কী লিখি কেন লিখি
আব্দুল মান্নান সরকার
জন্ম : ১৯৫২
আমি কেন লিখি? সত্য বলতে কি এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি আমি কখনো হইনি। কি অন্যের কাছ থেকে না নিজের কাছ থেকে। আমি সচেতনভাবে ভেবে দেখিনি কেন লিখছি। আবার অন্যভাবে বলা যায় আমি সচেতনভাবে লেখার জগতে আসিনি অর্থাৎ খুব ভেবে-চিন্তে বা আট-ঘাট বেঁধে নিয়ে লেখা শুরু করিনি। লেখার জন্য আমার কোন পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। অনেকটা আকস্মিকভাবে লেখার জগতে আসা। এর পেছনের ঘটনাটা এমন-- আমি তখন কালিগঞ্জ শ্রমিক কলেজে বাংলা পড়াই আর সেই সুবাদেই ছাত্রদের জন্য একখানা গাইড বই লিখি। আবার সেই সূত্রে প্রকাশনা ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ি। ভালোই চলছিল, মোটামুটি অর্থাগম হচ্ছিল, কিন্তু বিধি আমাকে সেখানে থাকতে দিলে তো! একদিন আমি সে গাইড বইটি দিতে গেলাম আমার শিক্ষক অধ্যাপক দলিল উদ্দিন ম-লের হাতে, তিনি তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। আমাকে ¯েœহও করতেন খুব। বইটি হাতে নিয়ে এক পলক দেখলেন তারপর সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন মেঝেয়। তারপর বেশ রাগ করে বললেন, তোমার এতবড় সাহস তুমি আমাকে নোট বই দিতে এসেছ। পরে আরো কিছু অপ্রিয় কথা হয় দুজনের মাঝে। আমি অপমানিত হয়ে ফিরে আসি। সে রাতেই প্রতিজ্ঞা করি আর কখনো নোট বই লিখবো না। পরদিন আমার প্রেস ও প্রকাশনা ব্যবসা দুটোই ছেড়ে দেই। এবং তখন থেকেই মৌলিক কিছু লেখার চেষ্টা করতে থাকি। সেটা ১৯৯৫ সাল। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে লিখি ‘পাথার’ উপন্যাসটি। তারপর থেকে তো লেগেই আছি প্রায় দুদশক হয়ে গেল লেখালেখির বয়স। তবে লেখা কি আকস্মিকভাবে শুরু করেছি ঠিক তাও নয়। আমি প্রস্তুতি নিয়ে বা আটঘাট বেঁধে লেখা হয়তো শুরু করিনি। এ কথা ঠিক কিন্তু সাহিত্যের সাথে চেনাজানা ছিল না এমনও নয়। আমি বেড়া উপজেলার বিবি হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থাতেই সাহিত্যের বইপত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি। মামা মরহুম আব্দুর রহমান ছিলেন বেড়া স্কুলের বাংলাভাষা সাহিত্যের শিক্ষক। বই পড়ার অভ্যাস ছিল তাঁর। নিজেও সখ করে দু’একটি কবিতা লিখতেন। নানা মরহুম নইম উদ্দিন আহম্মদ তো রীতিমত কাব্যচর্চাই করে গেলেন জীবনভর, যদিও কোন প্রকাশিত বই তাঁর নেই। সেই রক্তের ধারাটি হয়তো আমি নীরবে বইছিলাম। এ সময়েই আমি কবি জসিম উদ্দিনের সোজন বাদিয়ার ঘাটের অনুকরণে ‘নিধুয়া পাথার’ নামক একটি কাহিনী কাব্য রচনা করি। মনে আছে আমি আমার বাবার দেওয়া তিনখানা রোল টানা