কী লিখি কেন লিখি
অনিন্দিতা গোস্বামী
কী লিখি কেন লিখি
অনিন্দিতা গোস্বামী
কথাসািহিত্যক
কী লিখি কেন লিখি এসব প্রশ্ন একজন লেখকের কাছে বহুবার উঠে আসে। বহু পত্রিকায় বহু সাক্ষাৎকারে আমি তা আগেও বলেছি। কী লিখি তা এককথায় বলতে গেলে বলতে হয়, সব লিখি।কী লিখি না!এই চলমান পৃথিবীতে যা কিছু ঘটেছে, যা কিছু ঘটছে, যা কিছু ঘটতে পারে, সব।মানুষের সুখ দুঃখ, হাসি কান্না, আনন্দ বেদনা,পাওয়া না পাওয়া, তাদের অসহায়তা এসবই যেন ঘুরে ফিরে আসে আমার লেখায়।ওই যে যারা শুধু দিলে পেলেনা কিছুই..আমারও ওই তাদের কথা বলবার জন্যই কলম ধরা। বিশেষ করে মেয়েদের কথা। আমি নিজে একজন মেয়ে না হলে এভাবে মেয়েদের কষ্ট গুলো উপলব্ধি করতে পারতাম না। তাবলে কি শুধুই মানুষ? না, গাছপালা, কীটপতঙ্গ,পশুপাখি সকলের কথাই কোনো না কোনো সময় উঠে এসেছে আমার লেখায়। এমনকি জড় পৃথিবী ও কখনো বা আমার কাছে হয়ে উঠেছে জীবন্ত।
কিন্তু কেন লিখি এতসব?না লিখলে কী হতো?কিছুদিন আগে হলেও হয়তো বলতাম না লিখে পারি না তাই।কিন্তু এখন যেন আমার সত্যি মনে হয় কেন লিখি!সত্যিই কি এতো লেখার কোনো দরকার আছে?কারা পড়েন এতো লেখা! আগে কোটিতে গুটিক লেখক ছিলেন।একজন লিখতেন বাকি রা পড়তেন, এখন প্রায় সবাই লেখেন।প্রতিদিন অসংখ্য লেখা হচ্ছে।হোয়াটস এ্যাপ এ এই লম্বা লম্বা পোস্ট, ফেসবুকে অসংখ্য মানুষের লেখা,অগুনতি ওয়েব পত্রিকা। মানুষ পড়ার প্রতিই আগ্রহ হারাবে।যখন প্রথম এসব শুরু হলো আমি হায় হায় করেছিলাম। কপাল চাপড়েছিলাম। ভাবুন তো আগে লোকে সপ্তাহে একদিন রবিবার একটা গল্প পড়তো কাগজে, হয়তো মাসে একটা ধারাবাহিকের কোনো কিস্তি পড়তো কোনো পত্রিকায়। সেটা কতখানি প্রভাব পড়তো মানুষের মনে! মাথায় যদি সবসময় এতো বিদ্যে গজগজ আর খসখস করে তবে তো তা হজম হওয়াই মুশকিল। কিন্তু তাহলে কি মানুষ লিখবে না? এরমধ্যেও বোধের স্তরে উত্তীর্ণ হওয়া লেখা কেউ যদি লিখতে পারেন সে তো খুব ভালো কথা।
তাহলে এখনো লিখি কেন?ওই যে মাত্র আট বছর বয়স থেকে স্কুল পত্রিকায় কবিতা লেখার মাধ্যমে যে লেখার অভ্যাসের শুরু তা যেন আর ছেড়ে যাওয়া যায় না।লেখা ছাড়া আমি নিজেকে যেন ভাবতেই পারি না,বিশেষ করে চিন্তা করা ছাড়া। এ একটা নেশার মতো। প্রেরণা কে তা ভেবে বলতে গেলে মায়ের কথাই মনে হয়।একদিন ছোট্ট বেলায় হটাৎ করেই যখন লিখে ফেলেছিলাম একটা ছড়া মা-ই তখন উৎসাহ দিয়েছিলেন। উসকে দিয়েছিলেন যা মনে হবে তা খাতায় লিখে রাখতে। তবে আমার মনে হয় লেখক বোধহয় জন্মান, কেউ তাকে তৈরি করেন না,শুধু সহযোগিতা গুলো তাকে ধন্য করে মাত্র। হ্যাঁ, ক্লাস নাইনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম পড়ে খুব সচেতন ভাবে প্রথম আমার লেখক হবার কথা মনে হয়। মনে হয় আমিও লিখবো। আসলে ছোট থেকে দাদুর মুখে মুখে শুনতাম অসংখ্য গল্প।বিশ্ব সাহিত্যের কতোকিছুই না জেনে ফেলেছিলাম শুনে শুনে।তারপর দাদু আর মা-ই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন মণি মুক্তোর মতো সব বই। আর হয়তো সেইসব বইকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছিল আমার মনের একান্ত কল্পনার জগত।
