বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি|ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি গোবিন্দ ধর এই পর্বে প্রবীণ ব্যক্তিত্ব প্রাবন্ধিক গীতাপ্রিয়া ভট্টাচার্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি 
গোবিন্দ ধর 
এই পর্বে প্রবীণ ব্যক্তিত্ব প্রাবন্ধিক গীতাপ্রিয়া ভট্টাচার্য 



বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি 
গোবিন্দ ধর 
এই পর্বে প্রবীণ ব্যক্তিত্ব প্রাবন্ধিক গীতাপ্রিয়া ভট্টাচার্য 


পরিচিতি 

গীতাপ্রিয়া ভট্টাচার্যর ছোটবেলা কেটেছে চাতলাপুর চা বাগানে।অষ্টম শ্রেণীর পাঠ চলাকালে বাবার হাত ধরে কৈলাসহরে চলে আসতে হয়।তারপর কৈলাসহর গ্লাস হায়ার সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।মেধাবী ছিলেন বরাবরই তিনি।কাছ থেকে অনুভব করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। তাঁর বাবার চা বাগানে ছিলো চাকুরী। চা বাগানে কেটেছে শৈশব।

(১)আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কীরকম ছিলো যদি একটু বলেন?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত?তখনকার কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?


1নং বাংলা দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স প্রায় কুড়ি বছর।সেই স্মৃতি আজও শিহরণ জাগায়।     সারা কৈলাশহর জুড়ে মানুষ  আর মানুষ। তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে শরণার্থী আসছিল। কৈলাশহরের স্বাভাবিক ছন্দ যেন হঠাৎকরে পাল্টে গেল।এটাই প্রথম ধাক্কা  বিশেষ স্মৃতি।

প্রশ্ন:২
আপনার জীবনের সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলো?

2নং বাংলা দেশের মুক্তিযুদ্ধের কারণের যুক্তি যুক্ততা আমার মনে বিরাট প্রভাব ফেলে। তাছাড়া বিষয় সম্পত্তি বাড়িঘর ছেড়ে এপারে চলে আসা মানুষের কষ্ট আমাকে ভীষণ ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

প্রশ্ন :৩
পারিবারিক কোন স্মৃতি?

প্রশ্ন নং ৩
বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময়ের পারিবারিক নানা স্মৃতি কথা এই স্বল্প পরিসরে লিখে বুঝানো অসম্ভব | তবুও সংক্ষেপে লিখছি| আমার শৈশব ও কৈশোরের অনেকটাই  কেটেছে  বর্তমান বাংলাদেশ এর চাতলা বর্ডার এর অনতিদূরে চাতলাপুর চা বাগান এ | " চা বাগানের সবুজ শৈশব" নাম আমার লিখিত গ্রন্থে বিস্তারিত ভাবে লিখেছি| আমাদের পরিবারের কেউ বা নিকটাত্মীয় কেউই আর ওখানে ছিলেন না | কিন্তু চাতলাপুরের আমার বাবার সহকর্মীরা যখন সপরিবার লৈলাশহর এ শরণার্থী হয়ে চলে আসলেন, তখন তাদের সবাইকে, এতো বছর পরে দেখে যেন আত্মহারা হয়ে উঠলাম| ওদের অনেকেই তখন আমাদের বাড়িতে এসেছেন, খেয়েছেন, থেকেছেন ও | আমাদের বাড়িতে ওদের কেউ এ আসেন নি এমন দিন ছিলোনা | তখন যেন যুদ্ধটুদ্ধ ভুলে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম ওদের সাথে | আমাদের বাড়ি থেকে ভার পাঁচ কিলোমিটার উত্তোর দিকে শরণার্থী শিবিরে অনেকদিনইতো োর স্থায়ী ভাবে বসবাস করলেন| ওখানেও গেছি, থেকেছি ওদের সাথে | বিরাট এলাকা নিয়ে দুপাশে রেলগাড়ির মতো লম্বা আবাস তৈরী করা হয়েছিল| তাতে ছোট, বড়ো কথা চনবাশ দিয়ে তৈরী | প্রতি রুমএ বাসের তৈরী বড়ো ম্যাচ ঘুমোবার জন্যে | লাকড়ির উনুনে রান্নার ব্যবস্থা ছিল | রেশন থেকে পর্যাপ্ত পরিমানে ডাল, চাল, আটা, ময়দা, আলু পেঁয়াজ, দুধ, বেবিফুড সবই দেয়া হতো| বিদেশ থেকে ও নানা সাহায্য আসতো| বড়ো বড়ো কম্বল, বিছানাপত্র দেয়া হয়েছিল | ওখানে দুদিন থেকে, সবাইর সাথে দেখা করে গল্প করে তারপর বাড়ি আসি| এই কয় মাস যেন, ওদের সাথে গভীর মেলামেশার সুযোগ পেয়ে, এক পরিবারভুক্ত হয়ে গেছিলাম|।

প্রশ্ন :৪
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ত্রিপুরার জনসংখ্যা হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে গেলো। কিরকম লাগছিলো?

