কী লিখি কেন লিখি দীলতাজ রহমান

কী লিখি কেন লিখি 
দীলতাজ রহমান


কী লিখি কেন লিখি 
দীলতাজ রহমান
কবি-কথাসাহিত্যিক

আমার কী মনে হয় জানেন? মনেহয়, সারাক্ষণ কেন লিখি না! একটা কোনো ফুলের গন্ধ যদি বাতাস ঘাণেন্দ্রীয়’র পাশ দিয়ে ভাসিয়ে নেয়, সেই গন্ধটা আমাদের চেতনায়, মুহুর্মুহু জেগে উঠলেও আমরা তা দিয়ে একটা ফুল তৈরি করতে পারব না! কিন্তু আমাদের চারপাশে ঘটা প্রায় প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি স্মৃতি, এমন কি কল্পনায় ভেসে ওঠা কোন দৃশ্য নিয়েও আমার ফুলের অধিক একেকটা স্থাতব্য নির্মাণ করতে পারি! মন তাই নিয়ে খেলাচ্ছলে, আপনা থেকে কী চমৎকার একেকটা গল্প বানিয়ে ফেলে। তাই কেন লিখি’র চেয়ে, কেন লিখি না আমাকে সেই বোধটিই তাড়িত করে বেশি।
এবার আসি আরেক প্রশ্নে-নবমশ্রেণিতে থাকতেই বিয়ে হয়। লেখাপড়া এককথায় ওখানেই ইস্তফা। গার্জিয়ান যারা, তারা খালি বলতো ‘পড়ো! পড়ো!’ কিন্তু নতুন জায়গায় নতুন করে স্কুলে ভর্তি করা থেকে স্কুলের উচ্চক্লাসে পড়া একজন ছাত্রীর জন্য যা করতে হয়, তা তারা কেউ করেননি। না মা-বাবা, না স্বামী। এভাবে দেড়/দুই বছরের ব্যাবধানে ছেলেমেয়ে হয়ে, তাদের মুখে যখন কথা ফুটতে থাকলো, তখন আমার সব তৃষ্ণার রসদ যেন মরিয়া হয়ে তাদের মধ্যে স্থাপন করতে চাইলাম। তাদেরকে সময়ের আগেই খাতা-কলম ধরিয়ে দিলাম। তারপর তারা খাতার যে পাতা ছিঁড়ে দলামুচড়ো করে ফেলে দিতো, আমি সেগুলো জাজিমের নিচে রেখে দিতাম। তারপর মনে যা আসতো, তা-ই লিখে আমি আবার দলামুচড়ো করে ফেলি। একদিন আমার লিখে ফেলানো একটা কাগজের দলামুচড়ো ছাড়িয়ে আমার হাজবেণ্ড বললেন, ইদানীং তুমি যা লিখছো, দেখছি তা কবিতা হয়ে যাচ্ছে।’ (এইকথাগুলো আমি বহুবার লিখেছি, কিন্তু কখনো মনে হয়নি, তিনি আমার ফেলানো কাগজের দলামুচড়ো ছাড়িয়ে কেন দেখতেন?) যাহোক, তখন তিনি বলেছিলেন, এগুলো ফেলো না। রেখে দাও। বই করে দেবো।’
বাড়িতে ঢেঁকি থাকলে যেমন ধান-তুষ-কুঁড়োর ইতিহাস জানা যায়, তেমনি তিনি বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মৌলভি আবুল বাশার ওসমান গণির দৌহিত্র ছিলেন বলেই সেদিন ওই কথা বলতে পেরেছিলেন। কারণ তার নানার বাড়ি ৮, ওয়্যার স্ট্রিটে প্রেস ছিলো। তিনি যদি সেদিন ওই কথাটি আমাকে না বলতেন, আমার কখনোই লেখালেখি করা হতো না। তাই কৃতজ্ঞতা শুধু তার কাছে একা নয়, তার নানার কাছেও এবং সেই লগ্নটিরও কাছে। কারণ, ঠিক ওই সময়ে তিনি ওই কথাটি না বললে, হয়তো আর কোনদিনই বলতেন না! 