একথা সত্যি যে কোনো শিক্ষাই বুঝি সম্পন্ন হয় না গুরু না হলে । আমার গুরু হয়ে এলেন কবি সঞ্জীব প্রামাণিক। কবি দেবদাস আচার্যের বাড়িতে প্রথম পরিচয় ওঁর সঙ্গে। মা-ই নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে করে। না তিনি কোনোদিন আমার কোনো লেখা সংশোধন করে দেন নি। বরং তিনি তার মধ্যে দেখেছিলেন সম্ভাবনা। আর তার সঙ্গে ধার দিয়েছিলেন আমার শিক্ষায়। কার কার কবিতা পড়তে হবে। কিভাবে পড়তে হবে। শিখিয়েছিলেন ছন্দ। পর্ব ভাগ করে করে দেখিয়েছিলেন কবিতার চলন।কতো বই যে তিনি আমাকে পড়তে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। ওঁর ই উদ্যোগেই ১৯৯৫ সালে ভাইরাস প্রকাশনী থেকে বের হলো আমার প্রথম কবিতার বই। সেই বইয়ের অর্থের যোগান দিয়েছিলেন মা। গাংচিল প্রকাশনীর অধীর বিশ্বাস(যদিও গাংচিল তখনো তৈরি হয় নি) ছিলেন সঞ্জীব দার বন্ধু।তিনিই কলকাতা থেকে করিয়ে দিয়েছিলেন সেই বইয়ের প্রচ্ছদ এবং বাইন্ডিং। এক পঁচিশে বৈশাখের দিন সেই বইয়ের ছোট্ট রিভিউ বের হয় আনন্দবাজার পত্রিকার বইয়ের পাতায়।কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বহু পত্রিকায় তখন নিয়মিত আমার কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে।
এরপর পড়াশোনার চাপে কবিতা লেখা একটু কমলেও ২০০০সাল থেকে আবার পূর্ণ উদ্যমে কবিতা লেখার শুরু। দেশ,সানন্দা, কৃত্তিবাস, বিভাস সমস্ত পত্রিকায় লিখছি কবিতা। আর একটা দুটো করে গল্প লিখে রেখে দিচ্ছি ফাইল বন্দী করে। ২০০৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার গল্প প্রতিযোগিতায় দিলাম একটা গল্প পাঠিয়ে এবং দ্বিতীয় হয়ে তা নির্বাচিত হলো।প্রচুর অভিনন্দন। কিন্তু তারপর আবার চুপচাপ। পরের বছর আনন্দবাজারেই হলো বিষয় ভিত্তিক গল্প প্রতিযোগিতা।যাতে একটি বিষয়ে মাত্র দুটি গল্প নির্বাচিত হবে। তখন সাহস বেড়েছ। দিলাম একটা গল্প লিখে পাঠিয়ে।হ্যাঁ পরের বছর ও ওই দুটি গল্পের মধ্যেই আমারটি নির্বাচিত হলো। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি।প্রচুর পত্রিকা থেকে গল্প লেখার আমন্ত্রণ পেলাম। আনন্দবাজার, বর্তমান, আজকাল,সুখী গৃহকোন,সানন্দা,সাপ্তাহিক বর্তমান, দেশ, সর্বত্র প্রকাশিত হলো আমার গল্প। এমনকি বাংলাদেশের যুগান্তর, ভারত বিচিত্রা ইত্যাদিতেও প্রকাশিত হলো গল্প,উপন্যাস। বুঝতে পারলাম মানুষ আমার গল্প গ্রহণ করছেন। কিন্তু তখনো আমার কোনো গল্প সংকলন নেই।আমার বহু পাঠক ই আব্দার করেন গল্পের বইয়ের জন্য।কিন্তু প্রকাশক পাই না।আমার এক গোঁ নিজ খরচে বই করবো না। কারন তাতে কোনো লাভ নেই বলে আমার বিশ্বাস। প্রকাশক তখনই বই করেন যখন একজন লেখকের বাজার তৈরি হয়।আর তার জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ। আজকাল সেই অপেক্ষাই নেই।