কী লিখি কেন লিখি হোসেনউদ্দীন হোসেন

কী লিখি কেন লিখি 
হোসেনউদ্দীন হোসেন
জন্ম : ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪১

কেন লিখি? এটা একটা প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায় যে, আমি একজন ভাবুক মানুষ। নিজেকে নিয়ে ভাবি, অন্যকে নিয়ে ভাবি, আমার চারপাশের পরিবেশ নিয়ে ভাবি। জগৎ নিয়ে ভাবি। যে সমাজে বসবাস করি, সেই সমাজ নিয়ে ভাবি, সমগ্র মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে ভাবি। যা-যা ভাবি-- তাই, নিজের ভাবনাটাকে প্রকাশ করার জন্যে লিখি। বিষয়টিকে প্রকাশ করি কখনো গল্পচ্ছলে, কখনো কবিতাচ্ছলে, কখনো রঙ তুলির মাধ্যমে।
বেশ মনে আছে, খুব অল্প বয়সে বিভিন্ন কবির লেখা ছড়া পড়তাম। এই ছড়াগুলো যে কোনো ব্যক্তির লেখা, তা জানতাম না। এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন মনে হলো, আমি তো এরকম করে কিছু লিখতে পারি। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে একটা ছড়া রচনা করলাম। নিজেই নিজের লেখা পড়ে বিস্মিত হয়ে গেলাম। কয়েকদিন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে সময় কেটে গেল।
একটা কিছু লিখেছি, এটাই ছিল আমার কাছে মহাবিস্ময়। মনের ভেতরে একটা প্রফুল্লতা আমাকে উন্মাদ করে তুললো। আমিও লিখতে পারি। আমিও যে আমার ভাবনাটাকে ভাষার মধ্যমে প্রকাশ করতে পারলাম, এই ঘটনাটি ছিল আমার কাছে একটা মহাবিস্ময়।
এই যে আমি ‘লিখতে পারি’-- এই কথাটা কি ভাবে ঘোষণা করা যায়-- তাই নিয়ে আবার ভাবতে লাগলাম। একবার মনে হলো, আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে, ওই রাস্তার দু’পাশে যে গাছগুলো আছে, তার ডালে ডালে কাগজে লিখে আমার লেখাটি সুতোয় বেঁধে ঝুলিয়ে দেই। মুহূর্তেই মনে হলো, আমার এই লেখাটি পাঠ করবে কে বা কারা এই অঞ্চলের কতজনই বা লেখাপড়া জানে?
আসলে তখন নিরক্ষর লোকের সংখ্যা ছিল প্রায় নিরানব্বই ভাগ। শেষ পর্যন্ত মনের আবেগ মনের ভেতরেই চেপে রাখলাম।
সবেমাত্র দেশভাগ হয়েছে। এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে ভিটেমাটি ফেলে লোকজন। ওপার থেকেও আসছে কেউ কেউ। যে বিদ্যালয়ে পড়তাম, সে বিদ্যালয়ের অনেক হিন্দু শিক্ষক এপার থেকে ওপারে চলে গেলেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ননীবাবুও চলে গেলেন। কেমন যেন একটা শূন্যতা। ননী বাবুর বদলে হুগলি থেকে এসে প্রধান শিক্ষক হলেন আব্দুল বাকী সাহেব। আবার বিদ্যালয়টিতে নতুন করে কার্যক্রম শুরু হলো।
আমার লেখালেখির বিষয়টি তখনো কেউ জানে না। নিজের ভাবনাগুলো লিখে রাখতাম একটা খাতায়। 
আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন ওমর ফারুক নামে একজন মৌলবী সাহেব। তিনি আমাদের বাড়িতে থাকতেন এবং আমাদের বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা প্রদান করতেন। একদিন মৌলবী সাহেব আমার কবিতার খাতাটি দেখে ফেললেন। বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের নিকট আমি কবিতা লিখি বলে অভিযোগ জানালেন। প্রধান শিক্ষক মহোদয় আমাকে তলব করলেন। আমি ভয়ে ভয়ে তার সামনে গিয়ে হাজির হলাম।
তিনি প্রশ্ন করলেন, তুই নাকি কবিতা লিখিস?
আমি তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগলাম।
আবার প্রশ্ন করলেন, কিরে, জবাব দিচ্ছিস না ক্যান?
আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তিনি আমার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, যা বাড়িতে গিয়ে কবিতার খাতাটি নিয়ে আয়। আমি একটু পড়ব তোর কবিতা। বিদ্যালয় থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব বেশি নয়। আমি ছুটতে লাগলাম। বাড়িয়ে গিয়ে কবিতার খাতাটি হাতে করে আবার ফিরে এলাম।
প্রধান শিক্ষক মহোদয় খাতাটি দেখলেন। খাতার প্রথম পাতায় লেখা--
‘ওয়েসিস’, এই নামটি কি তুই দিয়েছিস?
আমি বলাম, জি স্যার।
তিনি কয়েকটি কবিতা চোখ বুলিয়ে দেখলেন।
নিতাই পদ ছিলেন বিদ্যালয়ের একজন দপ্তরি। তিনি তাকে বললেন, কালীপদ বাবুকে ডেকে আনো।
কালীপদ চক্রবর্তী ছিলেন প্রবীণ শিক্ষক। তিনি বিদ্যালয়ে অংক শিখাতেন। কিছুক্ষণ পর তিনি প্রধান শিক্ষকের ঘরে এসে চেয়ারে বসলেন।
প্রধান শিক্ষক মহোদয় বললেন, কালীপদ বাবু, এই খাতাটি নিন, দেখুন তো কবিতা হয়েছে কী না?
কালীপদ বাবু খাতাটি নিলেন, পাতা উল্টিয়ে দেখলেন, বললেন, আগামী কাল সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে তুমি আসবে, কবিতা হয়েছে কি হয়নি, এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
মৌলবী সাহেব চেয়েছিলেন আমার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তার বদলে আমি পেলাম আশীর্বাদ।
আমি যথারীতি পরের দিন সন্ধ্যায় কালীপদ বাবুর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম।
তিনি আমাকে ছন্দ সম্বন্ধে হাতে কলমে শিক্ষা দিলেন।
বললেন, তুমি যদি ছন্দ রপ্ত করতে পারো, তবে অবশ্যই ভালো কবিতা লিখতে পারবে।
এই প্রথম বুঝলাম, কবিতা লিখতে হলে ছন্দ জানা দরকার।
আবার শুরু হলো নতুন উদ্যমে লেখালেখির পালা। তারপর উপলব্ধি করেছি-- লেখালেখি করলেই হবে না-- লেখার মধ্যে থাকবে যেমন ছন্দ-- তেমনি থাকবে শিল্প ও পরিমিতি বোধ।
আমি এখনো বিশ্বাস করি যা লিখি তার মধ্যে যদি শিল্প ও জীবনবোধ না থাকে, তাহলে লেখালেখির কাজটা অনর্থক।
আমি আমার উপলব্ধি প্রকাশ করি শিল্প ও জীবনবোধকে অক্ষয় রাখার উদ্দেশ্যে। এটাই আমার লেখালেখির মূল ভাবনা। 

===========
মাহমুদ কামাল সম্পাদিক ‘অরণি’র ২১তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৫) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