কী লিখি কেন লিখি পিয়াস মজিদ

কী লিখি কেন লিখি 
পিয়াস মজিদ

কী লিখি কেন লিখি 
পিয়াস মজিদ
কবি-প্রাবন্ধিক

ঝোঁপজঙ্গলে ঘেরা এক ভুতুড়ে বাড়িতে আমার শৈশব-কৈশোর। বাড়িটার সামনেই শাহসুজার নামাঙ্কিত মোগল আমলের নয়নাভিরাম মসজিদ। পরবর্তীকালে 'রাজর্ষি' উপন্যাস আর 'বিসর্জন' নাটক পড়তে গিয়ে দেখি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই মসজিদের কথা লিখে গেছেন। পড়তে পড়তে পুলক জাগে মনে, আমার শৈশব-কৈশোরকালীন জায়গাটার কথা রবীন্দ্রনাথেরও অজানা ছিল না তবে! যাহোক, মসজিদের চৌবাচ্চায় মাছেদের খেলা দেখি, দেয়ালজুড়ে বাহারি নকশার স্রোতে ডুবি, হাস্নাহেনা ফুলের গন্ধের আগুনে পুড়ি। ঝিম ধরা দুপুরে বাড়ির সবাই তলিয়ে যায় ঘুমের দেশে। আর আমি অনিদ্রার পরিদের প্ররোচনায় জেগে জেগে বাড়ির সামনের মাটিতে ফুলের গাছ লাগাই; আমার হাতে-কাপড়ে মাটি দেখে ঘুমভাঙা বিকেলের মা রেগেমেগে একশেষ। শীত আসছে; তোমার হাতে ফোঁড়া-গোঁটা হল বলে!
হয়ও। আমি ব্যথায় কাতর। পুঁজ-জমা অশক্ত হাতেই বার্ষিক পরীক্ষা দিই। কষ্ট হয় খুব। 
আরে আরে, স্কুল থেকে ফিরে দেখি আমার বাগান ফুলে ছেয়ে আছে। কোথায় অসুখ, কোথায় কী!
সৃষ্টির আনন্দ-ঢেউ জাগে বুকে। বুকটা সাগর হতে চায়। নেভি সিগারেটের একটা বিজ্ঞাপন দেখায় টিভিতে। কতগুলো প্যাকেট জমিয়ে দোকানে জমা দিলে পেলেও পাওয়া যেতে পারে সমুদ্রভ্রমণের সুযোগ। আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেটের প্যাকেট জমাই। ধরা পড়লে বাসায় ভাববে আমি অতটুকুন বয়সে ধূম্র-এলাকায় নিজের অভিষেক ঘটিয়েছি। স্কুলের এক বন্ধু জেনে হাসে, 'শোন পিয়াস, তুই যদি সমুদ্রভ্রমণের সুযোগও পাস, এই বয়সে তোকে কি বাড়ির বাইরে যেতে দেবে!'
তাই তো! আমাকে তো থাকতে হবে এই পরিবার-সমাজের ঘেরাটোপেই। কিন্তু আমাকে ডাকে সাগরের বুকে ঘনীভূত কল্লোলেরা! আর অনেকের মতো 'ঠাকুরমার ঝুলি',  'হ-য-ব-র-ল' বা 'আজব দেশে এলিস' পড়া শৈশব আমার ছিল না। পাঠ্যবই-ই গন্তব্য একমাত্র। আমি অল্পতেই পুরো বছরের সিলোবাস পড়ে শেষ করে ফেলি। স্কুলের পড়া যখন ফিকে হয়ে আসে তখন  প্রতিবেশী অভি আপুর কণ্ঠে একটা বিদেশি রাইমের বই থেকে 'নেভার, এভার' জাতীয় কিছু একটা আবৃত্তি শুনে অন্ত্যমিলের মজা আস্বাদন করি।  ইশ্, একদিন আমিও এমন একটা কিছু লিখে অভি আপুকে তাক লাগিয়ে দেব নির্ঘাত।
রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাসের মতো আমাদেরও 'বাড়ি বদলে  যায়' একদিন। কাছেই একটা নতুন এলাকায় যেতে হয়।স্কুলও বদলে যায় আমার। বয়স বাড়ে কিন্তু আমি যেন পৃথিবী-মাফিক বাড়তে পারিনা। খেলাধুলা ভাল লাগেনা, সমবয়সী ছেলেপেলেরা কথায় কথায় মাবাপ তুলে গালাগাল করাকে আসন্ন  পৌরুষের লক্ষণ মনে করে, সবাই কেমন ঝাঁ-তকতকে স্মার্ট আর আমি নিজের মুদ্রাদোষে আলাদা হয়ে নিজের ভেতরবাড়িতে গুমড়ে মরি। নতুন বাড়িটাতে গাছপালা ঢের। এদের সঙ্গেই আমার যত সখ্য। স্কুলে রবি ঠাকুরের 'ছুটি' আর 'বলাই' পড়ি। নিজেই নিজেকে ফটিক বা বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠাউরাই।   