কী লিখি কেন লিখি বিশ্বজিৎ দেব


কী লিখি কেন লিখি 
বিশ্বজিৎ দেব 

কী লিখি কেন লিখি 
বিশ্বজিৎ দেব

আসলে প্রাণের কোন দায় নেই, কোন দ্বৈতও নেই। সামান্য আলোর ইশারাটুকু যখন চমকায়, রাত ক্ষনিকের তরে ফুটফুটে হয় নিজেকে মনে হয় কান্নাঠাসা একটি নিরেট আয়ুর ব্যারেল। 

পুরনো পৃথিবীর শ্যাওলা থেকে ক্রমবিকশিত একটি মাংসপিন্ড আমি, বায়োফ্রেন্ডলি শ্বাসের প্যাকেজ, ফালা ফালা হয়ে পড়ে থাকা এদিক ওদিক।চারপাশে প্রতিদিন উত্থিত এক একটি জীবনহাউই, প্রতিটি রেলইস্টিশনে অসহায় পেতে রাখা আর্তনাদের  ইস্পাত,
প্রতিদিন বাজার ফেরত এক একটি বিষন্ন পলিব্যাগ যারা জমা হচ্ছে শহরের কোনে হা করা ডাম্পিং জোনে, প্রতিদিন সরকারি বর্জ্য বোঝাই গাড়িগুলি যেখানে নিজেকে হাল্কা করে ফিরে যায় যেন সেখানেই আমাকেও হাল্কা করে ফিরে যাবে আচ্ছদিত বিনম্র শকট। 

জানি সমস্ত উপমা বোঝাই কবিতার ক্যারাভান,ছান্দোগ্য বিলাপ আর স্ফুটনের বিন্দুগুলো একে একে শান্ত হবে হিমের ক্লিভেজে,আবার গান হবে ছলছল শ্যওলাপৃথিবীর...

আসলে প্রাণের কোন দায় নেই, আছে দাউ দাউ, আছে শুধু উড়ন্ত লেলিহান। এসবের পরও টের পাই কোথাও রোমাঞ্চ রয়েছে, রয়েছে বৃষ্টিঅরণ্য কোথাও! সেই-ই কি তবে প্রেরণা  (inspiration)! যদি তাই হয় তবে তা কোন অনিকেত আবিস্কারের উল্লাস? পঙ্কতি আর অক্ষরের অবয়বে তাকেই কি ফিরে পাই আমি বার বার ফুরিয়ে যাবার আগে? যে অনন্ত অযুত চিন্তার বিন্দুগুলি এই ভূতস্রোতে বহমান তার নুড়ির ফাঁকে ফাঁকে বয়ে চলে আমারও প্রাণের জল, শ্যাওলাপৃথিবীর সজল। এছাড়া আমার কোন ঘর নেই। ঘরের বর্গফল ভেঙে ভেঙে যেটুকু দাঁড়ায় তার সবটুকু মাত্রা,যতি আর লুটিয়ে পড়ার বিরাম। তারপর এর রেশটুকুও থাকে না কোথাও....

তাই লিখি, লিখে যাই তাঁর বিন্দু বিন্দুতম।
শতবিভাজিত কোষকলাগুলি যাদের হাত পা ছড়ানো এই সব ছটফটে অমর্ত্য পঙ্কতিমালা....কার পাঠের অপেক্ষায় ঈশ্বরের মুখপানে চেয়ে থাকে আজও বুঝতে পারিনা। ফুরিয়ে যাওয়া রকেটের দাগ গুলিই কি তবে কবিতা কিংবা কবিতার মতো স্ফুটনের চিৎকার যা আমি লিখি নাকি আমাকেই লেখে কবি তথাগত!
টেনিসনের পঙ্কতিগুলি যেমন অকপটে বলে " and what am I....an infant crying in night.....an infant crying for the light..."  শেষ হওয়া গীতিকার রেশ যেমন থেকে যায় রাতভর , নিভে যাওয়া ধিকিধিকিগুলি যেমন ছাই হয়ে ওড়ে, চলে গেলে যেরকম মনে হয় এসেছিলো কেউ -লেখাগুলি যেন তারই প্রতিরূপ আর কিছু নয়।

আসলে আমি নিজের উপমা খুঁজি, যে আমার চিৎকারের প্রতিধ্বনি বয়ে বেড়ায় সেই বাতাসের রেশ খুঁজি...কবিতাই লিখি কি না কে জানে! এই ফুরিয়ে যাওয়াই আসলে জ্বালানির আর্ত অন্বেষার উদ্যম।
পেছনে পেছনে খুঁট ধরে সাতসকালের আলো থেকে চোখ মুছে মুছে... যে এসেছে কাঙাল...লুটিয়ে পড়ার আগে কান্নার মতো অঝোর পবিত্র হয়ে...সেই-ই লিখে যাচ্ছে আকাশের ফাঁকি, মন্দাক্রান্তা লয়। সকল কাঠের ভেতর থেকে সেই-ই লিখে যাচ্ছে সব ঘুনাক্ষর,সব ফুরিয়ে যাওয়ার উল্লাস উর্ধপানে অপরিসীম লেলিহান...

আমি যেনো তাঁরই ছায়ার উপমা, ছটফটে মাসপিন্ডের হাহাকার, আমি যেনো তাঁর বর্তনের দাগ, উদাসীন বালিয়াড়ি... দুরের ওয়াচটাওয়ারের আলো, ফুলকি ফুলকি প্রাণ, শুভ্র সকালে ওড়া চিমনির ধোঁয়া যার অকুস্থলে অবিরাম রুটিবেকারীর ইন্ধন! 

আসলে প্রাণ দাহ্য তাই তাঁর কোন দায় নেই
তবু প্রাণের দায়েই আমি লিখি, কবিতা লিখি কি-না কে জানে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