কথাসাহিত্যিক হারুন পাশা
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
হারুন পাশা কথাসাহিত্যিক [জন্ম. ১০ নভেম্বর ১৯৯০]। তাঁর লেখালেখির শুরু ২০১২ সাল থেকে। তিনি গল্প-উপন্যাসের বর্ণনায় লেখককে অনুপস্থিত রাখেন। গল্প-উপন্যাসে চরিত্ররাই কথক। তাদের কথনেই কাহিনি এগিয়ে যায় শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। আখ্যানে এক চরিত্র গল্প শোনায় আরেক চরিত্রকে কিংবা নিজেরাই বলে নিজেদের গল্প। ওই গল্প থেকে আমরা জানতে পাই দেশ, সমাজ এবং মানুষের সংকটাপন্ন জীবনকথা। কখনো আঞ্চলিক ভাষায় আবার কখনো প্রমিত বয়ানে উঠে আসে সংকটের গল্প। নতুন এই প্রকাশরীতি পাঠককে মুগ্ধ রাখে, আখ্যানে। তিনি লেখেন পিতার সম্মান বৃদ্ধির জন্যও। তিনি গল্প-উপন্যাস লেখার প্রয়োজনে দেশের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় যান। পছন্দ : মানুষের সঙ্গ। ভ্রমণ। অন্যের কাছ থেকে গল্প এবং গান শোনা। অবসর কাটে : বই পড়ে। গান শুনে। নাটক-সিনেমা দেখে। তাঁর জন্ম রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার তালুক শাহাবাজ গ্রামে। পিতা আক্কাস আলী ও মাতা ফাতেমা ইয়াসমীনের ষষ্ঠ সন্তান। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে ¯স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। অর্জন করেছেন এম.ফিল অ্যাওয়ার্ড। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সাল পর্যন্ত পেয়েছেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৮’ এবং ‘শওকত ওসমান সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯’।
তাঁর সাথে দীর্ঘ কথোপকথনে উঠে এলো এক ভিন্নমাত্রিক স্বর।পাঠকের ভালো লাগবে এই আলাপচারিতা দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রশ্ন:১
কবে কি রকম লেখালিখি শুরু।শুরুর দিনগুলোর আলোচনা চাই।
হারুন পাশা : লেখা বলতে গল্প-উপন্যাস হলে এর শুরু ২০০৯ সালে। আর লেখার প্রকাশসাল ২০১২। ২০০৯ সালে প্রথম গল্প লেখা শুরু করি ‘দিনভর প্রহসন’ শিরোনামে। আর ২০১২ সালে প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বেকারদের আর্তনাদ’।
প্রথম যে গল্পটি লেখা শুরু করেছিলাম তা শেষ হতে সময় লেগেছিল ৫ বছর। ৫ বছরের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন গল্প লিখেছি কিন্তু ওই গল্পটা শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল।
আর ভিন্ন কিছু লেখার শুরুটা ছিল ২০০০ সাল। তখন গান লিখতাম। এরপর ২০০৭ এর পর কবিতা লিখতাম।
প্রশ্ন:২.
আপনার গল্প-উপন্যাসে কথন আঞ্চলিক ভাষায় হলেও প্রমিত উচ্চারণেও আপনি এই অর্জনের নেপথ্যের শিল্পবয়ন শুনতে চাই।
হারুন পাশা : আঞ্চলিক ভাষা হলো আমার জন্মগতভাবে অর্জন। কারণ আমার পরিবারে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষাচর্চা হত এবং বাসার বাইরে চর্চা করতাম রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা। আর প্রমিত ভাষা নিজের চেষ্টা করে শেখা। এ শেখার চর্চাটা একদম ছোটোবেলা থেকেই ছিল আমার মধ্যে। আমি ছোটোবেলা থেকেই চেষ্টা করতাম অন্যদের থেকে আলাদা হতে। কথা বলা কিংবা আচরণ কিংবা মানুষের স্বভাবগত আর সব ব্যাপারে।
আমার চারপাশে যারা আছেন তারা যেরকম আমি সেরকম হতে চাইনি ছোটোবেলা থেকে বড়োবেলা পর্যন্ত। আমি আলাদা হতে চেয়েছি সব সময়ই। ফলে ভাষাগত ব্যাপারটাও এরকমই। আঞ্চলিক ভাষা তো সবসময়ই চর্চা হয়। এমনকি আমার চরিত্ররাও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। আবার প্রমিত ভাষাতেও বলে। ঘটনা কিংবা পরিবেশ-পরিস্থিতি তাকে ঠিক করে দেয় সে কোনো ভাষায় কথা বলবে। নেপথ্যের গল্প এমনই।
প্রশ্ন :৩
আপনি গল্প বলেন, লেখেন। লেখেন উপন্যাস। এতে উপস্থিত দেশ,সময় সমাজ এবং মানুষের জীবনকথা। এগুলোর কথাই আমাদের একটু বলুন। চরিত্র নির্মানের মৌলিকত্ব বিষয়ে আপনার গোপন কৌশল বলুন?
