বইপাড়ার বটবৃক্ষ সবিতেন্দ্রনাথ রায়
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
কলকাতার বইপাড়ার অভিজাত প্রকাশন সংস্থা মিত্র ও ঘোষের কর্ণধার কথাসাহিত্য সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক লেখক সবিতেন্দ্রনাথ রায়।
বটবৃক্ষ সবিতেন্দ্রনাথ রায়। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্সের অন্যতম তিনি।সবিতেন্দ্রনাথ রায় প্রথমদিকে আড্ডার আলাপচারিতা ও জ্ঞান-গর্ভ আলোচনা নোট বইয়ে টুকে রাখতেন। পরবর্তীতে অবশ্য মনে রাখাটা তার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায়। সেসব ঘটনা, গল্প ও ইতিহাস নিয়েই পরবর্তীকালে লিখা হয় তার সাড়া জাগানো বই 'কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর'। পর পর চার খণ্ডে তার লেখা কলকাতার সাহিত্য জগতের ইতিহাসেরঘ মহাকাব্য।বইয়ের জগতে সত্যি সত্যি এক বটবৃক্ষের সাথে আলাপচারিতা আমার পরম প্রাপ্তি। বইয়ের সাথে জীবন কাটানো কেমন ছিলো, সে সময়ের নানা ঘটনা উঠে আসে এই অধীনের আলাপে।পাঠকের ভালো লাগবে বিশ্বাস রাখি।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারটি নিয়েছি ভানুদার । ভানুদা -- কলেজ স্ট্রিটে সবাই তাঁকে এই নামেই জানে । পোশাকি নাম সবিতেন্দ্র নাথ রায় , যিনি প্রায় সাত দশক ধরে কলেজ স্ট্রিটে বই এবং খ্যাতিমান সব লেখকদের সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন, এখনও যুক্ত আছেন মিত্রও ঘোষ প্রকাশনালয়ের সঙ্গে। তাঁর লেখা 'কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর ' ( চার খণ্ড) বই প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য ইতিহাস।
(১)আপনাকে নমস্কার। আপনার উচ্চতা ও মেধার নিকট আমি নস্য।তাও আপনার সাথে গ্রন্থ নিয়ে আলাপ চারিতা হোক চাই।
মিত্র ও ঘোষ এর হয়ে উঠা যদি বলেন দাদা?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :১৯৩৪ সালের ৯ই মার্চ দুই লেখক বন্ধু গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও মন্মথনাথ ঘোষ এই প্রতিষ্ঠান শুরু করেন।তাঁদের এক ভাগ্নে প্রফুল্লকুমার বসু ছিলেন সহযোগী। আমি আসি ১৯৪৯ -এ।তারপর মনীশ চক্রবর্তী ও প্রদোষকুমার পাল। লেখকরা ভিড় জমাতে শুরু করেন।আড্ডার টানে ও গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য।
(২)এই সময়ে বই পাঠকের নিকট প্রকাশকদের অনেক প্রত্যাশা।কিন্তু পাঠক কি সেরকম সাড়া দিচ্ছেন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :দিচ্ছেন।পাঠক সবসময় বই পড়তে উন্মুখ।বইয়ের জন্য পাঠকের আগ্রহ এখনও অপরিসীম। এমন কি এই করোনা কালেও।
(৩)আপনি ত্রিপুরায় বইমেলায় বারবার এসছেন।এখানকার পাঠকের চাহিদা কেমন বলে মনে হলো?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :ভালো।সবসময় ভালো দেখেছি।সব সময়ে পেয়েছি। বইমেলায় তো পেয়েইছি।এমনিও।
(৪)ত্রিপুরার আতিথিয়েতায় আপনি সন্তুষ্ট?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :আপ্লুত!ত্রিপুরার মতো আতিথেয়তা খুব কম জায়গাতেই পেয়েছি। এঁরা একেবারে বাড়ির লোকের মতো করেও।আত্নীয়বৎ।
(৫)আপনার পরিচিতি বিস্তারিত লিখুন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :আমি শ্রী সবিতেন্দ্রনাথ রায়। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্সের অন্যতম সদস্য।
(৬)গ্রন্থশিল্পের উৎকর্ষ বাড়াতে আপনার পরামর্শ কি?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :"উৎকর্ষ" শব্দটাই যথেষ্ট। তার সঙ্গে 'তা' যোগ করা ভুল।
