কী লিখি কেন লিখি রনি রেজা

কী লিখি কেন লিখি
রনি রেজা



কী লিখি কেন লিখি
রনি রেজা


জোনাক পোকার পিছু চলতে চলতে


আমি ছিলাম একটু নরম প্রকৃতির মানুষ। কিছু বন্ধুরা সেমি-প্রতিবন্ধীও ডাকত। খেলার মাঠে তো এক বড়ভাই ‘মরামানুষ’ উপাধী-ই দিয়ে দিলেন। এত ধীর, নড়ি কি চড়ি না; এমন টাইপ ছিলাম। দুরন্তপনা, হৈ-হুল্লুর বা দুষ্টুমিতে খুব বেশি পাওয়া যেত না আমাকে। এর অবশ্য বেশ কিছু কারণ আছে। একদম শিশুকালে আমার নাকি কী এক রোগ হয়েছিল। মাথার চুল, চোখের ভ্রু, গায়ের লোম; সব দুধসাদা হয়ে গিয়েছিল। আরো কিছু জটিল উপসর্গ ছিল যা ঠিকঠাক বলা মুশকিল। মা-ও খুব বলতে পারেন না। রোগের নামও কেউ আজ অব্দি আবিষ্কার করতে পারেনি। এমন উপসর্গের রোগ আর কখনো কারো হয়েছিল বলেও জানি না যে তার থেকে নাম জেনে নেব। গ্রামসুদ্ধ মানুষের ধারণা ছিল— ‘বাঁচার জন্য যে শিশুর জন্ম হয়, সে আমি নই।’ মানুষের ধারণার ঊর্ধ্বে প্রকৃতি তার খেলাটা দেখালো। রইলাম বেঁচে। হলাম আদুরে। এই আদুরে ভাবের কারণেই হোক কিংবা শিশুকালের ওই অচেনা রোগের প্রভাবেই হোক, সব ঝক্কি এড়িয়ে চলতাম। এড়িয়ে হলেও চলতে তো হবে। কিভাবে চলব? বন্ধুরা যখন ইয়া মস্ত গাছে চড়ত, আমি গাছের নিচে বসে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে তাদের দেখতাম। শুধু তো তাদের দেখা হতো না, দেখতাম আকাশও। আকাশ দেখা মানেই বিশালতার সঙ্গে একটা সন্ধি হয়ে যাওয়া। যা হয়তো অধিকাংশেরই ঘটত না। বন্ধুরা যখন ঠা-ঠা রোদে ক্রিকেট খেলত, আমি গাছের ছায়ায় বসে এটাসেটা করতাম। সেই এটাসেটার মধ্যে থাকত রেডিওতে গান শোনা, ছবি আঁকা, গল্প কবিতা পড়া। তখনো কিছু লেখার মতো সাহস জমা হয়নি। তবে পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ছিল ক্রমে। গল্প শোনার প্রতিও। প্রতি রাতেই দাদীকে বিরক্ত করতাম। আমাদের বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলেও রক্ষা নেই। আমাকে গল্প শোনাতেই হবে। শুনতাম হাঁটের ক্যানভাসারদের গল্পও। তখন সুপ্ত মনে ক্যানভাসার হওয়ার বাসনাও উঁকি দিত। কত মানুষ গোল হয়ে বসে ক্যানভাসারের গল্প শোনে। কী জাদু তার কথায়? অবাক হতাম। মনে পড়ে— প্রথমে আমি গল্পই লিখেছিলাম। স্কুলে একটি গল্পের সারসংক্ষেপ লেখা এসেছিল। আমি দাদীর কাছে এবং আরো অনেকের কাছে শোনা কয়েকটি গল্পের মিশেল কিছু একটা লিখে দিয়ে এসেছিলাম। ওটার কোনো রেজাল্ট আর পাইনি। তবে আমি যে বানিয়ে লিখতে পারি, সেই ধারণাটা অঙ্কুরিত হলো। পরে ভাইয়ার (চাচাত ভাই) পড়ার টেবিল থেকে রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা চুরি করে পড়তাম। সেটাকে নকল করে