প্রশ্ন নং ৪
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, ত্রিপুরার জনসংখ্যা হটাৎ করে দ্বিগুন হয়ে গেলেও, আমরা মনে করতাম ওরা তো আমাদের অতিথি | সমাজের কুনোস্তরের কাউকেই ওদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখিনি, অনেক পরিচিত লোক যেমন কাছে আসলেন, তেমনি অনেক অপরিচিতও  যেমন পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন | আমাদের দেশ থেকে ও বিদেশ থেকেও অনেক দ্রব্য সামগ্রী ওদের জন্য আসতে থাকায়, আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র অগ্নিমূল্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা মনে পড়ছে না | মাছ তখন খুব বেশি পাওয়া যেত বাজারে এবং তা ন্যায্য মূল্যেই |

প্রশ্ন :৫
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার মহিলাদের ভূমিকা কেমন ছিলো?

প্রশ্ন নং ৫ 
আমি তো তখন কলেজ এ সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ি, কৈলাশহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয় এ | কিওচু বেকার যুবক দেড় নিয়োজিত করা হয়েছিল রিলিফ এর সবকিছু সুষ্টু ভাবে বিতরণ করার জন্য | আমাদের ক্লাস এর কিছু ছাত্র ও সাময়িক ভাবে ওই কাজে নিয়োজিত হয়েছিল | তবে তখন কুনো মহিলা বা মেয়েদের এই কাজে নিয়োগ করা হয়েছে বলে মনে পড়ছে না | মহিলারা তাদের বাড়িতেই অনেক আত্মীয় ও অনাত্মীয় সরণার্থীদের রান্না বান্না করে অতিথি আপ্পায়ন করেছেন দেখেছি |   

প্রশ্ন :৬
শরনার্থীদের যন্ত্রণা কাছ থেকে দেখেছেন?

প্রশ্ন নং ৬ 
শরণার্থীদের তখন খাওয়া পড়ার খুব একটা কষ্ট হয়েছে বলে আমাদের মনে হয় না | তবে হ্যায় ওদের যন্ত্রনা তো একটা ছিলই | নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে বিষয় সম্পত্তি, ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি এসব ফেলে শূন্য হাত এ  এখানে শরণার্থীর জীবন কাটানোর মতো দুর্ভাগ্যের যন্ত্রণার শিকার ওরা হয়েছেন, এসব ওদের কথাবার্তায় ফুটে উঠতো | অনেক বড়লোকদের, এমনকি চাবাগানের মালিকদেরও লাইনে দাঁড়িয়ে রেশনের চাল ডাল তুলতে দেখেছি, খুব কষ্ট পেয়েছি তখন | সাধারণ লোকের মধ্যে কেউ না খেতে পেয়ে মারাগেছে, এরকম শুনিনি, এসব তো খুব কাছ থেকে এ দেখা |

প্রশ্ন :৭
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপটের প্রকৃত সত্য কি?

প্রশ্ন নং ৭ 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে আমার একটা ভাষা ভাষা ধারণা আছে তাই, এর প্রেক্ষাপটের প্রকৃত সত্য সম্পর্কে বিষদে কিছুই বলতে পারছি না |

প্রশ্ন :৮
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর শতবছর সব মিলে প্রতিবেশী দেশের মুক্তকামী মানুষের দীপ্ত উচ্চারণ। আপনার মূল্যায়ণ শুনবো?


প্রশ্ন নং ৮
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ এর ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের টুকরো টুকরো কথা, মানুষের মুখে মুখে শোনা যেত সব সময় | আর বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষে বাংলাদেহ এ যে উদ্দীপনার ঢেউ, তা আমাদের ভারতবর্ষের সর্বত্র প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যে, তা বিশেষ প্রভাব ফেলেছে | ত্রিপুরায় তো ভারত বাংলার যৌথ উদ্যোগে, অনেক শোভা সমিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সর্বত্রই হচ্ছে সারা বছর ধরে, তাদের উদ্দীপনা ও আমাদের উদ্দীপনা মাইল মিশে যেন একাকার হয়ে যায়| 

প্রশ্ন :৯
আপনার সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে বলুন?

প্রশ্ন নং ৯ 
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, আমি কয়েকদিনের জন্য, কাছাড়ের হাইলাকান্দি তে গেছিলাম, সেখানকার একটি ম্যাগাজিনে এর, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত একটি সংখ্যায়, আমার একটি লেখা চাপা হয়, ওই লেখাতে ওই লেখাতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত অনেক কথা লিখেছিলাম, লেখাটির নাম ছিল "এপার ওপার"   

প্রশ্ন :১০
মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ কোনো স্মৃতি যা কোথাও বলা হয়নি?



