অধিক পঠিত কবিতা থেকে ২০টি ✍️ ওবায়েদ আকাশ

🔴 অধিক পঠিত কবিতা থেকে ২০টি ✍️ ওবায়েদ আকাশ 
✍️
প্রকৃতিপুত্র
✍️
ভাবতে গেলে তুমিই একদিন
আমাদের হারানো শেকড়, হারানো চুল, বয়সভেদে
ছোট হয়ে আসা পরিত্যক্ত পোশাকের ধরন, ছায়াভিত্তিক
ঘাসের আকৃতি, বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকা মাঠ–
আলের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ধানক্ষেতে পড়ে যাবার স্মৃতি–
একদিন ডেওয়া ফলের ঘ্রাণের মতো ফিরিয়ে দিতে পারো

যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম
মাছেদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রবাহ দেখে মনে হতো
ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাক্সের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ
আর যত্রতত্র অশ্বদৌড় দেখে মনে পড়ত
সেই সকল ক্রীতদাস ব্যবস্থার প্রবর্তক, যাদের   
ঐসব দুরন্ত অশ্বের লেজে জুড়ে দিয়ে 
ঘোরানো হচ্ছে কাঁটাঝোপ, বনবাদাড়, তপ্ত মরুভূমি–
একদিন আলোছায়ার নক্ষত্রের মতো 
তুমিই তার ভালোমন্দ, উঁচুনিচু শিখিয়ে নিতে পারো

যখন মাথার ওপর সুস্নিগ্ধ মেঘের পরিচ্ছদ দেখে
মনে হতো প্রাগৈতিহাসিক কুশলীরাজ কিংবা প্রাচীন গ্রীসীয়
স্থাপত্যপ্রেমিক কোনো রাজরাজড়ার মহান কীর্তির কথা–
কিংবা মনে পড়ে যেতো– গাছে গাছে বিবিধ কূজন আর বর্ণালি ফলের 
আস্ফালন দেখে ইবনে বতুতার চোখে অপ্সরী ও গন্ধর্বের পরম সংসার; আর
অতল সুখের এই পলিধৌত সুশীল রাজ্যের মতো স্বর্গীয় মাতৃভূমির কথা

ভাবতে গেলে একদিন তুমিই তার আগাপাছতলা দেখে ফেলেছিলে
আজ আবার পুনরুদ্ধারিত গৌরবের মতো
তারই কিছু গ্রহণ বর্জন সুখ স্মৃতি অনায়াসে তুলে ধরতে পারো, জানি 
 ***

বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ রোড নামকরণ হলো
✍️
আমার নাম দাও শিবপোকা। শিবপোকা মানে, একটি নতুন পোকার নামকরণের ক্ষমতা।... তুমি করো দোয়েলের চাষ। দোয়েল কি পরিযায়ী নাম? ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো সেবার বর্ষায় ছিল সাদারঙ হয়ে। আমি জানি, এ প্রকার জলসাদা ব্যাঙ পৃথিবীতে কখনো ছিল না। এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম। কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে।... তুমি করো দোয়েলের চাষ।... ভালো ছাইরঙ বোঝো।... মেটে কলসি, লাউয়ের খোঁড়লে কী গভীর সুর তুলে আনো। তোমাকে জানাই তাহলে, আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযত্নে রাখি ঘরের নিভৃত কোণে। তুমি তো জানো, কতোটা বেসুরো হলে হাটের গুঞ্জন ওড়ে আকাশে বাতাসে 
*** 

ঘুঙুর খেলা
✍️
কিছু সময় বদলে দিয়ে 
                   উড়ে যাবার সময় হয়েছে ঘুঙুরের?

ছোটবেলায় ঘুঙুরনাচ নাচতে গিয়ে– একবার দু’বার
শরীরছেঁড়া মৃদু রক্তে– ভেসে গেছে ঘুঙুরের মুখ     
আর তাকে মানিয়ে নিয়েছে– উচ্ছ্বাসের দুরন্ত প্রকার

মা বেঁধে দিতেন কোমরে ঘুঙুর
আর কোরবানির ষাঁড়ের পশুকে সংসারের পিতা

তারপর সবাই খুলে নিতেন
উভয় নৃত্যের একই রকম হাসি দেখবার পর

ঘুঙুর খেলা– একদার সাংসারিক সত্যে আমরা যাপন করেছি

ঘুঙুরের পরনে ছিল পিতলের আভা–
উচ্চতা যথারীতি, আর
গোলগাল চেহারায়– নাভির ওপর দীর্ঘ ফাঁড়া দাগ 
 ***

