কী লিখি কেন লিখি অমিতাভ দেব চৌধুরী

কী লিখি কেন লিখি 

অমিতাভ দেব চৌধুরী

কী লিখি কেন লিখি 
অমিতাভ দেব চৌধুরী

অনেক দিন ধরে আমি কোনও গল্প লিখতে পারছি না ।
অনেক দিন ধরে একটা গল্পই আমাকে লিখে চলেছে ‌। কিন্তু তার আগে আমার প্রথম গল্প লেখার গল্পটা বলি । আম্মি মারা যায় আমার খুব ছোট বয়সে । এর কয়েক বছর পর আব্বু আবার শাদি করেন । নতুন আম্মির জমানায় পাছে আমার অনাদর ঘটে---এই ভেবে খালাম্মা আমাকে তার কাছে নিয়ে আসেন । আল্লাহ আমাকে এতিম বানান নি । শুধু এক মায়ের কোল থেকে অন্য মায়ের কোলে এনে ঠাঁই দিয়েছিলেন । আব্বু ছিলেন গাঁয়ের মাতব্বর মানুষ । পুকুরওয়ালা, হাঁস-মুরগি-গরু-বাছুরওয়ালা বেশ দিলচোস্ত একখান আসাম টাইপ বাড়ি ছিল তার । পুরো বাড়ির মধ্যে আমার প্রিয় ছিল ওই পুকুর । পুকুর পারে বসে একা একা অনেকগুলি দুপুর কেটেছিল আমার । দূরে মিটারগেজ ট্রেনলাইন দিয়ে একটাই ট্রেন যেত। তার শব্দে পুকুরের জলে কেমন যেন কাঁপন লাগত । পেয়ারা গাছ, আমলকি গাছ থেকে টুপটাপ পাতা ঝরে পড়ত পুকুরের জলে । মাঝেমধ্যে মাছের ঘাই । ওই পুকুরের পারে বসে থাকাই আমায় নানারকম গল্প ভাবতে শিখিয়েছিল । আমি মনে মনে গল্পের কথক হয়ে উঠেছিলাম । ওদিকে আমার বিধবা ও নিঃসন্তান খালাম্মার বাড়ি এই এখানে । শহর শিলচরে । কোনও পুকুর নেই বাড়িতে ‌ । পেছনে একটা কুয়ো । আমাকে কুয়োয় পড়ার সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচাতে খালাম্মা নানান জ্বিনের গল্প বলত । 

আমি ভর্তি হয়ে গেলাম পাবলিক হাইস্কুলে । সেযুগে মুসলিম ছেলেদের মধ্যে বেশিরভাগই পড়াশোনা করতে যেত মাদ্রাসায় । বাকিরা বরাকপারের গভর্নমেন্ট স্কুলে । মুসলিম মেয়েরা পড়ত গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে । দেখুন, এভাবে কথায় কথায় মুসলিম মুসলিম বলতে আমার মোটেও ভালো লাগে না ‌ । কিন্তু কী করব ?  সবকিছুর পরও আমরা তো মুসলিমই। গভর্নমেন্ট স্কুলের পেছনে বরাকনদীর জন্য ওই স্কুলে পড়ার লোভ হত আমার । নদী তো নয়, যেন মস্ত একটা পুকুর । কিন্তু বড্ড দূরে যে ! খালাম্মাদের বাড়িটা ছিল লিঙ্ক রোড আর কাঁঠাল রোডের মাঝখানে।যেখানে   হিন্দুদের বসতি এসে মুসলিম পাড়ার সঙ্গে মিশেছে ঠিক তার মাঝখানটায় । হয়তো এই মাঝের অস্তিত্বের জন্য, আর নয়তো আমার  মরহুম খালুর সরকারি আপিসে চাকরি করার প্রভাবে ---খালাম্মা আমাকে মাদ্রাসার বদলে ইস্কুলেই ভর্তি করালো ।