প্রশ্ন নং ১০ 
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির মধ্যে বেশি করে মনে পড়ে, রোজই বিকেল থেকে শুরু হওয়া, কামানের গোলাবর্ষণের শব্দ, এমন শব্দ যেন দরজা জানালা কেঁপে উঠতো| পাখিগুলো গাছ থেকে উড়েযেতো, সারারাত শোনা যেত এই শব্দ| এই আওয়াজ এ প্রথম প্রথম ভয় হতো, ঘুম আসতো না আতঙ্কে, কিন্তু পড়ে অভ্যাস হয়ে গেলো, এছাড়া, সব সময় পাকিস্তানের প্লেন আকাশে উড়তো| শমসেরনগরে যেদিন আকাশ থেকে বম্বিং হলো, দেখলাম তিনটে এরোপ্লেন পর পর একটি নিদৃষ্ট জায়গায় এসে, বম্বিং করে আবার ঘুরে চলে যায় | প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি, পড়ে জানলাম শমসের নগরে বম্বিং হয়েছে | এক রাতে, আমাদের বাড়িতে, ঘরের কাছাকাছি একটি স্প্লিন্টার এসে পড়েছিল বাইরে| কোনো ক্ষতি হয় নি |

প্রশ্ন :১১
জনজীবনে কিরকম প্রতিক্রিয়া ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়?

প্রশ্ন নং ১১
কৈলাশহরের জনজীবনে এই মুক্তি যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয় | পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে, সর্বত্রই জটলা করে একই আলোচনা| পাক সেনাবাহিনীর, বর্বরোচিত হিংস্রতার আলোচনা | কোথায় কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা, কোন কোন জায়গা পাক শাসন মুক্ত করতে পারলো, কোথায়বা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো | তখন সেখানকার অনেক বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে খুন হতে হয়েছিল পাক সেনাদের হাতে| এসব মিলিয়ে একটা উদ্বেগের পরিস্থিতি ছিল সর্বত্র| খবর বলতে রেডিওতে| প্রতি ঘরে ঘরে রেডিও ও তো তখন ছিল না, তাছাড়া পত্র পত্রিকা পড়ার আগ্রহ বেড়েগেল | স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের খবর ও শোনা হতো| তখন কৈলাশহর এ, বর্তমানে প্রয়াত, সন্তোষ দেবরায়ের পত্রিকা  "কৈলাশবার বার্তা", খবপর পরিবেশনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল| বাকি খবর সব ছিল, লোকমুখে প্রচার| কৈলাশহর, বর্ডার সংলগ্ন হওয়াতে, ওপার থেকে নানারকম উদ্বেগজনক খবর পাওয়া যেত| আমাদের চাতলাপুর বাগানের একটি পরিবার, কৈলাশহর এর চন্ডিপুর এ বাড়ি করেছিল, সেই বাড়ির ছেলে ধীরুদা, রোজ সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ি আসতো, তার কাছে ওপারের অনেক খবর পাওয়া যেত | আমরা প্রবল আগ্রহে সেই খবর শুনতাম| মোট কথা কৈলাশহর এর জনজীবনের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর নেয়া|

প্রশ্ন :১২
জনজাতির অংশগ্রহণ কেমন ছিলো?

প্রশ্ন নং ১২
জনজাতির অংশগ্রহণ কিছু আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না| সারা কৈলাশহরবাসীর মনোযোগই ছিল ওপারের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীর দিকে|


প্রশ্ন:১৩
চালতাপুর বর্ডার দেখেছেন?গেছেন বাংলাদেশ? কৈলাসহরেও ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সেক্টর?

প্রশ্ন নং ১৩ 
হ্যাঁ চাতলাপুর বর্ডার অবশ্যই দেখেছি, কারণ ওই বর্ডার থেকে সামান্যদূরে চাতলাপুর চা বাগানে আমার বাবা চাকরি করতেন, ওই চা বাগান এই আমার জন্ম হয়েছে, শৈশব ও কৈশোর এর অনেকটাই কেটেছে ওখানে|

প্রশ্ন :১৪
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট লাগুয়া কৈলাসহরের কেউ  মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুক্ত ছিলেন?এ অঞ্চলে আসা শরনার্থীদের ভোগান্তি যন্ত্রণা আপনি কাছ থেকে দেখেছেন?

প্রশ্ন নং ১৪ 
বাংলাদেশে মুক্তি সংগ্রামে, কৈলাশহরের কেউ যুক্ত ছিলেন কিনা বলতে পারছি না, তবে শরণার্থী হয়ে আশা কিছু যুবক মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল | আমার চাতলাপুর এর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকমশাই সপরিবার শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন  কৈলাশহরে, তাঁর ছেলে রবীন্দ্র কুমার সিংহ, আমার সহপাঠী ছিল, সে ও মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে| স্বাধীনতা লাভ এর পর, সে খুব বড়ো পোস্ট এ চাকরি পেয়েছিলো| পরে একসময় বাংলাদেশেরই আততায়ীরা তাকে হত্যা করে, খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম এই খবর জেনে|

প্রশ্ন :১৫
পরিবারের কেউ কিংবা আপনি নিজে কখনও কোন রকম সহযোগিতা করতেন মুক্তিযুদ্ধাদের?