ধীরেন্দ্র আর ভুশার নস্টালজিয়া
✍️
‘ধিরে, সুখ নাই।’
[ভুশার একমাত্র ঘোড়াটি গতরাতে চুরি হয়ে গেছে। কিংবা ধারণা করা যায়, এ মুষল বৃষ্টিতে ঘোড়াটির দুরন্ত শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়।]

‘কেন?’ –বললো ধীরেন্দ্র। 
আবার ধীরেন্দ্র কয়, ‘তোর থেকে ত্রি-দন্ত চতুর কেউ একজন ঘোড়াটির আজকাল খোঁজখবর নেয়।’

‘ধিরে, এখন কী করি?’ 
‘যত দূর জানা আছে, তার কিছু তথ্য বের করি।’
[তথ্যে বেরিয়ে পড়ে, এ ভরা শ্রাবণে, তিনিও ঘোড়ায় চেপে হঠাৎই ছুটছেন নাকি সোমত্ত কৈশোরের দিনে।]

‘মাঝি, কোন ঘাটে ভিড়বে তোমার তরী?’
[নদীতীরে ধীরেন্দ্র আর ভুশা, তাদেরও শৈশবের দু’টি টিকিট যদি মেলে!]

মাঝি বলে, ‘আপনারা ব্যাটা নাকি ছেলে?’
এ ওর দিকে চায়, তারপর ধীরেন্দ্র বলেÑ ‘মুশকিলে পড়িলে ভুশা, মাঝিও মনের কথা রঙ ধরিয়ে বলে।’
 ***

প্রাক-বৈবাহিক
✍️
একবার আমাকে একটি বিবাহ-উপযুক্ত মেয়ের হস্তাক্ষর পাঠিয়ে বলা হলো, এই মেয়ে এতদিন জলেই বসবাস করেছেন; আর তার সাম্প্রতিক স্যাঁতসেঁতে প্রকাণ্ড শরীর রৌদ্রে শুকোতে দেয়া আছে। তার হস্তাক্ষরে এই যে কোথাও মাত্রা পড়েছে বা পড়েনি, আর এই যে যতিচিহ্নের কোথাও ভুল বা কোথাও সঠিক ব্যবহার– এসব কিছুই নাকি মেয়েটির যথার্থ যোগ্যতা বা দোষগুণ যেটাই ধারণা করা হোক। মেয়েটির উচ্চতা আমাদের মাঠভর্তি জলের সমান, অর্থাৎ এটা আমার আন্দাজ করে নেয়ার কথা। যা হোক, আমি মায়ের কাছ থেকে পত্রমারফত এ সংবাদ জেনেই কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি। আর ভাবছি, মীন রাজ্যের অধ্যয়ন পর্বে মেয়েটির দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসব প্রশ্ন খুব একটা কমন পড়ার কথা নয়। আর তাহলে এভাবে হস্তাক্ষর পাঠিয়ে এক জননীর কোনো অনাথ যুবকের এ মতো মন ভোলানোর কোনো মানেই হয় না

ভেবে দেখছি, আমার অপেক্ষার দিনগুলো কী উৎকণ্ঠার! শীত কিংবা বর্ষাই আমার প্রিয় ঋতু হলেও ভাবছি, তাকে ভেজা জবুথবু নাকি শীতে কোঁকড়ানো দেখতেই বেশি আনন্দদায়ক হবে

আজ এই মুখর বর্ষণে ছাতা হাতে বৃষ্টি বাঁচিয়ে এমনতর ভাবনাগুলোই পোস্টাপিস অবধি পৌঁছে দিয়ে এলাম। আর তখনই আমার হঠাৎ মনে এলোÑ তাকে শেষ প্রশ্নটি করাই হয়নি যে, অবশিষ্ট জীবনে তিনি মীন ধর্মেই ফিরে যেতে আগ্রহী কিনা 
*** 

অভিনেতা তীর্থঙ্কর
✍️
তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে
তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে
চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে

সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়
তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক
সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়
তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো :
ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল

আর এখন তাতে ফল ধরবে– যা পেড়ে খেতে
তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের 
***
(নিচের কবিতা দুটি ‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজের কবিতা)

