কী লিখি কেন লিখি দীপংকর দীপক

কী লিখি কেন লিখি 
দীপংকর দীপক 


কী লিখি কেন লিখি 
দীপংকর দীপক 

আমার জন্ম গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার তুলসী বাড়ী গ্রামে। এটি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। গায়ের মেঠো পথে দৌড়ে, সবুজ মাঠে ঘুরেফিরে, খালে সাঁতার কেটে, বৃষ্টিতে ভিজে, বিলে নৌকা বেয়ে, এ গাছ থেকে ও গাছে চড়ে—আমার ছেলেবেলা কেটেছে। মায়ের মুখে শুনে শুনে শৈশবেই আমি অনেক ছড়া-কবিতা আয়ত্ত করেছি। 

পাঠশালায় পড়াকালে রামসুন্দর বসাকের ‘আদি বাল্যশিক্ষা’ টানা মুখস্ত বলতে পারতাম। তখন থেকেই ছন্দ-ছড়ার প্রতি আলাদা আকর্ষণ অনুভব করি। পরে পাঠশালার শিক্ষকের নির্দেশেই ছড়া রচনা শুরু করি। তবে ওই সময়ের লেখা বেশির ভাগ ছড়াই হারিয়ে ফেলেছি। পরে বড় ভাইবোনদের উৎসাহে লেখা সংরক্ষণ শুরু করি। আমার ছেলেবেলার সেই সংরক্ষিত খাতার প্রথম কবিতাটি ‘পাখি’। 

কবিতাটি রচনার স্মৃতি এখনও চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। একবার পাঠশালার শিক্ষক আমাকে পাখি নিয়ে একটি ছড়া লিখতে বলেন। বিকালে বাড়ি ফিরে চৌকি নিয়ে আমি উঠানে পড়তে বসি। এ সময় কয়েকটি পাখিকে গাছের ডালে বসে কিচিরমিচির করতে দেখি। পরে ছন্দে ছন্দে লিখে ফেলি, ‘একটি বাড়ির দুইটি গাছে/চারটি পাখি বসে আছে।’ বড় হয়ে এ ছড়ার মধ্যে ছন্দ-মাধুর্যতার পাশাপাশি গুণনের চমৎকার সমন্বয় আবিষ্কার করি। অর্থাৎ ১ গুণ ২=২; ২ গুণ ২=৪।  

ছেলেবেলা থেকেই আমি নিয়মিত লেখালেখি করছি। এ কারণে লেখালেখি অনেকটা নেশায় পরিণত হয়ছে। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াকালে স্কুল ম্যাগাজিন ‘মুকুলিকা’য় আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এর নাম ছিল ‘বসন্ত দূত’। এ ম্যাগাজিনের জন্য আমি একসঙ্গে দুটি কবিতা জমা দিয়েছিলাম। অন্যটি আমার এক সহপাঠীর নামে ছাপা হয়। বিষয়টি শিক্ষকদের জানালে ওই সহপাঠী দুঃখ প্রকাশ করে। পরে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে আমার কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। 

ইন্টারে পড়ার সময় বই প্রকাশের ইচ্ছে জাগে। ২০০৫ সালের দিকের ঘটনা এটি। কিন্তু মফস্বল এলকায় তো প্রকাশনী পাওয়া সম্ভব নয়! তাই নিজ উদ্যোগেই বই প্রকাশে হাত দেই। নাম দেই ‘যৌবনের করুণ ব্যাথা’। এটাকে ঠিক ‘বই’ বলা যাবে না। তবে ‘বাঁধাই বই’ বলা যেতে পারে। একটি কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে কতগুলো কবিতা কম্পোজ করি। পরে সেগুলোর কয়েক সেট প্রিন্ট করি। পরে তা বাঁধাই করে বইয়ের মতো তৈরি করি। সেই বই মানুষের হাতে তুলে দিতে পেরে যে আনন্দ পেয়েছিলাম—প্রকাশনীর মাধ্যমে বই প্রকাশ করে তা কখনও পাইনি। 

এর পর কেটে যায় কয়েক বছর। তখন ঢাকায় বাংলা সাহিত্যে অনার্স পড়ছি। ক্লাসে এক শিক্ষক বললেন, অনার্সে পড়াকালেই তাঁর দু-তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ কথা শুনে আমিও অনার্স পড়াকালেই বই প্রকাশের প্রতিজ্ঞা করি। তখন বিভিন্ন সংবাদপত্রে ফ্রিল্যান্সে কাজ করতাম। সেই সুবাধে একদিন অঙ্কুর প্রকাশনীর অফিসে যাই। তারা কিছু কপি কিনে নেওয়ার শর্তে আমার বই প্রকাশে আগ্রহ প্রকাশ করে। অবশেষে ২০১০ সালের একুশের বইমেলায় আমার প্রথম বই ‘নিষিদ্ধ যৌবন’ প্রকাশিত হয়। 