হাজবেণ্ড ওই কথা বলার পর থেকে যা মনে আসতো সেইসব ছেঁড়া কাগজে লেখার পর তা আবার একটি ডাইরিতে তুলতাম। আর সেখান থেকে হাতে কপি করে করে বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতাম আর তা ছাপা হতে থাকলো। যতবার কপি করতাম ততবারই লেখার ধরণ পাল্টে যেত। 
চার-চারটে শিশুর মা এবং বাবার দায়িত্ব পালন করে, মানে ছোট ছেলের বয়স যখন একবছর, তখন তাদের বাবাকে বদলি করা হয় ঢাকার বাইরে। তাই দ্বিগুণ দায়িত্বের সাথে অপটু ঘরকন্নার আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা সেই হাঁসফাঁস দিনের ভেতর কবিতার লেখার তাড়না আমাকে বিভোর করে রাখতো। শুধু ছাই ফেলতে ভাঙাকুলো জীবন, শুধু প্রদীপের নিচে অনিবার্য অন্ধকার হয়ে থাকার যাতনা থেকে কবিতা লেখার নেশা আমাকে যেন আমার স্বল্প পরিসরের বাড়ির কার্নিশে একখণ্ড আকাশ এনে দিলো। এখন বুঝি, তখনকার ওগুলো ঠিকঠাক কবিতা হতো না। কবিতা অনেক দূরের কিছু। তবু তাদের খর্বত্ব নিয়ে আমার দুঃখ নেই, কবিতা সৃষ্টি করতে গিয়েই তো শব্দের সিঁড়ি বেয়ে একটি গন্তব্যের পথে আমি পা বাড়িয়েছিলাম! তখন ফেসবুক ছিলো না। এমন জায়গায় বাড়ি বানিয়েছিলাম, ভাঙা রাস্তা দিয়ে বহুদূর হেঁটে যেতে হতো। তাই বন্ধু-বান্ধব দূরে থাক, কোনো আত্মীয়ও ঠেকায় না পড়লে সেখানে যেতো না। একলার আনন্দে তখন যা লিখতাম, পত্রিকায় ছাপা হলেও এখন ওগুলো পাঠকের সামনে আনতে লজ্জা পাই। আমার কবিতার বই আটখানা। বিক্ষিপ্তও রয়ে গেছে বিস্তর কবিতা। জীবন যদি সে সময় আমাকে দেয়, তাহলে সেগুলো আরো ঠিকঠাক করে রেখে যাওয়ার একটা তীব্র ইচ্ছে আমার আছে।
যা হোক, লেখালিখির সূত্র ধরেই কবি নাসির আহমেদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তিনি একদিন আমার প্রথম লেখা একটি গল্প ফোনে শুনে বলেছিলেন, তুমি গল্প লিখলে অনেকের ভাত মরবে…। কিন্তু তোকে দিয়ে কবিতা হবে না!’ তার এই একটি কথাই আমার সেই বিভোর দিনে পথের ভেতর পথ পাল্টে দিলো। পেটে বিদ্যে যা ছিলো, তা ওই স্কুল পর্যন্তই। তারপরও শেষের বেঞ্চে বসা ছাত্রী ছিলাম। এদিকে ততোদিনে নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করেছি। তাদেরকে প্রতিপালন ছাড়াও স্কুলে আনা-নেয়াসহ লেখাপড়াও করাতে হতো। সস্তা জায়গায় নতুন করা বাড়ির রাস্তার কথা তো আগেই লিখেছি। তবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে গিয়ে টের পেলাম, বিদ্যেটা ঝালাই হচ্ছিলো। 
আর মুক্তিযুদ্ধের সময় একটা জিনিস আমার হাতে পড়েছিলো। তা আমার জীবন পাল্টেছে কি না, আমি জানি না। তবে তখনি না হলেও বয়সের সাথে সাথে, ক্রমে আমার মনন দুমড়ে-মুচড়ে পাল্টেছিলো। তাহলো, আমার মায়ের বিয়ের আগে আমার বাবার আরেকটা বিয়ে ছিলো। কিন্তু কোনো একটা কারণে রাতে বউ বাড়িতে এনে সকালে আমার বাবার ছোট দুটি ভাইবোন দিয়ে সে বউ বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। বিষয়টা