প্রশ্ন নং ১৫ 
আমাদের পারিবারিক সীমিত ক্ষমতার মধ্যে থেকে | আমরা শরণার্থীদের সহমর্মী হয়েই ছিলাম| ওরা যখনই আমাদের বাড়িতে আসতেন, আমরা ভাত না খাইয়ে ছাড়তাম না| কুনো পরিবারের বিশেষ কুনো আর্থিক প্রয়োজনে, আমাদের পরিবার থেকে আর্থিক সাহায্যও করা হয়েছে | আমাদের ঘরের বারান্দা থেকে দেখা যেত, বর্তমান বাংলাদেশ এর কৈলাশহর সংলগ্ন গ্রাম নয়মৌজা | ওখানকার অনেক ছেলে, চাতলাপুর বাগানে থাকার সময়ের, ওখানকার অনেক ছেলে (চাতলাপুর বাগানে থাকার সময়ের), আমার দাদাদের বন্ধু বা সিনিয়র দাদা, ওই দাদারা তখন, ঢাকাতে পড়াশুনা করতো, কেউ কেউ চাকরি ও করতো | নয়মৌজা কৈলাশহর সংলগ্ন হওয়াতে, ওখানে যুদ্ধের প্রভাব তেমন পড়েনি | ওরা তাই ওদের নিজ বাড়িতে চলে এসেছিলো | ধানের ক্ষেতের আলপথে প্রায় আধা কিলোমিটার হেটে ওরা আমাদের বাড়িতে চলে আসতো প্রায়দিনই |  ওদের কাছ থেকে কিছু খবর ও পাওয়া যেত | ওরা অনেক্ষন বসে গল্প করতো | ছুট্টুদা, ইমানুলদা, আজিজুলদা এবং আরো অনেকের কথাই মনে পড়ছে | তাছাড়া চাতলাপুর বাগানের বাবার সহকর্মী মিঞাবাবুর পরিবারও শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন | তাদের ছেলে ফজলুদা থাকতো লন্ডনে, সে চাতলাপুরে ছিল তখন | শরণার্থী হয়ে এসে, ফজলুদা তো প্রায়সময় আমাদের বাড়িতে এসে, আমাদের সাথেই গল্প করে সময় কাটাতো | মনে আছে, সে শঙ্করের লেখা এপার বাংলা ওপার বাংলা বইটি কিনে আমাকে উপহার দিয়েছিলো, ওদের সবাইর সাথেই পরেও অনেকদিনই যোগাযোগ ছিল |


প্রশ্ন :১৬ 
কী লিখি কেন লিখি?

প্রশ্ন নং ১৬ 
কী লেখি, কেন লিখি বলতে গেলে অনেক কথাই আসে | স্কুল কলেজ এর ম্যাগাজিন থেকেই লেখালেখির শুরু, তারপর স্থানীয় পত্রিকা- কৈলাশহর বার্তা, উত্তর ত্রিপুরা মিনি পত্রিকা, ছুটোবড়ো অন্যান্য ম্যাগাজিন, এসবে লিখেছি | সাতের দশকের কথা বলছি, দৈনিক সংবাদে অঙ্গনা বিভাগেও লিখেছি | কৈলাশহরে আমরা দশজন মিলে একটি পাক্ষিক পত্রিকা বের করেছিলাম | পত্রিকাটির নাম ছিল উত্তর | মুখ সম্পাদক ছিলেন প্রদীপ বিকাশ রায় | লেখালেখি করতে খুব ভালোলাগে, তাই লিখি | আগরতলাতেও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে, দৈনিক সংবাদের সাহিত্য বিভাগে, নিয়মিত লেখালেখি করছি | "মনোবীক্ষণে সমাজ সংস্কৃতি ও সময় " এবং "চা বাগানের সবুজ শৈশব" নামে আমার দুটি বই ও প্রকাশিত হয়েছে | খুব ভালোলাগে যখন কোনো পাঠক বা পাঠিকা, ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, তাঁর জীবন কোথায় আমার গল্পের বিষয়বস্তু কী না ! অথবা কেউ জানতে চায়, আমার লেখা গল্পের ঘটনা সত্যি না কাল্পনিক | আমি আমার সমাজ জীবনের চারপাশ থেকেই লেখালেখির রসদ পাই|    


(১৭)বৃহত্তরো সিলেট অঞ্চলের অবিভক্ত ভারতের আপনি সিলেট কলেজ থেকে স্নাতক। কলেজটি নিয়ে বলুন।পরবর্তী সময় কোথায় শিক্ষালাভ করেন?পেশাগত দিক কী ছিলো?

