কী লিখি কেন লিখি
মাধব রায়
কী লিখি কেন লিখি
মাধব রায়
প্রাবন্ধিক-পদার্থবিদ
ফুল আপনিই ফোটে
‘জুলেখা বাদশার মেয়ে। তার ভারী অহংকার।’Ñবাক্যদুটো মনে আছে। আর কোনও বাক্য হুবহু মনে নেই, কিন্তু গল্পটা মনে আছে। অহংকারী মেয়েটি একদিন দেখে, তার বাগানে পরী এসেছে ফুল ফোটাতে। আচ্ছা করে এক ধমক লাগাল, বললÑ এখানে আর আসবে না। পরীরা কষ্ট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল, আর আসে না। এদিকে জুলেখার বিয়ে, অনেক ফুল লাগবে । কিন্তু পরীরা না এলে ফুল ফোটাবে কে ! বিয়ে হবে কী করে? জুলেখা কাঁদতে লাগল।
এমনি এক অহংকার না করার শিক্ষামূলক গল্প পড়েছিলাম ক্লাস ওয়ান না-কি টুতে। বিশ্বাস করেছিলাম ফুলপরী এসে ভোরবেলা ফুলগাছে ফুল ফুটায়। সকালে ফুটন্ত ফুলগাছের নিচে এসে ভাবলাম, একটু আগেই পরীরা এসেছিল। ভোরে ঘুম ভাংলেই পরীকে দেখতে পেতাম। স্কুলে গিয়ে বললাম, আমাদের গাছে পরীরা ফুল ফুটিয়ে গেছে। শুনে বড় ক্লাসের ছেলেরা হাসল।
একজন বলল, পরী আবার ফুল ফোটায় না-কি? ফুল আপনিই ফোটে।
কিন্তু বইতে যে লেখা, মা বলেছে বইয়ের কথা সত্য।
স্যার বললেন, বইয়ের সব কথা সত্য হয় না। অহংকার করতে নেই। অহংকার করলে পরে কাঁদতে হয়, এটি সত্য।
পরী ফুল ফুটায়নি?
না, ফুল আপনিই ফোটে। লেখকরা বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখেন, মনের কল্পনা মিশিয়ে।
তাহলে আমি লেখক হব না। আমি মিথ্যে কথা লিখব না।
ক্লাস টু-তে পড়ার সময় লেখক হতে চাইনি। তবে পরীর গল্পটা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
বাড়িতে ট্রাংকভর্তি বই ছিল। মা-বাবা, বড়ভাই বই পড়তেন। দাদামণি, পরলোকগত মানস রায়, শিশুতোষ বই এনে দিতেন। বাঘ-কুমিরের গল্প, সোভিয়েত নারী, ছড়ার বই, রূপকথার গল্প, রাক্ষস-খোক্কসের গল্প পড়ে খুব মজা পেতাম আর সত্যি ভেবে রাতে ভয়ে মরতাম। বইয়ের কথা তো সত্যি,আবার সত্যি নয়, কোনটা ঠিক? একটু বড় হলে পড়লাম রামের সুমতি,শরৎচন্দ্রের। রামের কষ্ট দেখে কেঁদেছি। সিক্সে উঠে মনে হলো,সত্যি-মিথ্যে যা-ই হোক, পড়তে তো ভীষণ মজা! আমি যদি একটা কবিতা লিখতে পারতাম! টেন-এ উঠে শুনলাম একটা দেয়ালপত্রিকা বেরুবে। কিন্তু দেয়ালপত্রিকা আবার কী? খবরের কাগজ?
না, এতে বিভিন্ন ধরনের লেখা থাকে, দেয়ালে টানানো হয়।
কবিতা থাকে?