এমন হলো, মেয়ে ছোট হোক, কিন্তু বউ তো। তাই তারাও আর এ বাড়িতে তাদের মেয়েকে দেবে না। এ পক্ষও আর আনবে না। কিন্তু লোকবলে, তখন আমার দাদা ছিলো না, তাই দাদী লোকবলে দুর্বল হওয়ায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হয়ে বিষয়টা ঝুলে ছিলো। তবে সবাই জেনে গিয়েছিলো, মেয়েপক্ষকে যে লানত দেয়া হয়েছে, তারা এমনিতেই আর মেয়ে দেবে না। এর ভেতর মান্যগণ্য মানুষের ধরাধরিতে আমার বাবার সাথে আমার মার বিয়ে হয়। 
কিন্তু একসময় আমার সে বিমাতার বাবা অকালে মরতে পড়ে। আব্বা করাচিতে চাকরি করতো। তাই আমার বিমাতার পিতা আমার দাদীকে খবর দিয়ে নিয়ে আমার সে বিমাতাকে জোর করে নৌকায় তুলে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। অথচ আমার মায়ের তখন বাচ্চা দুটো। আমি আমার মায়ের তৃতীয় সন্তান। আগের তিনটি নেই। যা হোক, পুরনো বউ এতবছর পর জোর করে বাড়িতে এসেছে, খবর পেয়ে আব্বা পাকিস্তান থেকে চলে আসে। পুরো বিষয়টা ভজখট লেগে যায়। কারণ বিমাতার বাপ ততোদিনে পরলোকে। গণ্যমান্যদের অনুরোধ বউটিকে আর ফেরত না পাঠানো। ওদিকে আমার নানাভাই ছিলেন বিশিষ্ট আলেম। দেওবন্দ মাদ্রাসার তিনি ছাত্র ছিলেন। আমার মা তার চৌদ্দতম এবং শেষতম সন্তান ছিলো। তিনি কোলে দুটি সন্তানসহ মেয়েকে আটকে রাখলেন। এই ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীর তিনটি স্থলই একটি গ্রামের ভেতর। আমার বাবা প্রচণ্ড ভালবাসতেন আমার মাকে। তাই তিনি আর পাকিস্তান যাননি।  আমার মার জন্য চাকরিই ছেড়ে দেন এবং বড় স্ত্রী ফেরত আসা সত্ত্বেও তার দিকে না ফিরে আমার নানার বাড়ির বনে-বাদাড়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতেন। আমার নানার বাড়িটি ছিলোও বন-বাদাড়সম্বলিত। কারণ নানাভাই তার যৌবনেই তিনতিনবার বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি গড়েছেন, জমির উর্বরতা দেখে এবং তা কয়েক বিঘে জমি নিয়ে। যেখানে বাঁশবাগান, সুপারি বাগান, খেজুর বাগান সব আলাদা আলাদা। শেষবার যেখানে বাড়ি করেছে, যে বাড়ির ফিরিস্তি লিখছি, সে বাড়ি যখন করা হয় তখন আমার মা’র বয়স নাকি দুই ছিলো। তারপর আমার বাবার সাথে মায়ের দুাট সন্তানসহ ভজখট সময়টা যখন বইছিলো তখন নিশ্চয় মার বয়স বিশ পার হয়েছিল! তো আমি আমার মায়ের তিন নম্বর সন্তান, আমার সন্তান হওয়ার পর নয় শুধু, তারা যখন বড়ও হয়েছে, আমার মামাবাড়ি গিয়ে মায়ের নামে তারাকাটা দিয়ে সুপারি গাছে আমার বাবার ছন্দ মিলানো ক্ষুদ্র পঙক্তি তাদেরকেও দেখিয়েছি। তাদের মানে আমোর সন্তানদেরকে।  এখনো দু’একটি গাছে সে পঙক্তি আছে বলে আমার মনে হয়। 
 যাইহোক, আমার মা একসময় পালিয়ে চলে আসে আমার বাবার সাথে এবং আমার বাবা শেষ পর্যন্ত আমার মাকে বিশেষ সম্মান করে গেছেন এবং আমার বাবা মায়ের মায়ের কবর দু’টিও পাশাপাশি। 