হারুন পাশা : আমার সময়কালে আমার দেশ, সময়, সমাজ এবং চারপাশের মানুষ কেমন আছে তা জানতে আমার তুমুল আগ্রহ। এই আগ্রহ ফোর্স করে তাদের লিখতে। বিদ্যমান সংকট আমাকে বেশি পীড়িত করে। ফলে সংকটের কথা। আমার সব গল্প এবং উপন্যাসে আছে দেশ-বহির্বিশ^, সমাজ, সময় এবং মানুষের সংকটের কথা।
আমার গল্প-উপন্যাস যেহেতু চরিত্রপ্রধান সেহেতু তারাই রিপ্রেজেন্ট করে নিজেদের সংকটের কথা। সেইসঙ্গে চলে সময়, সমাজ ও দেশ-বহির্বিশে^র সংকটের প্রসঙ্গ। তাদের কথাতেই নানামাত্রিক সংকট উঠে আসে।
আমার সাহিত্যে চরিত্র নির্মাণের মৌলিকত্ব হলো চরিত্ররাই গল্প-উপন্যাসে দাপুটে। তারাই জীবন ও জগতের ব্যাখ্যাকারক। তাদের কথনেই গল্প-উপন্যাস সমাপ্ত হয়। লেখক এখানে গৌণ। চরিত্ররাই মুখ্য।
প্রশ্ন : ৪
সৃষ্টিসুখের উল্লাসে আপনি দেশ বিদেশে ঘুরেন।আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা কেমন করে সাহিত্যে আসে?
হারুন পাশা : আমি যখন কোনো কিছু লিখব বলে স্থির করি তখন ওই বিষয়ে ভালো করে জানার চেষ্টা করি। যে স্পট আমার লেখায় আসবে সেই স্পটে যাই। তা যতদূরেই হোক না কেন। ওই মানুষদের সঙ্গে কথা বলি। তাদের জীবনাচারণ, ওইখানকার পরিবেশ, ঘটনাবলী ভালো করে জানি। জানি ওইসবের অতীত ও বর্তমান। স্পটে যেতে হলে ভ্রমণ করতে হয়। ভ্রমণ করে এবং ওইখানকার মানুষের ইন্টারভিউ করে যা জানি তা নিয়ে লিখতে বসি। লিখতে লিখতে নতুন কিছু যোগও হয়। ভ্রমণ হয়ে যায় লেখার ভাইটাল পার্ট।
প্রশ্ন :৫
আপনার পারিবারিক পরিবেশ কেমন?
হারুন পাশা : আমার পারিবারিক পরিবেশ আমার লেখালেখির উপযোগী। আমাদের লেখক হওয়ার চেষ্টায় তাদের সহযোগিতা ছিল না, আবার বিরুদ্ধও ছিল না। আমার স্বাধীনতা ছিল। তাছাড়া আমার সিরিয়াল ভাইবোনদের মধ্যে মাঝামাঝি ছিলাম। মাঝের সন্তানরা এমনিতেই বাবা-মায়ের কম খেয়ালে থাকে। তাদের নিয়ে অত চিন্তাও থাকে না। যা চিন্তা বড়ো এবং ছোটোদের নিয়ে। ফলে আমি তাদের কড়া নজরদারির বাইরেও সামান্য ফাঁক পেতাম। নিজের মতো থাকতে পেতাম। নিজের মতো বই পড়তাম।নিজের মতো দৌড়াদৌড়ি করতাম। নিজের মতো থাকতে পারাটাও সৌভাগ্যের ছিল।
তারপর যখন লেখালেখির চূড়ান্ত শুরু ও প্রকাশ তখন তো আমি বাড়ির বাইরেই থাকছি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার জন্য রাজধানী ঢাকায় চলে এলাম। এখানে এসে কী করছি না করছি পরিবার তো জানতে পায় না। আমি জানালেই কেবল জানে। টিভি বা পত্রিকায় আমার কোনো কিছু বেরুলে আমার সম্পর্কে জানে।
প্রশ্ন :৬
কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ স্মৃতি?
