কী লিখি কেন লিখি
সসীমকুমার বাড়ৈ
কী লিখি কেন লিখি
সসীমকুমার বাড়ৈ
কবি-কথাসাহিত্যক-প্রাবন্ধিক। বিশেষ সচিব, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ভারত
লেখক হবো এমন কথা ভাবিনি কখনও, আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছি। কোনো প্রস্তুতিও ছিলনা কিন্তু, ভিতরে ভিতরে তৈরি করছিলেন আমার প্রধান শিক্ষক পিতা নারায়ণ চন্দ্র বাড়ৈ। রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্কসভা, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ইত্যাদি প্রায়ই আয়োজন হতো আমাদের বারপাইকা হাই স্কুলে। প্রতিযোগিতায় আমরা ভাইয়ের প্রথম দ্বিতীয় হতাম। নিন্দুকেরা বলত, হেডমাস্টারের পোলারাই তো সব পাবে। গ্রামীণ পরিবেশে এই ঈর্ষাটুকু স্বাভাবিক ছিল। তারা বুঝত না, সাফল্যের পিছনে একটা দীর্ঘ মেয়াদি প্রস্তুতি থাকে, একজন মানুষের প্রেরণা থাকে। আমার বাবা সীমাহীন দারিদ্র মাথায় নিয়ে জন্মেছিলেন এবং অনেকার্থে ছিলেন স্বশিক্ষিত। সমস্ত প্রতিকূলতা অস্বীকার নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন ধীশক্তি সম্পন্ন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে। চমৎকার গদ্য লিখতে পারতেন, আঁকতে পারতেন, বড় সংগঠক ছিলেন, অত্যন্ত ভাল বাগ্মী ছিলেন। তাঁর এই বিশাল ব্যাপ্তি আমাদের প্রভাবিত করত, অনুপ্রাণিত করত। তিনি একাধারে আমাদের শিক্ষক, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক চেতনার গুরু। এখনও আমার সত্তাকে প্রভাবিত করেন সত্যের প্রতি অবিচল থাকতে। পরবর্তীতে আমার জীবনে এলো দেশ বিভাজনের যন্ত্রণা। গোপালপুর রামকুমার কমলা বিদ্যালয়ে স্কুলে নবম দশম শ্রেণীতে পাঠকালীন স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলো একাধিক প্রবন্ধ। স্কুলে অনেক প্রতিযোগিতার পুরস্কার উঠে আসত আমার ঝুলিতে। কেউ জানত না সেই চালচুলোহীন বালকের মেধাশক্তির শক্তির উৎস কী। একাদশে ভর্তি হলাম কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। এই কলেজে বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন প্রাক্তনী। কত মনীষীর যে কলেজ এটি। শিহরিত হতাম, গর্বিত হতাম। যেন এক উজ্জল সমুদ্র। সেই সমুদ্রে কপর্দকশূন্য, আশ্রয়হীন আমি নামক ছেলেটি হাবুডুবু খেতাম কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল আমার শক্তপোক্ত বিচরণ। যুক্ত হয়ে পড়লাম বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে। কলেজ ম্যাগাজিনে ছাপা হতো প্রবন্ধ, আমার আঁকা ছবি। সম্ভবত ১৯৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুব কল্যাণ দপ্তরের মাসিক পত্রিকা ‘যুবমানস’-এ প্রকাশিত হলো “শ্যালোঘরে রাত্রি” নামে একটি কবিতা। আমার প্রথম প্রকাশিত কবিতা। প্রায় সমসাময়িক কালে ‘নাগরিক’ নামে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম গল্প। এই গল্পে ছিল মার্কসীয় দর্শনের প্রভাব, ধর্মীয় আফিম কিভাবে ভুলিয়ে দেয় মানুষের চেতনা।
পড়াশুনা, জীবিকার লড়াই এবং বামপন্থী মিছিল মিটিং-এ অংশগ্রহণের পাশাপাশি চলল অনিয়মিত কবিতা লেখা। এই পর্বে লিখেছিলাম একটি উপন্যাস। কিশোর বয়সে গল্প, উপন্যাস পাঠের প্রভাব দোষে দুষ্ট। ভিতরের মানুষটি বললেন, একে আলোর মুখ দেখাস না সসীম। আটের দশকের শেষের দিকে ভারতের গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘ, দমদম শাখা ঠিক করল একটি পত্রিকা বের করবে। গ্রুপে সব বয়স্ক লেখক সদস্য। আমি তখন এক নবীন কবি। ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করে সবে কলেজ ছেড়েছি। আমাকে করা হলো সংগঠনের সাহিত্য পত্রিকা ‘ভাস্কর’-এর প্রথম সম্পাদক। ১৯৯১ সালে পেলাম ভারতীয় রেলে চাকরি এবং পরের বছর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক পদে চাকরি পেয়ে সাময়িকভাবে কয়েক বছরের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম লেকাজোখা থেকে।
উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরে এলাম অবিভক্ত মেদিনীপুরের সবং ব্লকে সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক হিসেবে। আফিস থেকে ‘উন্মেষ” নামে একটি পত্রিকা বের করলাম ১৯৯৮ সালে। আমি থাকাকালীন দু’টি সংখ্যা বেরিয়েছিল। সেখানে লিখলাম গল্প। মেদিনীপুরের সুসংহত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আমার জীবনে মরা গাঙে বান আনল। পুনঃরায় শুরু হল সাহিত্য চর্চা। ইতিমধ্যে বর্ণ বিভাজিত ভারতীয় সামাজিক সংকট গভীরভাবে দেখতে শুরু করেছি। সঙ্গে দেখছি রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, ভারতীয় উপমহাদেশের দুর্নীতি এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের বিভিন্ন স্তর। বদলেছে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে স্নাতকোত্তরে পাবলিক এ্যডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়াশুনা ও সিভিল সার্ভিসের জন্য অধিত নৃবিদ্যা, আইন-কানুন আমার ভিত মজমুত করেছে। মানুষের এত বিপন্নতার কথা কবিতায় আটকানো যাচ্ছিল না। গল্পই হয়ে উঠল প্রধান মাধ্যম। মদনমোহন তর্কালঙ্কার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশংকর রায়, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বাংলা সাহিত্যের অনেক পূর্বসূরীকে প্রশাসনিক চাকরি জীবন গদ্য-সাহিত্যিক করে তুলেছিল। আমার গদ্যে আসাও যেন একই পথে। দেখতে দেখতে বাণিজ্যিক-অবাণিজ্যিক পত্র পত্রিকায় লিখেছি ৭০টির মতো গল্প। প্রথম গল্পগ্রন্থ “খোয়াজ খিজিরের গপ্পো” প্রকাশিত হয়েছে ২০০৭ সালে। প্রকাশক ছিলাম আমি নিজেই। অন্য দুটো গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ‘একুশ শতক’ ও ‘মন্দাক্রান্তা’ পাবলিকেশন থেকে। উপন্যাসের হাতে খড়ি রহস্য উপন্যাস লিখে। প্রথম রহস্য উপন্যাস “মৃত্যুখদে কুহক”। শ্রী সৌমিত্র লাহিড়ীর সহযোগিতায় ‘একুশ শতক’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয়টি “ছায়া মুখোশ,” লিখেছিলাম ত্রিপুরার ‘দৈনিক সংবাদ’ পুজা সংখ্যায়। গল্পের ন্যায় বিকল্প ধারার উপন্যাস লেখায় শক্তি সঞ্চারিত হলো ‘ক্ষয়িষ্ণু পুরুষশ’ ‘দেড়শো গজে জীবন’ ‘সুন্দরবনের মহাল কইন্যা’ ‘জরায়ু’ নামের উপন্যাসগুলিতে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বাইরে আটকে যাওয়া ভারতীয়দের সংকট নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘দেড়শো গজে জীবন’ ইতিমধ্যে বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয় উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় তাঁর পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছিলেন-“এত জটিল একটি বিষয় কী অবলীলায় চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি।“ সুন্দরবনের জংলী এবং পোষা মৌমাছির লড়াই কেন্দ্রিক উপন্যাস ‘সুন্দরবনের মহাল কইন্যা’-ও বিষয় ভিত্তিক বাংলা সাহিত্যে প্রথম। প্রকাশিত হয়েছে একটি কাব্যগ্রন্থ ‘গাঙ্গুরের নিঃশব্দ জলে’ এবং ইংরাজীতে লেখা সংকলন ‘Colours of Life’।
‘কাঁকড়া’ বেতার-নাটকের নাট্যকার হিসেবে মিলেছে “আকাশবাণী জাতীয় পুরস্কার-২০০৮”, ‘খোয়াজ খিজিরের গপ্পো’ গ্রন্থের জন্য ‘কবি নিত্যানন্দ পুরস্কার-২০১৪’ এবং সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থিওসোফিক্যাল পুরস্কার-২০২১’। থাইল্যাণ্ড সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রকের আমন্ত্রণে ‘এশিয়া ও আসিয়ান দেশের আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে -২০১৫’-এ অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।
0 মন্তব্যসমূহ