কী লিখি কেন লিখি গোলাম কিবরিয়া পিনু

কী লিখি কেন লিখি 
গোলাম কিবরিয়া পিনু

জন্ম : ৩০শে মার্চ ১৯৫৬

মুক্তিযুদ্ধের এমন এক পরিবেশের মুখোমুখি আমরা তখন, একদিকে বিধস্ত অবকাঠামো ও স্বজন হারানোর বেদনার্ত সময়, আর অন্যদিকে নতুন করে গড়ে উঠবার উদ্দীপনা ও স্বপ্নের আন্দোলিত প্রেষণা। এমন সময়ের কণ্ঠলগ্ন হয়ে কিশোর বয়সের জীবন ছিল তখন। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাঘর করছি, করছি ছাত্র সংগঠন, অংশ নিচ্ছি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। যাচ্ছি পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়মিত। এমন পরিবেশ নিয়ে ছোট শহর গাইবান্ধায় বেড়ে উঠছি। তখন বের হতো স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ দিবস উপলক্ষে বহু সংকলন। আর এসব সংকলনে প্রথম দিকে আমার কবিতা ছাপা হতে থাকে। হতো নিয়মিত সাহিত্যসভা ও অনুষ্ঠান। এগুলোর সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী ছিলাম আমিও। আর কবিতা রচনা প্রতিযোগিতায়ও পেয়ে যাচ্ছিলাম পুরস্কার। এমন অনুকূল পরিবেশ পেয়ে কবিতা ধরা দিতে শুরু করে। গাইবান্ধা থাকাকালীন সময়ে তখনই জাতীয় পত্র-পত্রিকায় কবিতা ছাপা শুরু হতে থাকে, এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকার লিটল ম্যাগাজিনেও । পরবর্তীতে শুধু কবিতা লিখবো--সাহিত্যের সাথে যুক্ত থাকবো বলেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্সে ভর্তি হই, তখন আরও কবিতা লেখায় উদ্দীপিত হতে থাকি, কবিতার সাথে তখন সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। জাতীয় পত্র-পত্রিকায় তখন আরও কবিতা ছাপা হতে শুরু করে। এমন ভাবেই কবিতার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে।
আমিও বুঝেছি কিশোর বয়সেই--কবিতা লেখায় আমার ভবিতব্য। শুধু কবিতা লিখবো বা লেখালেখি করবো এটাই ছিল জীবনের মূল লক্ষ্য। কিশোর বয়সেই অন্ধকারের দিগন্ত চিড়ে বুঝতে পেরেছিলাম, অনেক পথই হাতছানি দিচ্ছে, কিন্তু সেইসব হাতছানি পরিহার করে কবিতার পথই থাকতে হবে আমাকে। এইতো এখন মাঝে মাঝে শুনতে হয় আমার জীবনসঙ্গীর কথা : ‘তুমি যদি কবিতা না লিখতে, তাহলে আরও বেশি বেতনের চাকরি করতে পারতে, টাকা-পয়সা হতো, গাড়ি-বাড়ি-ফ্ল্যাট, আরও অনেক কিছু! না, তুমি এসবের দিকে তোমার যোগ্যতা থাকার পরও মনোযোগ দিলে না, সময় দিলে না!’ এক ধরনের হতাশা তার মধ্যে কাজ করে কি-না, জানি না। তবে, আমি মনে করি শুধু কবিতা লেখার জন্য দৃঢ় মনোবল নিয়ে জিদ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে সেই কিশোর বয়স থেকেই। বহু কিছু ছাড় দিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে একাকী অনেক গলিপথ-ঘুরপথ ঘুরে-ফিরে নিজেকে কবিতার জন্য রক্ষা করতে হতে হয়েছে। কখনো কখনো উন্মাতাল সময়ের মুখোমুখি হয়েছি, কত রকমের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ করতে হয়েছে কিশোর বয়স থেকে আজ অবধি। দর্শন-নৈতিকতার শিক্ষা, নিজের ভেতরে রেখে--কবিতার শক্তি আর সাহস নিয়ে এখনো চলছি। 
