বাংলাদেশের লাখাই ঐতিহাসিক দত্ত বাড়ী || ভি ডি নিউটন

বাংলাদেশের লাখাই ঐতিহাসিক দত্ত বাড়ী || ভি ডি নিউটন 


 বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার স্বজনগ্রাম ( টাউনশীপ) ছিল দত্ত বংশের বসতি। লাখাই দত্ত বংশ ছিল চক্রপানি দত্তের বংশধর।বৃটিশ আমলে লাখাই দত্ত বংশ পশ্চিমবাংলা,পুর্ব বাংলা এবং আসামের আলোকিত ও শিক্ষিত বংশ ছিল। এই দত্ত বংশে সেই সময়ে ১২০ জন ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের অফিসার। জনশ্রুতি রয়েছে, বৃটিশ আমলে শিলং,গৌহাটি,সিলেট থেকে কর্মকর্তারা লাখাই থানায় ভিজিট করতে এলে দত্ত বাড়ীর সামনে এসে গাড়ী থেকে নেমে হেঁটে লাখাই থানায় যেতেন।

লাখাই দত্ত বংশের লোকেরা সিলেট,শিলচর,শিলং,কলকাতা,দিল্লী,লন্ডনে বসবাস করতেন এবং চাকুরী করতেন। একমাত্র দুর্গাপুজার সময় হলে সবাই লাখাই বাড়ীতে আসতেন।
লাখাই দত্ত বংশের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিখ্যাত আইনজীবী এবং পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু এডভোকেট রামকুমার দত্ত,ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নগেন্দ্র দত্ত, ১৯২৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচিত সদস্য শ্রীশ চন্দ্র দত্ত, লাখাই থানার প্রতিষ্টাতা রায়বাহাদুর এডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্ত যিনি ১৯৩০ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং কিছুদিন ভারতবর্ষের স্পীকারের দায়িত্ব পালন করেন। রায়বাহাদুর হেমচন্দ্র দত্ত ১৯৩৭ এবং ১৯৪০ সালে আসাম পার্লামেন্টের মেম্বার নির্বাচিত হন। জ্যোস্না রানী দত্ত একবার আসাম পার্লামেন্টের মেম্বার এবং তিনবার ভারতের পার্লামেন্টের মেম্বার নির্বাচিত হন,রাজনীতিবিদ এডভোকেট ধর্মদাস দত্ত, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষক কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের প্রফেসর ডঃ ভবতোষ দত্ত,ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কমরেড বারীন দত্ত, ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নারী নেত্রী হেনা দাশ,হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক সত্যব্রত দত্ত,ঢাকা জগন্নাথ কলেজের প্রফেসর হেমেন্দ্র কিশোর দত্ত, প্রফেসর ডঃ দিগিন্দ্র চন্দ্র দত্ত,শিলচর গুরুচরন কলেজের প্রিন্সিপাল রথীন্দ্র চন্দ্র দত্ত, প্রফেসর মৈত্রেয়ী দত্ত,অধ্যক্ষ সুধীন্দ্র চন্দ্র দত্ত, প্রফেসর ডঃ চিত্ততোষ দত্ত, প্রফেসর দেবশ্রী দত্ত,প্রফেসর অসীম কুমার দত্ত,প্রফেসর ডঃ পুর্ণেন্দু দত্ত, প্রফেসর ডঃ রনজিত কান্তি দত্ত,ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট প্রকাশ চন্দ্র দত্ত, একাউন্ট জেনারেল বীরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত, যুগ্ম সচিব বীরেশ চন্দ্র দত্ত,আইন সচিব নির্মল চন্দ্র দত্ত,কর্ণেল অশোক কুমার দত্ত,সিলেট বিভাগের প্রথম FRCS ডাক্তার ডাঃ পরেশ চন্দ্র দত্ত, হবিগঞ্জ জেলার প্রথম আইসিএস অফিসার ও ভারতের কেন্দ্রীয় সচিব শিশির কুমার দত্ত,ডাঃ নরেশ চন্দ্র দত্ত,ডাঃ কালীপদ দত্ত,ইঞ্জিনিয়ার বীরেশ চন্দ্র দত্ত,এডভোকেট সুরেশ চন্দ্র দত্ত,এডভোকেট মহেশ চন্দ্র দত্ত,পুলিশের ডি আই জি সুধীর চন্দ্র দত্ত, পুলিশের এডিশনাল আই জি দেবী দত্ত,ক্রিকেটার পুন্যব্রত দত্ত,বিজ্ঞানী রনজিত দত্ত,ব্যারিষ্টার অসীম দত্ত,হবিগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান অখিল চন্দ্র দত্ত,ডাঃ অলকানন্দা রানী দত্ত, ডাঃ আনন্দিতা রানী দত্ত,নাসা বিজ্ঞানী দেবাশীষ দত্ত,সমাজসেবক দ্বীপ চন্দ্র দত্ত,এডভোকেট নীরেন্দু কুমার দত্ত,সিলেট বারের বিখ্যাত আইনজীবী চারু চন্দ্র দত্ত, 
 ত্রিপুরা সরকারের শিক্ষা দপ্তরের 
খ্যাতনামা অফিসার কৃষ্ণপদ দত্ত বা কেপি দত্ত,পুলিশের গুলিতে নিহত নক্সালপন্থী নেতা শহীদ ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত দত্ত। 

