কী লিখি কেন লিখি সমরেন্দ্র বিশ্বাস

কী লিখি কেন লিখি?

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

কী লিখি কেন লিখি?

সমরেন্দ্র বিশ্বাস
‘কেন লিখি?’ খুব সরল একটা প্রশ্ন। ভেবে দেখলে, এর উত্তরটাও খুব সহজ। আমার ভালো লাগে তাই লিখি। আবার এই সরল প্রশ্নটার উত্তর দেয়াটা, কখনো কখনো মনে হয় খুব কঠিন ও জটিল।

কেউ ময়দান দাপিয়ে ফুটবল খেলে, আমি তা একদম পারি না। কেউ সুন্দর গান গায়, চেষ্টা করেও আমার দ্বারা সেটা হয় না। কেউ পার্টি ক্যাডারদের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুন্দর ভাষণ দেয়। আমার দ্বারা ভাষণও সম্ভব নয়। কিছু বলতে গিয়ে দুচার লাইনের পর কোন কথা খুঁজে পাই না। বরং খাতা কলম নিয়ে বসলে, তখন আমি দু-চারটে লাইন লিখে ফেলি। কয়েকটা লাইন নিয়ে যখন আরেকটু কসরৎ করি, তখন দেখি আরো দুচারটে লাইন উঠে আসছে। তাই একসময়ে মনে হয়েছে, অন্য অনেক কাজের থেকে লেখালেখির এই কাজটা আমার কাছে কিছুটা সহজ। এজন্যেই হয়তো আমি লিখি, কিংবা লেখার চেষ্টা করি!

প্রত্যেকটা মানুষের একটা আভ্যন্তরীণ তাগিদ থাকে - নিজেকে প্রকাশ করবার। নিজের কথা অন্যকে শোনাবার। আমার কথা শোনবার মতো যখন তেমন কোন শ্রোতা খুঁজে পাই না, তখন মনে হয় নিজস্ব কথাগুলো লিখি ফেলি। ভবিষ্যতে কেউ যদি আমার কথাগুলোকে একটু দয়া করে ধৈর্য ধরে শোনে!

আমি দেখেছি, একটা কথা উচ্চারণের পরে সেটা আমাদের চারপাশের বায়ুমন্ডলে সামান্য কিছু সময়ে ভেসে বেড়ায়। তারপর সেগুলো সুনীল আকাশের নীলে কিংবা রাত্রের গাঢ় অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অনেক সন্ধ্যায় সবার অজান্তে সেই উচ্চারিত কথাগুলোকে বায়ুমন্ডলের মধ্যে গরু খোঁজার মতো খুঁজেছি, - পাই নি। হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো ছেঁকে তুলবার জন্যে জলস্রোতে জাল ফেলেছি – উঠে এসেছে বিস্মরণের শ্যাওলা! বুঝেছি, বৃথাই আমি আমার উচ্চারিত কথাগুলোকে খুঁজতে এতক্ষণ ধরে পন্ডশ্রম করছি।

সে অনেককাল আগের ঘটনা। হারিয়ে যাওয়া কথাগুলোকে কি করে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, তার উপায় বাত্‌লে দিতে ওনারা একরাতে আমার স্বপ্নে হাজির হলেন! ওনারা ছিলেন বিদ্যাসাগর, কবিগুরু এবং আরো কয়েকজন! সবাইকে ঠিকঠাক সে সময়ে চিনে উঠতে পারি নি! ওনারা আমার কানে কানে বলে গেলেন – ‘ওরে নাদান বালক, তুই যা ভাবছিস্‌, সেসব একটা খাতায়, নিদেন পক্ষে একটুকরো কাগজে লিখে রাখ। দেখবি কথাগুলো অতো সহজে হারিয়ে যাবে না!’ আমি ভাবলাম, ‘বাঃ বেশ বেশ!’