বই ভালো করার জন্য প্রকাশকের আগ্রহ, সদিচ্ছা, ছাপা, মুদ্রন, নির্ভুল ও পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হয় প্রতি বই এবং লেখকের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।সেদিকে প্রতি প্রকাশকের লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।
(৭)গ্রন্থ বিপণন কি কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যাবে?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :কর্পোরেট কোম্পানি যদি মনে করে গ্রন্থ বিপণনে তাদের লাভ হবে নেবে,তবে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো অনেক দামী সামগ্রী ব্যবহার করে।বই তাদের দখলে যেতে পারবে না।
(৮)শুনেছি কলেজস্ট্রীটেও নাকি এমন থাবা পড়ার অপেক্ষায়?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :না,এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু আসে নি।
(৯)একটি বই নিখুঁতভাবে পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে একজন প্রকাশকের প্রস্তুতিপর্বগুলো আলোকপাত করবেন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :প্রুফ রীডিং,নির্ভুল মুদ্রন,ভালো বাঁধাই এবং ভালো কসগজ -এ দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।
(১০)আপনি নিয়মিত এই সময়ে এসেও আড্ডায় আলাপচারিতায় অনবরত স্মৃতিকথা লিখেই চলেছেন।ত্রিপুরার কোন লেখক প্রকাশক কিংবা কারো কাজে মুগ্ধ হয়েছেন?কেন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় : ত্রিপুরার কোনো কোনো প্রকাশনীর" কাছে মুগ্ধ হয়েছি।তাদের বইয়ের বাছাই,গ্রন্থ সজ্জা,বিষয় নির্বাচন প্রভৃতি কারণের জন্য।ত্রিপুরার বহু জ্ঞানী গবেষক অধ্যাপক তাঁদের কাজ দিয়ে অবাক ও মুগ্ধ করে দিয়েছেন।
(১১)জীবনের সত্তরেরও বেশি সময় কলেজস্ট্রীটে কাটানো বটবৃক্ষ আপনি।শুরুর দিনগুলো শুনবো?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :আমার কলেজ স্ট্রীট সত্তর বছর চসরখণ্ডে বিস্তৃত বলেছি।
(১২)মিত্র ও ঘোষের অফিশে লেখকদের আড্ডার কথা শুনেছি।একটু বললে নবীনরাও জানবে।
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :নবীনরা তো এখনও আসছেন।
মিত্র ও ঘোষের অফিসে সাহিত্যিক আড্ডার কথা সবাই জানেন।প্রমথবাবু – প্রমথনাথ বিশী – এই আড্ডাটির নাম দিয়েছিলেন "হাউজ অব কমনস"।
আর একটি বইয়ের দোকান — এম.সি.সরকার এণ্ড সন্স — সেখানেও একটি ছোটো আড্ডা বসত —প্রমথবাবু সেটা অপেক্ষাকৃত প্রবীণতরদের আড্ডা বলে তার নাম দেন — হাউজ্ অব্ লর্ডস্।
হাউজ অব কমন্স অর্থাৎ মিত্র-ঘোষের আড্ডায় বিষয়ের বৈচিত্র্য ছিল নানারকম।আড্ডায় রাজা-উজীর মারার মতো আলোচনা হত।মাঝে মাঝে জ্যােতিষীরা আবির্ভাব হত।তখন তাই নিয়ে আলোচনা চলত।
ভৃগুজাতক দ্বারেশচন্দ্র শর্মচার্য এলে তো কথাই নেই।জ্যোতিষ হাত দেখা শুরু হয়ে যেতো।প্রমথবাবু তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন,দ্বারেশবাবু ভালো ভালো কথা বলুন।দ্বারেশবাবু হাত দেখে বলতেন,আরে আপনি তো আপনার ডিপার্টমেন্টের সর্বেসর্বা হচ্ছেন।
প্রমথবাবু বললেন,না না সর্বেসর্বা হচ্ছেন শশিবাবু,শশিভূষণ দাশগুপ্ত।
দ্বারেশবাবু আর কিছু বললেন না।তখন কেউই জানত না,শশিবাবু কিছুকাল পরে দুরারোগ্য রোগে প্রয়াত হবেন।প্রমথবাবু বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রধান হবেন।
দ্বারেশবাবু বলছিলেন,দ্যাখ,মানুষ মারা যাবার পরেও তার জন্মকুণ্ডলীর গ্রহ কাজ করে চলে।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা গেছেন ১৯৫০ -এ।তার বইয়ের বিক্রি এখন কীরকম বেড়ে গেছে।
সত্যি মিথ্যে জানি না,তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-
বিভূতিভূষণ পুত্র — তারও তাই হল।তার বইয়ের বিক্রি সে দেখলে কত খুশী হত।তার তারানাথ তান্ত্রিকের এখন কত বিক্রি!
মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্সের সেলস কাউন্টার cum আড্ডাখানা।আড্ডার মধ্যেই একদিন প্রমথনাথ
(প্রমথনাথ বিশী) হঠাৎই বললেন,মশাই সব কিরকম জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। একটা খেলা হোক্, কেউ ইংরেজি শব্দ বলবেন না, বললেই এক পয়সা জরিমানা।তখন এক পয়সার অনেক দাম,এক
পয়সায় ছোট পেঁয়াজি,আলুর চপ কলেজ স্ট্রীট
পাড়ায় পাওয়া যেতো।এক আনায় গুপ্-চুপ বলে এক ঠোঙা ব্যাসন মাখানো আলুভাজা পাওয়া যেতো।
ঠিক এই সময়েই ভূপেনদা এসে পড়লেন।সুমথকাকার শ্যালক ভূপেন্দ্রনাথ বসু।এঁর কথা আগে বলেছি।ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসে কাজ করতেন।গজেনবাবুকে মাস্টার মশাই
বলতেন।ভূপেনদার কথায় কথায় ইংরেজি শব্দ বলার অভ্যাস ছিল।
খেলা শুরু হতেই তিনি মুশকিলে পড়লেন। কিন্তু প্রথমেই জরিমানা দিতে হল মাস্টার মশাইকে,
কৃষ্ণদয়াল বসুকে।উনি হঠাৎই বলে বসলেন,এক পয়সা ফাইন বড় কম।
প্রমথবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "ফাইন" ইংরেজি শব্দ,জরিমানা বলা উচিত ছিল আপনার।এক পয়সা দিন।
ভূপেনদা বললেন,হোয়াই, ফাইন তো বাংলা শব্দই হয়ে গেছে।
প্রমথবাবু অমনি হিসেব করলেন, হোয়াই, ফাইন
দুটোই ইংরেজি শব্দ—দিন দুই পয়সা।
প্রমোদবাবুও দুটো শব্দ বলে ফেললেন ইংরেজিতে।বলেই জিভ কাটলেন। মন্তুদাকে বললেন, মন্তু,এই এক আনা ভাঙিয়ে দুটো দু'পয়সা দাও।
তখন দুই পয়সার একটা মুদ্রা হত।প্রমথবাবুর ইচ্ছে ছিল না প্রমোদবাবুকে জরিমানা করা
কিন্তু প্রমোদবাবুই জোর করে বললেন,না না,ওসব চলবে না,নিয়ম নিয়ম।আর আজ তো আমি বড় লোক।কুড়ি টাকা এখনই দেবেন গজেনবাবু।
এই করতে করতে সবাই জরিমানা দিলেন, গজেনবাবু,সুমথবাবু কেউ বাদ গেলেন না।সবাই চুপ
করে আছেন,কথা বললেও হিসেব করে বলছেন।
হঠাৎ ভূপেনদা বলে উঠলেন,না স্যার,আর পারা যাচ্ছে না,ইট ইজ গেটিং ওভার মাই নার্ভস।
প্রমথবাবু গুনতে শুরু করলেন,স্যার থেকে।সাতটা শব্দ।সাত পয়সা।দিন দু-আনাই।আজ খেলা শেষ।
দেখা গেল টেবিলে সাড়ে তিন টাকা জমে গেছে। প্রমথবাবু বললেন,নিন,এবার মুড়ি বাদাম আনুন।
কাকাবাবু বললেন, মন্তু,আরও দেড় টাকা দাও ক্যাশ থেকে। পাঁচ টাকায় একটু বেশি ডালমুট হবে।
প্রমোদবাবু ওঠার সময়ে বললেন,গজেনবাবু,
এবারের কথাসাহিত্যের কিস্তিটা আমি সামনের সপ্তাহে দেবো।আজ আর শেষ করে উঠতে পারলাম না।
(১৩)আপনি ভ্রমণেও বেশ। আপনার ভ্রমণের ট্রিপ থেকে একটি বিশেষ পর্ব শুনবো?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :১৯৫৬ সালে হঠাৎই আমাদের মধ্যে ভ্রমণের নেশা চাপল।আমাদের মানে প্রদোষ, মনীশ ও আমি।কাকাবাবুই পরামর্শ দিলেন,যাবে তে কাছাকাছির মধ্যে দার্জিলিং যাও।ওখানে কবি অচ্যুত চট্টোপাধ্যায় আছেন।একটা ধর্মশালায় ব্যবস্থা করে দেবেন।উনি তো ওখানকার সবচেয়ে বড় অ্যাডভোকেট।
অচ্যুত চট্টোপাধ্যায় কল্লোল,কালিকলম পত্রিকায় লিখতেন।আমাদের কথাসাহিত্য পত্রিকাতেও ওঁর কবিতা নিয়মিত বেরোত।গজেনবাবু সুমথবাবুর সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা।কাকাবাবু চিঠি লিখে দিতে উনি তৎক্ষনাৎ বাজারের কাছে নাগরমল ধর্মশালায় আমাদের জন্য সবচেয়ে
ভালো ঘরটির ব্যবস্থা করে দিলেন।
সব তো হল,কিন্তু 'রেস্ত' কোথায়?আমরা তিনজনের নিজেদের পুঁজিপাটা হিসেব করে দেখলাম এক-একজনের পঞ্চাশ টাকার বেশি হচ্ছে
না।সুমথকাকাই পরামর্শ দিলেন,দার্জিলিং-এ রেলের টিকিটে হিল-কনসেসনের সুবিধা পাওয়া যায়।সেটার সুবিধা নাও,এতে যাবার সময়ে ব্রেকজার্নি হবে না,আসার সময়ে ব্রেকজার্নি করা যায়।আর তোমাদের ব্রেকজার্নির দরকারই বা কি!