খাতায় সে কাব্যটি লিখেছিলাম। কাব্য কিছু হয়েছিল কিনা আজ আর তা বলা যাবে না। কারণ খাতাটি হারিয়ে ফেলেছি। তো এত কথা বলার দরকার কি! এর দুটো অর্থ হয় এক, আমি প্রত্যক্ষভাবে লেখা পরে শুরু করলেও ভেতরে ভেতরে এক ধরনের প্রস্তুতি চলছিল। আবার শুরু এবং আগের শুরু এই দুই সময়ের মধ্যেও বিস্তর পার্থক্যের কারণ আমার সাহিত্য অনুরাগ-অঙ্গীকারে কখনোই দৃঢ়তা ছিল না। আর হয়তো ভালোবাসাও ছিল না।
হ্যাঁ, আট-ঘাট বেঁধে লেখা শুরুর কথা এ কারণে বলতে হচ্ছে যে, আজকের দিনে সাহিত্য ও সাহিত্য সমালোচনায় তত্ত্ব, রীতি-পদ্ধতি, ভাষা বিষয়ে এত কথা হয়, আর এ সবের প্রয়োগ-পরিচর্যা এত বেশি জটিল রূপ নিয়েছে যে এ সব উপেক্ষা করেও কিছু লেখা সম্ভব নয়। শরৎচন্দ্রের আবেগী রচনা আজকের দিনে অচল, কিন্তু সত্যই কি অচল? আমরা যখন ছাত্র তখন হবু কবিদের মাঝে একটা শব্দ মুখে মুখে ফিরত, সুররিয়ালিজম, পরাবাস্তববাদ। সৈয়দ আব্দুল মান্নান তখন জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ লিখেছিলেন, তিনি ফ্যানের ঘুর্ণনে গলা দড়ি বাঁধা ছাগলের চক্রমণ দেখছেন কেবল। সে সময়ের দুটো উচ্চারণ, ‘বনভূমিকে বল ওখানে লম্বালম্বি একটি মানুষ শুয়ে আছে।’ কিংবা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘আজও আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’ কোন ভনিতা নেই, কোন চাতুরি নেই, কি আন্তরিক আর স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ। কাউকেই বলে দিতে হয় না কবিতা কোনটি। এই কথাগুলো বলার অর্থ, আন্তরিক আর গভীর উচ্চারণ ছাড়া ভাল কিছু হয় না তা সে যত কায়দা করে বলা হোক। আজকের দিনে খুব বেশি শুনি উত্তর আধুনিকতা, আর যাদুবাস্তবতার কথা। না, তাও নয় আধুনিক-উত্তর আধুনিকতা, কাঠামোবাদ-উত্তর কাঠামোবাদ, ফেমিনিজম, উপনিবেশবাদ-উত্তর উপনিবেশবাদ, নি¤œবর্গ, মার্ক্সীয় সাহিত্য আরও কত কি! ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষা শুরু হয়েছিল আগেই, ব্যক্তির বহিঃর্লোকের পরিচিতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের চৈতন্য প্রবাহ রীতি, দর্শনের অস্তিত্ববাদ আর চিত্রকলার বিমূর্তবাদ, প্রকাশবাদ, বাস্তববাদ, পরাবাস্তববাদ আরো কত কিছু। আমি হয়তো অতটা জেনে বুঝেও লিখছি না, তাই বলছি আট-ঘাট বেঁধে শুরু করিনি, যেমন করেছেন শহিদুল জহির, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আরো আগে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। আর এ কারণে অনেকে আমাকে ব্রাত্যজন জ্ঞান করতে পারেন, যদি তাও হয়, তা হলেও আমি কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই বলব, হ্যাঁ আমি