প্রশ্ন নং ১৭
আমি সিলেট কলেজএ পড়িনি, কৈলাশহর বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি | কৈলাশহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয় থেকে দর্শনশাত্রে হোনোর্স সহ বি.এ পাশ করি| কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এম.এ ও বি. এড করি| বিষয় শিক্ষিকা হিসাবে কৈলাশবার বালিকা বিদ্যালয়, আগরতলা গার্লস বোধজং ও আনন্দনাগার এইচ. এস স্কুলএ চাকরি করি, এর পর প্রমোশন পেয়ে সুভাষনগর দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়ে এ.এইচ.এম  পদে অধিষ্ঠিত হই| এরপর ওখান থেকেই অবসর গ্রহণ করি |

প্রশ্ন :১৮
আপনার ছোটবেলার স্মৃতি শুনবো?

প্রশ্ন নং ১৮ 
চাবাগানের সবুজ শৈশব বইটিতে আমার ছোটবেলার সব স্মৃতি লিখেছি, সেই শৈশবের দিনগুলিতে আমরা যে আনন্দ পেয়েছি, আজকালকের যুগের ছেলেমেয়েরা বর্তমানে সেটা পাচ্ছে না | ওদের শৈশব হারিয়ে গেছে তাই খুব আক্ষেপ হয় |

প্রশ্ন:১৯
ড:সৈদয় মুস্তাফা আলী অবিভক্ত ভারতের আসামের জেলা মৌলভীবাজার। আপনার প্রতিবেশী ছিলেন ড:সৈয়দ মুস্তফা আলী। তাঁর সম্পর্কে আলোকপাত করবেন?

প্রশ্ন নং ১৯ 
আমি তেরো-চোদ্দ বছর বয়সেই তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসি | সৈয়দ মুজতদা আলীর লেখা বই পড়েই, তাঁর সম্পর্কে কিছু জেনেছি | তাঁর সিলেটি রসবোধ আমাকে আকৃষ্ট করে | 

প্রশ্ন :২০
আপনার দেখা মৌলভীবাজার এব তৎকালীন সময়ে লোকবিনিময়ের মাধ্যমে আপনিও এদেশে এলেন।এতে আপনাদের কিরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল?

প্রশ্ন নং ২০
এদেশে চলে আসার সময়ের লোকবিনিময় প্রথা সম্পর্কে আমার তেমন কিছুই মনে পড়ছেনা | শুধু সবকিছু ফেলে চলে আসার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিলো তখন |

প্রশ্ন :২১
আপনার দেখা স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু কথা শুনবো?তৎকালীন সময়ে সিলেটে গান্ধীজি, সুভাষচন্দ্র বোস এসেছিলেন?রবীন্দ্রনাথও তো এসছেন? তাঁদের সাথে আপনার সাক্ষাৎ হয়েছিল?

প্রশ্ন নং ২১ 
আমার জন্ম স্বাধীনতার পরে, তাই এই বেপারে বইপত্র পরে জেনেছি | আগরতলা শ্রীহট্ট সম্মিলনীর মুখপত্র, "সুরমা" সম্পাদনা করি | ওই "সুরমা" তে রবীন্দ্রনাথ এর  সিলেট আগমন সম্পর্কে বড়ো প্রবন্ধ লিখেছি | স্বাধীনতা আন্দোলনে শ্রীহট্টের অবদান সম্পর্কেও বড়ো একটি প্রবন্ধ লিখেছি | সেখানে গান্ধীজি, সুভাষ চান্দ্রা বোস, ওরা যে সিলেটে এসেছিলেন, সে বেপারে আলোকপাত করেছি | 

পরিশেষে বলি, আমাদের কৈলাশহরের বাড়িতেই, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার একটা পরিবেশ ছিল | গান বাজনা, আবৃত্তি, লেখালেখি, সবকিছুই চলতো | তখনকার সময়ে যারা কৈলাশহরে লেখালেখি করতেন, অনেকেই আমাদের বাড়িতে আসতেন | ত্রৈপুরা বিখ্যাত কবি হিমাদ্রি দেব, সব সময় এসে এই পরিবেশকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতো |

প্রশ্ন :২২
রামকৃষ্ণ কলেজ নিয়ে আপনার স্মৃতিচারণ চাই?