পুরোনো খাতাকে মলাট দিয়ে বানিয়ে ফেললাম আমার ব্যক্তিগত লেখার একটা গোপন খাতা! তাতে সুবোধ বালকের মতো কয়েকটা বলবার কথা, ছড়া ও পদ্য লিখে ফেললাম। বছর খানেক বাদেও দেখলাম, আমার লিখে রাখা কথাগুলো হারিয়ে যায় নি। একদম ঠিকঠাক সশরীরে বেঁচে আছে।

আমার লেখার খাতা থেকে একটা লেখা পাড়ার ‘বলাকা’ ক্লাব নিলো। ওরা একটা জাল ঘেরা বোর্ড বানিয়ে দেয়াল ম্যাগাজিনে আরো অনেকের লেখার সাথে আমার সেই কবিতাটাকে তুলে দিল! দেখছি, দু একজন দেয়াল পত্রিকার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের লেখাগুলো পড়ছে। দূর থেকে দেখে আমার চিত্ত প্রসন্ন হলো, বুকের ছাতির আয়তন বেড়ে ডবল হয়ে গেল! স্কুলের একটা লেখা ম্যাগাজিনে ছাপা হলো। এক ভীষণ রাগী মাস্টার আমার দিকে হেসে বললো, ‘তুই লিখেছিস, খুব ভালো।’ তখন মনে হলো, লেখা লেখির কাজটা মোটেই খারাপ ব্যাপার নয়!

একসময়ে মনে হতো, আমার কিছু কিছু বিশেষ, আবেগময় কিংবা অনুভূতিপ্রবণ কথাগুলোকে খাতায় কলমে আটকে রাখবো। আমার দেখা কোন বিশেষ ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করে রাখবো। এমনি ভাবেই হয়তো শুরু হয়েছিল আমার সচেতন ভাবে লেখা লেখির পর্ব।

আমার লেখালেখির শুরু অবশ্যই কবিতা দিয়ে। বাচ্চা বয়সে ট্রানজিস্টার, রেডিও বা মাইকে গান শুনতাম; খাট পেতে পাড়ার কোন বাড়ির উঠোনে রবীন্দ্র জয়ন্তী হতো, তাতে ছড়া বা ছোট খাটো কবিতা বলার সুযোগও মিলে যেত; ঘরে বৃহস্পতি বারে লক্ষীর পাঁচালি পড়া হতো, শ্রাবণে সারা মাস ধরে পিসি ও প্রতিবেশীরা মিলে সুর করে মনসামঙ্গল পাঠ করতো। এ সবের মধ্য দিয়ে কখন যে নিজের মধ্যে কবিতা সহ নানা লেখালেখির ব্যপারটা কি ভাবে ঢুকে গেল, নিজেই জানি না।

যখন অনেক ছোট ছিলাম, সেই সব বাচ্চা বয়সে অনেক কথা ঘুরে বেড়াতো ভোরের মালতী ফুলে, কাঁঠাল গাছের নীচে ভিজে মাটিতে - ছায়ার মধ্যে গজিয়ে ওঠা বড়ো বড়ো ঘাসে, কিংবা সঙ্গিনীর সঙ্গে রান্নাবাটি খেলতে খেলতে হঠাৎ ভেসে আসা কোকিলের ডাকে! এসবের মধ্য দিয়ে কি করে যে নানা লেখা আমার মধ্যে ভর করতো, সেসব বোঝানো মুস্কিল। তবে পরিণতঃ বয়সে বুঝেছি, লেখারা সর্বত্রই ঘুরে বেড়ায়, তাতে জান্তে-অজান্তে সব মানুষই কখনো না কখনো কম-বেশী সংক্রামিত হয়। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, এই লেখালেখি নামক এক সংক্রামক রোগে আমি আক্রান্ত হয়ে পড়েছি!

 আজকাল মনে হয়, গল্প লিখতে হবে, কবিতা লিখতে হবে। কেউ বলে পাঠায় একটা ছোট্ট প্রবন্ধ চাই! লিখি। আসলে লেখাটা একটা মনের তাগিদ। সেটা ভালো কি মন্দ হচ্ছে – তা জানি না! এই ভেতরের তাগিদটুকুই আসল। আগামীর আরো যেটুকু সময় এই তাগিদটুকু বেঁচে থাকবে, আমি লিখবো। ফুল লিখবো, পাখি পাহাড় সুর্য নদী লিখবো। মানুষের দারিদ্র, অন্যায় অবিচারের কথা লিখবো। নেতাদের ভন্ডামি, বাংলাদেশের যুদ্ধ, ভাষা শহীদদের কথা, চার্লি চ্যাপলিনের হাসি কিংবা হিটলারদের নাৎসীবাদ নিয়ে লিখবো! নিজের ভেতর থেকে সেই লেখবার তাগিদটুকু যখন ফুরিয়ে যাবে, তখন আর লিখবো না – তখন চাবুক মেরেও কেউ কিছু লেখাতে পারবে না! তাই প্রার্থণা, এই লেখালেখির তাগিদগুলো আরো কিছু কাল যেন বেঁচে থাক!