ব্রাত্যজনই! এখানে আরো একটি কথা বলা যায়, অনুপ্রেরণার বিষয়ে কবিগুরু বলেছিলেন, মা লক্ষ্মী কি জীবন দেবতার কথা, নজরুল বলেছিলেন, কে একজন তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়, আর পিকাসো বলেছেন, কেউ তাঁকে ঠেলে ক্যানভাসের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, আমার কিন্তু তেমন কিছু মনে হয় না। তবে আমি অস্থিরতার মধ্যে থাকি, কিভাবে লিখব তা আমি কখনোই ভাবি না, কি লিখবো সে আমি জানি, আর সেই তো আসল, বলাটাই শিল্প এ কথা মেনেই বলতে হয় লেখার প্রাণ কিন্তু বিষয়ই।
সংজ্ঞার্থ বিবেচনায় সাহিত্য এক হৃদয়ের সাথে আরেক হৃদয়ের মিলন ঘটানোর মতো কিছু, আর এ ক্ষেত্রে একজন কাব্য কলাকারের ওপরই সরস্বতীর দয়া সমধিক মনে হতে পারে এ কারণে যে, কবি তার হৃদয় সংবেদী উচ্চারণের মধ্য দিয়ে অপরের হৃদয়তন্ত্রীতে যেভাবে টোকা মারতে পারেন, তেমন আর কেউ পারেন কিনা সন্দেহ! একেবারেই যে পারেন না তা নয়। যেমন রাসকলনিকভ যখন বলেন, সোনিয়া আমি তোমার কাছে নত হচ্ছি না, নত হচ্ছি আর্ত-বিশ্বমানবতার আত্মার কাছে। আমি সারারাত ঘুমোতে পারিনি আর হাসান আজিজুল হক আমাকে বলেছিলেন বাক্যটি আজও তাঁকে তাড়িয়ে ফেরে। কিংবা এম, কোয়েৎজি যখন বলেন, আমি যখন ভাবি আমার এই দেহ অন্যের পরিশ্রমের ফল, আর যাদের জন্যে আমি কিছুই করতে পারিনি, তখন নিজের এই দেহকেও আমার ঘেন্না হয়। না, একে আমি কবিতা বলবো না, এ যেন বুক চিরে হৃদপি- দেখানো। পেড্রে-পারামো, কি আউরা, কি মেটামরফোসিস, কি আউটসাইডার এ সব উপন্যাসে যে টেকনিক, রীতি-পদ্ধতি অনুসৃত হোক না কেন বিষয়বস্তু কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই, ব্যক্তির আত্মিক সঙ্কট, আর না হয় সমাজ রাষ্ট্র তথা সামষ্টিক সঙ্কট। শেষ পর্যন্ত কি হলো, সমাজ পরিপ্রেক্ষিত বাস্তবতাকে অস্বীকার করা গেল না। তা বলে সঙ্কট তো সব কিছু হতে পারে না, প্রেম-ভালোবাসা নাই, উদারতা নাই, ক্ষমা নাই?
ক্রামই এন্ড পানিসমেন্ট, পুনরুজ্জীবন, কি মাদাম বোভারি এ সব উপন্যাসে তো সাদামাটা বয়ানই দেখি, আছে প্রচ- আবেগ, ভালোবাসা, করুণা আছে, সর্বোপরি আছে মানবতা। এসব লেখাকে কোন দিন বাতিল করা যাবে না। দেবেশ রায় এত যে নতুন ধরনের উপন্যাসের খোঁজ করেছেন, তার হয়তো আলাদা এক অর্থ আছে। তবে তার সব উপন্যাসেই কিন্তু সমাজ-সম্পর্কটাই প্রধান হয়ে আছে এও তো ঠিক।
কবিতার প্রশংসা আমি আরো একটি কারণে করি, কবি গুরু বলেছিলেন, ‘কবিতায় আমি কখনো মিথ্যে বলিনা।’ আমি বলি, কবিতায় মিথ্যে বলা যায় না, কেননা কবিকে যে উঁচুতে উঠে উচ্চারণ করতে হয়, সেখানে আর সত্য মিথ্যে বলেই কিছু থাকে না। তো কথাসাহিত্যের বেলায়ও কি তাই? কথাসাহিত্যে মিথ্যে বলার প্রচুর অবকাশ থাকে, আর যে ব্যাপকতা নিয়ে কাজ, সেখানে প্রতি মুহূর্তে সৎ থাকা দায়। ভারতচন্দ্র তো কবেই বলে গেছেন, ‘সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর।’