প্রশ্ন নং ২২ 
আমি কৈলাশহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী| ১৯৬৯ ইংরেজির মাঝামাখি থেকে ১৯৭২ ইংরেজির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই কলেজ এ পড়াশুনা করেছি | অনেক স্মৃতি বিজড়িত সুন্দর এই সময়কাল| বর্তমানের ঝা চকচকে দালান তখন ছিল না, আধপাকা টিনের চালের ঘর ছিল| পাশে একটি দোতালা বিল্ডিং নুতন হয়েছে তখন| ওখানেই আমরা ক্লাস করতাম| এছাড়াও একটু দূরেই ছিল বাঁশের বেড়ার লম্বা ঘর| চাটাই বেঁধে পার্টিশন দেয়া ছোট ছোট কোঠা, ওখানে আমরা আমাদের অপশনাল ক্লাস গুলি করতাম| সামনে রাস্তার পাশে ছিল সারি সারি নাককেশরের গাছ| যখন ফুল ফুটতো সব গাছে, কি সুন্দর যে লাগতো, আর সারা কলেজ মোমো করতো ফুলের গন্ধে| কলেজ এ ঢুকেই, বামদিকের যে লম্বা ঘরটি ছিল, তার আমাদের অর্থাৎ মেয়েদের কমন রুম ছিল| চাটাই এর পার্টিশন দেয়া এর আগের রুমেই  ছিল স্যারদের কমন রুম| ম্যাডাম প্রথমে আমরা পাই নি| পরে দুজন এসেছিলেন, ওরা স্যারদের সাথেই বসতেন| এর ঠিক আগের রুম তা ছিল লাইব্রেরি, ওখানে নানা বইয়ের সমাহার| কলেজ এ ঢুকেই ডানদিকেই ছিল একটা অফিস রুম, এর পরেই প্রিন্সিপাল রুম, ছেলেদের কুনো কমন রুম ছিল না, তবে চারদিকেই ছিল উন্মুক্ত প্রাঙ্গন, পাশেই আবার বড় মাঠ| মাঠে অফ পিরিয়ডএ ছেলেরা খেলাধুলা করতো|
       আমাদের পাশের রুমটাই তো স্যারদের কমন রুম, তাই টৌতিনে অনুযায়ী, আমরা মেয়েরা রেডি থাকতাম ক্লাসে যেতে| স্যার বেরুবার সাথে সাথে, আমরা পেছন পেছন, আমরা ক্লাসে এ যেতাম| ক্লাসে মেয়েদের জন্য এক সাইড এ আলাদা বসার জায়গা নিদৃষ্ট ছিল, ওখানে আমরা বসতাম, আবার ক্লাসে শেষ হলেই, আমরা আগেই বেরিয়ে পড়তাম| এরপর স্যার আমাদের পেছন পেছন আসতেন, এটাই ছিল তখনকার নিয়ম, জানি না এখন আর এই নিয়ম আছে কি নাই ! ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে একটা খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল|

       আমাদের কলেজটি তখন ছিল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেখানে পর্যাপ্ত পরিমান শিক্ষক শিক্ষিকা তখন ছিলেন না|  এতে আমাদের বিভিন্ন বিভাগেই পড়াশুনার খুবই অসুবিধা হতো| তাছাড়া স্যার ওরা নিয়মিত প্রতিমাসে মানিনেও পেতেন না, তিন চারমাস অন্তর একসাথে মেইন পেতেন| এটা ছিল ওদের পক্ষে খুব একটা অসুবিধাজনক একটা পরিস্থিতি, আমরা এটা অনুভব করতাম| কলেজ এ ইলেকশন হতো, জমজমাট প্রচার ছিল, আমাদের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন বিমল সিনহা, ওর নেতৃত্বে আমরা প্রায়শই আন্দোলন করতাম| কলেজ যেন সরকার অধিগ্রহণ করে, পর্যাপ্ত শিক্ষক যাতে দেয়া হয়, এসব ছাড়াও কৈলাশবারের উন্নয়নের বেপারেও আমরা আন্দোলন করেছি, গণঅবস্থানও করেছি |

     পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলেও যারা ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই আমাদের, খুব সুন্দর ভাবে পাঠদান করতেন| তাঁদের সাথে ছাত্রছাত্রীদের একটা আত্মিক সম্পর্কও ছিল| সেকেন্ড ইয়ার এর শেষএর দিকে ও থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও দুজন শিক্ষিকা আমাদের কলেজএ জয়েন করেন, এতে আমরা, দেরিতে হলেও উপকৃত হয়েছি| 

      পড়াশুনা ছাড়াও, কলেজ এ, একটা সুন্দর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল, দেওয়াল পত্রিকা বেরুতো, প্রায় নিয়মিত| কলেজ ম্যাগাজিনের নাম "শ্রী"| প্রায় সপ্তাহেই ডিবেট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো| বিমল সিনহা, বিভাষ কিলিকদার, বনমালী সিনহা, ধনঞ্জয় গণ চৌধুরী, হিমাদ্রি, কুতুব এবং আরো কয়েকজন খুব ভালো বক্তব্ব্য রাখতো| অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র তখন কলেজ এ থাকায়, পরবর্তী সময়ে ওরা অনেকেই, নানাদিকে, নানাভাবে ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করেছেন|                
 ওই সময়টা কিন্তু, ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল এক সময় ছিল, রাজনীতির প্রভাবও ছিল, আমাদের কলেজ তার বেতিক্রম ছিল না|

        রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে আমি খুবই গর্বিত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা যেন, এই মহা বিদ্যালয়ের, সুনাম, ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখে এই কামনা করছি|
প্রশ্ন :২৩
আপনার দেখা কৈলাসহরের প্রাচীনত্ব বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা চাই?