থাকে।
আমি একটা দেব।
লিখলাম। কী লিখেছিলাম মনে নেই। হারিয়ে গেছে প্রথম কবিতা, প্রথম প্রেমিকার মতোই। প্রেমে পড়লাম অনার্সে উঠে। চিঠি ছাড়া প্রেম হয়! তখন তো মোবাইলফোন ছিল না। ভালো লেখকদের লেখা কুটেশন, তুলনা, উপমা প্রয়োগ করলাম প্রেমিকাকে । কিসের কবিতা, চিঠিই যেন কবিতার চেয়ে বেশি মধুর।
উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় গল্প লিখেছিলাম একটা। কীভাবে প্রকাশিত হবে, বই হবে,কিংবা পত্রিকায় পাঠাতে হবে কীভাবে জানি না। ক্লাসের খাতায় পড়ে থাকল গল্প। অনার্সে পড়ার সময় একটা গল্প লিখে মান্নাদাকে দেখালাম। সুদীপ চৌধুরী মান্না; নাট্যকার, বেতার এবং মঞ্চের জন্য নিয়মিত নাটক লিখতেন। মেসে থাকি, এক বিকেলে ডেকে এনে গল্পটা হাতে দিলাম, তিনি পড়তে লাগলেন। আমি মান্নাদার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। পড়ে বললেন, সুন্দর।
খালি সুন্দর ! আর কিছু নয় ! হতাশ হলাম। মুখে কিছু বললাম না। আমার দৃষ্টিতে তো অসাধারণ কিছু লিখে ফেলেছি। মান্নাদা বললেনÑ সুন্দর হয়েছে, তবে ভাষাটা একটু দুর্বল । আর বিষয়টা বদল করার চেষ্টা করবে। প্রেম নিয়েই লিখতে হবে তা নয়। অনেকগুলো গল্প পড়ে ফেলো, তারপর আবার লিখো।
আমি বললাম, এটি প্রকাশ করা যাবে না?
পত্রিকায় পাঠিয়ে দাও।
আপনি যদি সম্পাদককে একটু বলে দিতেন ...
আমি বলার পর ছাপা হলে তোমার তো সন্তুষ্টি হবে না। ভাববে মান্নাদা বলায় ছাপা হয়েছে। নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস থাকবে না। পাঠিয়েই দেখো।
যদি না ছাপে?
আরেকটা পাঠাবে। একটা গল্প লিখলেই ছাপা হবে, ভাবলে তো হবে না। না ছাপলে তখন দেখা যাবে।
পাঠালাম ,স্থানীয় পত্রিকায়। এরপর অপেক্ষা। একদিন , কী আনন্দ! আমার গল্প ছাপা হয়েছে। মান্নাদা বললেন, বলেছিলাম না ছাপা হবে?
প্রথম গল্প ছাপা হলো। প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ অন্তরিত আলোকসঙ্কেত, প্রকাশ করেছে উপমা প্রকাশ, ঢাকা।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তৃতীয় ঢাকা বইমেলায় ১৯৯৬ সালে, নির্মলেন্দু গুণ-এর উপন্যাস দেশান্তর এর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখায় পুরস্কার প্রদান করে। তৎকালীন সংষ্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের-এর হাত থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করি।
সাপ্তাহিক যায়যায়দিন একবার ঘোষণা দিল বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে। লিখে পাঠালাম, ছাপা হলো। সম্মানী দু’শ টাকা। খুশি আর কাকে বলে! লিখে দু’শ আয় করা দু’লাখ রোজগারের চেয়ে বেশি। ১৯৯৭ সালের ১৪ মার্চ ঢাকায় যায়যায়দিনের প্রথম লেখক সম্মেলনে অংশ নিয়ে বেশ কয়েকজন লেখকের বক্তব্য শুনলাম। পাথেয় হয়ে থাকল। বড় পাওনা ছিল ভারত সরকারের উদ্যোগে মণিপুর রাজ্যে অনুষ্ঠিত সাঙাই ফ্যাস্টিভ্যাল ২০১৯-এর সাথে সংযুক্ত ইমফাল লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল-এ আমন্ত্রিত অতিথি হওয়া। সেখানে অন্যান্য ভাষাভাষী লেখকদের সাথে বাংলা ভাষায় স্বরচিত কবিতা পাঠ করি। সেই কবিতা ইংরেজি এবং মণিপুরী ভাষায় অনুবাদ করে পাঠ করা হয় এবং মণিপুরী ভাষায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
লেখক হতে পেরেছি কি-না জানি না, তবে এই পৃথিবীর মানুষের সুখ-দুঃখ,ভালোবাসা,অভাব-অভিযোগ নিয়ে লিখে যাবার বাসনা থাকবে আমৃত্যু।
1 মন্তব্যসমূহ
খুব সুন্দর অথচ খুবই সংক্ষিপ্ত। লেখকের আর অনেকগুলো প্রকাশনার কথা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন- এটাই তাঁর বদান্যতা। পরিশ্রমী এই গুণী লেখকের জন্য রইল শুভকামনা।
উত্তরমুছুন