তীর্থনগরী হাজো- সমন্বয়ের পুণ্যভূমি
সত্যজিৎ চৌধুরী
আসাম ভ্রমণে ভ্রমণযাত্রীদের ভ্রমণতালিকায় থাকে মা কামাখ্যা মন্দির দর্শন এবং গুয়াহাটি শহরের মাঝে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য দ্রষ্টব্যস্থান যেমন শুক্রেশ্বের ঘাট, উমানন্দ মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির, বালাজী মন্দির ইত্যাদি। যারা ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে উৎসাহী , একদিন হাতে সময় নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন গুয়াহাটি শহর থেকে মাত্র ৩২ কি.মি দূরে অবস্থিত তীর্থনগরী হাজো।
হিন্দু, ইসলাম এবং বৌদ্ধ, এই কাছে তিন ধর্মাবলম্বী লোকেদের কাছে হাজো একটি পবিত্র পুণ্যভূমি। এদের মধ্যে অন্যতম হাজোর মণিকূট পর্বত নামের একটি টিলার উপর অবস্থিত পূণ্যতীর্থ হয়গ্রীব মাধব মন্দির। এখানে বিষ্ণুর অবতার হয়গ্রীবের পূজা-অর্চনা করা হয়। সংস্কৃতভাষায় 'হয়' মানে 'ঘোড়া' এবং 'গ্রীবা'র অর্থ 'মাথা'। তাই মন্দিরকে 'হয়গ্রীব মন্দির' বলেও সম্বোধন করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এটি একটি পবিত্র স্থান। ভক্তরা বিশ্বাস করে যে গৌতমবুদ্ধ, শরীর ত্যাগ করে এই স্থানে এসে 'মোক্ষ' বা 'নির্বাণ' লাভ করেছিলেন।
কিংবদন্তি প্রবাদ অনুসারে 'মধু' ও ও 'কৈটভ' নামের দুইজন অসুর বেদের সৃষ্টির সময় ব্রহ্মার কাছ থেকে বেদ চুরি করে নিয়ে যায়। ব্রক্ষা বিষ্ণুকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বেদ উদ্ধারের জন্য অনুরোধ করেন । তখন বিষ্ণু 'হয়গ্রীবে'র রূপ নিয়ে পাতালে প্রবেশ করেন ও বেদসমূহ উদ্ধার করে ব্রহ্মার হাতে ফিরিয়ে দেন। তারপর বিষ্ণু উত্তর-পূর্ব দিকে এসে শয়ন করেন। মধু ও কৈটভ ফিরে এসে বিষ্ণুকে যুদ্ধে আহ্বান করে। সেই যুদ্ধে বিষ্ণু অসুর দুইজনকে পরাস্ত করেন।
কালিকা পুরাণ মতে এই তীর্থস্থানের প্রতিষ্ঠাতা ঔর্বঋষি। ভগবান বিষ্ণু ঔর্বঋষির তপস্যা ভঙ্গকারী জ্ববাসুর, হয়াসুর ইত্যাদি পাঁচজন অসুরকে বধ করে হয়গ্রীব মাধব নামে এই পর্বতে অবস্থান করেন।
হয়গ্রীব মন্দির একটি প্রাচীন মন্দির হলেও বর্তমানের স্থাপনা পরবর্তীকালের। কালাপাহাড় প্রাচীন মন্দির ভাঙ্গার পর কোচরাজা রঘুদেব ১৫৪৩ খ্রীষ্টাব্দে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।
কিছু সংখ্যক ঐতিহাসিকদের মতে পাল বংশের রাজা ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
হয়গ্রীব মন্দির পাথরে নির্মিত। মন্দিরটির গায়ে হাতির প্রতিমূর্তি খোদাই করা আছে। এইগুলি অসমিয়া স্থাপত্যের নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়। সমস্ত মন্দিরের গঠন ইটের স্তম্ভের ওপর স্থাপিত, যেগুলি মূল মন্দিরের সাথে পরবর্তীকালে সংযোগ করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।
মন্দিরটি তিনটি ভাগে বিভক্ত- গর্ভগৃহ (তলভাগ), মধ্যভাগ এবং শিখর (ওপরভাগ)। মন্দিরের যাওয়ার রাস্তা গ্রানাইট পাথরে নির্মিত।
মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে বিষ্ণুর দশাবতারের বর্ণনা করা ভাস্কর্য আছে, যার ভিতরে নবম অবতার 'বুদ্ধদেব' অন্যতম। অন্যান্য ভাস্কর্যগুলি সনাক্ত করা না গেলেও বেশীর ভাগই পুরুষাকৃতির এবং হাতে ত্রিশূল ধরা আছে। মূল মন্দিরের কাছে আহোম রাজা প্রমত্ত সিংহের নির্মাণ করা একটি ছোট মন্দির আছে। এখানে প্রতিবছর দৌলোৎসব ধুমধাম ভাবে পালন করা হয়। মাধব মন্দিরের সামনে "মাধব পুখুরী" নামে এক প্রকাণ্ড জলাশয় আছে। জলাশয়ে শতাব্দী প্রাচীন কচ্ছপদের দেখা মেলে।
মনিকূট পর্বতের পাদদেশে 'চৈতন্য ঘোপা' নামে একটি গহ্বর আছে। প্রাচীন পুঁথিপত্রে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কোচরাজা নরনারায়ণের রাজত্বকালে আসাম আগমন করেন এবং ভাগবত প্রচার করেন। শংকরদেব ও শংকর শিষ্য দামোদরের সঙ্গে শ্রীচৈতন্যের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি প্রসঙ্গে নানা তথ্য পাওয়া যায়। যোগিনী তন্ত্রের কাহিনী মতে উড়িষ্যার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুরীর সমুদ্রতীরে ভেসে আসা বিশাল বৃক্ষটি কুঠার দিয়ে সাতটি খণ্ড করেছিলেন। তার মধ্যে দুটি খণ্ড কামরূপে নিয়ে এসে তা দিয়ে হয়গ্রীব এবং মাধবের (মৎস্য অবতার) বিগ্রহ তৈরী করেন । অর্থাৎ কোথাও যেন জগন্নাথের পুরীর সঙ্গে কামরূপের হয়গ্রীব মাধব মন্দিরের যোগ রয়েছে। কথিত আছে, পুরীতে জগন্নাথ দর্শনের পর আসামের এই নীলমাধব মন্দির দর্শন না করলে নাকি পূণ্যলাভ হয় না।
হাজোর সাথে এই বঙ্গের একটা যোগসূত্রের কথা এই প্রসঙ্গে যোগ করা যেতে পারে। কথিত আছে যে, সপ্তদশ শতকের শেষভাগে মুঘলেরা হাজোতে বুলবুলি পাখির লড়াই শুরু করে। ভোগালি বিহুর (মাঘ সংক্রান্তি) দিন মণিকূট পাহাড়ের মাধব মন্দির চত্বরে এই লড়াইয়ের আয়োজন করা হতো। উনিশ শতকে কলকাতার বাবুরা এই হাজো থেকে বুলবুলি পাখীর লড়াইয়ের পরম্পরা বঙ্গে নিয়ে আসেন।
হাজো শহরের প্রবেশদ্বারে গডুরাচল পর্বতের উপর অবস্থিত মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের উপাসনাস্থল 'পোয়া মক্কা'। এখানে মসজিদ ও মাজারের দুটো অংশ রয়েছে। আছে কামরূপ প্রদেশের প্রথম মুসলমান ধর্ম প্রচারক সুলতান গিয়াসউদ্দিন আউলিয়ার সমাধিস্থল। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে ও প্রিন্স সুজার গভর্নরশিপে ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে এই পবিত্র মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কথিত আছে যে মক্কা থেকে এক পোয়া মাটি এই মসজিদের ভিতে দেওয়া হয়েছিল, তাই মসজিদটির নামকরণ পুয়া মক্কা হয়েছে। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায় এই তীর্থস্থানে এসে মনস্কামনা পূরণের লক্ষ্যে মানত করে থাকেন। ভক্তদের মধ্যে বিশ্বাস এই স্থান দর্শনে মক্কা দর্শনের পুণ্যের এক চতুর্থাংশ পুণ্য অর্জন হয়। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার বেশ কিছু অংশ ভেঙে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মুঘল খাদিমদের তত্ত্বাবধানে পুনঃনির্মাণ করা হয়।
0 মন্তব্যসমূহ