আমার লেখালেখির প্রেরণা একদমই আত্মগত অনুভব। পরিবার থেকে নয়, বই পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েও নয়। শৈশব-কৈশোরে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা আমাকে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করে। তখন আমি দুচোখ ভরে প্রকৃতি দেখেছিলাম, আর নর-নারীর সম্পর্কের নানা দিক দেখারও সুযোগ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এসব অনুভব জোরদার হয়ে ওঠে। নানা ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ মনের সীমানায় জড়ো হতে থাকে। লিখতে শুরু করি। পরিবার থেকে আমার প্রথম বই প্রকাশের সহযোগিতা পাই। কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন।
নিছক সাহিত্যের বিষয় না। সমাজ বদলের স্বপ্ন। আমি লেখক জীবনের শুরু থেকেই মনে করেছি, লেখকের উচিত সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে নিজের লেখক সত্তাকে উজ্জীবিত রাখা। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় মনুষ্যবোধের চেতনায় সিক্ত মর্যাদার জায়গা যেন প্রতিটি মানুষের জন্য নির্ধারিত থাকে। এমন চেতনায় আমার গল্প উপন্যাসের চরিত্র আঁকি। সাহিত্য আমার কাছে নিছক কল্পনার ছক নয়।
১৯৬৪ সালের আমি কলেজে পড়ি। তখন একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতায় গল্প লিখে প্রথম হয়েছিলাম। সেই থেকে আমার লেখালেখির সূচনা। ২০২১ চলছে। এখনো থেমে যাইনি। এ বছরে প্রকাশিত হয়েছে ‘বধ্যভূমির বসন্ত বাতাস’নামে উপন্যাস।
এটা তো অত্যন্ত সত্যি কথা যে পরামর্শ নিয়ে কেউ কখনো লেখক হবে না। লেখক হতে হবে নিজের ভেতরের নির্যাসটুকু ছেঁকে। সৃজনশীলতা ও বাস্তবতার আলোকে সেই নির্যাস চারদিকে ছড়িয়ে নিজের বিশ্বাস ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সাহিত্যের নানা দিক আছে, সেই দিককে যে যত বেশি বুঝবে, তার ভেতরে সাধনার জায়গাটি অনেক গভীর হবে।
আমি যখন ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন আমার শিক্ষক প্রয়াত আবদুল হাফিজ আমাকে আমার লেখালেখির সূত্র ধরে বলেছিলেন, মেয়ে হয়েছ বলে একটি গন্ডির মধ্যে নিজেকে আটকে রেখো না, দুই চোখ ভরে তোমাকে বিশ্ব দেখতে হবে। তোমাকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
সাহিত্যের জন্য মানুষকে চেনা খুবই জরুরি প্রসঙ্গ। সাধারণ মানুষের জীবন দেখা আরো জরুরি। শিল্পের জন্য শিল্প- এই ভাবনা যেন তোমাকে আচ্ছন্ন করে না রাখে। আমি আমার শিক্ষকের এই নির্দেশ মেনেছিলাম। আমার সাহিত্য জীবনের ৫৭ বছর ধরে আমি এই পরামর্শ অনবরত বিভিন্ন সূত্রে খুঁজে বেড়িয়েছি। আমার শিক্ষকের এই পরামর্শ তরুণ লেখকদের জন্য নয়, আমি বলেতে চাই এই পরামর্শ কেউ যদি মানে, তাহলে বৃহত্তর জগৎ তার সামনে উঠে আসবে। তবে লেখক নিজে তাঁর সাহিত্য-সাধনার দিকনির্দেশক। তিনি অপন বলয় গড়বেন। জীবনের সবটুকু উপাদান সেই বলয়ে থাকবে। তিনি তাঁর থেকে নিজে ভাঙবেন। ভাঙা-গড়ার খেলায় জীবনের দ্বৈরথ নির্মাণ করবেন। ভাববেন, এই আশ্চর্য জগতের ¯্রষ্টা আমি। শিল্পের সাধনা প্রবলভাবে ব্যক্তিনির্ভর। ব্যক্তি নির্ধারণ করবেন তাঁর পরিসর। ব্যক্তি নির্মাণ করবেন সেই পরিসরের ভুবন। সুতরাং সাহিত্য লেখকের মানস জগতের খুঁটিনাটি আন্তর্জাল। কোনো পরামর্শ গ্রহণ করে এই অন্তর্জাল কেউ বিস্তার করতে পারবে না। দরকার সৃজনশীলতার, পাশাপাশি দরকার অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। অভিজ্ঞতা লেখকরে মাত্রার বিস্তার ঘটায়। অভিজ্ঞতা কাহিনীকে গতি দেয় এবং চরিত্র বানানোর সহায়ক শক্তি হয়। আমার শিক্ষক বলেছিলেন দুই চোখ ভরে বিশ্ব দেখতে। তাঁর পরামর্শে আমি আমার বিশ^ দেখতে শিখেছি। কিন্তু দেখাটা আমার নিজের। অনেকের দেখা ধার করে একটি গল্প বা উপন্যাস আমার বিশ^কে আলোকিত করে না। সেটা আমার নিজেরই দেখা। দেখাটা যেন নিজের হয় তরুণ লেখকদের জন্য আমি এটুকু বলতে পারি। নান্দনিক বৈশিষ্ট্যে ফুটে উঠবে শিল্পের ভূমি।
