কবি ও গীতিকার শামসুল আলম সেলিম
মুখোমুখি
গোবিন্দ ধর
সৃষ্টিলোক আয়োজিত ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী উৎসব:২০১৭তে এসেছিলেন সিলেট থেকে শামসুল আলম সেলিম।তিনি যাওয়ার আগে আজ আমাদের বাসায় এসছিলেন।তাঁর সান্নিধ্য পাচ্ছিলাম গত তিন চার দিন। তিনি কবি ও গীতিকবি।সাতাশ বছর ধরে কবিতার পাশাপাশি গানও রচনা করেন।বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে বাউল সাধক রাধারমণ দত্ত, শাহ আব্দুল করিম, লালন,হাছন রাজারা যেমন বিশ্বের দরবারে সহজিয়া মরমী গান রচনা ও সুর করে পৌঁছে গেলেন মানুষের মনের গহীনে সেই ধারারই তরুণ সেলিম।গত তিন চার দিন তাঁর কাছে ছিলাম।মিশলাম।মনে হলো একজন প্রগতিশীল মানুষকে কাছে থেকে পেলাম।আমি তাঁর কবিতা গান আর কথা বলার ঢং এর কাছে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে গেলাম।কিছু কথা মুখোমুখি বসিবার....
(১)আমি:জন্ম আব্বা আর আম্মা নিয়া কিছু বলুন?
সেলিম:আমার জন্ম বাবার চাকরীস্থল সিলেটের হাবিবনগর চা বাগানে।আমার বাবা শফিক আহমদ,মা- মনোয়ারা বড় ভুঁইয়া।আমারা সাত ভাই বোন বাব মায়ের কাছেই জীবন শিখেছি,যে জীবন মানুষের কল্যানে কাজ করে।
(২)আমি:কেন লেখেন?
সেলিম:কেনো লিখি তা তো জানি না।শুধু এটুকুই জানি যে সমাজ সংস্কৃতির প্রতি একটা দায় আছে।যুগের প্রয়োজন হয় তো তাড়া দেয়,তাই কলম হাতে নিই।
(৩)আমি:কবিতার পাশাপাশি গান লিখেন না গানের পাশাপাশি কবিতা?
সেলিম:কবিতা দিয়েই লেখালেখি শুরু।প্রথম যৌবনে যা হয়,প্রেমের কবিতা দিয়েই কবিতার যাত্রা।প্রথম ছাপা হয় নবম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায়।ছোট বেলা মায়ের কণ্ঠে গান শুনতাম,ভালো লাগতো,খুব টানতো।ঘারকন্নার ফাঁকে ফাঁকে মা খালি গলায় গাইতেন।১৯৮১ তে গান শিখতে শুরু করলাম।তার পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতাম,গণসংগীত,লোক সংগীত।একদিন আমার সংগীতের ওস্তাদ মরহুম আলী আকবর খান আমাকে নির্দেশ দিলেন ' কোয়েলিয়া বোলে রে মায়ী' ইমন ঠাটের এই রাগপ্রধান গানটিতে বাংলা কথা বসিয়ে দিতে।নির্দেশ অনুযায়ী করে দিলাম ' প্রিয়ারও প্রেমে তাজমহল গড়ে শাজাহানে'।ওস্তাদজী সেদিন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।সেই থেকে ধীরে ধীরে গান লিখতে শুরু করি।একসময় বুঝতে পারলাম গাওয়াটা আমাকে দিয়ে যথার্থ হবেনা,থেকে গেলাম লেখাতেই।গান লেখার পাশাপাশি একটু আধটু কবিতা লিখি।
(৪)আমি:গীতিকবিতা ও শুধু গান কোথাও কোন তফাৎ থাকলে কি?
সেলিম:বাদ্যযন্ত্র সহযোগের আগে গানের বাণীটি একটি কবিতা।আমি তাকে গানের কবিতা বলি।তবে আধুনিক গান বলুন কিংবা লোকজ ধারার গান বলুন,সবখানেই কাব্য থাকা উচিৎ।যে গানে কাব্য নেই, তা হয় তো শুধু সুর আর যন্ত্রানুসঙ্গে শ্রবণযোগ্য হতে পারে কিন্তু উৎকৃষ্টতা পায় না।একটি মানোত্তীর্ণ গান নিঃসন্দেহে একটি উত্তীর্ণ কবিতা।
(৫)আমি:আপনি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। এ বিষয়ে বলুন?
সেলিম:আমি একজন সংস্কৃতিকর্মী।এটাই আমার পরিচয়।প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র অংশীদার।সংগঠক হিসাবে কতোটা সফল তা জানি না।
(৬)আমি:লালন রাধারমণ,হাছন আব্দুল করিমের আপনি উত্তরসরী।আপনি পুলক অনুভব করেন?
সেলিম:আমি গর্ব অনুভব করি।আমাদের হাজার বছরের বাঙালি লোকসাহিত্যের এ উজ্জ্বল সাধকরাই আমাদের বাতিঘর।তাঁদের পথ অনুসরণ করেই চলতে চাই।
(৭)আমি:আপনার এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো বলুন?
সেলিম:
১]গানেয়াল (অমর একুশের বইমেলা ২০১০)গীতিকবিতা।
২] ঠুনকো কাচের শব্দডিঙা (২০১৪) ষষ্ঠীপদি সনেট) কবিতা।
৩] অন্ধের কুর্নিশ (অমর একুশে বইমেলা ২০১৫) তানকা সনেট কবিতা।
৪] আয়নাঘর দুয়ার খোলা ( অমর একুশে বইমেলা ২০১৬) গীতিকবিতা।
(৮)আমি:কত সংখ্যক গান লেখা হলো?