তৃতীয় শ্রেণির যাতায়াত বত্রিশ টাকা।তখন প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় — তিনটি শ্রেনি ছিল।কনসেসন
দাঁড়াল ট্রেন ভাড়া যাতায়াত চব্বিশ টাকা।মাথা পিছু রইল ছাব্বিশ টাকা,সাকুল্যে আটাত্তর টাকা।আমরা ঠিক করলাম কুলি ভাড়ায় টাকা খরচ করব না,সব লাগেজ নিজেরা বইব,যত ভারি হোক।নিজেরা রান্নাবান্না করে যাতে খেতে পারি সেই চেষ্টা করব।সে সময় তৃতীয় শ্রেণিতে রিজার্ভেশনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
তখন ফারাক্কা ব্রিজ হয়নি।দার্জিলিং মেল সকরিগলিঘাট-এ নামিয়ে দিল।স্টীমারে গঙ্গা পেরিয়ে ওপারে মনিহারিঘাটে ভাত ও সরল পুঁটি মাছের ঝাল পেলাম পাঁচসিকে থালি।সেই প্রথম পয়সা খরচ হল পথে।কাকিমা লুচি, আলু-চচ্চড়ি
চন্দ্রপুলি দিয়েছিলেন। তাইতে এ পর্যন্ত চলেছিল খাওয়া-দাওয়া।মনিহারিঘাট থেকে আবার ট্রেনে চেপে শিলিগুড়িতে পৌঁছলাম রাত্রে।তখনও নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন হয়নি।
পরের দিন টয় ট্রেনে দার্জিলিং যাত্রা।সুকনা স্টেশন পেরোতেই চোখ জুড়িয়ে গেল সৌন্দর্যে।যত ট্রেন এগোয় তত মুগ্ধ হই।ঘুম স্টেশনে অচ্যুতবাবু নিজে এসে ধর্মশালায় পৌঁছে দিলেন।একটি স্টোভও পাওয়া গেল।চা,সকালের জলখাবার, দিনের ভাত ডাল,রাতের তরকারি করে বেড়াতে বেরোতাম।রাত্রে স্টেশনের কাছে ইন্দ্রশেখরের হোটেল, এক টাকায় ষোলটা রুটি,দর করে কুড়িটায় রফা করে নৈশ আহার চালাতাম।
একদিন কষ্ট করে ঘুম স্টেশন থেকে হেঁটে টাইগার হিল-এ সূর্যোদয় দেখতে গেলাম। কষ্ট লিখলাম বটে কিন্তু তখন কষ্টবোধ ছিল না,আনন্দ পেয়েছি অফুরন্ত। টাইগার হিল-এ সূর্যোদয় দেখা হল না কিন্তু মেঘ আলোছায়ার অপূর্ব দেখলাম,এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
কৃষ্ণ মেঘের ধারে যেমন আশার রুপোলি রেখা থাকে,আনন্দের পরে তেমন থাকে দুঃখের জ্বালা।দার্জিলিঙে ঘোড়ায় চড়ার শখ হল তিনজনেরই।দেখলাম যা খরচ,দিতে অসুবিধা হবে না।ম্যালের কাছ থেকে ঘোড়ায় উঠে অবজারভেটরি হিল ঘুরে একটা চক্কর দেওয়া।মণীশ প্রদোষের ঘোড়া এগিয়ে গেল।আমারটা পিছিয়ে পড়ল।ওরা ঠাট্টা করতে ঘোড়ার মালিককে বললাম,আমারটা ছুটিয়ে ওদের আগে নিয়ে যাও।সে তাই করল,তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে যাবার পর ও যখন থামাতে বলল,প্রাণপণে লাগাম টানলাম,ঘোড়া থামল না,
ছুটেই ম্যালের মধ্যে ঢুকে পড়ল।কিছু বোঝবার আগেই পুলিশ আমার হাত ও লাগাম ধরে ঘোড়া থামাল।তারপর হাত ধরে নামাল,ভেবেছিলাম সাহায্য করছে,পরে বুঝলাম সাহায্যের হাতটা আসলে গ্রেপ্তারির হাত।ম্যালে ঘোড়া ছোটানো অপরাধ,সাইনবোর্ড দেখাল পুলিশটি। আমার সঙ্গে এইরকম আর এক আরেহীকে ধরল আর এক পুলিশ। আমাদের নিয়ে চলল থানায়,ম্যালের একটু নিচে।দেখি মণীশ প্রদোষ হতভম্ভ হয়ে আমার পিছু পিছু আসছে।থানার ইন্সপেক্টর ওদেশের মানুষ,গুর্খা সম্ভবত।বাংলাতেই আমাদের অপরাধ শুনে বললেন—ম্যালে ঘোড়া ছুটিয়েছেন!বোর্ডে দেখেন নি এটা অপরাধ?
বললাম,আসলে এই প্রথম ঘোড়ায় চড়া।ছুটন্ত ঘোড়া কিভাবে লাগাম আলগা করে থামাতেনহয় জানি না,আর বোর্ডটাও দেখিনি।
ইন্সপেক্টর পাথরের মতো মুখে বললেন,আইন না জানাও একটা অপরাধ।আমাদের এখানকার একটি গুর্খা ছেলে যদি কলকাতার চৌরঙ্গীতে 'নুইস্যান্স' করে তাকে কি কলকাতাট পুলিশ ছেড়ে দেবে? আজ শনিবার,আপনারা দুজন আজ লক-আপে থাকবেন,কাল রবিবার — কালও থাকতে হবে।সোমবার কোর্ট খুললে আপনাদের 'পুট-আপ' করব।
শোনা মাত্র মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।কদিনের জন্য এসেছি, তিনদিন থানায় কাটবে!