এই মানব সভ্যতায় ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম লেখা। যা ধরে রাখার জন্যে আছে আমাদের পান্ডুলিপি, পত্র পত্রিকা, পুঁথি-পুস্তক, ফিলহালের ল্যাপটপ- কম্পিউটার। লিখতে পারছি বলে এই মানব সভ্যতার কাছে আমি সত্যি সত্যিই ঋণী! শ্লেট-পেন্সিল ছিল বলেই তো প্রথম কথাটা একদিন লিখতে শিখেছিলাম।

পরিশেষে আরেকটা কথা, আমি লিখি। মূলত বাংলাতেই। কেননা বাংলাভাষা জড়িয়ে আছে আমার চেতনায়। আমার চিন্তা ভাবনায়, আমার দৈনন্দিন জীবনে। বাংলাভাষা আমার লেখার কলমটাকে জাগিয়ে রাখে!  কখনো কখনো মনে হয়, বাংলাতে সামান্য যা কিছু লিখছি, তা ব্যতিক্রমী কোনো বিষয় না। এই লেখাটাই আরো অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের মতো আমার একটা কাজ। এই লেখালেখিটুকুই আমার এক ধরণের যাপন ও জীবন চর্চা।

[ 06.06.2021. 825 words ]

 

 

To:

গোবিন্দ ধর , সম্পাদক , স্রোত

Sent by email on 6.6.21 > boibari15@gmail.com 

 

 

 

 

 



 

পরিচিতি / সমরেন্দ্র বিশ্বাস


#  সমরেন্দ্র বিশ্বাসের জন্ম কোলকাতায়, ১৯৫৭ সালে। স্কুল জীবন কাঁচরাপাড়ার জোনপুর হাই (এইচ এস) স্কুলে। এর পরে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতক। চাকুরীসূত্রে ভিলাই স্টীল প্লান্টের আধিকারিক ছিলেন, সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত । ভিলাইতে ১৯৮০ থেকে দীর্ঘ বসবাস। ইতিপূর্বে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে -  তবু স্পন্দমান পথ (১৯৮৬), সময়ের পদাবলী / স্রোতে স্রোতে ভাসমান ভেলা (১৯৮৯), হাওয়া শিকার (১৯৯৫) , পিতৃস্মৃতি,উদ্বাস্তু শিক্ষিকা ও অন্যান্য কবিতা (২০০৫), হাফিজের ফেয়ারওয়েল (২০১৫) , অনন্ত জলশব্দে আমি (২০১৬) । সমরেন্দ্রর লেখা কিছু গল্প সাপ্তাহিক বর্তমান, দেশ, দুর্বাসা, গাঙচিল পত্রিকা, শহর, মধ্যবলয় সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গল্প সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে ।

 

স্থায়ী নিবাস – ৪৬০-গোকুলপুর কলোনী , কাঁটাগঞ্জ , জেলা – নদীয়া , ৭৪১২৫০ ;  [ ভায়া – কাঁচরাপাড়া ] । #

বর্তমান যোগাযোগ –

House-49/B, Street-11, Smritinagar, BHILAI ,

PO- M L Nehrunagar, Dt. Durg ( Chhattishgarh ) PC-490020

# Mob-9407980976 ,

Email –  biswas.samarendra@hotmail.com   & biswas.samarendra@gmail.com

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. খুবই গুরত্বপূর্ণ কথা সোজা সরল প্রাঞ্জল ভাষায় আপনি লিখলেন। মনে গভীর দাগ কেটে যায়। খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর লিখেছেন দাদা... লেখার তাগিদটা বেঁচে থাক...

    উত্তরমুছুন