লেখাকে একটি সংগ্রাম হিসেবে মনে করি, তাই লেখকমাত্রই সংগ্রামরত। একদিকে লেখক তার নিজের বোধ ও দর্শনকে সংহত করেন, আবার অন্যদিকে সমাজের অন্যান্য মানুষের রুচি ও মনোভাব লেখার প্রশ্রয়ে সূক্ষ্মভাবে তা নির্মাণ করেন। এ এক মিথস্ক্রিয়া : গ্রহণ ও বর্জন, নেওয়া ও দেওয়া, অপূর্ণ ও পূর্ণতা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য পঠন-পাঠন ও সামাজিক বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি; এর ফলে আমার ভেতর যে বোধ রয়েছে--তা কবিতার মধ্যে দিয়ে পাঠকের বোধের মধ্যে সঞ্চারিত করতে লিখি। কবিতা নিছক আনন্দের বিষয় নয়, চৈতন্যের বহু স্তর উন্মোচিত করে। জীবনের খন্ডখন্ড অনুভূতির মধ্য দিয়ে জীবনের তাৎপর্য কবিতায় উন্মুক্ত করতে পারি--সেজন্যও লিখি। কবিতা মানুষকে ভাবায়, ভাবতে শেখায়, জাগিয়ে তোলে, কৌতূহল সৃষ্টি করে। কবিতা সমকালের হয়েও আগামীকালের ও চিরকালের হয়ে উঠতে পারে। ভালো কবিতার শিল্প-সৌন্দর্য স্বতঃস্ফূর্ত ও আনন্দময় অনুভূতির জন্ম দেয়। এজন্য আরো লিখি যে--কবি অগ্রজ্ঞান নিয়ে অগ্রগামী থাকেন, এই মর্যাদায় কবির যে দায় রয়েছে--তা পালনের জন্যও লিখি। নিছক আত্মসর্বস্ব সুখকে গুরুত্ব না দিয়ে জীবনবোধের প্রেষণায় লিখি। কবিতা লিখে যে আনন্দ, স্বাধীনতা, স্পর্ধা ও জীবনের বিভিন্ন দিক সূক্ষ্মভাবে উন্মোচনের যে অধিকার পাই--তা আর অন্য কাজে পাই না; তাই লিখি। যা কিছু অনৈতিক, অন্যায়, নৈরাজ্যপূর্ণ ও নেতিবাচকতা--তার বিরুদ্ধে এক ধরনের নিজের বিবেচনাবোধ তুলে ধরার জন্য মানুষের কণ্ঠলগ্ন হয়ে লিখি। মানুষের চেতনা ও ভাবজগৎ ছুঁয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে লিখি। এজন্য নিজেকেও রূপান্তর করি--লেখাকেও রূপান্তরিত করি।
লিখছি চার দশকের অধিককাল। কবিতা ছাপা হয়েছে অনেক। ছাপা হয়েছে সকল উল্লেখযোগ্য পত্রিকা-সাময়িকীতে এবং উল্লেখযোগ্য সম্পাদকের হাত দিয়েই। অনেক উল্লেখযোগ্য সংকলনেও আমার কবিতা গ্রহণ করা হয়েছে। এসবও একদিক থেকে অর্জন বলে আমি মনে করি। তবে, আরও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বহুরৈখিকভাবে আমার অর্জন বা ব্যর্থতা কতটুকু--তা মূল্যায়ন করবেন পাঠক-সমালোচক ও অন্যান্যরা। তবে--নিজের প্রতি সমালোচনা রয়েছে ও বিচার-বিবেচনাও রয়েছে--তা এক ধরনের আত্মসমীক্ষাও বলা যেতে পারে। যত কবিতা লিখেছি--বিভিন্ন বিষয়ে ও বিভিন্ন নিরীক্ষাসমেত লিখেছি--তা সমালোচক ও অন্যান্যদের কাছে সেভাবে উপস্থিত বা তাঁদের চোখে পড়েনি, সে-কারণে সেভাবে মূল্যায়িত হইনি। এজন্য অপেক্ষা করা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়--সকল প্রকৃত কবিকেই অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার জন্য কঠিন নীরবতা সহ্য করা প্রকৃত কবির জন্য শ্রেয়। আমার ব্যর্থতা কী আর কতটুকু তা বিভিন্নভাবে নিজের কাছে মূল্যায়ন করি। নিজের কড়া সমালোচক নিজের কাছে হতেই হয়। আমার অতৃপ্তি আছে--এখনো কাঙ্ক্ষিত কবিতা লিখতে পারিনি, তা লিখতে এখনো সচল আছি। 

=======================
মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ২৪তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৯) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