অচ্যুতবাবুকেই বা কী করে মুখ দেখাব!বোধ হয় আমাদের মুখ দেখে ইন্সপেক্টরের একটু করুণা হল।
বললেন—কি করেন আপনারা?
আর এক আরোহী, তিনি বললেন—আইনের ছাত্র।
ইন্সপেক্টর ব্যঙ্গ করে বললেন—আর এখন থেকেই আইন ভাঙছেন?তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—আর আপনি?
আমি ছাত্র বলেই পরিচয় দিলাম।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিওর ম্যাথমেটিক্স নিয়ে পড়ছি জানালাম।এবার ইন্সপেক্টর সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হল।জিজ্ঞেস করলেন — প্রফেসর ছেত্রির নাম শুনেছেন?
আমি বললাম — হ্যাঁ,খুব নাম ওঁর ছাত্র মহলে,তবে আমি যে বছর ভর্তি হই,সেই বছরই উনি অবসর নিলেন।
ইন্সপেক্টর সগর্বে বললেন—আমার বাবা।
পিতার ছাত্র হওয়ার সুবাদে করুণা আরও বাড়ল।একজন কনস্টেবলকে ডেকে বললেন —এঁদের ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে নিয়ে যাও।
আমাদের বললেন—আপনারা যান,ওঁকে সব বলুন গিয়ে,উনি যদি সব ছেড়ে দেন দেবেন।
ইন্সপেক্টরই এই,ম্যাজিস্ট্রেট কেমন হবেন ভেনে হৃৎকম্প শুরু হল।
কনস্টেবল দুজনকে নিয়ে হাজির করল ম্যাজিস্ট্রেটের কোয়ার্টারে।ভেতরে খবর দিতে গেল বোধ হয়।আমরা ঘরে দাঁড়িয়ে সেই ঠাণ্ডাতেই ঘামছি।
তারপরই দেখি খস্ খস্ শব্দ।লালপাড়ের সাদা সিল্কের শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা ঘরে এসে জিজ্ঞেস করলেন,কী করেছিলেন?
বললাম,প্রথম ঘোড়ার চড়া,কিভাবে ঘোড়া থামাতে হয় জানতাম না,ফলে এই কাণ্ড।
মুখের দিকে চেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় প্রশ্ন করলেন,আবার চড়বেন?
আমরা দুজনে সমস্বরে বললাম—না,না আর নয়।
ম্যাজিস্ট্রেট হাসলেন কিনা বোঝা গেল না।
কনস্টেবল-এর কাছ থেকে কাগজ নিয়ে warned and released লিখে ছেড়ে দিলেন।
পরে জেনেছি এই ম্যাজিস্ট্রেট হলেন—রমা মজুমদার,প্রথম মহিলা আই.এ.এস।
(১৪)বানান নিয়ে আপনার ভাবনা শুনবো?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :বানান সাধারণত আমরা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বানান মেনে চলি।কোনো কোনো লেখক 'সাথে 'শব্দটি ব্যনহার কটপন। আমরা সেগুলো 'সঙ্গে'করে দিই।ওনার, ওনাদের তেমনি ওঁর ওঁদের করে দিই।
আমাদের বাংলা
নামকে
ইংরেজিতে লিখতে গিয়ে
প্রায়ই ভুল লিখি।
আসুন নিয়মটা সবাই মিলে পড়ি।সবাই নিজের বাড়িতে রেখে দিই।ছেলে,মেয়ে,নাতি,নাতনিদের নাম ইংরেজিতে লেখার আগে একবার নিয়মটায় চোখ বুলিয়ে নিই।
নিজের পাড়ার ক্লাবের নাম,পুজোর নাম ইংরেজিতে লেখার সময়ে যাতে ভুল না হয়ে যায় তার জন্যে নিয়মটা জেনে হুঁশিয়ার হয়ে যাওয়াই ভাল।
নামের বানান ইংরেজিতে ভুল লেখাটা আজ বেশি হচ্ছে তা নয়। ইংরেজরা উচ্চারণ করতে না পেরে ভুল উচ্চারণ করে ভুল বানান লিখে দিলে আমরা আহ্লাদে গদগদ হয়ে সেই ভুল বানানকে আশীর্বাদ মনে করে পুরুষের পর পুরুষ ধরে লিখে যাওয়াটাকে আভিজাত্য বলে মেনে নিয়েছি। মতিলাল শীল-কে ইংরেজ Mutti Lal Seal ( মুট্টিলাল শীল) বানিয়ে যেন পরবর্তী চতুর্দশ পুরুষকে কৃতার্থ করে দিল।
সাদা সাহেব ইংরেজিতে জ গ দ্ধা ত্রী উচ্চারণ করতে না পরে ' জ গ ঢা ট্রি' বলিয়াছে। আমরাও চন্দননগরে আহ্লাদে গদগদ হইয়া আজও ইংরেজিতে J A G A D H A T R I লিখিতেছি। যদিও চন্দননগরে বাংলা বানানটা ঠিকই লেখা হয়।
নামের ঠিক ইংরেজি বানান লেখার নিয়ম কখনও বাঙালিকে জানার সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি?