কথাটা বলছি এ কারণে যে, একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সমালোচক বলেছেন বাস্তবতা একটি বাজে শব্দ। আর সিঙ্গার তো নিজেই উচ্চারণ নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছেন, অকারণে নয়। সত্যই তিনি সত্য উচ্চারণ করেছেন কিনা! কথাটা ভেবে দেখার মতো বটো। সত্য উচ্চারণ খুব কঠিক কাজ। কবিগুরু বলেছিলেন, ‘জানিলাম সত্য কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা।’
আমি বলি অমন বঞ্চনাহীন সত্য বইবার ক্ষমতা বিধাতা সবাইকে দেন না। আর বহু মিথ্যের মধ্য দিয়ে যার বেড়ে ওঠা, তার পক্ষে সত্য উচ্চারণ কি এতটা সহজ।
তো আমি সত্য উচ্চারণ করি কথাটা বলি কিভাবে? আমার চারপাশে জেঁকে আছে মিথ্যে। যেখানে দারিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়েও ব্যবসা করা হয়, সেখানে সত্য স্বরূপ সন্ধান তাইবা সহজ হবে কেন?
নিজের সত্য স্বরূপ যখন স্পষ্ট নয়, তখন আঁধির মধ্যে ঘুরপাক খেতে হয় বৈকি!
আমি একজন বাউলকে চিনতাম, তত্ত্বের ভা-ারি তিনি ব্রহ্মতত্ত্ব, শিবতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, শরীয়াতি-মারফতি কত কি জানেন।
‘লালন, কুবির গোসাই, যাদু বিন্দু কতজনের পদ শুন্যে ঘোরের মধ্যে থাকি।
একদিন তাকে বললাম তত্ত্ব কথা ভালই জানেন, সবই গুরুর কাছে শেখা। আমার কথায় হেসে বললেন, তয় আমি সারা জীবন ধরে কি করছি, নিজেরে কিছু কি আর না চিনেছি কন? সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম এই মানুষটি অতি সাধারণ কিন্তু চেনাজানা আর দশ জনের মতো নয়। বাউলদের কথিত সেই সহজ মানুষ, যে আঁধির মধ্যে ঘুরপাক খায় না। কেন লিখি? সম্ভবত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন পাঠককে ধরিয়ে দেবার, পাইয়ে দেবার কথা। আমি তা বলি না, আমি বলি আমার মতই পাঠকও জানেন; তবে হ্যাঁ, পাঠক তা জানেন সংবাদ হিসেবে। আর সে সংবাদ পাঠককে বিচলিত করবে এমনও কথা নেই। একজন লেখক, সেই বিষয়টাকে পাঠকের উপলব্ধির আওতায় পৌঁছে দিতে পারেন, অর্থাৎ যা নিয়ে পাঠক শেষ পর্যন্ত ভাববেন, ভাবতে বাধ্য হবেন। এর যথার্থ উদাহরণ হতে পারে ক্রাইম এ্যান্ড পানিসমেন্ট, কি পুনরুজ্জীবন উপন্যাসগুলো। রাসকলনিকভ নামক একজন যুবক কর্তৃক বুড়িকে হত্যা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সংবাদ সেদিনের রাশিয়ার কোটি মানুষ জানতেন। কিন্তু দস্তভয়েস্কি রুশ সমাজের ভেতরের ঘুণে ধরা অবস্থাকে উলঙ্গভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। মানবতার জয় জয়কার ঘোষণা করেছিলেন।