১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হলে লাখাই দত্ত বংশের লোকেরা নিজ জন্মভুমি ত্যাগ করতে থাকেন।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সামরিক আইন জারী করলে লাখাই দত্ত বংশের লোকেরা একেবারে শুন্য হয়ে যায়। কমরেড বারীন দত্ত ও নারী নেত্রী হেনা দাশ দুই ভাইবোন  ঢাকায় অবস্থান করে কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েন।

১৯৬০ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান " টাউনশীপ" প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে লাখাই ঐতিহাসিক দত্ত বাড়ীতে লাখাই থানা পরিষদের কার্যক্রম এই বাড়ী থেকে শুরু হয়। যার কারনে লাখাই ঐতিহাসিক দত্ত বাড়ীর নাম হয় " টাউনশীপ"। 

১৯৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল লাখাই থানার সদর দপ্তর বামৈ ইউনিয়নের কালাউকে স্থানান্তরিত করা হলে দত্ত বাড়ীর ধালানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। 

দত্ত বাড়ীর লাল বিল্ডিং,দুটো সাদা বিল্ডিং,টিনশেডের দুতলা একটি  বিল্ডিং যেখানে সাবরেজিষ্টার অফিস ছিল,কাছাড়ী ঘর,ইংলিস মিডল স্কুল,লাইবেরী,ডাক বাংলা,একটি দুর্গা মন্দির ছিল। সবই আছে তবে জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। এই লাল বিল্ডিংতে থাকতেন রায়বাহাদুর এডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্ত। পরবর্তীতে লাখাই সার্কেল অফিসার ( সি ও) এর বাসভবন ছিল। 

লাখাই দত্ত বাড়ীতে লাখাই ১ নং ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়,ভুমি অফিস, লাখাই হাজী করিম হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা,এতিনখানা,মসজিদ প্রতিষ্টিত হয়েছে। 

ঐতিহাসিক দত্তবাড়ীর লোকেরা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন,ভাষা আন্দোলন,মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখেন। দত্ত বাড়ীর ইতিহাস আজ ধবংসের পথে। 
এই ধালানগুলো লাখাই উপজেলা প্রশাসনের দখলে আছে। 

লাখাই উপজেলা প্রশাসন নিজে উদ্যোগী হয়ে এই লাল বিল্ডিং এ " লাখাই দত্ত বাড়ী স্মৃতি বিজড়িত যাদুঘর"  করতে পারেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