তো এই অনাহুত প্রসঙ্গটি যে জন্য আমার এখানে টানতে হলো, সেই যে দীর্ঘদিন আমার মা তার বাবার বাড়ি আটকে ছিলেন, তখন বাবার সাথে যে চিঠি চালাচালি হয়েছিলো, সেইসব চিঠি একটা ময়না কোলার (যে কোলা কলসের মতো গড়ন) ভেতর রেখে কোলার মুখে একটি ঢাকুন নিয়ে মাটি দিয়ে সে মুখ লেপে রাখা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স দশ বছর ছিলো। কিন্তু যুদ্ধের আগে আমরা ঢাকার টঙ্গীতে ছিলাম। এখন যা গাজীপুরের ভেতরে। তখন মাত্রই খুলনা থেকে ব্যাবসা গুটিয়ে আব্বা আমাদেরকে নিয়ে ঢাকায় আসছেন মাস তিনেক হবে। আমার বাবার হারবাল ঔষধের ব্যাবসা ছিলো। ব্যাবসাটা খুলনাতে অনেক বড় পরিসরে ছিলো। কিন্তু ঢাকাতে মাত্র শুরু হয়েছিল। স্পষ্ট মনে আছে, পঁচিশে মার্চের ঠিক তিন/ চারদিন আগে এক দুপুরে আব্বা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে আমার মা’কে বললেন, পাকিস্তান থেকে অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে মিলিটারি আসছে। রক্ত ছাড়া কোনো দেশেই স্বাধীনতা আসে না! শিগগীর বাড়ি চলো!’ আব্বা খুব ভীতু ছিলেন। মরণকে খুব ভয় পেতেন। একেবারে ঠিক ওই সময়ই আমরা স-ব ফেলে চলে গেলাম! বাড়ি যখন গেলাম, গ্রামের মানুষ আব্বাকে দেখে আর তার সন্ত্রস্ত হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফেরার কারণ শুনে, তাকে নিয়ে সবাই কটাক্ষ ও ঠাট্টা-তামাশা করতে লাগলো। এর ভেতরই একদিন সকালে দেখে আমাদের চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামের একপাশে পাশাপাশি দুই গ্রামে একসাথে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে! এরপর আব্বার ভবিষ্যৎ বাণী গ্রামের মানুষের কাছে খুব মূল্য পেতে থাকলো!
যা হোক। আর দু’তিনদিনের ভেতর সে আগুন আমাদের গ্রামেও এসে লাগলো। বাড়িঘরে থাকতে পারি না। না খেয়ে দড়ি দড়ি অবস্থায় থাকি পথে পথে, ঝোপেঝাড়ে, মাঠে। বা কারো পুকুরের শীতল পাড়ে। হাঁটতে হাঁটতে এমন অবস্থা হতো, আব্বার ওপর রাগ হয়ে দোয়া করতাম, যেন মিলিটারির মুখোমুখি হই। যেন মিলিটারিরা আমাদের মেরে ফেলে। ক্ষুধার জ্বালা আর হাঁটার কষ্ট দুই-ই এক হয়ে আমাদের এমন অবস্থায় নিয়েছিল। 
দেখা গেছে অন্যরা যখন রাঁধছে-বাড়ছে-খাচ্ছে-গোছল করছে। গাই দোয়াচ্ছে, আমরা তখন পালাতে যাচ্ছি। কারণ কোনদিক থেকে একটা গুলির শব্দ আসছে। তাই নিরিখ করে সেই বন্দুকের বিপরীতে, মানে ছোটা গুলির দিকে আমরা ছুটছি! ঠিক এমন  সন্ত্রস্ত সেইসব দিনের একদুপুরে ভিষণ ক্ষুধা নিয়ে মাচায় উঠলাম। মাটি দিয়ে মুখ লেপা কোলা দেখে বুকের ভেতর এক ঝলক আনন্দ উথলে উঠলো। চুলোর কাছ থেকে খুন্তি এনে আস্তে চাড় দিতেই পুরো মাটিটা উঠে গেলো। তারপর হাত ঢুকাতেই টের পেলাম, চিড়া-মুড়ি কিচ্ছু নয়। কাগজ খসখস করছে।  