আমার ভেতরে কত কথা কিন্তু প্রকাশের উপায় জানি না। একদিন মায়ের সংগ্রহে দেখি 'অনি'; সমরেশ মজুমদারের বই। বুঝে-না বুঝে পড়তে শুরু করি। মুহূর্তে চলে যাই আঙরাভাসার জলে, চিংড়িঘেরে আর অজানা দেশের পানে। আরও আরও বইয়ের ক্ষুধা জাগে। স্কুলের বন্ধুরা তিন গোয়েন্দা পড়ে, আমাকেও দেয়। পড়ি কিন্তু টানেনা। বুদ্ধির জাহাজিপনা আর জিতে যাওয়ার কাহিনীর কাছে নিজেকে অসহায় লাগে। মনে হয়, এরা আমার সংবেদন জানে না। তবে জানে, আনা। আনা ফ্রাঙ্ক। তাঁর ভূতলবাসের দিবানিশি-যাপন আমাকে আচ্ছন্ন করে। তারপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই-জাহাজের ভেঁপু বাজে আমাদের স্কুলে। 'পথের পাঁচালী', 'ঝিন্দের বন্দী', 'স্কারলেট পিম্পারপেল' পড়ি। আমার একলা দুপুর দুলে ওঠে রহস্যরোদ্দুরের ভারে। নিশ্চিন্দিপুরের ছায়ালতায় ছেয়ে যায় আমার মৃত্যুকামী বেঁচে থাকা। অপু-দূর্গার সঙ্গে আমার কাছে আসে কবিতা। 'জীবনানন্দ দাশকে কিছু প্রশ্ন' নামে একটা কবিতামতো লেখা পাঠিয়ে দিই কুমিল্লার জীবনানন্দগ্রস্থ সম্পাদক আবদুল ওহাবের 'রূপসী বাংলা' পত্রিকায়। ছাপা হয়। কতজনকে দেখাই, নিজের নাম মুদ্রিত আকারে দেখে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করি, এ কি আমি!
তবে যতই বইপত্র পড়ি ততই বুঝি শিল্পের দেবী কতটা দূরে থাকেন, আমার মনোদ্বীপ থেকে। আমাদের ছোট্ট শহরে আমার চোখে দেখা প্রথম বড় কবি আসাদ চৌধুরী।।তার পর একদিন আসেন আল মাহমুদ। তারও পর নির্মলেন্দু গুণ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ। দেখেছি আবদার রশীদ, শহীদ আখন্দ এবং আবু ইসহাককেও। ভিড়ের মধ্যে তাঁদের কথা শুনি সবার পেছনে গুটিশুটি বসে থাকা ছোট্ট আমি। অনুধাবনে আসে, সাহিত্যই একটা সমুদ্র; যে সমুদ্রের সম্মোহনে ছোটবেলায় খালি সিগারেটের প্যাকেট জমাতাম আমি।  বুঝি, আমাকে গহন শিল্পদেশের সন্ধানে যেতে হবে।
 লিখি, পত্রিকায় পাঠাই। যত না ছাপা হয়, তার চেয়ে বেশি ছাপা হয় না। স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখা তো এন্তার  ছাপা হল; হয়তো ভাল লেখার অভাবে আমার এলেবেলে লেখা দিয়ে পাতাও ভরাতো অনেকে। একদিন পত্রিকায় দেখি, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী 'নতুন দিগন্ত' নামে একটা সাহিত্যপত্র প্রকাশ করছেন। ভয়ে ভয়ে একটা কবিতা তাঁর ঠিকানায় কুরিয়ার করি। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে ও ভরসা জাগিয়ে পরের সংখ্যাটা আমার ঠিকানায় এসে পৌঁছে একদিন। কে বলে, বিশিষ্ট সম্পাদকগণ খাম খুলে দেখেন না মফস্বল থেকে আসা লেখা! যে আমাকে  তখন কেউ চিনতোই না, সে-ই  আমার লেখাও ছাপা হল বিশিষ্ট একটি কাগজে। প্রেরণা পাই, তাই পরপর কয়েকটা লেখা পাঠাই কবীর চৌধুরী সম্পাদিত 'সাঁকো', মযহারুল ইসলাম সম্পাদিত 'মেঘবাহন' আর ব্রাত্য রাইসু সম্পাদিত প্রথম আলো সাহিত্য সাময়িকীতে। ধীরে ধীরে আমার সব লেখাই প্রকাশ পায়। কিন্তু পত্রপত্রিকায় ভাল ভাল সব লেখা পড়ে ভীষণ কুণ্ঠা জাগে নিজের লেখা নিয়ে। হতাশায় দমে যাই। আমি কি পারব কখনও উত্তীর্ণ কোনো লেখা লিখতে! 