হ্যাঁ। ১৯৩৬ সালে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাঙলাভাষীদের শেখানোর জন্যে কলকাতার ' রূপা '- প্রকাশকের মাধ্যমে " ভাষা- প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ " নামে একটা সংহত বাংলা ব্যাকরণ লেখেন।সেই বইতে বাংলা শব্দকে ইংরেজি বর্ণের সাহায্যে কীভাবে লিখতে হবে তা বাংলার শিক্ষক ও ছাত্রসমাজকে শিখিয়েছিলেন। তা আমাদের সমাজ সাড়া দিল কীভাবে? ব্যাকরণ তো ব্যাকরণ তা হল সংস্কৃত ব্যাকরণ। বাংলার আবার ব্যাকরণ কীসের হে? সুনীতিবাবুকে চটকে দিল।
--- ' হঃ, আইছে আবার ট্রানস্লেশন শিখাইতে!'। স্যার ওটা traslation নয়। ওটা হল trnsliteration । ওই হল গিয়ে। ' এই ছিল সমাজের ৯৮% ভাগ মানুষের চিন্তাধারা।
তারপরে আর কখনো এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ছাত্র সমাজকে বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছে কি? হ্যাঁ হয়েছে।
১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদকে ছাত্রছাত্রীদের নামের ইংরেজি বানান নিয়ে যে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা যাচ্ছে তা বন্ধের জন্যে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেয়। সেইমতো মধ্যশিক্ষা পর্ষদ
নং- সি/৫৬/২১ আদেশনামা ১৭.১১.৫৫
তারিখে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার জন্য বাঙালী হিন্দু পরীক্ষার্থীর নাম ও পদবী বানান এই শিরোনামে প্রতিটি বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়। তারপর পাঁচ/ছয় বছর বাদে কোন ফাইলের তলায় ছিল বলে হারিয়ে যায়। তারপরে অধ্যাপক সুদিন চট্টোপাধ্যায় যখন পর্ষদের দায়িত্বে ছিলেন তখন এই বহুদিন আগের এই আদেশনামাকে পুনরায় জারি করেন। আমি ১৯৮৩ সালে চন্দননগর বঙ্গ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে এসে সবাই মিলে বিদ্যালয়ের নিয়ম কানুন জেনে বুঝে নেওয়ার সময়ে এই আদেশনামাটি দেখি এবং সবাই আমাদের করণিক ভাইয়েরা সমেত বিষয়টাকে উপলব্ধি করি ও কার্যকর করি।
তাহলে কার্যকর করার দায়িত্ব ছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের।
আর যেটা দরকার ছিল এবং যা অতি সহজেই অতি দ্রুত কার্যকর করা যেত বা আজও যায় তা হল নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলা ব্যাকরণের অন্তর্ভূক্ত করে এই অধ্যায়ের মাত্র ২ নম্বরের প্রশ্ন
বাধ্যতামূলক করে দেওয়া। তাহলেই দেখা যাবে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সমাজ নিজেদের অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নততর স্তরে নিয়ে যেতে পেরেছেন।
(১৫)ডি এম লাইব্রেরীর গোপালবাবুকে কেমন দেখেছেন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :বহুবার দেখেছি। ডি.এম লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠিত কর্ণধার গোপালদাস মজুমদার এক আশ্চর্য ছিলেন।গরমের দিনে কৃষ্ণকায় শরীরে খালি গায়ে কাউন্টারে বসতেন।গরম বোধ হলে ধুতির কষি আলগা করে দিতেন।কিন্তু দাঁড়িয়ে উঠে র্যাক থেকে বই পাড়বার সময়ে সে কথা খেয়াল থাকত না।অবস্থা প্রায়ই বেসামাল হয়ে যেত। এই নিয়ে বন্ধু লেখকেরা প্রায়ই ঠাট্টা তামাশা করতেন।গোপালবাবুর কথাবার্তায় সরসতা থাকতো না বিশেষ। কোনো লাইব্রেরি বই কিনতে গিয়ে কমিশন বাড়াবার জন্য বললে,কিছুতেই বাড়াতেন না।ঝগড়ার উপক্রম হলেও নিজের জেদ বজায় রাখতেন।আবার বৃষ্টি নেমে গেলে সেই লাইব্রেরি ক্রেতাকে দশ টাকার মিষ্টি খাওয়াতেন।লাইব্রেরির লোক বলতেন,এই দশ টাকা তে কমিশনই দিতে পারতেন।গোপালবাবু অম্লানবদনে বলতেন,ওটা ব্যবসা,এটা আতিথেয়তা,দুটো আলাদা ব্যাপার।
গোপালবাবুর এই সব ব্যাপার অনেক সময় সামাল দিতে হত তাঁর ভাই অমূল্যবাবুকে।ওঁর ডাক নাম ছিল ভন্তুবাবু।একবার এক লাইব্রেরি থেকে দুজন ব্যক্তি এসেছেন।বই দেখে বেছে কিনবেন।দুজনেরই হাতে বই বহন করার থলি।গোপালবাবু বললেন,যান ভিতরে যান।ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,ও ভন্তু,এঁরা বই দেখে কিনবেন।
যোগরঞ্জনকে (এক কর্মচারী) বলো সব নতুন বই দেখাতে,আর দেখো সাবধান,এঁদের দুটো থলে আছে।
লাইব্রেরির লোকেরা চটে উঠলেন।তার মানে?