প্রশ্ন নং ২৩
কৈলাশহর এর প্রাচীনত্ব বিষয়ে বলতে গেলে, প্রথমেই বলতে হয়, "কৈলাশহর" নামের সাথেই জড়িয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ঊনকোটি| রাজ আমলের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী ধনঞ্জয় ঠাকুরের মতে, " 
ইহা শিবাধিষ্ঠিত স্থান বলিয়াই, কৈলাশ + হর = কৈলাশহর নাম হইয়াছে" অন্য দিকে ঊনকোটির মূল দেবতাযে, "ঊনকুটিশ্বর শিব"| কৈলাশহরএর আগের নাম ছিল ছামবুলনগর| ত্রিপুরার রাজাদের পারিবারিক ইতিবৃত্ত রাজমালায়, ছামবুলনগর, মনুনদী, ঊনকোটির উল্লেখ আছে | কিরাতদেশ (বর্তমান ত্রিপুরার পূর্বনাম) এর ছামবুলনগরই আমাদের আজকের কৈলাশহর| যেমন " কিরাত আলোয় আছে ছামবুলনগর" অথবা "মনুনদী তীরে মনু বহু তপঃ কইলো" ইত্যাদি লাইন রয়েছে| 

    কৈলালশাহার হলো ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম মহকুমা| ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে, মহারাজা বীর চান্দ্রা মাণিক্যের আমলে কৈলাশহর ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম উপবিভাগ, তথা মহকুমার স্বীকৃতি পায়| কালীপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত, রাজমালার দ্বিতীয় লহরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, মহারাজা ইন্দ্র মাণিক্যের আমলে, ত্রিপুরার রাজধানী ছিল কৈলাশহর| আজ রাঙাউটি মহারাজা আমলের ইন্দ্রনগর পরগনা বলে পরিচিত| স্বাধীনতা সংগ্রামী "দেবীযুদ্ধ" বইএর রচয়িতা শরৎচন্দ্র চৌধুরী কৈলাশহরের কালিশাসন চা বাগানে কিছুদিন আত্মগোপন করেন | বর্তমানে কালিশাসন বাগানের যে কালীবাড়িটি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেই কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠার পেছনে শরৎচন্দ্র চৌধুরীর অবদান আছে যা গবেষণা সাপেক্ষ| বিনয়-বাদল- দীনেশ এর  দীনেশ গুপ্ত ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে কৈলাশহরের মনু ভ্যালি চাবাগানে কিছুদিন ছিলেন | ১৯১৬ সালে নির্মিত হীরাছড়া চাবাগান, ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম চা বাগান| 

    ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয় রাজ্যের সর্বপ্রথম বেসরকারি মহাবিদ্যালয়রূপে আত্মপ্রকাশ করে| কৈলাশহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো অনেক প্রাচীনত্বের নিদর্শন | কৈলাশহর হচ্ছে গবেষণার আকরস্থান| ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গবেষণা করে এসব প্রাচীন তথ্য উদ্ঘাটন করবে এ আশা আমরা রাখতেই পারি |

প্রশ্ন :২৪
চা শ্রমিকেরা মুক্তিযুদ্ধের সময় অংশগ্রহণ করেছিলো?

প্রশ্ন নং ২৪ 
মুক্তিযুদ্ধের সময় কৈলাশহর অঞ্চলের চাবাগানের শ্রমিকরা প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল কিনা, তা আমার জানা নেই, তবে মূর্তিছড়া চা বাগানের অনেক লোকের সাথেই আমাদের পরিচয় ছিল, ওখানকার অনেকেই আমাদের বাড়িতে আসতো| তাঁদের কাছ থেকে জেনেছি, প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও, সেখানকার শ্রমিকরা চাতলাপুরএর এবং কাছাকাছি এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা করেছে| একটি ছোট্ট ছড়া, তার ঐপারে চাতলাপুর বাগান আর এপারে মূর্তিছড়া | দূরত্ব কম ও সুবিধাজনক পরিস্থিতি থাকায়, তখন দলে দলে মানুষ ওই বর্ডার দিয়েই ত্রিপুরায় এসেছেন শরণার্থী হয়ে | তখন মূর্তিছড়া চা শ্রমিকদের সাহায্য সহায়তার কথা মুখে মুখে শোনা গেছে | মোটকথা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সহায়তায় চা শ্রমিকরা যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, সেটা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে |

প্রশ্ন :২৫
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কৈলাসহরের ভূমিকা কেমন ছিলো?

প্রশ্ন নং ২৫ 
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে কৈলাশহর এর ভূমিকা সম্পর্কে আগের প্রশ্নগুলির উত্তর হিসাবেই যথেষ্ট আলোচনা হলো|

প্রশ্ন :২৬
দেশভাগের ফলে চা শ্রমিকদের যন্ত্রণা  রেখাপাত করেছে?