সেলিম: সব মিলিয়ে দু' হাজারের মতো।
(৯)আমি:গানের সিডি গুলোর নাম বলুন?
সেলিম:হিসাব করে বলা মুশকিল।ন'য়ের দশকে অডিও ক্যাসেট,সিডি হতো,তখন অনেক গান হয়েছে।এখন সিডি বাজার মন্দা,সবাই করতে সাহস পায় না।গান হচ্ছে রেডিও টেলিভিশনে।বানিজ্যিক গানগুলো এখন ইউটিউভে চলে।
(১০)আমি:স্রোত ও সৃষ্টিলোক সম্মাননা কেমন লাগলো?
সেলিম:এক কথায় অনন্য।এর তুলনা হয় না।সবাই জৌলুশ দেখে,আমি দেখে এলাম হৃদয়ের বিশালতা।আমি কৃৃৃৃতজ্ঞ।
(১১)আমি:ত্রিপুরায় এই প্রথম এলেন কেমন লাগলো?
সেলিম:এ ভালোলাগা যে ভাষায় লেখা যায় না।
এ ভালোলাগা অন্তরে পুশি।বিশেষ করে আপনি ( কবি গোবিন্দ ধর) এবং গোপাল চন্দ্র দাস ( সৃষ্টিলোক সম্পাদক) যে মমতা ও ভালোবাসায় আবদ্ধ করলেন,তার কোনও তুলনা হয় না।ইচ্ছে হয় বার বার ফিরে আসি।
(১২)আমি:কাব্য আন্দোলনে তানকা বিষয়টা একটু যদি বলুন?
সেলিম:তানকা কবিতা আসলে একটু অন্যরকম,সহজবোধ্য নয়।তবুও আমি চেষ্টা করেছি সাধারণ পাঠক উপযোগি করতে।এটি প্রায় চারশ বছরের পুরনো জাপানি ফরমেট।বিজ্ঞরা বলেন তানকা হলো ' বিন্দুতে সিন্দুর ব্যাপ্তি'।আমি কতোটা পেরেছি জানি না।
(১৩)আমি:আপনি ক্লাসিক্যাল ঘরানার কবি।গীত রচনায় মুখর।ভারত বাংলাদেশের সম্প্রীতি রক্ষায় আপনাকে মনে রাখার মতোই অবদান আপনার।গানের ছয়টা বিভাগ নিয়ে একটু কথা হোক।গীত রচনায় এই স্থায়ী,অন্তরা, সঞ্চারী,আভোগ,আলাপ,আঁখর একজন রচনাকারের কিরকম মনে রাখতে হবে?
সেলিম:গান রচনার ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত বিষয় তো অবস্যই মাথায় রাখতে হবে,না হলে গানের কাঠামোই দাঁড়াবে না।এ ছাড়া সব চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হলো ছন্দ এবং মাত্রাজ্ঞান।আগের মতো এখন আর সঞ্চারির ব্যাবহার হয় না।স্থায়ী,আস্থায়ী এবং দু' অন্তরাতেই সীমাবদ্ধ।লোকজ ধারার গানগুলোতে নাম ভনিতা সহ তিন কিংবা চার অন্তরা থাকে।
(১৪)আমি:কিছুক্ষণ পরই বিদায় দিতে হবে।আমরা চাই আরও সহজ যোগাযোগ গড়ে ওঠার বিষয়ে কিছু বলবেন আপনি?
সেলিম: মন চাইছিলো না আপনাদের ছেড়ে আসতে,তবু যেতে তো হয় ই।অন্তরটা পড়ে থাকলো আপনাদের মাঝে।
হ্যাঁ,ভারত-বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিনিময় আরও বাড়াতে হবে।দু'দেশের মধ্যে বিনিময় যতো বেশি হবে ততোই সমৃদ্ধ হবে বাঙালি সংস্কৃতি।আমি চাই আপনারাও আসুন আমাদের মাঝে।আমরা বিনিময়ে ঋদ্ধ হই।
(১৫)আমি:সেতু বন্ধনে আপনার ভূমিকা মনে রাখবো।এই বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা বলুন?
সেলিম:সেতুবন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে আমি এ বছরেই বাংলাদেশ 'ভারত-বাংলা মৈত্রী উৎসব' আয়োজন করতে চাই।
ত্রিপুরাতে এসে কুমারঘাটের মানুষের যে উষ্ণ ভালোবাসা এবং অন্তরসান্নিদ্ধ পেয়েছি,তা কখনও ভুলবো না।বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়নে আপনার অক্লান্ত পরিশ্রম অনুসরণীয়।
আপনাদের এ সংগ্রাম চিরজীবী হোক।যাবার বেলা কবিগুরুর একটি গানের বাণী বার বার মনে পড়ছে 'তুই ফেলে এসেছিস কারে মন,মন রে আমার...
যাওয়ার আগে এক বিয়োগ ব্যথায় বুকটা কেমন কান্নায় ভরে গেলো।
মন চায় আরো একটু সময় আমাদের মাঝে থাকতে।তবু সময় বলছে বিদায় এবার তাঁকে দিতেই হবে।টা টা আর বুকে বুক লাগিয়ে গভীর ভালোবাসায় আলিঙ্গন শেষে আমরা পরস্পর পরস্পরের সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করি আবার দেখা হবার প্রত্যাশায়।
০৯:০৮:২০১৭
রাত:৮:৩০মি
কুমারঘাট।
0 মন্তব্যসমূহ