সাহিত্য তৈরি হয় ভাষা দিয়ে। ভাষা রপ্ত করা লেখকরে জন্য জরুরি। নিজেকে প্রকাশের ভাষা মুখের ভাষার চেয়ে ভিন্নতর পরিচর্যা দাবি করে। আবার অন্যদিকে বাংলা ভাষার ভিন্নতর প্রকরণ বাংলাভাষী অঞ্চলে দেখা যায়। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা সব জায়গায়ই ভাষার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। যে কারণে বলা হয় বাংলাদেশের সাহিত্য, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য কিংবা আসামের বরাক উপত্যাকা বা ত্রিপুরার সাহিত্য। লেখক তাঁর সাহিত্য সচেতনভাবে ভাষার বৈশিষ্ট্যে আলাদা করবেন। ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রেও এমনটি বলা যায়। ইংরেজিতে সাহিত্য রচিত হয় ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। কিন্তু সব দেশের সাহিত্যের মাত্রা ভিন্ন। বিশ^জুড়ে পাঠক এই মাত্রা অনুধাবন করেন। চিনুয়া আচিবের লেখা পড়ে কেউ মনে করবে না যে তিনি ইংল্যান্ড বা আমেরিকার লেখক। তেমনি এমে সিজারের লেখা পড়ে কেউ ভাবনে না যে তিনি কানাডার লেখক। তিনি যে দ্বীপরাষ্ট্র মার্টিনিকের লেখক, তা কোনো না কোনোভাবে উঠে আসবে। যতই সাহিত্যের মাধ্যম ইংরেজি ভাষা হোক না কেন, লেখকরে আত্মপরিচয়ের স্বরূপ, দেশের মানুষের কথা, প্রকৃতির, জীবনাচরণ ভিন্নতর হবেই। চিনুয়া আচিবের ক্ষেত্রেও এটি একই সত্য। আফ্রিকার অনেক কিছু তাঁর লেখার প্রাণস্বরূপ। সে জন্যই আমরা মনে রাখি আমাদের সাহিত্য যেন আমাদেরই হয়। বাংলা ভাষার পাঠক বুঝতে পারবেন কোনটা বাংলাদেশের সাহিত্য, কোনটা পশ্চিমবঙ্গের কিংবা ত্রিপুরার।
তারপরও আমরা অন্য ভাষার একটি বই পড়ে মনে করতে পারি যে এটা আমার নিজেরই কথা। এটাকে লেখকরে সার্থকতা বললে কম বলা হবে। সাহিত্যের জন্য এটাই সত্য। আমি কেন পাবলো নেরুদা পড়ব কিংবা মার্কেজ পড়ব কিংবা টলস্টয় পড়ব, তা আমার অন্য দেশের সাহিত্যকে বোঝার আগ্রহ থেকে তৈরি হবে। আমি তরুণ লেখকদের জন্য বলি, পড়ার জগৎটা যদি বিস্তৃত না হয়, তাহলে নিজের ভেতরে ঘাটতি থাকার জায়গা তৈরি হতে পারে। বিশ^সাহিত্য জানা নিজের জন্য জরুরি। উপলব্ধির জন্য জরুরি। বিশ^সাহিত্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখলে ক্ষতি নিজেরই।
পঞ্চাশের দশকে বা তার কিছু আগে থেকে যখন আমাদের এই বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারা তৈরি হলো তখন কিন্তু তরুণ লেখকদের সামনে প্রবীণদের পরামর্শ ছিল বলে আমি মনে করি না। ১৯৫৩ সালে ‘একুশে সংকলন’ নামে যে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি পড়লেই বোঝা যায় সে সময়ের তরুণরা কীভাবে নিজেদের সাহিত্য ধারাকে তৈরি করার যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁদের সামনে ভাষা আন্দোলনেরন মতো বড় ঘটনা ছিল। তাঁদের লেখার পরিচর্যায় নতুন রাষ্ট্রের সাহিত্যের ভিন্ন ¯্রােত তৈরির প্রতিজ্ঞা ছিল। উর্দু-আরবি শব্দ মেশানো ভাষা ত্যাগ করে প্রমিত বাংলা তৈরির জেদ ছিল। কারো পরামর্শে একক লেখকরা পরিচালিত হননি। প্রত্যেকের বোধের ভিন্নতা প্রত্যেক আপন শক্তিতে লালন করেছেন। এটাই ছিল নবীনের যাত্রা শুরু। আমি মনে করি, প্রশিক্ষণ দিয়ে লেখক তৈরি করা যায় না। বাংলা একাডেমির ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ তার প্রমাণ। তবে প্রশিক্ষণের সময়কে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে কাজে লাগাতে পারে। সাহিত্য বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে, বইয়ের খবরের দেওয়া-নেওয়া হতে পারে, প্রত্যেকের লেখার আলোচনা হতে পারে কিংবা তাত্তি¡ক আলোচনাও বিষয় হতে পারে। গড়ে উঠতে পারে বন্ধুত্ব। এভাবে একদল তরুণ সাহিত্যের জায়গাটিকে অন্যভাবে নির্মাণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সাহিত্যের মূল ¯্রােতে সে চেষ্টা নতুনতর সংযোজন ঘটাবে।
এভাবে যে কথাগুলো বললাম আমি তার এমন কোনো সুযোগ পাইনি। আমার চিন্তা আমার নিজেকে গড়ে তুলতে হয়েছে। গণমানুষ নিয়ে বামরাজনীতির যে দর্শন এটা সবসময় আমার লেখায় থাকে। মানবিক বোধের চেতনা থেকে সরে গিয়ে আমি সাহিত্য রচনা করতে চাইনা। বামরাজনীতির দার্শনিক বোধ থেকে দূরে থাকব না। গণমানুষের চিন্তা আমার সাহিত্যে দীপ্ত থাকবে।
জীবনচর্চার নানা ভাবনা থেকে আমি লিখি। এই পরিচর্যার নানাদিক প্রসারিত করাকে আমি দায় মনে করি। এজন্য লিখে যাচ্ছি সমাজ-সত্যের মূল ধরে।
******
0 মন্তব্যসমূহ