প্রশ্ন নং ২৬ 
আগেই বলেছি আমার দেশ ভাগের পরে তাই তখনকার শ্রমিকদের চা শ্রমিকদের চা শ্রমিকদের যন্ত্রণার কথা বলতে পারছি না | ছোটবেলায় চাবাগানের শ্রমিকদের কাছাকাছি থেকে থেকে, দেখে তাঁদের খুব একটা দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনা আছে বলে মনে হয় নি| তবে একটা ঘটনার কথা ছোটবেলায় শুনেছিলাম বড়দের মুখে | চাতলাপুর বাগানতো কৈলাশহরএর মূর্তিছড়া বাগানের খুবই কাছে| বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে বাউরি সম্প্রদায়ের লোক খুব বেশি ছিল| দেশভাগের পরে নাকি একদিন মার্কণ্ড সর্দারের নেতৃত্বে সাতশোজন বাউরি সম্প্রদায়ের শ্রমিক একই দিনে, একই সঙ্গে বাগান ছেড়ে মূর্তিছড়া বর্ডার দিয়ে ভারতে চলেএসেছিলো | মার্কণ্ড সর্দার নাকি তখন বলেছিলো " হামি মার্কণ্ড বৈলচি, হামি যেদেশে থাইকবক নাই | হামার সাতশো বাউরি নিয়ে একসাথেই ঝাঁপ মাইরবো "

(২৭)কৈলাসহরের সাহিত্য সংস্কৃতি আড্ডা বিষয়ে বিষদ আলোচনা চাই?

প্রশ্ন নং ২৭ 
আমার সাহিত্য চর্চা বা লেখালিখির শুরু সাতের দশকে, এই দশকটা কৈলাশহরএর সাহিত্যচর্চার তৃতীয় পর্যায় বলা চলে কারণ আমাদের পূর্বসূরীরা অনেক প্রতিবন্ধকতা আর সীমিত ক্ষমতার মধ্যে থেকেও সাহিত্য চর্চা করেছেন| পত্র পত্রিকা ম্যাগাজিন বেরিয়েছে অনেক| অনেক আগে থেকেই যারা লেখালেখি করছেন, তারা হলেন লবি পীযুষ রাউত, সুধীরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, প্রিয়ব্রত ভট্টাচার্যী, মানিক চক্রবর্তী, অরবিন্দ ভট্টাচার্যী, কাজল পুরকায়স্থ, বিমল দেব, সুব্রত দেব এবং আরো অনেকে| এদের মধ্যে অনেকেই আজো লেখালেখির জগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন| তারা আমাদের নমস্য, তাঁদের লেখা কবিতা গল্প এসবই আমরা তখন পড়তাম| তারাই আমাদের পথপ্রদর্শক| মহিলা কবি একজনই ছিলেন, কবি শক্তি দত্তরায় তিনি কৈলাশহর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন | তাঁদের সাহিত্য আড্ডা হতো বিভিন্ন যায়গায়| কখনো চায়ের দোকানে, কখনো বা কোনো কবির বাড়িতে | সেসবের গল্প মাঝে মাঝে শুনতাম| জমজমাট আড্ডাই হতো তখন| 
     কবি পীযুষ রাউতএর ''জোনাকি" তো অনেক আগে থেকেই বেরোতো, পরে আসে হিমাদ্রির "পরমাণু", রবীন্দ্র ভট্টাচার্যের "আগুন", সুব্রত দেবের "বাশরিয়া", পান্নালাল রায় এর "নবাগত" প্রভৃতি | 

       প্রদীপ বিকাশ রায় একটি পাক্ষিক সাহিত্য পত্রিকা বের করেছিলেন কৈলাশহরে, তিনি ছিলেন মুখ্য সম্পাদক, পত্রিকাটির নাম ছিল "উত্তর", সম্পাদক মণ্ডলীতে ছিলেন দীনেন্দ্র ভট্টাচার্যী, প্রদীপ বিকাশ রায়, হিমাদ্রি দেব, বিধু দেব, কিশোর রঞ্জন দেব, রতিষ মজুমদার, রবীন্দ্র ভট্টাচার্যী ও গীতপ্রিয় ভট্টাচার্যী | উত্তর পত্রিকার পক্ষ থেকে সাহিত্যের আড্ডা বশত নিয়মিত| সপ্তাহের প্রতি রবিবার, কখনো প্রদীপ বাবুর বাড়িতে, বা অন্য কুনো সম্পাদকের বাড়িতে, মাঝে মাঝে আমরা রবিবারের শীতের সকালে আর. কে. আই সংলগ্ন বড় বটগাছটির নিচে মুক্তাঙ্গনে বসেছি সবাই মাইল সাহিত্য আড্ডায়|

        এছাড়া অনেক সময় হিমাদ্রি চার পাঁচজন লেখক, কবি নিয়ে যেকোনো সময় হাজির হতো আমাদের বাড়িতে, অনেক্ষন ধরে আলোকনা চলতো| একবার তো হিমাদ্রি, তিন চারজন কবি সহ, বিখ্যাত কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীকে নিয়ে আসলো আমাদের বাড়িতে| তখন প্রায় এগারোটা বাজে|, চা টা খাবার পর আমার মা বললেন সবাইকে, দুপুরে ভাত খেয়ে যেতে, এক কথায় ওরা সবাই রাজি| দুপুরে ভাত খাবার পর বিকেলবেলা শক্তিদার উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি "নাদের আলী! আমি আর কত বড় হবো" এখনও কানে বাজে|

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