কবি জীবনানন্দ দাশ প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে ট্রামের লাইনে চমৎকার চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন
✍️
কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ ঘুরে মধ্যরাতে স্ত্রী লাবণ্য দাশের তৎকালীন নারী জীবনের স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। শোনা যায় : বিদূষী লাবণ্য দাশ উনুনের পাশে শুয়েবসে কী করে শীতরাত্রির গল্প ফেঁদে কাঁচামাটির পাত্রের মতো আগুনে পুড়িয়ে নিতে পারতেন। আর পুরোটা জীবনের এ দীর্ঘ অবসরে জীবনানন্দ দাশ অভাবিত সোনার ডিম উনুনে তুলে কিছু তাঁর জীবদ্দশায় আর বাকিগুলো তাঁর মৃত্যুর পর আপামর পাঠকের জন্য পরিবেশন করে যান। আমরা তাঁর কাছে বনলতা সেনের অনেক গল্প শুনি। তবু, কোনো এক মানবীর মনে তাঁর ঠাঁই না হবার অপার বেদনার কথায় এতোটুকু বিচলিত কেউ নই; কারণ, একবার সুরঞ্জনা অন্য যুবকের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে বনলতা বিষয়ে এক গভীর জটিলতা তৈরি করে বসেন। আর তাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, ভাবনার পূর্ব থেকেই তিনি কখনো বনলতাকে একক মানবীর মর্যাদা দিতে পারেননি। কলকে পাড় শাড়িতে জড়িয়ে যে কিশোরী সন্ধ্যে হলে ঘরে ধূপ দিতে যায় প্রতিদিন অথবা যে অনিবার্য মানবী এক শোভনা, সুদূর দিল্লিতে বসে উজানের স্রোতের তীব্রতায় টানেন সর্বদা নিমগ্ন খুব পুরুষ হৃদয়– বরং তাকে ঘিরেই তাঁর জীবনে নারীপ্রেম সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা করা যায়। এবং ধারণা করা যায় যে, এরই পরিণতিতে তিনি হায় চিল নামের কবিতাটি লিখে থাকতে পারেন, এবং আমার সকল গান তবু তোমারেই লক্ষ্য করে– বলে তাঁর ভালোবাসার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটান। আশৈশব তিনি জলসিড়ি, বিশালাক্ষীর তীরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন– আমার মতন আর নাই কেহ! আমার পায়ের শব্দ শোনো– নতুন এ– আর সব হারানো– পুরনো। যেহেতু তিনিই কেবল ঘাইহরিণীর প্রতি অপার মমতা হেতু একদিন ক্যাম্পে লিখে গভীর সমালোচিত হন; নির্জন খড়ের মাঠে পৌষ সন্ধ্যায় হেঁটে হেঁটে রচনা করেন বাঙালির পরিভাষা– রূপসী বাংলার প্রগাঢ়তা। সেই হেতু এই মহাপৃথিবীতে যার যেখানে সাধ চলে গেলেও তিনি এই বাংলার ’পরেই আমৃত্যু থেকে যেতে অভিলাষী হন। আবার বছর কুড়ি পরেÑ হারানো মানুষীর সাথে দেখা হয়ে গেলে– এই কাশ-হোগলার মাঠের ভেতরেই যেন দেখা যায় তারে– অথবা হাওয়ার রাতে– যেন দেখা হয় এশিরিয়ায়, মিশরে-বিদিশায় মরে যাওয়া রূপসীরা যখন এই বাংলার আকাশে কাতারে কাতারে নক্ষত্রের সমুজ্জ্বল সংসার রচনা করে– তেমনি তারার তিমিরে। আবার আট বছর আগের একদিন– কল্পনার নক্ষত্রচূড়ায় এক মৃতের গল্প রচনা করে বলেন– তবু জানি– নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ– নয় সবখানি;– অর্থ নয় কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয়– আরো এক বিপন্ন বিস্ময়– আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে– খেলা করে;– আমাদের ক্লান্ত করে– ক্লান্ত– ক্লান্ত করে। জীবনানন্দ দাশ নিশিথের অন্ধকারে সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ঘুরে ঘুরে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ বিবেচনা করে বলেন– ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে... ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে... উপেক্ষা সে করেছে আমারে– অথবা জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র অধ্যাপনা ও সম্পাদনা জীবনের প্রগাঢ় বেদনাময় মুহূর্তে নিতান্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাঁর কিছু উৎকৃষ্ট রচনার নামকরণ ধূসর পাণ্ডুলিপি করে অনায়াসে পাড়ি দেন বাংলা কবিতার ঊষর উদ্যান। একবার খুঁজতে খুঁজতে নক্ষত্রতিমিরে– জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনাÑ বলে যখন সরোজিনীর অবস্থান নির্ণয়ে একপ্রকার ধোঁয়াশায় পতিত হন– আত্মাভিমানে নিজেও ঝরা পালকের মতো ঝরে যেতে চান শুকনো পাতা ছাওয়া ঘাসে– জামরুল হিজলের বনে– কিংবা নক্ষত্র সকাশে। যেহেতু তাঁর ট্রামের নিচের জীবন এমনই ইশতেহার রচনা করেছে যে, যে জীবন দোয়েলের শালিখের– মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা– ফলে, কার্তিকের নরম নরম রোদে– এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক সাদা বক– এই দৃশ্য দেখে ফেলে যে, আমাদের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ– এবার মানুষ নয়, ভোরের ফড়িং তারে দেখা যায়– উড়ে উড়ে খেলা করে বাংলার মুখর আঙিনায়– 
***