লেখাপড়ায় ভালোই ছিলাম ‌। গল্পকার হিসাবে এত যে নামডাক আমার এখন তা তো ওই পড়াশোনায় ভালো হবারই জন্য । আর ওই ফেলে আসা পুকুরটার জন্য । পুকুরটা প্রায়ই আমার স্বপ্নে এসে হানা দিত । খালাম্মার কাছে পয়গম্বর ইউসুফের গল্প শুনতাম । ইউসুফ নাকি স্বপ্নের ব‍্যাখ‍্যা করতে জানতেন । তাঁকে ত়াঁর সৎমার ছেলেরা কুয়োর জলে ফেলে দিয়েছিল । 

একদিন  একটা গল্প লিখে ফেললাম । গল্পে পুকুরটা মানুষের মতো দুঃখ কষ্ট পাওয়া এক পানিহুরির মোকাম হয়ে গেল । একটা বাচ্চা ছেলে তার পার, তার রোদ, তার পাতাঝরা দুপুর ছেড়ে চলে যাওয়ার দুঃখে কাতর সেই পুকুর আস্তে আস্তে পানিহীন হয়ে গেল । শুকিয়ে গেল । লিখে, গল্পটা জমা করে দিলাম স্কুল ম‍্যাগাজিন স‍্যার শ‍্যামলবাবুর কাছে
।গল্প পড়ে স‍্যার চমকে উঠেছেন বোঝা গেল । বললেন, এ তো একেবারে পাকা হাতের লেখা । অ্যাই , বল কোথা থেকে টুকে এনেছিস ? কেঁদে ফেললাম, টুকিনি স‍্যার, এ আমার নিজের কথা । তারপর ভ‍্যালভ‍্যাল করে স‍্যারকে সব বলে ফেললাম । ব‍্যস, স‍্যারদের মহলে আমার কদর বেড়ে গেল ।

গল্পটা ছাপা হল । দেখলাম ছাত্ররা মুখ বাঁকাচ্ছে । হয়েছে হয়েছে, এ মাল ওর লেখা নয় । আরে, মুসলমানরা বাংলা লিখতে পারে নাকি ? ওরা তো জানে শুধু দেশ ভাঙতে আর গলা কাটতে ‌ । দেখলাম, একটা গল্প আমাকে লিখে চলেছে । কিংবা অনেকদিন ধরেই লিখছিল । আমিই শুধু টেরটি পাই নি ।দেখলাম , এ গল্প যেমনটি চাইছে তেমনটা না হতে পারলে আমাকে নিয়ে গল্পটা গোলমালে পড়ে যাচ্ছে । একদিন শুনলাম আমি নাকি এতিমেরও এতিম । মা-বাপের কোনও ঠিক নেই । যাকে আমি বড়মাসি বলি , তিনি নাকি আসলে আমার মালকিন । আমাকে বাংলাদেশ থেকে কুড়িয়ে এনেছেন । কামকাজের জন্য । শুনে আর মাথার ঠিক থাকল না । দিলাম ধুমধাম ঘুষি । একটার চোয়াল ভাঙল, আরেকটার দাঁত । আমাকেও স্কুল ছাড়তে হল । স‍্যাররা চাননি, কিন্তু গার্জেনদের গর্জন থামানোর সাধ‍্য ছিল কি তাঁদের ?