আশাহত অবস্থায় একমুঠ কাগজ তুলে এনে চোখের কাছে ধরতেই দেখি আমার মায়ের হাতের লেখা। ভাঁজ খুলে দেখি আব্বাকে লেখা মা’র চিঠি! ক্ষুধা ভুলে গেলাম। উঠোনের কোনায় ছিলো বিরাট খড়ের পালা। একমুঠো একমুঠো করে চিঠি ফ্রকের কোচড়ে তুলে, আস্তে নেমে গিয়ে খড়ের পালার আড়ালে লেপটে বসে পড়ি। দেখি, মার চিঠির ভেতর উত্তর হিসাবে আব্বারও কিছু চিঠি ওতে মিশে আছে। সেসব চিঠির যেগুলো পড়া হয়, সেগুলো আবার ওই কোলার ভেতর ছেড়ে দেয়ায়, একসময় দেখা যেতো একমুঠোর অর্ধেক চিঠি আগের পড়া। তারপর সিকি চিঠি পড়া। তারপর দু’আনি, একআনি। এরপর চুলোর কাছ থেকে খেটোনি নিয়ে কোলার ভেতর চিঠিগুলো ওলট-পালট করলাম। কতদিন ধরে সে চিঠি পড়েছিলাম মনে নেই। কিন্তু সব চিঠি পড়ে শেষ হওয়ার আগে আমার এক আইবুড়ো চাচা আমাকে ওভাবে মগ্ন হয়ে চিঠি পড়তে দেখে তার কি সন্দেহ হলো কিনা, যে আমিই ওই বয়সে কারো সাথে প্রেম করছি…। সে তাই চিলের মতো উড়ে এসে আমার হাত থেকে চিঠিখানা ছোঁ মেরে নিয়ে একঝলক চোখ বুলিয়ে যখন দেখলো যে ও চিঠি আমার মা’র, তখন সে আইবুড়ো একহাতে আমার কান ধরে আরেক হাতে চিঠি নিয়ে আমার মায়ের সামনে গিয়ে বললো, এই দেখো ভাবিসাব, তোমার মেয়ে তোমার প্রেমের চিঠি পড়ছিলো…। আমি ধরে নিয়ে এসেছি!’ চিঠি কোথায় পেয়েছি শুনে আমার মা আমাকে এমন মার দিলো যে ক’দিন পরই রাজাকাররা ঘরে আগুন দিলো এবং তাতে বাকি সব চিঠি পুড়ে ভস্ম। যখন চুরমার হওয়া কোলার চাড়া আর চিঠি পোড়া ছাই বিক্ষিপ্ত হয়েও একাকার মিশে ছিলো, সেদিন আমার মনে হয়েছিল, ঘরসহ ঘরের যা পুড়লো, সবকিছু মিলেও আমার মায়ের ওই চিঠির মূল্যের সমান হবে না! কিন্তু না পড়া চিঠিগুলোর কথা মনে হলে সেই চাচাকে চামারের অধিক আজো মনে হয়। 
এতক্ষণ আমার মায়ের চিঠির বর্ণনা দিলাম এজন্য, যে আমার গল্প নিয়ে কবি নাসির আহমেদের প্রেরণামূলক কথাটি শোনার পর আর কবিতা লিখতাম না। খুব অল্প সময়ে আমি অনেকগুলো গল্প লিখি। যেন তখন যার দিকে তাকাই, তার মুখেই গল্প। খালি সে উদ্গম গল্পকে বাঁশ-কঞ্চি দিয়ে জাংলা দিলেই যেন লতানো গাছের মতো ধেয়ে বাড়ে! আমার লেখালেখি শুরুই একটু বেশি বয়সে। বয়সানুপাতে আমি আশির দশকের হই। কিন্তু লেখা শুরু আমার নব্বই দশক থেকে। গল্প লেখা দুই হাজার সাল থেকে। তাই আমাকে তো কেউ চিনতেন না। কবিতা যত সহজে ছাপা হয়, গল্পের বেলা তো তা নয়। তারওপর আগেই লিখেছি আমার স্বামী প্রবর বিরাট একটা চাকরি করলেও তিনি থাকতেন ঢাকার বাইরে বাইরে। পরবর্তী সময়ে ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে আর বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার আমি লেখা ছাপার জন্য ইত্তেফাকে দাদাভাইয়ের কাছে ধর্ণা দিতাম। দাদাভাই মহিলাঙ্গনের এতটুকু পরিসরে যে গল্পটি ধরতো সেটাই ছাপতেন। তখন তো ঘরে ঘরে ইত্তেফাক রাখা হতো। দেখলাম ওই বিন্দু-বিসর্গ গল্পই পড়েই আমার প্রচুর মুগ্ধ পাঠক তৈরি হয়েছিলো। ড. আশরাফ সিদ্দিকীও ফোন করতেন। তিনি সেই আমার মহিলাপাতার যুগেই বলেছিলেন, তোমার মাথার ওপর আমার আর্শীবাদের হাত আছে। একসময় মানুষ তোমাকে খুঁজবে…।’ আজ তিনি নেই। তবু আমি তার বলা কথা এখানে লিখলাম, কারণ তিনি জীবিত থাকতেও আমি এ কথা বিভিন্নখানে লিখেছি। তবে এটা ঠিক, তিনি আর্শীবাদ করে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু আমি তো নিজেকে সেই উচ্চতায় নিতে পারিনি! চেষ্টাও করতে পারিনি। নিজের এই সীমাবদ্ধতাকে আমি বুঝি। তো ড. আশরাফ সিদ্দিকী আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কোথায় লেখাপড়া করেছি, আমি বলেছিলাম, স্যার, লেখাপড়া করার সুযোগ পাইনি। আমার বাবা তার এক অতি ধীমান শিষ্যকে টার্গেট করেছিলেন মেয়ে বিয়ে দিতে। শেষে সে হাতছাড়া হয়ে যায়, তাই তাড়াতাড়ি করে বাবা তার স্কুলে পড়া মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। তারওপর ছাত্রী হিসাবেও ভাল ছিলাম না। তারওপর আবার মাত্র সাড়ে বাইশ বছর বয়সের ভেতর বাচ্চা চারটে…। লেখাপড়া যতটুকু করেছিলাম, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে করাতে তাই ঝালাই হয়ে কাজে লাগছে…।’ বাংলা একাডেমির মাঠে তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে তুমি লেখার এই ভাষা পেলে কোথায়?’ সেই তখন আচমকা উত্তরটা আমার মাথায় এলো, আমি কখনো ভেবে দেখিনি আগে, যে এইরকম একটি প্রশ্নও থাকতে পারে! আমি তাঁকে বললাম, আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার মায়ের বেশ কিছু চিঠি পড়েছিলাম…!’ আমার এই কথা তিনি কীভাবে নিয়েছিলেন, আমি জানি না! কিন্তু তিনি ওই প্রশ্নটি না করলে আমি কোনোদিনও হয়তো বুঝতাম না, মায়ের চিঠিগুলোর নির্যাসই আমার ভেতরে আলোর পাহাড় হয়ে আছে। আর শুধু ভাষা কেন, ভাবও আমার মায়ের! মা’র মিশ্র সেইসব ভাষা-‘ভাব’ই আজো আমার ভেতর ব্যঞ্জিত হচ্ছে বহুরূপে। বহুভাবে।  কী অন্তর জর্জরিত দহন ছিলো, সমাধানহীন কী কঠিন সঙ্কটের স্থাতব্য ছিল প্রতিখানা চিঠিতে! মনে হয় তার থেকে তিল পরিমাণও আমি নিতে পারিনি! বাবাকে লেখা মা’র  একখানা চিঠির সম্বোধন এখনো মনে পড়ে গায়ে কাঁটা দেয়। ‘পরাণের ধোকাবাজ’।
এমনিতে মা দুপুরে ঘুমানোর আগে মাটির শ্লেটের ওপর একটা লাইন লিখে আমাকে বলতেন, আমি ওই লাইন দেখে দেখে যেন একশোবার লিখি। লিখি আর মুছি। কিন্তু হাতের লেখা মা’র হাতের লেখার মতো ভাল করতে খালি মা’র লেখা ওই লাইনটা যেন না মুছি। এক টুকরো তেনা মা ভিজিয়ে হাতের কাছে দিয়ে মা বলতো, ‘ছেপ দিয়ে যেন শ্লেট না মোছো। ওই তেনা দিয়েই মোছো!’  আমি কখনো তেনা দিয়ে মুছতাম। কখনো একখাবলা ছেপ দিয়ে। কিন্তু একশো বারই লিখতাম। এরপর যখন বড় হলাম, নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করতো। কারণ, কেন আমি একটি লাইন একশোবার লিখতাম! আমি একবারও কেন কম লেখলাম না! কেন আমার মনে হতো, কমবার লিখলে মা টের পাবে!
