকিস্তান ও ভারত আমার মা।
"সাবেক ভারত আমাদের মা"
শিরোনামে তিন দেশের কবিকে নিয়ে কবিতা সংকলন করার ইচ্ছা আছে।



(১৩)কী লিখি কেন লিখি?

এতক্ষণে এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় পেয়েছেন। আলাদা করে আর কিছু বলছি না।


(১৪)আপনার কবিতাসংকলনগুলোর নাম নির্মানের গোপন জিয়নকাটি কিরকম?

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই আমার দুই কাব্যসংকলন "আসিফা এবং" ও "যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ"-এর নাম নির্মানের জিয়নকাঠি।




প্রশ্ন :১৫

শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছায় একটি শিল্প রূপ পায়? নাকি আরো কোনো অতিভৌতিক কোন বিষয় প্রতিটি ছবির ঘরনা তৈরী করে?

অতিভৌতিক বিষয়টার কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে বলে মনে করি না। শিল্পী কল্পনায় ন্যায় ও সত্যের সৌন্দর্য সৃষ্টি করেন। প্রতিবাদও সত্যের একটা রূপ।


প্রশ্ন :১৬

আপনার সাথে তেমন আড্ডা আমার নেই। আপনি আড্ডারু সে আমি জানি।আড্ডা কি শিল্প সৃষ্টির উৎস মনে করেন?

মনে প্রাণে সহমত পোষণ করি। আড্ডায় চিন্তার আদান প্রদানে সত্য প্রতিভাত হয়।




প্রশ্ন :১৭

কবিতা তো একটি স্বতন্ত্রশিল্প ছবিও স্বতন্ত্র। একটি রেখা একটি বিন্দু কিংবা তুলির কতটুকু স্বাধীনতা এই সমাজ এই সংবিধান আমাদেরকে দিয়েছে?যদিও বাকস্বাধীনতা যেখানে এসে থমকে যায় শিল্প কি তেমন কোন আটকে পড়ার সম্ভাবনায় দমে যায়?

একদম নয়। শিল্প-র মেরুদণ্ড সবসময় ঝজু ও শক্ত। কোথাও মাথা নত করে না।



প্রশ্ন  :১৮ 

আপনার পারিবারিক পরিবেশ শিল্প ও শিল্পীর।এই সম্মেলন কেমন লাগে?

আমার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন উপযুক্ত নয়।


প্রশ্ন  :১৯

আপনার নিজস্ব ঘরনায় লৌকিক সংস্কৃতি কতটুকু আনতে পেরেছেন?আপনি কি সচেতনতার এই বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন?

লোকসংস্কৃতি বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই। তবে কবিতায় চিত্রকল্প হিসেবে কিছু কিছু বিষয় এসেছে।




প্রশ্ন  :২০

জীবন কেউ কেউ নেশা বলেন।কেউ কেউ উৎসব। কেউ কেউ একটি নাটক।আবার কারো কারো নিকট জীবনে কবিতাই জীবন।আপনি কোন নিজস্ব জীবনচেতনায় তাড়িত নিশ্চয়ই। ব্যাখ্যা চাই।

দীর্ঘ এই আলোচনায় নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কবিতা বা সাহিত্য আমার কাছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। তবে প্রেমের কিছু কবিতা অবশ্য লিখেছি। তা অবশ্য আমার কল্পিত মানবীর উদ্দেশ্যে আমার প্রেমিক সত্ত্বার প্রকাশ বলতে পারেন।

ধন্যবাদ আপনাকে আমার সম্পর্কে জানতে চাওয়ার জন্য। যতদূর জানি আপনিও একই সাহিত্য-পথে আমার সহযাত্রী। বরং বলা উচিৎ আপনি আমার থেকে এগিয়ে আছেন।

১৪:০৯:২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