কী লিখি কেন লিখি সুমন্ত রায়

কী লিখি কেন লিখি
সুমন্ত রায়

কী লিখি কেন লিখি
সুমন্ত রায়

কবি-গবেষক। বাংলাদেশ
আমার লেখক হয়ে ওঠা অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে। প্রথম লেখা ছাপা হয় শঁখারি বাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকীর বিশেষ ম্যাগাজিনে। নামটা সম্ভবত ‘বোধন’। সেটা ছিল একটা কবিতা- কবিতার শিরোনাম ছিল ‘আগমনী’। আমি তখন বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। আমার বিষয় ছিল গণিত। গণিতের স্বনামধন্য অধ্যাপক নির্মল কান্তি মিত্র আমার কবিতটি দেখেন। একদিন তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে আমাকে কবিতাটি পড়তে বলেন। সহপাঠিদের কাছে আমি কবি হয়ে গেলাম। এমনকী স্যারও আমাকে ‘কবি’ সম্বোধন করে ডাকতে লাগলেন। এর বছর খানিক পরে কেমন করে যেন একটা উপন্যাস লিখে ফেললাম। তখন আমার ভাষাজ্ঞান খুবই সীমিত। একদিন নির্মল মিত্র স্যারের কাছে পান্ডুলিপি দিয়ে এলাম। তিনি মাসখানিক পরে আমাকে ডাকলেন। দেখি পান্ডুলিপি ভরা লাল কালি দিয়ে কাটা আর নতুন করে লেখা। স্যার বললেন, আমি দু-তিন বার পড়েছি এবং যতটা পারি ভুল সংশোধন করেছি। কম্পোজ করার পর তুমি ভাল প্রুফরিডার দিয়ে দেখাবে। আমি বললাম, ‘স্যার এ বই কী কেউ ছাপাবে?’ স্যার বললেন, ‘আমার বন্ধু আছে ড. আলী আযহার মুনীর ‘জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল’-এর সত্ত্বাধিকারী। আমি ওর সঙ্গে কথা বলবো।’ প্রদ্ধেয় মুনির ভাইয়ের ‘হীরামণি’ প্রকাশন থেকে আমার প্রথম উপন্যাস ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’ প্রকাশিত হল ১৯৯৩ সালে। মিত্র স্যারই তাঁর পরিচিত মৃণাল নন্দীকে দিয়ে অসাধারণ একটি প্রচ্ছদ করিয়েছিলেন। বইটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়। দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক বিচিত্রাসহ অনেক জাতীয় পত্রিকায় বইয়ের ওপর রিভিউ বের হল। আমি ক্যাম্পাসে জনপ্রিয় লেখক হয়ে গেলাম। সেইসমই শ্রদ্ধেয় মুনির ভাই আমাকে পাঁচ হাজার টাকা লেখক সম্মানী দিয়েছিলেন। এরপর আমার বেশ কয়েকটি বই দ্বিতীয়, তৃতীয় মুদ্রণ হয়েছে কিন্তু কেউ লেখক সম্মানী দেননি। তৃতীয় উপন্যাস ‘তুমি শুধু আমার’ প্রকাশিত হয় ঢাকা টাউন লাইব্রেরি থেকে। প্রকাশকাল ১৯৯৮। এই বইটি কম্পোজ করেছিলেন প্রখ্যাত আবৃত্তিকার ও কবি বরিশঙ্কর মৈত্রীর সহধর্মিণী নীলু মৈত্রী বৌদি। রবিদার বাসায়ই পরিচয় হয় বেশ কয়েকজন গুণী মানুষের সঙ্গে। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তপন বাগচী - যা আমার জীবনের এক আশীর্বাদ স্বরূপ। তপনদা সেইসময়ই আমার এ উপন্যাসের একটি চমৎকার রিভিউ করেছিলেন দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায়। পড়ালেখা শেষ করে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন ও কলেজে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করি। এটাও আমার জীবনের আরেকটি আশীর্বাদ। বিশ^বরেণ্য এই বিজ্ঞানীর ওপর পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখতে পেলাম তাঁর শতাধিক মূল্যবান আবিষ্কার রয়েছে কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ কোনো জীবনীগ্রন্থ নেই। ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু’ জীবনীগ্রন্থটি। প্রকাশক মনিরুল হক, অনন্যা প্রকাশনী, ঢাকা। বিজ্ঞানীর ওপর আমার আরো কয়েকটি বই প্রকাশিত হয় - যা দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী প্রফেসর হামিদুজ্জামান খান-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত হয় বই ‘ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান জীবন ও কর্ম’। এই বই লিখতে সময় লাগে প্রায় ৭ বছর। প্রকাশ করে এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা। এ বই লেখক, শিল্পী সমাজে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি প্রফেসর সিরাজুল ইসলম স্যার খুশি হয়ে আমাকে সোসাইটির আর্ট গ্যালারি সঞ্চালন করার সুযোগ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তির ওপর জীবনীগ্রন্থ বের করি। এঁরা হলেন: প্রথা বিরোধী লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ, জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ, বসুন্ধরা সিটির স্থপতি, চিত্রশিল্পী মুস্তাফা খালীদ পলাশ প্রমুখ। করোনাকালে আরো দুজন গুনী মানুষের ওপর জীবনী লেখা শেষ করেছি। তাঁরা হলেন: মাটি ও মানুষের কবি আতিয়ার রহমান (মুকসুদপুর) ও ফরিদপুরের ইতিহাস সহ বহু গ্রন্থের লেখক শিক্ষাবিদ প্রফেসর আনম আবদুুস সোবহান। করোনাকালে ফেসবুক খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আমিও জীবনে এমন অখন্ড অবসর পাইনি। ফেসবুকে নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করি। অনেকেই আমার কবিতা পড়ে তাদের ভালোগালার কথা কমেন্টস-এ লিখে জানান। অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই বের করে ফেলি প্রথম কাব্যগন্থ ‘আলোয় ভুবন ভরা’। আমন্ত্রণ পেয়ে একটি কবিতার আড্ডার মধ্যমণি হয়ে গেলাম। দু’জন কবি আমার কবিতার তীব্র সমালোচনা করলেন। মনটা ভীষণ ভেঙ্গে গেল। ভাবলাম, কবিতা আর লিখব না। এ ঘটনার সপ্তাহ খানেক পরে ড. তপন বাগচী আমাকে মেসেঞ্জারে তিনটি কবিতা দিতে বললেন। আমি কবিতা দিলাম। তিনি কবিতা পড়ে বললেন, ‘তুমি ছন্দে কবিতা লিখ। ভাল হবে।’ শ্রদ্ধেয় তপনদা আমার আদর্শিক মানুষ। লেখালেখি জীবনের গুরু। তাঁর কথা মতো ছন্দ নিয়ে একটু পড়াশোলা করে ছন্দে কবিতা লিখতে শুরু করি। সত্যিই এবার কবিতা লিখে তৃপ্তি পেলাম। আমার ভেতরের দুর্বলতা কেটে যেতে লাগল। এবার ব্যাপক পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত হলাম। ২০২১-এর বইমেলায় বের হল আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘে ঢাকা আকাশ’। এ বইয়ে আমার কবিতা নিয়ে লিখলেন, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা ও ড. তপন বাগচী। কবি হিসেবে এটা আমার জীবনের এক বড় পাওয়া। আমি বিক্রমপুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি। আমাদের সংগঠনের একটি প্রকাশনা আছে ‘ঢেউ”। আমি সেই লিটলম্যাগ পত্রিকার সম্পাদক। ‘ত্রৈমাসিক অগ্রসর বিক্রমপুর’- এর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য। একসময় দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সহজপাঠ পাতায় নিয়মিত লিখতাম। আমার ছোটদের জন্য লেখা দুটো বই হল : শুভ্রর আবিষ্কারের স্বপ্ন ও নাম তার কচি। প্রথম বইয়ের নামটি দিয়েছিলেন আবৃত্তিকার, ‘সহজ মানুষ’ - এর সঞ্চালক রবিশঙ্কর মৈত্রী। যিনি আমার আরেকজন আদর্শিক মানুষ - আমার লেখালেখির প্রেরণা। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা হৃদয়ে ধারণ করি। তাঁদের লেখায় অনুপ্রেরণা পাই। মুকসুদপুরের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে জুবিল্যান্ট পদক-২০০৪, বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু স্মারক সম্মননা - ২০১৫, কলকাতা, ভারত। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস ‘একাত্তরের শিশু’ - এর জন্যে ফুলকলি পুরস্কার - ২০২০, ডুমুরিয়া, খুলনা। আমার কাছে মনে হয় লেখালেখির বড় পুরস্কার হল পাঠকের ভালবাসা। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা - ২৮। আমি লিখি নিজের ভালোলাগা থেকে - লিখি পাঠকের নির্মল ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