কিছু লেখার বাসনাও তৈরি হলো। ছন্দের মিলে কথা ঘুরিয়ে লিখতাম। বন্ধুদের শোনাতাম। বাহ বা পেতাম। পুলক অনুভূত হতো। এরপর লিখলাম জসিমউদ্দীনের কবর কবিতার অনুকরণে। দীর্ঘ কবিতা। এরপর ছন্দের মিলে নিজের মতো করে বেশ কিছু লেখা। তখনো জানতাম না এগুলো কোথাও ছাপানো যায়। লিখতাম, পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। যে বন্ধুটা আগেরদিন বিকেলে প্রতিপক্ষের ১১জনকে পাশ কাটিয়ে গোল দেয়ার গল্প বীরদর্পে বলত, ওর মুখের ওপর কিছু একটা বলার জন্যই হয়তো আমার কবিতা পকেটে রাখা হতো। যে বন্ধুটা স্কুল থেকে ফেরার পথে একাই তিনটাকে পিটিয়েছে ওর বীরত্বের সামনেও ধরার মতো অস্ত্র ছিল আমার আঁকা, লেখা। অর্থাৎ বলা যায়- শুরু থেকেই লেখালেখি আমাকে আলাদা সুবিধা দিয়েছে। পেয়েছি। 
তখন আরেকটা নেশা হয়েছিল- রেডিওর অনুষ্ঠান শুনে চিঠি পাঠানো। সেখান থেকে ফিরতি বইটইও পেতাম। একদিন এমন একটা ম্যাগাজিনে দেখলাম কবিতা আহ্বান। দিলাম পাঠিয়ে। পরে আরো কিছু ম্যাগাজিন তারা নিয়মিত পাঠাত। টাকা দিয়ে ছাড়াতে হতো। আমার কবিতা প্রকাশ হয়েছে ভেবে ম্যাগাজিনগুলো পোস্ট অফিস থেকে টাকা দিয়ে ছাড়াতাম। কিন্তু দেখতাম আমার কোনো কবিতা ছাপা হয়নি। হতাশতা তৈরি হতো। তারচে বেশি ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার বসনা তীব্র হচ্ছিল। একদিন অমাদের গ্রামের মাদরাসার ওয়াজের পাশে বসা দোকানগুলোর মধ্যে দেখলাম একটা বইয়ের দোকান। শুধু ধর্মীয় বইন নয়। বিভিন্ন ম্যাগাজিন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের বইও সেই দোকানে আছে, দেখলাম। একটা ম্যাগাজিন সংগ্রহ করলাম। নাম ‘আল-আশরাফ’। ইসলামী ম্যাগাজিন। ওটার মধ্যেও কবিতা আহ্বান দেখলাম। যেহেতু ইসলামী ম্যাগাজিন তাই ইসলামি কবিতা লিখে পাঠালাম ওখানে। মুহাম্মদ (স.)-এর বিদায়ী ভাষণের ওপর লেখা ছিল কবিতাটি। তারা প্রকাশ করল। দুইটা সৌজন্য কপিও পাঠিয়েছিল। তার একটি কপি স্কুলব্যাগে স্থায়ী আবাস গেড়েছিল। এরপর স্থানীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানো। প্রকাশ হওয়া। তবে আমি বরাবরই ভাগ্যবান বলে দাবি করি নিজেকে। পরিবেশটা সব সময় আমার সহায়ক ছিল। সহায়ক বলেই ছোটবেলা থেকে আলাদা পরিবেশ পেয়েছি সৃষ্টিশীল কাজের জন্য। মিশতাম এক বড় ভাই নামকরা ইংরেজি শিক্ষক মুজাহিদ স্যারের সঙ্গে। কিছু একটা লিখেই চলে যেতাম তাকে দেখাতে। উৎসাহ পেতাম। শুধরে দিতেন। তার মাধ্যমে পরিচয় কবি মাসুদ সুমন, পরিতোষ হালদার, অরব্দি চক্রবর্তীদের সঙ্গে। যেতে শুরু করলাম বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায়। এক্ষেত্রে আমার পরিবারের