আমার বই চুরি করব?থলে আছে সাবধান এ সব কথার মানে কি?
গোপালবাবু বললেন,আচ্ছা কি মুশকিল,
আপনাদের তো কিছু বলি নি,অনেকের এই বদভ্যাস
আছে তাই আমার ভাইকে সাবধান করেছি।
লাইব্রেরির লোকেরাও তেমনি,তারা আর ঢুকবে না,বইও কিনবে না।শেষে অমূল্যবাবু অর্থাৎ
ভাই ভন্তুবাবু অবস্থা সামাল দেন।
বিমল কর আমায় একবার বলেছিলেন, গোপালবাবু এক অদ্ভুত চরিত্র।গিয়ে বললাম,
গোপালদা,আমার পাঁচ হাজার টাকার দরকার,
দেবেন?
গোপালদা অদ্ভুত শান্ত স্বরে বললেন,দেবো,
ম্যানাসস্ক্রিপ্ট দাও।
বিমল বলেছিলেন,সে তো দেবোই।
গোপালদা নাকি বলেছিলেন,ও হবে না,আমি টাকা দিয়ে তোমার পিছনে দৌড়ব,তা চলবে না।এক হাতে ম্যানাসস্ক্রিপ্ট, আর এক হাতে টাকা।
বিমল করের দেওয়াল উপন্যাস প্রথম ছেপেছিলেন ডি.এম.লাইব্রেরি। গোপালদাস মজুমদারের এই মরুভূমি-সদৃশ আপাত-রুক্ষ প্রকৃতির মধ্যে একটি আশ্চর্য মরূদ্যান ছিল। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সমরেশ বসুকে নিয়ে গোপালবাবুর কাছে আসেন।তখন সমরেশ বসু সবে
খ্যাতির পথে উঠছেন,কিন্তু চটকলের চাকরি চলে
যাওয়ায় নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েছেন।সমরেশবাবু একটি উপন্যাস লিখে দেবেন এই প্রতিশ্রুতিতেই নারায়ণবাবুর কথায় গোপালদাসবাবু সমরেশকে
পাঁচ শত টাকা অগ্রিম দেন।এ কথা পরে নারায়ণবাবুর কাছেই শুনেছিলাম।
ডি.এম.লাইব্রেরির আরও উত্তরে বৈকুন্ঠ বুক হাউসও প্রাচীন প্রতিষ্ঠান।তবে এঁরা সাধারণত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা।এর উত্তরে-পশ্চিমে বটতলার সব বইয়ের দোকান।আর এখানেই আজও অবস্থান করছে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান
পি.এম.বাগচী এন্ড কোং।কালি,টাইপ ফাউন্ড্রি,
ছাপাখানা,পাঁজি,ধর্মপুস্তক—এত রকম কাজ-কারবার এক ছাতার নিচে।
কলেজ স্ট্রীট বইপাড়া এবং বিবেকানন্দ রোড-বিধান সরণী এলাকার প্রায় মধ্যস্থলে ছিলেন এবং এখনও আছেন দেব সাহিত্য কুটির।এঁদের প্রকাশনা ছোটদের বই,পূজাবার্ষিকী এবং ডিকশনারী ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে।বর্ণপরিচয় রিসিভার সংস্করণ এঁদের হাতেই ছিল।এর কাছেই বেনেটোলায় গুপ্তপ্রেস নামে একটি প্রতিষ্ঠান। গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা প্রকাশ করতেন।কিন্ত উপন্যাস সাহিত্যগ্রন্থও ছিল। এখন পাঁজি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।
(১৬)রবীন্দ্রনাথের পর কোন কবি আেনার পছন্দ?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :রবীন্দ্রনাথের পর কোন্ কবি আপনার পছন্দ একথা জিজ্ঞেস করলে,আমি অবশ্যই যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত,কবিশেখর কালিদাস রায়,সত্যপন্দ্রনাথ দত্ত,কুমুদরঞ্জন মল্লিক,যতীন্দ্রমোহন বাগচী নজরুল ইসলামের নাম করব।অনেকে বলতে পারেন,কেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নয় বা নজরুল জীবনানন্দ নয়,ঠিকই এঁরাও বড়ো কবি সন্দেহ নেই,কিন্তু ভালো লাগার তো কোনো যুক্তি থাকে না।
কেন যে যতীন্দ্রনাথের নামের পাশে দুঃখবাদী তকমা দেওয়া হয়েছে বুঝি না।ওঁর থেকে পরবর্তীকালের অনেক আধুনিক কবি দুঃখবাদী। যতীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ ব্যথা আনন্দ খুব বেশি বুঝতেন।হয়তো দৃষ্টিভঙ্গি তির্যক ছিল কিছুটা,কিন্তু দুঃখবাদী তাঁকে বলা যায় না।
"কচি ডাব" নামের কবিতাটিতে তাঁর বৃদ্ধ ডাবওলার প্রতি তাঁর মমতা নিঃসংশয়ে আমাদের চিত্ত উদ্বেল করে —
হাঁকে বৃদ্ধ 'ডাব,কচি ডাব'?
