অণুগল্প দাউ দাউ/মন্মথ দেব

অণুগল্প 
দাউ দাউ/মন্মথ দেব


সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু--।তার পরের লাইনে আছে, অনলে পুড়িয়া গেল।পরের লাইন উল্লেখ করার ইচ্ছা ছিল না। অনল মানে তো হল অগ্নি বা আগুন।অগ্নি নিয়ে আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতিতে অনেক কথা অনেক ব্যাখ্যা অনেক কর্মকান্ড আছে।অগ্নি সর্বত্র বিরাজমান।শুধু একটু ঘষে দিতে হবে।তা'হলেই জ্বলে উঠবে। 

সেই জ্বলে উঠারও রিদম আছে।তা'হল দাউ দাউ। দাউ দাউ কারো সুখের ঘর পুড়ে যাক কেউ চাইবে না।ঘর পোড়ার কি যে জ্বালা তা মানুষ কেন গরুও খুব ভাল করে জানে।লাল মেঘ দেখলেই জাবর কাটা মুলতুবি রেখে লেজ তুলে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়তে থাকে।মানুষ ঘর বাঁধে সুখে থাকার জন্যই।প্রথম প্রথম মনে হত এ অনল কোন দাউ দাউ অনল বা অগ্নি নয়।ঐ দার্শনিক অনল বা অগ্নি হবে। দর্শনের স্থান তো চক্ষে থাকে না,থাকে মনে।
উপদেশ হিসাবে অনেকে বলে,ওর মনে আগুনটা জ্বালিয়ে দাও।দেখবে খাঁটি সোনা বেরিয়ে আসবে।আবার এই আগুনই যখন মনে ধিকি ধিকি জ্বলে ক্রুধাগ্নিতে পরিণত হয় তখন মানুষ তার নিজের উপাধি ত্যাগ করে শর্মা হয়ে যায়।তাকে বলে 
অগ্নিশর্মা।সে বড় ভয়ংকর! সুখের ঘর তচনছ।দেশ ও দশের জন্য কঠিন পথে সমালোচনা গালিগালাজ শুনে চলে সবাইকে লক্ষে পৌছে দেবার পথকে বলে অগ্নিপথ।এই অগ্নি হল উত্তম অগ্নি। অগ্নি কন্যা! অতি উত্তম। আলাদা করে অগ্নি পথের দরকার হয় না।
আগ্নেয়গিরিকে অনেকে জ্বালামূখী বলে।ধারে কাছে কেউ যায়!
অপরদিকে সৃষ্টির পর থেকে এই অগ্নিই জগৎকে সচল করে রেখেছে।সে হল জটরাগ্নি।সে অগ্নি কখনো ধিকি ধিকি কখনো দাউ দাউ।তাকে প্রশমিত করতে অন্ন আহুতি দিয়ে অগ্নিহোত্রী হতে হয়।জগৎজুড়ে সেই আহুতি অন্ন সংগ্রহে জীবজগৎ ছুটে চলেছে।
তাকে রুদ্ধ করে রাখা মানে জগৎ অচল।জীবন অচল।এখানে বলার অপেক্ষা রাখে যে অন্ন নেই হেতু কাঁচ কলা খাওয়ার কথা বললে কিন্তু হবে না।আমাদের সংস্কৃতিতে সব খাদ্য বস্তুকে অন্ন হিসাবেই বিবেচিত করা হয়।
অগ্নি সেই অন্নকে রসে জারিত করে।কিন্তু কপালের ফেরে সেই অগ্নি  উঠে এসেছে মনে। সময়ে কপালদোষে কি না হয়।'তারক পাল' হয়ে যায় 'তার কপাল।
আমরাও আজ কপালদোষে হয়ে গেছি রুদ্ধ। কোথাকার এক ডন ভাই আকণ্ঠ রস পান করে আমাদেরকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে।অন্ন অণ্বষণে বাইরে যাওয়া বারণ।গেলেই মারন ডন ভাইরাসের অন্ন। কাজ শেষে মানুষ তো ঘরেই ফেরে।ঘরেই তো আছি।সুতরাং ফেরার প্রশ্নই নেই।এক ডনে রক্ষা নেই।কাবু হতে হতে রেখে যাচ্ছে প্রজন্ম ডন।ডায়লগ মেরে যাচ্ছ,ডনকো মারনা সম্ভবই নেহি, না মুমকিন হ্যাঁ।  
ইংরেজিতে ঘর মানে হোম।সেখানেও হোমের আগে বসানো হয় বিশেষণ, সুইট।সে তো সুখের জায়গা বলেই।কিন্তু  অবস্থা গুনে তারক পাল যেমন হয়ে গেছে তার কপাল তেমনি সুখের ঘরও হয়ে আছে আজ কপাল দোষে ঘরবন্দি। সে দোষ কারো নয়।

আমাদের জীবনের আনন্দ বেদনা,হর্ষ বিষাদ,পাওয়া না পাওয়া প্রেম ভালবাসা সব কিছুর জন্য অনন্ত হৃদয় রবীন্দ্রনাথের শরণাগত হই। লিখে গেছেন,
ভালবাসা কারে কয়,সে কি কেবলই যাতনাময়।আজ হয়তো আমাদের ভাবনায়-
ঘরে থাকা কারে কয়,
সে কি কেবল এ ঘর থেকে সে ঘর,
সে কি বিছানায় শোয়া,
বারান্দায় বসা,
সে কি এদিকে সেদিকে উঁকি মারা,
সে কি লিখতে বসে লিখতে না পারা।
সে কি দিন গত সংক্রমণ আর মৃত্যুর শতকরা শুনা। 
সে কি কেবল আলফা বিটা গামা লেমডা শুনা!

 না,আবার খাপ্পা কাপপাও আছে। কেন জানি মনে হয় সবাই যেন আমাদের উপর ক্ষ্যাপা হয়ে আছে।হবে  হয়তো! না কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই।সবাই সাধ্যমত চেষ্টা করছে অভিজ্ঞতাহীন বিপদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভাগ্যে তারক পাল তার কপাল হলে কি আর করা যাবে! বাটের কিল ভূতেও কিলিয়ে যায়।অনেক সময় মনে হয় যাত্রা পালার দুই মুছ সর্বস্ব সেনাপতির মত সময় পার করার জন্যে মঞ্চের  দুই কোণায় থেকে কাঠের তরোয়াল ঘুরিয়ে যাচ্ছি। 

মনে তাই ধিকি ধিকি,হয়তো বা দাউ দাউ! সব শেষে আছে ঢেউ।ঢেউ শুনলেই মনে হয়,ঘরে নয়, বসে আছি নদীকূলে।প্রথম ছিল উত্তেজনা। পরে একঘেয়েমি এখন কখনো মনে হয় ঐ গানই ঠিক,অনলে পুড়িয়ে গেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