কিন্তু আমার মা যে লাইনগুলো আমাকে লিখে দিয়ে প্রতিদিন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়তো, সে আধফোটা ফুলের মতো অস্পষ্ট ভাবের সে লাইনগুলো আমি আর কোথাও পাইনাই। অতএব লাইনগুলো আমার মায়েরই সৃষ্ট ছিলো।   
আমার জীবনে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পুরস্কার নেই। শ্রীপুর সাহিত্য পরিষদ বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে একটি সম্মাননা দিয়েছেন, আরেকটি দিয়েছে কিশোরগঞ্জ ছড়াকার সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্মৃতি পদক ও সম্মাননা ২০১৮। আরেকটি দুইহাজার উনিশে ‘হিউম্যান রাইটস্ এ্যাওয়ার্ড’ মানবাধিকার সোসাইটি থেকে।
আর জীবনে কিছু মানুষের আশীর্বাদ তো আছেই অনুপ্রেরণা হয়ে। যা যে কোনো পুরস্কারের চেয়ে আমার কাছে বড়। ড. রফিকুল ইসলাম স্যার যখন বাংলা একাডেমির ডিজি ছিলেন, তখন একদিন ফোন করে বলেছিলেন, আপনার একটি গল্পের বই আমার হাতে। গল্পগুলো আমাকে ঊর্ধ্বশ্বাসে টেনে নিচ্ছে। আজই একটি গল্প নিয়ে আসুন উত্তরাধিকারের জন্য।’ বাংলা একাডেমিতে বহুবছর ধরে আমি এমনিই যাই। কারণ ওখানে অনেকেই আছেন যারা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তো একদিন ঝড়ের বেগে বেরিয়ে আসতে দেখি আমাদের এক সিনিয়র লেখিকা আপা ডিজি স্যারের সাথে দেখা করতে সামনের রুমে বসে আছেন। আমি তাকে বললাম, আপা বেরোবেন? তিনি বললেন, ডিজি স্যারের সাথে দেখা করে পরে যাবো।’ ডিজি স্যারের সাথে দেখা করার কারো কোনো কারণ থাকতে পারে, তাও আমি জানতাম না ওই তখন। আমি তাই সে আপাকে বললাম, আমিও তাহলে আপনার সাথে ভেতরে যাই। পরে একসাথে একাডেমি থেকে বেররো। সেই আপা যে দরকারে গিয়েছিলেন, সেই কথা তিনি খুব ধীরে বলতে লাগলেন, আর আমি এই সুযোগে স্যারকে আমার দু’খানা বই দিয়েছিলাম। মাত্র তখন আমার দুটি বই একসাথে বের হয়েছে। ‘ধূসর আঁচলে চাবি’ ও ‘বহুকৌণিক আলোর সংঘাতে’ স্যার আমাকে ওইটুকুই দেখেছিলেন।
এরপর বাংলা একডেমিতে আরেকজনের ভূমিকার কথাও এসে যায়, যদিও এরকম অঢেল ঘটনা আছে। তবু এইটুকু বলে শেষ করি। একদিন একুশের মেলায় কে একজন আমাকে দীলতাজ ! দীলতাজ!’ বলে নাম ধরে ডাকছেন, আমি ফিরে তার দিকে এগোতে থাকলে আরেকজন আরেকদিক থেকে আমার দিকে এগিয়ে এসে অধীর হয়ে বললেন, ‘আপনি দীলতাজ? আমি হ্যাঁ বলতেই তিনি বললেন, আমি মাহবুব আযাদ। বাংলা একাডেমির উপপরিচালক। আপনাকে আমি মনে মনে কত খুঁজছি…। আপনি ‘উত্তরাধিকার’এ যে গল্প পাঠান, জমতে জমতে একবোঝা হয়ে গেছে। আমার বাড়ি চট্টগ্রাম। তাই একদিন ট্রেনে যেতে আপনার গল্পগুলো নিয়ে যাই পথে পড়বো বলে। আমি জানালার পাশে বসে