হারুন পাশা : বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখের স্মৃতি হলো এ সময় প্রচুর পড়তে পেরেছি এবং এ সময় অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা ও পড়ার জন্য প্রচুর সময় বের করতে পেরেছিলাম। লাইব্রেরি ওয়ার্ক করতাম। লাইব্রেরিতে এত বেশি সময় কাটাতাম যে, ওইখানে দায়িত্বরত সবাই আমাকে চিনতেন। আমাদের লাইব্রেরির নিয়ম ছিল যেখানে বইয়ের সেলফ সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা যেতে পারবে না। সেখানে যাবে কেবল শিক্ষকরা। কিন্তু সেখানে আমি যেতে পারতাম। দায়িত্বরতরা আমাকে যেতে দিতেন। এর ফলে আমার প্রয়োজনীয় বইগুলো পড়তে পারতাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমার বইপাঠের উৎকৃষ্ট সময়। এ সময় ১৫০ বছরের সাহিত্য পড়েছি। দীর্ঘ পাঠাভিজ্ঞতা থেকেই জেনেছি কীভাবে লিখতে হবে এবং কী লিখতে হবে।
প্রশ্ন :৭
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আপনি ঢুকে গেছেন এ আমাদের প্রাপ্তি। সাহিত্যে আপনার উপস্থিতি বাংলাদেশকে নয় গোটা বাংলাসাহিত্য সমৃদ্ধ করবে।কেমন দেখেন বিষয়টি?
হারুন পাশা : আমার উপস্থিতি বা লেখনীতে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে এ আভাষ আপনি পাচ্ছেন এটা একজন লেখকের জন্য অবশ্যই দামী ব্যাপার। আপনাকে ধন্যবাদ। আমার পক্ষ থেকে বলার হলো সাহিত্যকে নতুন কিছু দেওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং শেষজীবন পর্যন্ত চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
প্রশ্ন : ৮
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, কায়েস আহমেদ, মঈনুল আহসান সাবের, শহীদুল জহির, মামুন হুসেন, নাসরীন জাহান, শাহাদুজ্জামান, ইমতিয়ার শামীম, হরিশংকর জলদাস প্রমুখের উত্তরসূরী হিসেবে কেমন লাগে এই অবস্থান?
হারুন পাশা : এটা নিঃসন্দেহে ভালোলাগার। আপনি যাঁদের কথা বললেন তাঁদের কেউ কেউ কিংবদন্তিতুল্য কথাসাহিত্যিক। তাঁদের সাহিত্যে নিজস্ব নির্মাণরীতি আছে। তাঁরা স্ব স্ব অবস্থানে উজ্জ্বল। আর আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি নিজস্বতায়।
প্রশ্ন :৯
'বাংলাভাষা ও আইনচর্চায় গাজী শামছুর রহমান' শিরোনামে করা গবেষণার পাণ্ডুলিপি রেডি আপনার।একটু বলবেন কেমন লাগছে বিষয়টি?
হারুন পাশা : এটা বাংলা একাডেমির গবেষণাকর্ম। এ পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। পরিশ্রম শেষে পাণ্ডুলিপি গোছানো সমাপ্ত হলে তত্ত্বাধায়ক যখন বলেন, পুরো পাণ্ডুলিপিটি পড়েছি। পাণ্ডুলিপিটি গবেষণাকর্মের বড়ো জায়গা ছুঁয়ে রচিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি মানসম্মত পাণ্ডুলিপি, তখন তো এটা চমৎকার প্রাপ্তি।
প্রশ্ন : ১০
আপনার প্রকাশিত তিনটি উপন্যাস তিস্তা, চাকরিনামা এবং বদলে যাওয়া ভূমি নিয়ে জানতে চাই।কী কী বিষয় নিয়ে লেখা এ তিনটি উপন্যাস?