আমার শহরেই তো শান্তনু কায়সারের মতো ধীমান লেখকের বাস। তিতাশ চৌধুরীও থাকেন একই শহরে।  তাঁদের বইপত্র পড়ি; ভাবি একই শহরে বসে কী সব আশ্চর্য সুন্দর লেখা লিখছেন তাঁরা। নাহয়, বয়সে ছোট আমি কিন্তু লেখায় তো বৃহতের ছাপ থাকতে হবে। অগ্রজের বরাভয় দিয়ে গল্পকার-গবেষক মামুন সিদ্দিকী কাছে আসেন। ভরসা দেন, কত কত  বইপত্র পড়তে দেন! বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জাভেদ হুসাইন ভাইয়ের পাঠচক্রে বসি। শুনি, মার্কস-হেগেল আর মিনার্ভার পেঁচার দ্বান্দ্বিক উড়াল।
 সৈয়দ আহমাদ তারেক, জসীম উদ্দিন অসীম, আরিফ হাসানের সঙ্গে কাটাই কবিতাসকাল বা বিকেল। গোমতীর তীর থেকে ধর্মসাগর দীঘির পাড় আমার কবিতা-কৈশোরক হাঁটাচলার সাক্ষী হয়ে বয়ে চলে। শহরের পাঠাগারগুলোতে বুঁদ হয়ে বসে থাকি। পড়ি মার্কেজের শতবর্ষী নিঃসঙ্গতার গল্প, বুদ্ধদেব বসুর স্বাতী-সত্যেনের হাতছানি-দেয়া 'তিথিডোর',  হাসান আজিজুল হকের শকুন-ময় দুপুরের গাথা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলোকোঠাবাসী ওসমান-সেপাইয়ের কিসসা আর সৈয়দ শামসুল হকের 'আয়নাবিবির পালা'।
 লিখি আর ছিঁড়ি। পৃথিবীতে এত এত ভাল লেখার পর এক বিন্দু নতুনতার রঙ না থাকলে কী লাভ বাড়িয়ে কাগজের জঞ্জাল!
একসময় নস্টালজিক শহর ছাড়ি। যে আমি, প্রতিবেশী কেউ ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার আগে আমাদের বাসায় বিদায় নিতে এলে একা একা কেঁদে বুক ভাসাতাম সে আমি বাবা-মা-ভাইবোন ছেড়ে চলি দূর জাহাঙ্গীরনগরে। এসএসসিতে ভাল ফল করলেও, এইচএসসিতে ফল খারাপ হয় বেশ! সারাদিন কবিতা আর শিল্পের অতলতার সন্ধানে থাকলে এছাড়া কী-ইবা হওয়ার থাকে!