জাতিসংঘের মরচেধরা চাবির জন্য কবি আবুল হাসানের কোনোই দুঃখ ছিল না 
✍️
ভালো আছি, খুব ভালো আছি? আবুল হাসান। রাত্রিদিন পৃথক পালঙ্কে শুয়ে অচিকিৎস্য আরোগ্যের পাশে তোমাকে দেখাচ্ছে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। রাজা যায় রাজা আসে আর আমাদের মাঠভর্তি ধানক্ষেত দীর্ঘকাল অরক্ষিত থেকে এবার বানের জলে ভাসে। যে তুমি হরণ করো তার টিকিটি ধরে একবার পচাডোবা এঁদো পুকুরের জলে নিক্ষেপ করে প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিলে– এইবার দীর্ঘদিন তোমার লক্ষ্মী বোনটিকে নিরুপদ্রবে লাল শাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে বৈকি। অথচ তার নগ্ন নিমিত্ত দেখো : একদিন তোমার নিজের চিবুকের কাছেও ভীষণ একা হয়ে গেলে। আর একদিন এইসব অসহ্য সুন্দর তোমাকে মানিয়ে গেলেও– জাতিসংঘ তোমাকে মেনে নিতে পারেনি কখনো। আর সেই থেকে ভাবতে বসে গেলে : দুঃখের কোনো মাতৃভাষা থাকতে নেই কেন। কেবলই লাবণ্য ধরে– এমন পাথর, তার হিতাহিত ধরে টান দিতে গিয়ে একদিন মৃত্যু এসে তোমাকে নিয়ে গেল আবুল হাসান। তোমার বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, ততদিন তোমার বাংলায় কোনো মৃত সুন্দরীকে গোর দিতে দেখেছিলে বলে মনে করতে পারছ না ভেবে– পুলিশ ও মানুষের মধ্যে যথার্থ বৈষম্যজ্ঞান তোমার আমৃত্যুই থেকে গিয়েছিল। তোমার উদিত দুঃখের দেশে পানপাতা হলুদ হতে হতে আমরা তো ভুলে গেছি নিসর্গের প্রকৃত বানান। তবু ভেবে দেখি, বেশ ভাল আছি (?), তুমি কেমন আছ আবুল হাসান! 
***
রূপনগর   
✍️
রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ পোড়ার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস... এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল– এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ।

বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।... 

রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালোবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে–
***

গগণ ঠাকুর : গণিতজ্ঞ
✍️
গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন
লিটল ম্যাগাজিনের দুর্মূল্য খাঁচায় তার নাম
যাদুঘরের প্রহরীবেষ্টিত উজ্জ্বল হয়ে আছে

জীবনে প্রথম তিনি ভাষাবিজ্ঞান থেকে নেমে
লোকসংস্কৃতির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন রিক্সার চাকা
তারপর নাটক সরণির মুখোশের কেনাবেচায়
গণিত বিষয়ে গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন

এবং যে কোনো বাহাস কিংবা প্রথম প্রথম কবিতার খাতায়
ব্যাকরণ থেকে জ ফলা কিংবা নৈতিকতা থেকে ঐ ফলাগুলো
ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন বলে
একদা এ্যান্টি স্টাবলিশমেন্টের কয়েকজন তরুণ কর্মী
তাকে গভীর উৎসাহে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়

বলে, যে কোনো স্কুলিংয়ের নির্জনতায় জনসভার উত্তেজনা
কিংবা কফি হাউসের ছায়ায় সরাইখানার পরাপাঠ 
রটিয়ে দিতে পারলেই তবে মুক্তি 

কোনোদিন মুক্তি নেননি গগণ ঠাকুর 
বরং দীর্ঘ কারাবাস কালে এ্যালজ্যাবরার প্লাসগুলো একদিকে
এবং বন্দিজীবনের নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তিগুলো একদিকে রেখে
প্রতিদিন ঘুমোতে অভ্যস্ত ছিলেন
একদিন যোগের সঙ্গে ভাগ এবং নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তির সঙ্গে
গুণীতকের গভীর সখ্যের ফলে তারা মধ্যরাতে হাত ধরে পালিয়ে চলে গেলো

অথচ তিনি প্লাসের সঙ্গে মরালিটি এবং 
মাইনাস ও একাকিত্বের সঙ্গে হিউম্যানিটির সমন্বয়গুলো 
গভীর কাছ থেকে ভেবে এসেছিলেন–