কেন লিখি? পিকাসো বলেছিলেন, তিনি ছবি আঁকাকে নিছক বিনোদনের কোন বিষয় বলে মনে করেন না। তিনি চেয়েছেন তার ছবিকে মানুষের চেতনার গভীর থেকে গভীরে পৌঁছার অস্ত্র করে তুলতে। যারা বলেন লিখতে ভাল লাগে তাই লিখি, এ যেন সৌখিন মানুষের সখ করে ছবি তোলা। অনেকে লেখার মধ্য দিয়ে সত্য শিব সুন্দরকে খোঁজেন, কথাগুলো শুনতে খুব ভাল লাগে, যারা রোজ প্যারিস ইভনিং সকাল বিকাল মাখেন, তাদের শ্রমিকের গায়ের ঘাম ভাললাগার কথা নয়, কেননা ঘাম কোন সুরুচিকর পদার্থ নয়। আর শিল্পসাহিত্য নিছক বিনোদনের ব্যাপার হলে কেন এত শ্রম দিতে যাব, তাস পিটেই তো ভাল সময় পার করা যায়। আবার দায় থেকে লিখি, এই দায়বদ্ধতা কথাটা বলতে আমার ভয় লাগে। আমি কি মানুষকে সত্যই ভালবাসি? নাকি এ আমার ধরনের বিলাস! কেন লিখি? এখন আমি বুঝি, লেখালেখি আর কিছু নয় নিজেকেই বুঝতে চাওয়া নিজেকে আবিষ্কার করা। এটা আমার কাছে আরো স্পষ্ট হয়েছে লালন সাঁইজিকে নিয়ে আমার উপন্যাস ‘আরশি নগর’ লিখতে গিয়ে। নিজেকে বোঝা, নিজের অবস্থানকে বোঝার চাইতে আর কোন বড় সন্তুষ্টি নেই। আমি কে? এই মাটি আকাশ প্রকৃতি, সমাজ-সভ্যতার মাঝে আমার অবস্থান কি তাই বোঝা। আমি যখন ‘পাথার’ উপন্যাসটি লিখি তখন থেকেই অনেক মানুষের কথা বলতে শুরু করি। পরস্পরের সম্পর্কটাও তখন থেকেই বুঝতে শুরু করি। মানুষ যে এক অভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্ট এই ধারণা ক্রমশ বদ্ধমূল হতে থাকে, এক প্রবহমান রক্তধারার কথা ভেবে। এ যেন এক বিশাল নদী কত মাঠ ঘাট, জনপদ, খাল-বিল ছুঁয়ে অবশেষে সাগরে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু এই বোধটা তো বহু পরের। ছোটবেলার কথা ধরুন, কি হতো তখন। পাড়ার ফুটবল টিমে নাম লেখাবার জন্য অস্থির হতাম, পাড়ার সমবয়সী ছেলে মেয়েদের মধ্যে, স্কুলের ছেলে মেয়েদের মধ্যে ক্যাপ্টেন হতে চাইতাম। তার মানে কি নিজের অস্তিত্বের জানান দেবার ইচ্ছেই তো! হ্যাঁ সাহিত্যচর্চার একটা উদ্দেশ্যও তাই, নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়া, এই দেখ আমি আছি। স¤্রাট শাহজাহান বা তাঁর মতো শক্তিমানেরা সমাধি সৌধ তুলে নিজেদের অস্তিত্বের একটা কালজয়ী প্রমাণ রেখে গেছেন। মিশনের ফারাওয়েরা পিরামিড গড়েছেন। স¤্রাট অশোক পাহাড়ে উৎকীর্ণ করে গেছেন নিজের ভাবনা। আমরা এই লেখাটুকু ছাড়া আর কিইবা করতে পারি, অবশ্য জানিনা তা কালজয়ী হবে কিনা, না হোক তবু তো বলে গেলাম, আমিও ছিলাম। আমিও কিছু না কিছু ভেবেছিলাম। একমাত্র ভাবনা ছাড়া আর কোন কিছু দিয়েই তো বলা যায় না আমি