সহযোগিতা ছিল বেশ। যেখানে প্রতিমুহূর্ত সমসাময়ীক লেখকদের কাছে শুনি তাদের প্রতিবন্ধকতার কথা তখনই ভক্তির অঞ্জলি ঢেলে দেই আমার বাবা-মায়ের চরনে। তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। মাদারীপুরের কলাবাড়িতে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানের জন্য বাবার থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে গেলাম। বাবা শুধু বললেন- এতদূর চিনে ঠিকঠাক যেতে পারবে তো? কলেজে থাকাকালীন চলে গেলাম ফরিদপুরের আটরশি। পরিচিত কেউ নেই সঙ্গে। অথচ বাবা-মায়ের কোনো বাধা নেই। বাবার কথা ছিল, ‘যা-ই করো; পড়াশুনাটা ঠিকমতো করো। আর মানুষ মন্দ বলবে এমন কিছু করো না। তোমার বিবেক আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ বাবার ওই বিশ্বাস যত্নে রেখেছিলাম। রাখছি সাধ্যানুযায়ী। লেখালেখিটার প্রতি ভালোলাগা ক্রমে বাড়ছে। চেষ্টা করছি লেখার। 
মানুষ তো কতকিছুই লেখে। বাজারের ফর্দ থেকে শুরু করে অফিসের শো-কজ লেটারের জবাব পর্যন্ত। সবই প্রয়োজনীয় লেখা। আমিও অমনই লেখি। গল্প, প্রবন্ধ, কলাম, গান, মাঝে মধ্যে দু’একটা কবিতা। তবে দিনশেষে ওই গল্পেই ফিরতে চাই। গল্পই আমাকে টানে। গল্পের প্রতিই যত মায়া অনুভব হয়। প্রকাশও হয়েছে এ পর্যন্ত ২টা গল্পের বই ও একটা শিশুতোষ গল্পের বই। প্রথম বইটা আমাকে এনে দিয়েছে বেহুলাবাংলা বেস্ট সেলার সম্মাননা ২০১৯। বইটি বেহুলা বাংলা প্রকাশনী ২০১৯-এর বইমেলায় প্রকাশ করেছিল। সেবছর বেশি বিক্রির ক্যাটাগরিতে পুরস্কারটি দেয়। না, আমার ব্যক্তিগত তেমন পাঠক নেই। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য পাঠক রয়েছেন, যারা নেশা থেকেই বই কেনেন, বই পড়েন। কেনার জন্যই কেনেন। অনেক বই কেনার ভেতর রনি রেজার মতো নতুনদের বইও কেনেন। ফলে পেলাম বেস্ট সেলার সম্মাননা। পেলাম প্রেরণা। এভাবেই তো বাড়ে লেখার শক্তি। প্রতিবন্ধকতকা বা কিছু হতাশার গল্পও থাকে। সেগুলো না-ই বা বললাম। আমি আশাবাদি মানুষ। শ্যামঘণ আমাবশ্যার রাতেও একটি জোনাক পোকার থেকে আলো কুড়িয়ে বাঁচতে চাই। পথ চলতে চাই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. সুন্দর উপস্থাপনা।
    বেহুলাবাংলা বেস্ট সেলার সম্মাননা অনুষ্ঠানে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এ রকম কয়েক ডজন সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার তীব্র বাসনা আমার-প্রিয় ভাই।
    শুভকামনা অবিরাম...

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক অনেক ভালোবাসা জানবেন। আপনাদের ভালোবাসাই আামার এগিয়ে যাওয়ার শক্তি

      মুছুন