চটপট সবাই খ্যাতি পেতে চান। আমার বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা ১২ প্রথম বইটি আর একটি কবিতাই বই ছাড়া সব কটি বইই প্রকাশক তার অর্থ ব্যয় করে করেছেন। নিজে বই করলে আমার বইয়ের সংখ্যা হতো কমপক্ষে ২২।আমার বহু পান্ডুলিপি এখনো পড়ে আছে।২০০৮ সালে চন্দননগর গল্পমেলায় আলাপ হয়েছিল সাহিত্যিক অমর মিত্রের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছিলেন করুণা প্রকাশনী তে শনিবারের আড্ডার কথা। সেখানে গিয়েই আলাপ হয় কতো না সাহিত্যিকদের সঙ্গে(সেই আড্ডা এখন বহুদিন হলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে)। সেই বছর ই প্রথম কলেজস্ট্রিট পত্রিকার পুজোসংখ্যায় আমন্ত্রণ পাই উপন্যাস লেখার। ২০০৯ সালের বইমেলায় সেই উপন্যাস বই হয়ে বেরয় করুণার প্রকাশনীর বামাচরণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে। তারপর থেকে প্রায় প্রতি বছর ই বইমেলায় আমার একটি করে উপন্যাস প্রকাশ করে করুণা প্রকাশনী। ২০০৮ এ ই কবি গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে শৈব ভারতী পত্রিকার পুজো সংখ্যায় লিখি একটি ছোট্ট উপন্যাসিকা। কিন্তু সেটার তখন প্রকাশক পাই না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২০ র বইমেলায় সেই বই প্রকাশ করেন গুরুচণ্ডালী। একটি বড়ো উপন্যাস লিখছিলাম দীর্ঘদিন ধরে, ২০১৮ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হলো আমার সেই সুবৃহৎ উপন্যাসের একটি অংশ। আর বহু অপেক্ষার পর বেশিরভাগ বাণিজ্যিক পত্রিকায় এবং দুএকটি উল্লেখযোগ্য অল্প পত্রে প্রায় দেড় শতাধিক গল্প লেখার পর ২০১৯এ করুণা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হলো রয়াল সাইজের আমার ৫০টি গল্প সংকলন। হ্যাঁ চেয়ে নিলেন প্রকাশক।ওই যে বললাম আমি এটুকুর জন্য অপেক্ষা করি।কারন প্রকাশকই একমাত্র বোঝেন বইটি প্রকাশের সময় হয়েছে কি হয়নি।
এ সবই তো আমার পুরস্কার। পাঠকের চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী ই বা হতে পারে! যদিও সর্জনা শারদ সম্মান, জাগরন সাহিত্য সম্মান, টেগর ভিলেজ সাহিত্য সম্মান, রেউই পুরস্কার ইত্যাদি সব সম্মান ই আমাকে ভালোবাসায় আপ্লুত করেছে। তথাপি লাইব্রেরীতে আমার বই পড়ে আমার এক পুরনো ছাত্রী যখন নিজে হাতে তৈরি পুঁতির পুতুল নিয়ে ৪০কিমি ট্রেনে করে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে,কেউ আমার লেখা পড়ে ফোনে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে বলেন,আমার কথা এমন ভাবে লিখলে কেমন করে ,কেউ পুজো মন্ডপে জড়িয়ে ধরেন বুকে,ট্রেনে কেউ যখন আমার হাতটা ছুঁয়ে দেখতে চান, তখন সে প্রাপ্তির কোনো তুলনা হয় না।মনে হয় এর জন্যই বেঁচে আছি আমি। এই হট্টগোলের মধ্যেও এটুকুর জন্যেই হয়তো লিখি।
অনিন্দিতা গোস্বামী
বি ৭/৮৭ কল্যানী,নদিয়া।
পিন.৭৪১২৩৫
0 মন্তব্যসমূহ