ছিলাম, আমি আছি। তাই লিখি। কিন্তু এটুকুই সব কিছু নয়। না আরো কিছু আছে এর পেছনে। আমাদের বাড়ির মোরগটিকে দেখলেও তো বেশ বুঝতে পারি সে শুধু তার নিজের অস্তিত্বের জানান দিতেই চায় না, একটু বেশি করেই দিতে চায় বিশেষভাবেই দিতে চায়। সে তাই জমিদারী চালে হাঁটে, ঘাড় উঁচু করে ডাকে কুক্কুর-কুক্কুর! হ্যাঁ এই হলো খ্যাতির মোহ। যে লোভ ভেতরে ভেতরে কাজ করে, না হলে আয়ু পুড়িয়ে লিখবো কেন? এর সাথে প্রাপ্তির যোগটার কথাও ভাবতে হয়। লেখালেখি করে কিছু যদি না পাওয়া যায় তবে লেখক টিকে থাকবে কি করে। সবাই তো আর তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ নয়। যা হোক, আমাদের এই সমাজে সব লেখকের বেলায় লক্ষ্মীর আশীর্বাদ প্রাপ্তি ঘটে না। বিষয়টা সুখকর নয় বলে এখানে আলোচনায় না আনাই ভালো।
সাহিত্য সৃষ্টির আর একটি কারণ যে অভাববোধ তাতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এ অভাব অর্থগত অভাব নয়। নিজ অস্তিত্বের শূন্যতা থেকে রক্ষার উপায় খোঁজা। অনেকেই বলেন শুধু মনের আনন্দেই নাকি সাহিত্য কর্মটি করেন। কথাটায় যে সত্যতা নেই তা নয়। তবে তা আংশিক সত্য। আমরা যে কোন সুন্দর কিছু দেখেই মুগ্ধ হতে পারি তা নিয়ে গান, কবিতা, ভাস্কর্য কত কিছুই তো হতে পারে। কিন্তু শুধু সুন্দরই কি আমাদের ছুঁয়ে যায়! অসুন্দর কি আমাদের বিচলিত করে না। করে। আর তাই অসুন্দরকে নিয়ে, দুঃখ নিয়ে জগতে কত কিছু হয়েছে। না হলে বিপ্লব হবে কেন, বিদ্রোহ হবে কেন। এসব নিয়ে এত গান কবিতাই বা হবে কেন।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতা বলেও তো একটা কথা আছে। মানবকল্যাণ বলেও তো কিছু আছে। যদিও আজকের পৃথিবীতে এ বিষয়টি নিয়ে কত কিছুই না বলা হচ্ছে। আমি নিজে প্রচ- রকমের ভোগবাদী মানুষ নই, এই এতটা বয়স পার করে দিয়ে এসে এই একটি কথা ভালই বুঝেছি, পৃথিবীতে কোন কিছুই অনিবার্য নয়, অপরিহার্য নয়। কোন কিছু স্থায়ীও নয়; তাই কোন কিছুই আঁকড়ে ধরি না, না পেলে দুঃখও হয় না। হ্যাঁ, আমার উপস্থিতি জানান দিতে পারে একমাত্র আমার ভাবনা। আর সে ভাবনা যদি ভাবনার মতো হয়। পৃথিবীতে মানবকল্যাণ চিন্তা ছাড়া আর কিছুই স্থায়ী হয় না-- টেকে না। লালনের কথায় আসি, মানুষের উত্তম কিছু নাই তাই এই মানবভাবনাই কেবল কিছুটা সুখ দিতে পারে।
আমি ডাস্টবিন থেকে কুকুরের সাথে মানুষকে খাবার ভাগ করে খেতে দেখেছি। দেখেছি শীতের রাতে মানুষকে কুকুরের সাথে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতে। এই তিলোত্তমা ঢাকা শহরে হোটেলের উচ্ছিষ্ট খাবার বিক্রি হয়। আর তা মানুষই খায়। ফেলে দেওয়া দই-এর পাত্র অর্ধ উলঙ্গ একটি কিশোর চেটে খাচ্ছে। এইসব উলঙ্গ ছবি অনেক সময় আমাকেও তাড়া করে।