হারুন পাশা : আমার প্রথম উপন্যাস ‘তিস্তা’, দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চাকরিনামা’ এবং তৃতীয় উপন্যাস ‘বদলে যাওয়া ভূমি’। তিনটা উপন্যাস তিনরকম বিষয় নিয়ে। বিস্তারিত বলবো যে বিষয়গুলো এসেছে উপন্যাসে।
‘তিস্তা’ উপন্যাস বাংলাদেশ ভূখণ্ডের তিস্তা নদী নিয়ে। পানি না থাকায় নদী শুকিয়ে গেছে। তিস্তাবাসীরা পানি পাচ্ছে না, ঠিকমতো আবাদ করতে পারছে না। নানা সমস্যায় আক্রান্ত নদী ও মানুষ। তাদের আখ্যান ‘তিস্তা’। আমাদের সমাজবাস্তবতায় বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে, কিন্তু কর্মের ব্যবস্থা সেরকম হচ্ছে না। বেকার সব সময় অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের কাছে। এমনকি প্রেমিকার কাছেও। বেকারের মনোকষ্ট, বঞ্চনা, সংগ্রাম, সফলতার আখ্যান হলো ‘চাকরিনামা’। করোনা আমাদের সব কিছুই উলট-পালট করে দিয়েছে। বদলে গেছে সমাজ ও দেশের সাথে মানুষের মনস্তত্ত¡ ও অর্থনৈতিক অবস্থান। বদলে গেছে বিশ্বরাজনীতি। সব কিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখা ‘বদলে যাওয়া ভূমি’।
প্রশ্ন :১১
"পিতা, পুত্রের লেখা উপন্যাস ‘তিস্তা’ দেখলেন, কিছুটা পড়লেন। এর আগে সময় টিভিতে ‘তিস্তা’ নিয়ে প্রচারিত সাক্ষাৎকারটি দেখেছিলেন, পুরোটাই। সে বিষয়েও বললেন। পুত্রের উপর পিতার কনফিডেন্স বাড়ছে।"এ বিষয়ে আপনার আরো কথা শুনবো।
হারুন পাশা : বাবা আমার লেখক জীবন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। পাড়া-পড়শীরা তাঁর চিন্তাকে আরো বেশি উদ্বেগের করে তুলতেন। ‘তিস্তা’ উপন্যাস বেরুলে এবং দুটি বড়ো পুরস্কার অর্জন করলে তিনি আনন্দিত হন। তাঁর আনন্দ আরো বাড়ে যখন টেলিভিশনে আমার সাক্ষাৎকার দেখেন এবং জাতীয় দৈনিকে আমার ছবি ও লেখা দেখতে পান তখন। নিজের পুত্রকে টেলিভিশনে দেখতে পেয়ে সম্মানিত বোধ করেছেন। আনন্দিত হয়েছেন। ভরসা রাখা যায়। অর্থনৈতিকভাবেও সাপোর্ট নিতে পারবে। পিতা তো পুত্রের উপর আস্থা রাখতে পারে। আর এই আস্থা রাখাটা পুত্রের জন্য গর্বের।
আর আমার পিতা আমাকে টিভিতে দেখে সম্মানিত বোধ করেন এতে আমারো ভালো লাগে। পিতার সম্মান যাতে বৃদ্ধি পায় সেজন্যও আমি লিখি।
প্রশ্ন :১২
"হয় নতুন স্বর তৈরি করো, না হয় গোল্লায় যাও। লেখালেখি ছেড়ে ব্যবসা করো। সংসার করো।" আপনার এই উচ্চারণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনি নিজস্ব স্বর বাঁক কিংবা উচ্চারণ করতে পেরেছেন বলে আমরা পাঠক এবং বাংলাসাহিত্যের আলোচকেরাও স্বীকার করেন।এ বিষয়ে আপনার দীর্ঘ ভাবনা জানবো আগামীদিনের লেখক গঠনে এই আলোকপাত কাজে আসুক চাই।