জাহাঙ্গীরনগর যেন এক স্বপ্নের দেশ। কবিতামঙ্গলা, শিল্পফসলা ভূমি। এই ক্যাম্পাসে থাকেন 'কীর্তিনাশা'-র কবি মোহাম্মদ রফিক আর 'কিত্তনখোলা'র নাট্যজন সেলিম আল দীন। তাঁরা তো আছেনই আর আছে কত কত পাঠচক্র, চলচ্চিত্র উৎসব, নাট্যসপ্তাহ! ক্যাম্পাসের ভয়াবহ সবুজে, নিদ্রালুপ্ত রাত্তিরের নিবিড় নির্জনে আমি টের পাই এর আগে লেখা ডায়েরি-ভরা কবিতানাম্নী লেখাগুলো আসলে কিচ্ছু না। আমাকে নতুন করে লিখতে হবে নিজেকে, নিজের দেখা ভুবনকে এবং অদেখাকেও। একদিন কবিতাভর্তি ডায়েরটা হলের জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে যেন ভারমুক্ত হলাম। অবশ্য, দুঃখ থেকে গেল ডায়েরিটা কবিতা লেখার জন্যই উপহার দিয়েছিল আমার প্রিয় বন্ধু গোলাম কিবরিয়া তুহিন।
ক্যাম্পাসে এসে ভীষণ করে পাই বিনয় মজুমদার আর উৎপলকুমার বসুকে। একলা হাঁটি, সাথী পাই বিনয়ের 'চাকা'-কে; 'আমার আশ্চর্য ফুল যেন চকোলেট, নিমেষেই গলাধঃকরণ তাকে না করে, ক্রমশ রস নিয়ে তৃপ্ত থাকি। দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি; আবিষ্কারে, প্রেমে'।
আমি আবিষ্কারের চেয়ে বেশি প্রেমে পড়ি। কারণ প্রেম মানে আবিষ্কারের বেশি বিজন বনের ইশারা। জাহাঙ্গীরনগরের দিনরাত্রির ছায়াঘরে আমি 'শকুন্তলা' দেখি। আমার চলার পথ মুহূর্তে হয়ে যায় মহাভারতের মাঠ। 'পিয়ানো টিচার' মুভিটা দেখি; রুচির নাবালক কোষ চুরমার হয়ে মোলাকাত করি আমার ভেতরের সাজগোছ করা বিকারবহুল সত্তার সঙ্গে। ভাবি, লেখায় যদি  আনগ্ন নিজেকে প্রকাশ না করি তাহলে আমগ্ন লেখার মানেটা কী! দ্বন্দ্বজর্জর সেই প্রহরগুচ্ছে খালেদ হোসাইন, রায়হান রাইন, শামীম রেজা প্রমুখ পাশে ছিলেন ভীষণ।
শামীম ভাই তো 'আজকের কাগজ'-এর 'সুবর্ণরেখা' সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যায় আমার গুচ্ছকবিতা প্রকাশ করে বললেন 'আরও লিখো। পড়ো তার চেয়ে বেশি।' 
পড়ি। বই এবং জীবন। জাহাঙ্গীরনগর থেকে মাঝেমধ্যে ঢাকায় যাই। বিশাল নগরে পথ চলতে চারুকলার বকুলতলায় একসন্ধ্যায় দেখি কবি শামসুর রাহমানের পঁচাত্তর জয়ন্তীর সংবর্ধনা চলছে। সেই তাঁকে চোখে দেখা। 'একটি ফটোগ্রাফ' এর প্রিয় কবি আর ফটোফ্রেমে নন, আমার সামনেই বসে আছেন। শাহবাগ  আজিজ মার্কেটে বই দেখি, তার চেয়ে বেশি লিটলম্যাগ। একদিন দেখা হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে; 'ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল'-এর রাশেদকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি কতদিন আমি! বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি মিস করি। সাভারের লোকাল গাড়িতে রাত করে ক্যাম্পাসে ফিরি; বাসে সিট না পেয়ো দেখি মাছের ডালা নিয়ে দাঁড়িয়ে কত কে ফিরছে গন্তব্যে।  কত কষ্টের জীবন তাদের। ক্যাম্পাসের মধ্যিখান দিয়েই যাওয়া-আসা করে কাছেদূরের গার্মেন্টসের নারী কর্মীরা। তাদের মুখের দিকে দেখি। কষ্টের আলপনা আমাকে ঘুমুতে দেয়না। একদিন শুনি মীর মশাররফ হোসেন হলের পেছনে পিঁপড়ায় খাওয়া একটা লাশ পাওয়া গেছে।।আর একদিন চোখের সামনে আমাদের এক শিক্ষার্থী বাসচাপায় মরে গেল। তার বিশুদ্ধ  রক্তে ভেসে গেলাম আমরা অশুদ্ধ সবাই। জহির রায়হানের নামে আমাদের মিলনায়তনের নামকরণের দাবি নিয়ে মিছিল করছিলাম। রাতে শুনি মিছিলের দুই সহযাত্রীকে রাতে হলে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে।