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন। এ-মতো গাণিতিক সমস্যা 
জীবনে এটাই প্রথম বলে তার মীমাংসা হেতু
নতুন কোনো লিটল ম্যাগাজিনের খাঁচার দিকে তাকিয়ে আছেন
 ***

মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি
✍️
মিশেল ফুকো পাগলাগারদের বৃত্তান্ত বোঝেন
তার প্রতিটি অস্থিসন্ধির প্রলাপ– ভিসুভিয়াসের উত্তপ্ততায় 
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে অকৃত্রিম অনুরাগীকুলে

পাশ্চাত্য-যৌনতার উন্মুক্ততা ও অবদমন বিষয়ক তর্ক কিংবা 
স্বভাব মনোবিকলনকালে, যখন তিনি হেঁটে হেঁটে 
আমাদের মধ্যরাত্রিক চেতনার উদ্যানজুড়ে বসিয়ে দেন মীমাংসা;– 
আমরা কি তখন ততোটাই প্রলাপমুখর গভীর তন্দ্রায়?

কিংবা আমাদের প্রতিদিনের কারাগারের অবিশ্বাস্য বোঝাপড়ায় 
যখন মিশেল ফুকো দাম্পত্যে, প্রেমে, রান্নাঘরে, বাথরুমে
অফিসে, বক্তৃতায়, সংগ্রামে, সৈকতে– ঘরে ঘরে পাঠ্য হয়ে ওঠেন– 
আমরা তখন ফুকোর চকচকে টাক উঠোনের আমগাছের ছায়ায়
বিছিয়ে নিয়ে দল বেঁধে দিবানিদ্রায় যাই–

আজ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যে দর্শন ও শল্যচিকিৎসার 
করুণ পরিণতিজুড়ে একদিন আমাদেরও খোয়াবনামায়
জুড়ে বসেছিল মিশেল ফুকোর আসমান-সমান প্রকাণ্ড ছায়া

তবু ফুকো আমাদের প্রতিদিনের আসবাবপত্র ঝাড়মোছ
ঘষামাজায় কতটা কী যোগান না যোগান, তার চেয়ে বড়
তিনি আমাদের অগণিত প্রধান সড়কের পাশে পদ্মপাতার
অসংখ্য শুশ্রূষালয় ফেরি করে ফেরেন ফরাসি ভাষায়–

তখন আমি আমাদের অসামান্য কথাকার, মনোচিকিৎসক
মামুন হুসাইনের শরণাপন্ন হলে– তিনি আমাকে তার উপন্যাস
ও গল্পের বিভাষায় একটি টাকা আটকানোর রাবার বাঁ-হাতে লাগিয়ে 
চলতেফিরতে ও সময়মতো টেনে আবার শরীরে ছুড়ে মারতে বলেন!
তাতে আমি যেমন চিৎকার করে সুস্থ হয়ে উঠি; 
তেমনি দিনদিন মামুন হুসাইনের অন্ধ ভক্ত হয়ে– প্রতিদিন তার 
কোলেপিঠে চড়ে মিশেল ফুকোর বেবাক গল্প শুনি
*** 

মুক্তি
✍️
আমার বিছানাসঙ্গীর গায়ের ওপর থেকে
চাদর সরিয়ে দেখি, সে ওখানে নেই!
একটি প্রাপ্তবয়স্ক আত্মজীবনী পড়ে আছে

কে যেন আমার দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাসের সঙ্গে
শয্যাসঙ্গীর অনুপস্থিতির বিবাহ পরিয়ে দিল–

তারা যখন তুমুল সঙ্গমে ব্যস্ত, আমি আত্মজীবনীর
একটি একটি পাতা খুলছি আর
নতুন নতুন পাতা এসে ভারি করে তুলছে স্মৃতি–

তারা আমাকে সঙ্গমে আহ্বান করছে– আর 
আমি তাদের মুক্তির কথা ভেবে
পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো ছিঁড়ে 
                  উন্মুক্ত উচ্ছ্বাসে উড়িয়ে দিচ্ছি

অভ্যাসবশত ভোরবেলা– আমাদের সন্তান যখন 
                   আমার গায়ের চাদর ধরে টান দিলো– 
দেখলো, আমাদের দু’জনের কেউই তখন 
                                 নেই ওখানে!