পাগল! আজি এ সাঁঝে
সঙ্কীর্ণ গলির মাঝে
উদরে উদরে অন্নাভাব,—
সেইখানে এই শীতে
কি বাতিক প্রশমিতে
কে তোমার খাবে কচি ডাব?
তবু যতীন্দ্রনাথ বলেছেন —
আর ওরে গাল দিয়ো না বন্ধু,আজকে শীতলাষষ্ঠী;-
সোনার স্বরূপই ধ্যান করে মূঢ় কৃষ্ণ-কঠিন কষ্ঠি।
যতীন্দ্রনাথের "হাট" কবিতাটি পড়ুন
দূরে দূরে গ্রাম দশবারোখানি,
মাঝে একখানি হাট :
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলেনা প্রদীপ
প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট।
নৈর্ব্যক্তিক বস্তু "হাট" এর প্রতিভা ঝরে পড়েছে কবির সহানুভূতি।
"মালাবদল" নামে একটি অসাধারণ কবিতা আছে।কবি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।যখন কাজে যোগ দিতে যাচ্ছেন, ঝাউয়ের ছায়ায় জিজ্ঞেস করলেন — কত বয়স বুড়ো ঝাউ?ঝাউ উত্তর দিলে -
দেওয়ান তখন রামভদ্র শাউ।যখন অবসর নিয়ে ফিরছেন,লাঠি হাতে তখন সেই ঝাউকে মনে হল নবীন ঝাউ — জিজ্ঞেস করলেন,কত বয়স হল ঝাউ।সেই একই উত্তর এল — দেওয়ান তখন রামভদ্র শাউ।
এমন সহমর্মিতা আমি অন্যের কবিতায় পাই নি।
হয়তো তার নিচের চার পংক্তি পড়ে তাঁর সম্বন্ধে ভুল ধারণা পোষণ করেন কেউ কেউ
তব জয় জয় চারিদিকে হয়,আলোক পাইল লোক,
শুধাই তোমায়-কি আলো পেয়েছে জন্মান্ধের চোখ?
চেরাপুঞ্জির থেকে,
একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে?
"বাইশে শ্রাবণ, ১৩৪৮ শীর্ষক কবিতাটি আমি যতবার পড়ি চোখে জল আসে —
সহসা দেখা গেল —
মরণের কুসুমকেতন জয়রথ!
মনে হল—
কি বিচিত্র শোভা তোমার—
কি বিচিত্র সাজ !
পলকের তরে চোখে পড়ল তোমার মুখ !
মরণের অভিনন্দনে
সে মুখ কি অপরূপ হয়েছে বন্ধু !
এক বিখ্যাত একতারার গানের লাইন মনে পড়ে–
থৈ থৈ শাওন এল ওই !
এত অল্প পরিসরে কোনো কবিরই আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না।
(১৭)আগামীদিন বইয়ের ভবিষ্যৎ কতটুকু নিরাপদ?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :যতদিন বাংলা বইয়ের পাঠক থাকবে, ততদিন বইয়ের ভবিষ্যৎ অক্ষুন্ন।
(১৮)বই বিমুখ প্রজন্ম কি আমরা চেয়েছি?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :কেউ চায়নি।হনেও না।
(১৯)গ্রন্থ নির্মানে একজন প্রকাশক সবচেয়ে তীক্ষ্ণ নজর কোন দিকে দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :ছাপার ভুল না থাকে, কাগজ ভালো হয়,ছাপা ভালো হয়।তারওর বাঁধাই।
(২০)লেখক প্রকাশক দ্বন্দ্ব হয়?মিত্র ও ঘোষ কি এরকম কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে কখনো?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :হয় মাঝে মধ্যে তবে আমাদের এরজম হয় নি।
(২১)লেখক প্রকাশক চুক্তি হওয়া খুব প্রয়োজনীয়?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :হ্যাঁ প্রয়োজনীয়।
(২২)একজন প্রচ্ছদ শিল্পীর ভূমিকা একটি বই নির্মানে কতটুকু?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :অনেকটা। প্রচ্ছদ থেকে মুদ্রণেও সহযোগিতা প্রয়োজন।
(২৩)বইয়ের ভুবনে নতুন একজন প্রকাশক কাজ করতে এলে আপনার পরামর্শ?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :প্রুফ রীডিং, ছাপা ও বাঁধাইয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে প্রকাশক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
(২৪)আবার ত্রিপুরায় স্বাগতম। আসবেন?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :যখন 'ত্রিপুরেশ্বরী 'ডাকবেন।
(২৫)ত্রিপুরার লেখক ও প্রকাশকদের প্রতি আপনার কোন রকম পরামর্শ?
সবিতেন্দ্রনাথ রায় :ত্রিপুরার ঐতিহ্য ও বইয়ের প্রতি নিষ্ঠা রেখে প্রকাশকের কাজ চালিয়ে যাওয়া।সেই সঙ্গে অবশ্যই সৎ থাকা।
সবিতেন্দ্রনাথ রায়
২০:১০:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