এবারের গল্পে একটা স্কুল গভীর রাতে ডাক পাঠালো তার এক পরাজিত ছাত্রর রুহে । ছেলেটি ঘুমের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে আসে । স্কুলের দরজা জানলা খুলে যায় । নির্জন স্কুলঘরে ক্লাস ক্লাস খেলা জমে ওঠে ছেলেটির, স্কুলের সঙ্গে ।

কলেজে গেলাম । গিয়েই , মাধুরীকে পেয়ে গেলাম । আশিক হয়ে উঠলাম তার প্রেমে । শেষে তাকে নিয়ে ভেগে গেলাম । আবার গল্পটা লিখতে লাগল আমাকে ।  যে যার মনের মতো বানাতে লাগল আমার কাহিনি । এ যুগ হলে ভেগে পার পেতাম না, কিন্তু তখনও স্বাধীন বাংলাদেশের রোমাঞ্চ ও পুলক ছেড়ে যায় নি বরাকভ‍্যালির মানুষের মন । আমার যেমন মা ছিলেন না, মাধুরীরও তেমনি ছিলেন না বাবা । মামার বাড়িতে মানুষ । মামা দুঃখ পেলেও মেনে নিলেন । মামি অবশ্য এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব কিছু ঠিক করে দেবার অছিলায় আমার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা  হাতিয়ে নিলেন । এ কথা আর কেউ জানল না ।

আমাকে নিয়ে এবারের গল্পটা লিখতে শুরু করলেন দু-তিনজন মোল্লা আর মৌলবী । আমি প্রেমবশত মাধুরীকে তার ধর্মচ‍্যুত করিনি । খবরটা ঘর পেরোল, বাইরে এল, গোল পাকালো । এ গোলমালেরও পরিসমাপ্তি আমার কিসমতকে বাঁচিয়েই ঘটল । তবে ভারত মুসলিম কান্ট্রি হলে অন্যরকম ঘটত । 

সে যাক । খেয়াল করে দেখলাম আমাকে নিয়ে লেখা গল্পগুলো খুব চৌকো, এলেবেলে, সূক্ষ্মতাহীন । অথচ আমার লেখা গল্পগুলো  যেন কল্পনার আলপনা । আমি কি তাহলে বাস্তব থেকে পালানোর জন্য গল্প লিখি ? তা এত এত গল্প লিখেও বুঝে উঠতে পারলাম না । কিন্তু পাঁচ বছরের দাম্পত্য শেষে মাধুরী একদিন পালাল । লিখে রেখে গেল, মুসলমানের সঙ্গে ঘর করলেও নাকি মুসলমানের বাচ্চার মা হওয়া যায় না । বুঝলাম গল্পটা আবার আমাকে লিখে চলছে । আমাকেও তার একটা জবাব দিতে হবে । এবারের গল্পে একটা ফেলে-রেখে-যাওয়া রুমাল জেগে উঠল মাঝরাতে । একজন স্বপ্ন-দেখতে-থাকা বিরহীর অশ্রু মুছিয়ে দিতে । ব‍্যস । ওই আমার শেষ গল্প । তারপর এত বছর আর কোনও গল্প লিখিনি ।

অথচ গল্পটা কিন্তু আমাকে এখনও লিখে চলেছে । খালাম্মা মারা যাবার আগে তার সবকিছু আমার নামে লেখাপড়া করে আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন । এখন কোথা থেকে এক প্রমোটার এসে জুটেছে । জানে আমার তিনকুলে কেউ নেই । আর এখানে হিন্দু মুসলমান মিলে একই ফ্ল্যাটে থাকার আদব তো এখনও গড়ে ওঠে নি ! আমি সুতরাং জমির বিনিময়ে ফ্ল্যাট পাব না । লোকটা আমার কাছ থেকে অল্প দামে মাটি কিনে নিতে চাইছে ।কারণ, আমি তো বাংলাদেশের মাল । আমার আবার এত গুমোর কিসের ? প্রমাণ করতে পারব যে আমি বাংলাদেশী নই ?

আবার একটা চৌকো গল্প লিখতে চলেছে আমাকে । কিন্তু এ গল্পের শেষটা যদি ছোরা চাকু দিয়ে লেখা হয় ? নাকি এবার আমাকে লিখতে হবে নিজের দেশ ছেড়ে-চলে-যাওয়া এক মানুষের জন্য তার আপন দেশের চোখের গোপন অশ্রুর কাহিনি ?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