মনে মনে ভাবলাম, প্রত্যেকের মুক্তির জন্য
কেউ-না-কেউ একজন থাকেই প্রান্তরে 
***

রক্তের ধারা
✍️
মাছবাজারে যে মাছটির দরদাম নিয়ে 
কথা কাটাকাটি হাতাহাতির দিকে যাচ্ছিল–
তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা
আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেলো

তখন মস্তকবিহীন কাতলের অবশিষ্ট দেহের দিকে তাকাতেই
আমার সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে গেলো

কাতলের যিনি প্রকৃত ক্রেতা ছিলেন
মানিব্যাগ থেকে মূল্য পরিশোধ করে বললেন–

“এ নিয়ে কিছু ভাববেন না হে
আজকাল মাছেরা যেভাবে রক্তপাত করতে শুরু করেছে
এভাবে চললে আপনি-আমি সবাই এমন রক্তে নেয়ে যাবো”

আর তৎক্ষণাৎ বাজারের সকল মৎস্যবিক্রেতা যার যার রক্তের ধারা
আবিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে গেল

কেউ বলল: আমি সেন বংশজাত, আমি পাল বংশোদ্ভূত, আমি...

এবং দেখা গেলো, বাজারে যে ক’জন ক্রেতা ছিলেন
শুধু তারাই ছিলেন মীনবংশজাত

যারা নিজেরাই নিজেদের মাংস ভক্ষণ করতে 
বাজারে এসে কথা কাটাকাটি থেকে রক্তারক্তি পর্যন্ত চলে যেতে পারে
 ***

যে গাঁয়ে সবাই রাজা
✍️
লাটিম নিয়ে খেলতে গিয়ে
পরাজয় থেকে আঁকতে শিখেছি বাঘ

অথচ কোনোদিন বাঘ বাঘ খেলিনি আমরা

আমাদের প্রহরা থাকত সুলতানপুর
ডালিমের মতো ভোর, মানুষে মানুষে মায়াবী প্রহর

ময়রা পট্টির সন্দেশ বিকোবার ঠোঙায়
সুদৃশ্য ভরাট শূন্য আঁকা ছিলো–

গারোয়ানের শৈশশের খাতায় শূন্য দেখে 
ঘরে ফিরে এঁকে ফেলি বিকল্প চাবুক

অথচ ঘোড়া ও চাবুক কোনোদিন খেলিনি আমরা

কতো কী খেলে গেছি ‘প্রযত্নে : সুলতানপুর’ লিখে!
অনর্গল ফুটফাট, নামে-ধর্মে কতো কী কাটাকুটি ছিলো!

অথচ কাটাকুটিজুড়ে রক্তপাত ছিলো না কোথাও

কী ভীষণ রাজায় রাজায় যুদ্ধ করেছি
অথচ সুলতানপুরের সিংহাসন 
           কখনো রাজার প্রয়োজনে ছিল না
 *** 

ব্যর্থ মানুষ
✍️
তখন থেকেই আমরা ভাবতাম
সুলতানপুর প্রাথমিক এবং উচ্চ বিদ্যালয়ের 
আঁটসাঁট দেয়াল কিংবা বাঁশের বেড়াগুলো 
একদিন আর অক্ষত থাকবে না

তাতে অসংখ্য সুপণ্ডিত দরজা বসানো হবে
দেশি-বিদেশি বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে
যাতে অনায়াসে বেরুতে পারে এ-গাঁয়ের প্রবল সম্ভাবনা

এবং গ্রামের সদর প্রবেশমুখ থেকে জন্ম নেবে অগণিত 
প্রধান দরজা
যারা মেধাবী উচ্চাশাগুলোর আসা-যাওয়ায় সদা তৎপর হবে

কিন্তু আমরা ভাবতে ভুলে গিয়েছিলাম যে
স্কুল কিংবা গাঁয়ের অনায়াসগম্য দরজা ব্যবহার করে 
একবার কেউ বেরিয়ে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না

এবং কালেভদ্রে হঠাৎ কারো ফিরে আসাকে গাঁয়ের মানুষ নাম দেয়
ব্যর্থ জীবন

ব্যর্থ মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধান কাটতে গেলে, গরু চড়াতে গেলে
লোকেরা আক্ষেপ করে : হায়রে জীবন!

ব্যর্থ জীবন পাখিদের মুখরতা ঘিরে কবিতা লিখলে, গায়েন হইলে
মানুষ আক্ষেপ করে : আহারে জীবন!
 ***

সম্পাদকীয় নোট
✍️
কৃষ্ণচূড়ার বেদিতে যখন 
একক বক্তৃতা দিতে দাঁড়াতাম

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায় শ্রোতা হতো
ভাতশালিক-দোয়েলের অঢেল কথকতা
এভাবে রচিত হতো সুলতানপুরের ক্যানভাসে 
সম্পাদকীয় নোট