হারুন পাশা : সাহিত্যে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে নতুন স্বর তৈরি করা জরুরি। নিজের বলার ভঙ্গি থাকা জরুরি। নিজস্বতা না-থাকলে পরনির্ভরতা নিয়ে বেশিদিন লাস্টিং করা যায় না। আমাদের সাহিত্যে যাঁরা স্থায়ী আসন করে রেখেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নতুন স্বর কিংবা প্রকরণরীতি নির্মাণ করেছেন বলেই টিকে আছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা বাংলাদেশের দুই সৈয়দ (ওয়ালীউল্লাহ ও শামসুল হক), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক কিংবা শহীদুল জহির নিজস্ব স্বর বা প্রকরণরীতি তৈরি করেছেন বলেই তাঁরা আজ অবধি আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছেন। নইলে তারা হারিয়ে যেতেন। এজন্য নতুন কিছু সাহিত্যে যোগ করতে না পারলে টিকে থাকা দুরূহ।
প্রশ্ন :১৩
"রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না করা গেলে দেশের ভেতরেও একটা কাশ্মীর কিংবা ইসরায়েল গড়ে উঠবে।" ব্যাখা করে বললে আমরাও বুঝতে পারি। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জীবনের বিপন্নতায় মানবসভ্যতা মানবিক না হলে কে হবেন?
হারুন পাশা : বাংলাদেশের ‘মানবসভ্যতা’ মানবিকই। মানবিক না-হলে দেশকে ঝুঁকিতে ফেলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিত না বাংলাদেশ। খেয়াল করলে জানবেন ভারত, পাকিস্তান, চীনের মতো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী দেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়নি। চীন বিশ^ ক্ষমতায় এখন এক নম্বর দেশ। ভারত চীনের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতা লাভ করেছে। কিন্তু ভারত কিংবা চীন রোহিঙ্গাদের দিকে ফিরেও তাকায় নাই। তারা আশ্রয় দেয় নাই। আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।
মানবিক হতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের অমানবিক আচরণ আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে। তারা আমাদের প্রকৃতি নষ্ট করেছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা বাড়িয়েছে। কক্সবাজারের মানুষদের সঙ্গে মারামারি করছে। রোহিঙ্গাদের কারণে আশেপাশের এলাকার মানুষের শান্তি নষ্ট হয়েছে, নিত্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে তারা এদেশে থাকতেই এসেছে, যেতে নয়।
প্রত্যেক বছর যে হারে রোহিঙ্গা-শিশুর জন্ম হচ্ছে আগামী পঞ্চাশ বছরে তাদের সংখ্যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার সমান হয়ে যাবে, এমনকি বেশিও হতে পারে। তখন তারা নিজেরা স্বাধীনতালাভের জন্য আন্দোলন করতে পারে, নিজস্ব ভূখণ্ড দাবি করতে পারে। না দিলে জোর করে দখল করে নিবে। অবস্থা দাঁড়াবে ইসরায়েল ও কাশ্মীরের মতো। এটাই বোঝাতে চেয়েছি। আর এ অবস্থা সত্য সত্যই তৈরি হলে বাংলাদেশ বড়ো প্রকারের বিপদে পড়বে। বলা যায় বাংলাদেশকে বিপদে ফেলার জন্যই বড়ো রাষ্ট্র রোহিঙ্গা ঢুকিয়ে দিয়েছে।
প্রশ্ন:১৪
আপনার গল্পে-উপন্যাসে কবিতা, ছড়া ও গানের বিভিন্ন পঙক্তি ব্যবহার করেন।কখনো নিজের কখনো অন্যেরও। এ থেকে কি বার্তা দিতে চান?