লাল সাঁই তার গানের মধ্য দিয়ে নিজেকে খুঁজেছেন। আমি আমার লেখার মধ্য দিয়ে হয়তোবা সেই সত্যের দিকেই যাচ্ছি। শুধু শিল্পসাহিত্যই নয় পৃথিবীর সব জ্ঞানের উদ্দেশ্যই তাই। সব ধেয়ে চলেছে এক সত্যের পানে। এ যেন রাগ রাগিনীর ঊর্ধ্ব পানে ধেয়ে চলা। আমি সেই ঐকতান শুনে মুগ্ধ।
জীবনের এ অনন্ত প্রবাহ, নদীর মতোই কত যে বিভক্তি তার, কত গোত্র, কত বংশ, কত জাতি কিন্তু তারপরেও সেই একই রক্ত! এই উপলব্ধি আর কিসে আসবে, সঙ্গীত ছাড়া, কবিতা ছাড়া, ধ্যান ছাড়া। আমি লেখায় সেই ধ্যান করি। আর কিছু নয়।
শেষ কথা হলো কবিতা বলুন, সাহিত্য বলুন সবই শব্দের শিল্পকলা। এ কথা হাজারবার সত্য। কিভাবে বললাম, কত আকর্ষণীয়ভাবে বললাম তাও দেখার জিনিস বটে। জড়োয়া গহনা তো দামি ধাতু দিয়েই তৈরি হয় তবে ধাতুর দামে তার দাম, গহনার মূল্য রূপসীর গলায়। আর সে নারী যদি জীবিত হয়। এর অর্থ কি? উপলব্ধিটাই বড় কথা। তা না হলে সেটা হতো মৃত নারীর গলায় পরানো জড়োয়া গহনার মতো।
তো আমি মানুষের কথা লিখি, বহু মানুষের কথা লিখি। সখের বশে নয় তবে কি এই মানুষগুলোর জন্য ভালোবাসা উথলে উঠেছে বলে, না সে জন্যেও নয়। চারপাশের এই মানুষগুলো আছে বলেই আমার অস্তিত্ব আছে, যে মাটির উপর দিয়ে হাঁটছি এই মাটি, যে মাটি জল আমার অন্œ জোগায় সে মাটি জল, চারপাশের এই সব গাছপালা, পশু পাখি, আছে বলেই আমি আছি। কেউ নেই, কিছু নেই তো আমি থাকব কেন? থাকবই বা কিভাবে?
আবার সেই বাউলের কথায় ফিরে যাই, তারা যে সহজ মানুষের খোঁজ করে, সেই সহজ মানুষ কি? সবাইকে ভালো না বাসলে, আত্মার আত্মীয় বলে গ্রহণ করতে না পারলে সে মানুষ পূর্ণ হবে কেন? আমি কৈলাশকে খুঁজি, মোহন্তদাসকে খুঁজি কারণ এদের বাদ দিয়ে আমার পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না।
আমি আমার সম্প্রতি লেখা ‘নয়া বসত’ উপন্যাসটিতে দেখিয়েছি, করিম মৃধা তার মেয়ের পক্ষের নাতির মুখে নিজ বংশধারার একটুখানি পরিচয়-চিহ্ন খুঁজছে। না, মেয়ের মুখের আদলের ছাপটুকুও যেন নাই। আর সে তখন কেঁপে উঠছে, তবে কি তার বংশের সেই রক্তধারা দুর্বল হয়ে পড়লো। চন্দ্রকান্তি তার তার বংশের শক্তিমান সেই মানুষটির পুনর্জন্মই সে কামনা করে। আর তা সে তার ছেলের মধ্য দিয়ে।
আমি বাঙালি হয়ে উঠি না, আমি বাঙালিই। কিন্তু না, এই স্বাজাত্য অভিমানও নয়, আমি মানুষ, আর এই সব কিছুর মাঝেই সেই সহজ মানুষের সন্ধান করা। আর কিছু নয়।
মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ২০তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৪) প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