বৃক্ষপত্রে-বাকলে পত্রিকার শিরোনাম হতো
কানাকুয়োর কানকথা, ডাহুকের প্রসব বেদনা

আর আলোকচিত্র জুড়ে বসতো
ময়না-সারস টিয়ে-মাছরাঙার প্রেম

ফুলেদের জীবন ফুরাত দেবতার নৈবেদ্যে
আর মানুষ নিজেকে হারাত জনহিততায়

একক বক্তৃতার কোনো ধারাবিবরণী
কখনো কি ঠাঁই পেয়েছিল পাখিদের প্রচারযন্ত্রে!
 ***

ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই
✍️
বকুলফুল কুড়িয়ে এনে
মঙ্গলবারের অপেক্ষায় সোমবারের উঠোনে এসে দাঁড়াতাম

সোমবার ছিলো আদরণীয় আর
মঙ্গলবার ঘিরে প্রচলিত ছিলো নানা অমঙ্গলের কথা

শিশুমনে এই প্রথম অসামঞ্জস ঘটে যেতে দেখি–

বিদ্যায়তনের পাঠ একদিন কৈশোরক আঙুল উঁচিয়ে বলে
‘সবার উপরে মানুষ সত্য’

অথচ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি
মানুষের কোনো জীবনী তাতে নেই

পড়তে হয় সেন পাল মুঘল বাদশাহের প্রসিদ্ধ জীবনী

পৃথিবীতে এতো এতো সুলতানের কথা শুনি
অথচ সুলতানপুরে একজনও সুলতান মেলে না

বুকের ভেতর বাদানুবাদ ঘটে যেতে দেখি–

সুলতানপুরে থোকা থোকা হাড়জিরজিরে 
অনাহারী, অর্ধাহারী মানুষের মুখ দেখে ভাবি
বৈপরীত্য লেখা থাকে যে কোনো স্বখ্যাত নামে

বাগানে ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই
অথচ ঝরে পড়ার আছে করুণ মর্মর ধ্বনি
 ***

ভাঙা টুল, সিংহাসন ও স্ত্রীবিষয়ক
✍️
এবার ঈদে তেমন কোনো আনন্দ নাই!

তাই আমার স্ত্রী 
এবার বাংলা ফেলে 
চাইনিজ রানছে
আর একা একা রান্নাঘরের ভেতরে বসে কাঁপছে–

এদিকে উনুনে গরম পানি, লেবুর রস
এক পেয়ালা মধু, আদার কুচি, লবণজলের গড়গড়া
আর ফুটন্ত পানির ভাপ...
তারা রান্নাঘরের সমস্ত চাইনিজ-প্রকার উল্টে দিয়ে
এক রকম ধোঁয়ার সিংহাসন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে

আমাকে দেখেই আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় স্ত্রী
তার ভাঙা টুলটি উঁচিয়ে প্রচণ্ড ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললে:
“এসব বদলাতে পারো না?
বসতে গেলেই খালি কটমট করে
জামা ছেঁড়ে, ওড়না ফাড়ে
আর সারাক্ষণ কেমন পড়ে যাবার ভয়!”

আমি তাকে শান্ত হতে বলি
বলি যে, আচ্ছা অন্তত আজকের দিনটা...
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরো খানিক খেঁকিয়ে উঠে বলে:
“এসব গাঁজাখুরি সংসার আমার ভাল্লাগে না, বুঝছো!
খালি নিজেরটা বুঝো
এই তুমিই না একদিন কইছিলা– ‘শোনো, ভাঙা টুল আর 
সিংহাসন– চরিত্রে একই রকম হয়!
সারাক্ষণই খালি পড়ে যাবার ভয়!’
এইবার বুঝছি তোমার চালাকি
তুমিও আমারে টুল থিক্যা ফালায়া হাত-পা ভাঙতে চাও
আর সিংহাসনচ্যুত রাজার মতো দুনিয়ার হতভাগা আর একা বানাতে চাও
 
আর সেই চান্সে একা একা তুমি মনের মতো গাছে গাছে পোস্টার ঝুলাবা জানি:
‘আহা কী নিঃসঙ্গতা’! ‘ও পরম একাকিত্ব’! ‘হে কবিতা’!”
***

অক্ষরেরা উড়ে উড়ে পাখি
✍️
কবিতায় পদ্য মেশাতে গিয়ে যে লোকটি ধরা পড়ে গেলো
দীর্ঘকাল ধরে তাকে আর দেখাই গেলো না

অথচ তার স্ত্রী বলছে, লোকটি ভালো মানুষের মতো ছিলো!
কন্যা বলছে, বাবার হাত যেন চন্দ্র-সূর্যের স্রষ্টা!
আর প্রতিবেশি একদল পুরুষ:
যাদের কারো উঁচু বুক, লম্বা চুল, শার্ট ও কামিজের মাঝামাঝি পরিধেয় পরে 
প্রতিদিনের মীমাংসা ঘটান
শুধু তারাই লোকটির প্রতিপক্ষ আজ!

সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যারা 
মধ্যরাতে লোকটির কাছে খাবার পৌঁছে দেয়
তাদেরও আছে লোকলজ্জা, পুলিশের ভয়–

একদিন আমি নিশি রাইতে তাদের সঙ্গী হতে চাইলে 
এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে আমাকে বলে:
‘ঘুমের সঙ্গে রাত্রি কিংবা দিনের সঙ্গে নিদ মেশানোর দায়ে 
ধরা পড়ে যাবেন! মেনে নিতে হবে নির্বাসন!’

এসব কথার আগামাথা না বুঝেই আমি দুপাশে তাকিয়ে দেখি:
একদিকে জীবনানন্দ দাশ আর অন্যদিকে শক্তিদা’র মুখ 
কেমন নির্ভার চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

আমারও দুঃসাহস বাড়ে
তাদের পিছে পিছে মধ্যরাতে ধরাপড়া লোকটির কাছে যাই
আমাকে দেখেই লোকটি হোহ হোহ করে প্রাণ খুলে হাসে, হাসে 
এবং কাশে–
আর আমি তাকে বলি:
 
‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’!
 ***

বাণিজ্য ঘুমিয়ে গেলে তুমি বাংলাদেশ
✍️
ম্যাকডোনাল্ডসে খেতে বসে
ভাতের অর্ডার দিতেই একজন 
তেড়ে এসে অসহ্য ইংরেজিতে বলল: 
“আপনি কি এখনো আগুনেই ঘুমান আর উত্তাপে জাগেন?”

আমি তিরস্কার টের পেয়ে– কিছু না বোঝার ভান করেই আবার বলি: 
“ভাত, সাদা ভাত, সঙ্গে ইলিশ মাছের ঝোল দেন”

মুহূর্তে সমস্ত রেস্তরাঁর মনোযোগ আমার দিকে হামলে পড়েছে
বলিভিয়ান মেয়েটি কচ্ছপের পিঠের মতো বড় চোখ করে দেখলো
জ্যামাইকান ছেলেটি তার আইরিশ বান্ধবীর দিকে এমন করে তাকালো যে
এমন কথা তারা জীবনে শোনেনি!

এদিকে আমার দুইপাশে কখন এসে দাঁড়িয়ে গেছে দুইজন গানম্যান!
ম্যান! মানে তারা দুইজনেই সটান-বুক লেডি! 
তাদের শরীরে ঝোলানো নেমপ্লেট দেখে বুঝলাম:
দুটি মেয়েই এসেছে ক্ষুদ্র দেশ দ্য রিপাবলিক অব পালাউ এবং
সেন্ট কিটস এ্যান্ড নেভিস পেরিয়ে

অথচ মনে হলো, দেশদুটো ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বটে, বিস্তৃত হৃদয় তাদের– পদ্মার সমান!
কেননা তাদের একজনের মুখে এইমাত্র টাটকিনি মাছের ঝোলে 
ভাত খেয়ে আসার সুরভি; আর একজনের শরীরে তাজা বরষার
কেতকী ফুলের মই মই ঘ্রাণ

আমি গদগদ হয়ে নিপাট বাংলায়ই বলি তারা আমাকে 
কোনো বাঙালি রেস্তরাঁয় পৌঁছে দিতে এসেছে কিনা

নির্বাক তারা বন্দুকের নল উঁচিয়ে আমাকে ইশারা করলো– সামনে হাঁটুন

যেতে যেতে তারা একটি পদ্মপাতায় ছাওয়া 
বাঁশ-বেতের আবাসনালয়ে ঢুকিয়ে একে একে বসন খুলতে শুরু করলো– 

তাদের ত্বকের এবং চুলের পরিচ্ছদ খোলার দৃশ্যে যতোটা না 
তাদের যুবতী দেহের সর্বশেষ কাপড় খোলার দৃশ্য ভেবে
সলজ্জ মুখ ঘুরিয়ে থাকি। আর মেয়ে দুটি সহজাত লোকজ বাংলায় বলল, “ভাই,
একটু সামনে তাকান দেখি!”

আমি দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে টাঙ্গাইলের মহার্ঘ তাঁত
আর ঢাকাইয়া জামদানি আঁকা অপূর্ব দুই বাংলাদেশ!
একজন বিলকিস আর একজন কৃষ্ণকলি শেফালী তাদের নাম!

তাদের রান্নাঘর থেকে ছুটে আসছে আমাকে আপ্যায়নের
ইলশে-ঝোলের ধোঁয়া, পুইশাক আর কালো বেগুনের সাথে
খলসে মাছের চচ্চড়ি...
***

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