আপনার গল্প পড়ছি, আর তাতে আমার মুখে যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে, তাই দেখে আমার পাশের যাত্রী মাথা উঁচু করে করে দেখছিলেন আমি কী পড়ি। পরে তাকে বললাম, আপনি পড়বেন? বলে তাকে ব্যাগ থেকে দুইএকটা গল্প বের করে দিলাম। পরে তার দিকে তাকিয়ে দেখি তারও মুখের অবস্থা আমার মতো! তো, আপনি গল্প পাঠিয়েছেন অনেক, ওখান থেকে একটা গল্প ঠিক করে দেবেন। আমরা তো বেশি খোলামেলা বর্ণনার লেখা ছাপতে পারি না। তাই আপনি নিজেই একটু সংযত করে দিয়েন। তারপর মাহবুব ভাই আমাকে দিয়ে অনেকগুলো গল্প লিখিয়ে নিয়েছেন এবং আমাকে দিয়ে তিনি পাঁচটি শিশুতোষ বইও করিয়েছেন। 
একদিন এক লেখিকা বললেন, ‘দাদাভাই তোমার কথা বলেছেন, তুমি যেমন মেধাবী তেমন চোর। নাম পরিবর্তন করে করে একই লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় দাও।’  তবু দাদাভাই ইত্তেফাকের মহিলাঙ্গনে আমার বেশ কিছু লেখা ছেপেছেন। গল্পে সেটাই ছিল পাঠকের সাথে আমার পরিচয়ের বড় ভিত্তি। এরপর আরেকজনের নাম না লিখলে নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবো। আর সেই তিনি কবি সৈয়দ হায়দার। আমি যখন একের পর এক গল্প লিখছি, কেউ ছাপে না। না ছাপা হওয়া গল্পে যখন স্তূপ ভারী হচ্ছিল, তখন সৈয়দ হায়দার ক’জনকে বলে দিয়েছিলেন, ‘তোমরা দেখো তো দীলতাজ কেমন গল্প লেখে!’ হায়দার ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব তো ওই রকমই ছিলো, সবাই জানতেন, ছাপার মতো গল্প দীলতাজ না লিখলে কবি সৈয়দ হায়দার কাউকে বলতে যাবেন না। 
একদিন আমি হায়দার ভাইকে বললাম, ‘অনন্যা’য় কত গল্প পাঠাই কিন্তু দিল মনোয়ারা মনু আপা ছাপেন না। হায়দার ভাই বললেন, একটা গল্প আপনি আমার নামে পাঠান তো!’ 
তখন হায়দার ভাইয়ের বাসা ছিল ‘অনন্যা’ পত্রিকার কাছাকাছি। হায়দার ভাই আমার পাঠানো প্যাকেটি ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মনু আপাকে দিতে। মনু আপা নাকি রূঢ়স্বরে একজন কবির নাম বলে বলেছেন, ‘দীলতাজের সব গল্প উনি লিখে দেন…।’ হায়দার ভাই মনু আপাকে থামিয়ে বললেন, তাহলে ওই কবিকে বলবেন তো নিজের জন্য এমন একটা গল্প লিখতে!’ 
যা-ই হোক, একজন প্রকৃত সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা যেমন মহার্ঘ বিষয়। তেমনি প্রতিবন্ধকতাও তার সৃষ্টির উৎসমুখ খুলে দেয়। তাই যিনি লেখেন, তিনি সর্বাবস্থায় তিনি কাহিনী বুনে চলেন। হয়তো অনেকাংশে অনেক কিছু লেখা হয় না, কিন্তু যা লেখা হয় না, তার কাহিনীও তিনি আপন মনে নির্মাণই করে চলেন, বিশ্ব প্রকৃতিকে ক্যানভাস করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