এ সব দৃশ্য আমার ভেতর গেঁথে যায়। বিঁধে যায়। আমি রঙ পাই। নিজেকে আঁকার। আমার আত্মা আমার ইজেল।
লিখতে থাকি নতুন কিছু কবিতা। কবি আমিনুর রহমান সুলতান 'সাতসন্ধ্যার সবুজ' শিরোনামে পাণ্ডুলিপি ছাপেন তাঁর 'অমিত্রাক্ষর' ছোটকাগজে। আবার অনেকে কাগজের সম্পাদক আমার সামনেই অন্য বন্ধুদের কাছে লেখা চান, আমাকে বুঝিয়ে দেন- আমার লেখা এখনও অতটা মানসম্পন্ন হয়নি। প্রথমে অভিমান হতো কিন্তু তারপর ক্রমশ নিজের খামতি টের পেতাম। অনেকের সচেতন বা অবচেতন অবহেলা বা উপেক্ষায় ভেতরে ভেতরে  মরে যেতে যেতে আমি আবার সিকদার আমিনুল হকের কবিতাবইয়ের মতোই 'বহুদিন উপেক্ষায়, বহুদিন অন্ধকারে' বলে বেঁচে ওঠেছি। ক্যাম্পাস-জীবন শেষ হয়ে আসে প্রায়। সেলিম আল দীনকে কখনও নিজের কবিতা দেখাইনি। একদিন 'জনকণ্ঠ' সাময়িকীতে 'দূর্দশার ঋতু' নামে একটা কবিতা পড়ে তিনি তাঁর নাট্যকলা বিভাগের কক্ষে ডাকলেন। আমার কবিতার কয়েকটা শব্দবন্ধে দাগ দিয়ে, কবিতা লেখার জন্য কলকাতা থেকে আনা একটা খাতা উপহার দিলেন। অ-লেখা এই খাতাটাকে বলা চলে কবিতার জন্য আমার প্রথম পুরস্কার। 
চলে যাওয়ার ডাক এল।ক্যাম্পাসকে বিদায় জানাতে হবে। বিচ্ছেদিয়া সুর বাজছে মনে। একাডেমিক অর্থে আমি তো ক্লাসরুমের ছাত্র ছিলাম না মোটেও। জাহাঙ্গীরনগরের বটতলা, প্রান্তিক,  ধূলিবালি, অতিথিপাখি, সপ্তম ছায়ামঞ্চ, মহুয়াতলা আর ব্যাপ্ত স্মৃতি-সরোবরের স্নাতক আমি।
 সেইসব স্মরণে আমার কলম কথা কয়ে উঠল 'নাচপ্রতিমার লাশ' শিরোনামের সিরিজ কবিতর স্বরে। নিজেই বুঝতে পারছিলাম, এতকালে আমি আমার প্রত্যাশিত সমুদ্রের সন্ধান পেলাম। তবু দ্বিধা যা ছিল, দূর হল কবিবন্ধু তারিক টুকুর আন্তরিক আবাহনে এবং 'নিসর্গ' সম্পাদক  সরকার আশরাফের সস্নেহ প্রশ্রয়ে। আমার পুরো পাণ্ডুলিপিটি বই হওয়ার আগে প্রকাশ পেল একটি বিশিষ্ট ছোটকাগজের পাণ্ডুলিপি সংখ্যাতে। একদিন বাংলাবাজারে অন্য এক লেখকের বইয়ের কাজে সহযাত্রী হয়ে গেলাম 'বাঙলায়ন'-এর প্রকাশক অস্ট্রিক আর্যুর দপ্তরে। আমার নাম শুনে বললেন, 'আপনার পাণ্ডুলিপি কোথায়? আমি আপনার প্রথম বইয়ের প্রকাশক হতে চাই'।
এই আহবান ভুলি কী করে আমি! 
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি।আমার দ্বিতীয় জন্মের বছর যেন কারণ এবছরই আমার প্রথম কবিতার বই 'নাচপ্রতিমার লাশ'-এর জন্ম হল। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল:

'যে উড্ডয়নশীলা আমার লাশে বোনা নীলিমায়'।

 আশ্চর্য বটে! যে পরা-মানবীকে ভেবে এমন মর্বিড উৎসর্গ-বাক্য এক যুগ পর সে আমার কাছে এসে এই বইটির খোঁজ করে গেছে।

কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