এর পর বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে এ পর্যন্ত আমার ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। অন্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—গল্পগ্রন্থ ‘বুনো কন্যা’ (২০১৩), ‘নাস্তিকের অপমৃত্যু’ (২০১৪), ‘ঈশ্বরের সঙ্গে লড়াই’ (২০১৫), ‘নিষিদ্ধ যৌবন : দ্বিতীয় খণ্ড’ (২০১৬), ‘প্রহেলিকা’ (২০১৭), ‘কালচক্র’ (২০১৭), ‘ছায়ামানব’ (২০১৮) ও ‘হে বঙ্গ’ (২০১৯)। 

সর্বশেষ এবারের একুশের বইমেলায় আমার ‘রক্তফুল’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অর্ধশত জীবনমুখী ও প্রতিবাদী কবিতা নিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে বেহুলা বাংলা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন শতাব্দী জাহিদ। ‘রক্তফুল’র প্রতিটি কবিতার চরণে চরণে রূঢ় বাস্তবতার প্রকাশ ঘটেছে। স্বদেশপ্রেম, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহদ্যোতক পঙক্তিমালাতে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। এসব পঙক্তিমালার মাধ্যমে শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। তাছাড়া কবিতাগুলোতে রাজনীতি-দেশপ্রেম ও ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একইসঙ্গে এসব কবিতায় প্রাচীন থেকে বর্তমান, গ্রাম থেকে শহর, পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা, মাটি থেকে কংক্রিট—সব কিছুই দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা চালানো হয়েছে। কবিতাগুলোতে স্বদেশপ্রেম, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর কীর্তিগাথা, প্রকৃতিপ্রেমসহ গবেষণামূলক নানা বিষয় স্থান পেয়েছে। এমনকি চলমান সংকট করোনা পরিস্থিতি নিয়েও ব্যতিক্রম কবিতা রয়েছে।  

এর আগের বই ‘হে বঙ্গ’র ভূমিকা লিখেছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আসীম সাহা। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “এ বইয়ের ‘বাংলাদেশ’ নামের কবিতাটি আমাকে অভিভূত করেছে। এ কবিতায় সে শব্দের পাশে শব্দ বসিয়ে পুরো বাংলাদেশের একটি মানচিত্র এঁকে ফেলেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোও আমাকে মুগ্ধ করেছে। ‘তোমরা—দুঃশাসকের নামে কবিতা লেখো না’ কবিতায় সাহিত্যের বিশেষ শক্তিমত্তা প্রকাশ পেয়েছে। আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতে সে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে নেবে।’’ 

বর্তমানে আমি দুটি বই লেখায় হাত দিয়েছি। এগুলো হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘বাবা আমার রাজাকার’ ও সম্পাদনা গ্রন্থ ‘বিশ্বশ্রেষ্ঠ ১০০ কবির ১০০ কবিতা’। বইয়ের পাশাপাশি মাঝে মধ্যে গানও লিখি। আমার লেখা ‘সোনার দেশে জনম আমার মাগো’ গানটি শ্রোতামহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। প্রয়াত সঙ্গীতব্যক্তিত্ব বাসুদেব ঘোষের সুর-সঙ্গীত পরিচালনায় এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বৃষ্টি। বর্তমানে শ্রম অধিকার নিয়ে লেখা ‘সমতার লড়াই’, ‘চুপি চুপি’ এবং ‘ও ললনা’ শিরোনামের তিনটি গানের কাজ চলছে। তাছাড়া সম্প্রতি আমার কবিতা অবলম্বনে ‘অন্ন কিংবা আত্মহত্যা’ শিরোনামে একটি নাটক প্রচারিত হয়েছে। 

সাহিত্যচর্চার সুবাধে ইতোমধ্যে আমি কয়েকটি পুরস্কারও অর্জন করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘সোনার বাংলা সাহিত্য পুরস্কার’ (২০১৭), ‘বেগম রোকেয়া সাহিত্য সম্মাননা’ (২০১৮), ‘বিশ্বভরা প্রাণ সাহিত্য সম্মাননা’ (২০১৯), ‘কান্দি ইউনিয়ন যুবসংঘ সম্মাননা’ (২০২০) প্রভৃতি। 

বর্তমানে কালের কণ্ঠের বার্তা বিভাগে কর্মরত রয়েছি। ফলে সাংবাদিকতা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। পাশাপাশির টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঝে মধ্যে অংশ নিচ্ছি। তা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে কাব্যসাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছি।  

[দীপংকর দীপক, সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও গবেষক]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