হারুন পাশা : কবিতা, গান, ছড়া গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। গল্প-উপন্যাসের প্লটের সঙ্গে মিশে গিয়ে নির্ধারিত বিষয়ে পাঠককে তথ্য দেয় কিংবা নির্ধারিত বিষয়কে পোক্ত করে। আমার সাহিত্যে ব্যবহৃত কবিতা, ছড়া, গান, প্রবাদ প্রত্যেকটি মিনিংফুল। চরিত্রের বক্তব্যকে সমৃদ্ধ করে এবং তাদের অপ্রকাশিত কথা প্রকাশ করে।
প্রশ্ন :১৫
কী লিখি কেন লিখি?
হারুন পাশা : আমি লিখি গল্প এবং উপন্যাস। গল্পের বই করিনি এখনো; উপন্যাস বেরিয়েছে তিনটি। তিনটি উপন্যাস তিন ধরনের বিষয় নিয়ে লেখা।
কেন লিখি?
এক কথায় উত্তর করা খুবই কঠিন। বেশি কথায় বলতে গেলেও সব বলে উঠা যাবে না। কম-বেশির মাঝে একটা হিসাব দাঁড় করিয়েই বলছি কেন লিখি গল্প-উপন্যাস।
এজন্য জীবনের ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে। ছোটোবেলা, মানে স্কুলে যাওয়ার বয়স থেকেই আমার চারপাশে যা দেখতাম তা বিশ্লেষণ করতাম। গল্প আকারে সাজাতে চাইতাম। বলতে চাইতাম। ছোটো ছোটো ঘটনা আমাকে আনন্দ দিত। আমি সেসব বিশ্লেষণ করে আনন্দে ডুবে থাকতে পছন্দ করতাম। আমি তো তেমন কারো সঙ্গ পেতাম না। এজন্য ঘটনা বিশ্লেষণের আনন্দ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে চাইতাম না, হয়তো। একজন সঙ্গহীন বালক হিসেবে লেখার চেষ্টা করতে থাকি।
আমার গল্প শুনতে ভালো লাগে। গান শুনতে ভালো লাগে। মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে। কিন্তু এসব হয়ে উঠত না। শৈশব-কৈশোরে গল্প শোনাবে এমন কাউকে পাইনি। গল্প শোনার জন্য আমাদের বড়ো ভরসা হয়ে উঠেন দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি। আমি এতটাই অভাগা যে, আমার জন্মের আগেই তাঁরা মারা গেছেন। পরের ভরসা হলো বাবা-মা। আমার মা রান্না কিংবা সংসারের কাজ এবং আট ভাইবোনকে সামলাতেই সময়হীনতায় থাকতেন। বাবা চাকরি করতেন। তাঁর অত সময় ছিল না আমাকে দেওয়ার মতো। ভাইবোনদের ভেতর বড়ো বোন সামান্য সময় দিতেন, কিন্তু তা পর্যাপ্ত ছিল না। আবার ঐ সময়টুকুতে কোনো গল্প-টল্প থাকত না। তাঁর পড়ালেখা, মাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা করা, অন্য ভাইবোনদের সামলানো। এজন্য আমার জন্য তাঁর সময় সামান্যের থেকেও ছিল বেশি সামান্য।
ফলে আমার গল্প শোনা হয়নি। সঙ্গ পাওয়া হয়নি। গল্প শুনতে না পারার অতৃপ্তি আর যন্ত্রণা ভুলতে আমি গল্প বলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। লেখার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেই গল্প-উপন্যাস। আর এটা হয়ে যায় আমার কথাসাহিত্যের প্রকরণগত বৈশিষ্ট্য। আমার গল্প-উপন্যাসে এক চরিত্র শোনায় গল্প আরেক চরিত্রকে কিংবা চরিত্র নিজেই বলে গল্প।
তাদের গল্পে থাকে দেশ-বহির্বিশ্ব, সমাজ, সময় এবং মানুষের সংকটের কথা। কেন লিখি এর উত্তরেই এত কথা বলা হয়ে গেল।
আমি লিখি সংকটের কথা। লিখি আমার সময়ের কথা। আমার উপস্থিতকালে আমার দেশ কেমন আছে, আমার সমাজ কেমন আছে, আমার চারপাশের মানুষ কেমন আছে- তা তুলে আমি গল্প-উপন্যাসে।
