কী লিখি কেন লিখি
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর
কী লিখি কেন লিখি
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর
কী লিখি এর উত্তর আমার দেবার দরকার আছে কি? সেটা তো আমার লেখার পাঠক জানেন। যারা আমার লেখা পড়েন না বা পড়েন নি তাদের জন্য হয়তো কী লিখি এ প্রশ্নের উত্তর প্রাসঙ্গিক হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। কারণ, এমনও হতে পারে আমার মতো একজন অচেনা বা অখ্যাত লেখকের লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ নাও থাকতে পারে। জগতের বিখ্যাত ক'জন লেখকের লেখাই বা আমরা পাঠ করবার সময় পাই! আর কত কত ভালো লেখা তারা লিখে গেছেন সে সবের খবরও কি আমরা রাখি কিংবা পাই আদতে? পেলেও সেসব লেখা কি এক জীবনে পাঠ করে শেষ করা সম্ভব? তাই মনে করি, কোনোভাবে আমার লেখা যারা একবার পাঠ করেছেন, আর সে লেখা যদি তাদের ভালো লেগে থাকে, যদি আরও কোনো লেখা তাদের কাছে পৌঁছে তবেই না আবার পড়বেন। আমি এমন কোনো লেখক নই যে পাঠক আমার লেখা খুঁজে পড়বেন।
কেন লিখি এ প্রশ্ন আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে এখন, যখন আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন। কেন লিখি এ প্রশ্ন আমাকে আগে কেউ করেছেন মনে পড়ে না। আমি নিজেও নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি মনে পড়ে না। কেন নিজেকে জিজ্ঞেস করি নি সে বিষয়ে ভাবনার সুযোগ আছে।
লিখছি তো দীর্ঘদিন যাবত। তবু কেন লিখছি, এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার জন্য সহজ নয়। আমি জানি না অন্য লেখকরা কেন লিখেন সহজ কথায় এর উত্তর দিতে পারবেন কি না। আমি সহজ কথায়, স্বল্প কথায় মনের সব কথা বলতে পারব না। তবু সহজ করে বলতে হলে বলব, যখন যা লেখার ইচ্ছা হয়েছে তাই লিখেছি। আর লেখা শুরু করেছিলাম কৈশোরেই, মাত্র ১৬ বছর বয়সে। গল্প দিয়েই শুরু করেছিলাম। মনে পড়ে সেই বয়সে কিছু গল্প উপন্যাস পড়ে ফেলেছিলাম। নানা রকম গল্প পড়তে পড়তে এক সময় মনে হয়েছিল এসব চরিত্র যেন আমার চেনা। আমিও চাইলে গল্প লিখতে পারব। আমার আশপাশে কত কত চরিত্র আর গল্প আছে! আমি লিখতে শুরু করে দেখি চরিত্র আর জীবন চোখের সামনে থাকলেও গল্প বানানো সহজ কাজ নয়। ঘটনা লেখা যায় সহজেই, কিন্তু গল্প নয়। অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকলে ঘটনা ধীরে ধীরে গল্পে রূপ নিতে থাকে।
প্রথম লেখায় আনন্দ পেয়েছিলাম, সেটা ছাপা হলে আরও আনন্দিত হয়েছিলাম। এর পর যখন থেকে ভাবতে শুরু করেছি আরও লিখতে চাই তখন কী নিয়ে লিখব ভাবতে শুরু করেছি। তাকিয়েছি চারপাশে, পর্যবেক্ষণ করেছি। সেই পর্যবেক্ষণে জীবন, প্রকৃতি সবই ছিল এখনো যেমন আছে। কোন একটা ঘটনা গল্পের জন্ম দিয়েছে মনে। কোন একটা চরিত্রও গল্পের সূচনা করেছে। কারো গল্প পড়ে আমারও মনে অন্য একটা গল্প জন্ম নিয়েছে।
আমার সমালোচক আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
আমি লিখি মূলত যা লিখতে ভালো লাগে, যদি মনে হয় এটা লেখা দরকার, জানামতে কেউ লেখেন নি, অথবা লিখলেও আমি যেভাবে লিখতে পারি সেরকম করে লেখেন নি। লিখলে হয়তো আরও মানুষ আমার ভাবনাটা জানতে পারবেন। যদি মনে করি তাদের জানা দরকার, জানাতে পারলে মানুষের কল্যাণ হবে, আমি পাঠকের বোধে নাড়া দিতে চাই, তাদের বিবেচনার জন্য আমার বোধ তাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমি লিখি আমার অনুভবকে কাগজে ধরে রাখতে, যা না লিখলে ধরে রাখা যাবে না, পাঠকের কাছে পৌঁছানো যাবে না। আমি লিখি আমার মনে যদি সামান্যতম সৃষ্টিশীলতা আছে সেটা প্রকাশ করতে। আমি লিখি আমার লেখার মধ্য দিয়ে মৃত্যুর পর অন্তত কিছুদিন হলেও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায়। আমি লিখি লেখার তাড়নায়। লিখি মানুষের জীবনকে মানুষের কাছে তুলে ধরবার জন্য। আমি লিখি মানুষের যাপিত জীবনকে যথা সম্ভব সাহিত্যে ধারণ করার জন্য। আমি লিখি আগামীর পাঠকের কাছে আমাদের সময়কে পৌঁছে দেবার জন্য। সর্বোপরি আমি লিখি আমার মনের কথা পরোক্ষভাবে অপরকে জানানোর জন্য।
0 মন্তব্যসমূহ