সংকট কিংবা বঞ্চনার আখ্যান আমাকে পীড়া দেয় এবং পীড়া থেকে মুক্তি পেতে লিখি। আমি বৃহত্তর জীবন কিংবা সামষ্টিক চেতনাকে ধারণ করি লেখায়। অনুভব করি সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমার লেখা দিয়ে সমাজ বা মানুষের কল্যাণ সাধিত হলে কিংবা রাষ্ট্র উপলব্ধি করতে পারলে বা সচেতন হয়ে সংকট সমাধানে সিদ্ধান্ত নিলে এটা হবে পরমপ্রাপ্তি। আমার লেখালেখির আর-সব কারণের মধ্যে এটাও একটি।
লিখি পিতার সম্মান বৃদ্ধির জন্যও। পুত্রের লেখা পড়ে কিংবা প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পুত্রকে দেখতে পেয়ে, পুত্রের কথা শুনতে পেয়ে তিনি যদি মনে মনে গর্ববোধ করেন এবং সম্মানিত বোধ করেন, এটা আমার কাছে অনেক বেশি দামি।
দেশ-বহির্বিশ্ব, সমাজ কিংবা মানুষের সংকটের প্রকাশ ঘটাতে লিখি। বাংলা কথাসাহিত্যে বিষয় ও প্রকরণে নতুন কিছু যোগ করার অভিপ্রায়েও লিখে চলছি।
প্রশ্ন : ১৬
আনস্মার্টরাই এখন বই পড়েন। স্মার্টরা বই সুন্দর থাকবন্দী করে শো করে আভিজাত্যপূর্ণ ড্রয়িং জুড়ে তন্ময় আড্ডায় বন্ধুদের সাথে মশগুল সময় কাটান।এ দলে লেখকেরাও কম নয়।বিষয়টি কেমন ভাবেন?আগামী প্রজন্ম তাহলে বই বিমুখ? কিংবা বই একদিন দেখানোপনাতেই সৌন্দর্য বাড়ানো টনিকের দায়িত্ব পালন করবে শুধু?যদিও হাতাশার কথা কিন্তু স্রোত প্রকাশনা ও সাহিত্য পত্রিকার সাথে ত্রিপুরায় কাজ করতে গিয়ে আমাদের এমন এক নৈব্যত্ত্বিক ধারনারও জন্ম দিচ্ছে। তা হয়তো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।তবুও বই নিয়ে আপনার নানা অভিঘাত অভিমুখ শুনবো?
হারুন পাশা : বইবিমুখ সমাজ বই পড়াটাকে মনে করে অনস্মার্টের লক্ষণ। বই না পড়ে আর সব কিছু করাটা হলো স্মার্টনেস। ঘরে ঘরে বই পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে স্মার্টফোন আর টিকটক-লাইকির একাউন্ট।
আর বাকিসব তো আপনিই বললেন। পরিস্থিতি এরকমই।
প্রশ্ন : ১৭ "আমি লিখি সংকটের কথা। এ সংকট হতে পারে দেশের, হতে পারে সমাজের, হতে পারে মানুষের। সংকটের কথাগুলো প্রকাশ করতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পাদকরা রিস্কি মনে করেন। তারা নীরস লেখা হলে ছাপতে আরাম পান। এটাও মন্দ কিছু না। তাদের নিজস্ব নীতি থাকতে পারে। কোনো কোনো সম্পাদক আবার ছাপেন রিস্কিটাও। এত শত সংকটের ভেতর কোনটাই বা বলবে, আর কোনটাই বা প্রকাশিত হবে। বললে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাধানও আসে। ফলে বলাটা কল্যাণেরও হয়।" নিজের কথা বলতে না-পারার সংকট নিয়ে একজন লেখকের ভাবনা জানবো?
হারুন পাশা : সনাতন ধর্মের মানুষদের সংকট নিয়ে লেখা গল্প একটি পত্রিকা ছাপতে রাজি না হলে এ পোস্ট দিয়েছিলাম। তারা জানিয়েছিল গল্পের সাহিত্যগুণ আছে কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপার যুক্ত থাকায় তারা ছাপতে পারে না, এতে তাদেরও দোষ নেই, কারণ গল্পটা ছাপলে তারা প্রশ্নের মুখে পড়বে। সমস্যা হবে।
১৩:০৮:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