কী লিখি কেন লিখি
অপাংশু দেবনাথ
কী লিখি কেন লিখি
অপাংশু দেবনাথ
বেশ কিছুদিন হল কিছুই লিখছি না। কেন লিখছি না জানিনা। লিখতে পারছি না এমন নয়। আবার হয়তোবা পারছিও না। কেন পারছি না তাও জানিনা। অথবা ঘরে বসেই থাকছি।স্বজনদের মৃত্যু খবর শুনছি। যাচ্ছিনা তাকে দেখতে।কেমন স্বার্থপরের মতো হয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। ভুলে যাচ্ছি ক্রমশ সব ব্যথা। সব কিছু ভুলতে ভুলতে নিজেকেই যেন যাচ্ছি ভুলে। এতসব ভ্রম বুকে নিয়েও উঠে দাঁড়াচ্ছি। বাজার করছি সাধ্যমত। সময় মতো খাচ্ছি। ঘুমোচ্ছি। কোনো বই পড়ছি না তাও নয়। পড়ছি। কিন্তু মন বসছে না। কবিতার খণ্ড ক্ষুদ্র শব্দগুলো সকল সময়ই মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কিছুই লিখতে পারছি না। এই না পারাটা অক্ষমতা বলা যেতেই পারে। মন চাইলেই একটু আধটু লিখি কিন্তু একটা বিষয় হল এই যে কদিন ধরে কিছু লিখছি না তাতে কি সুস্থ আছি? অসুস্থ মন থেকে প্রকৃত সত্য কখনোই শিল্প রূপ পেতে পারে বলে মনে হয় না। হা দেখলে হয়তো সকলেই বলবেন বেশ সুস্থ স্বাভাবিক। সব ঠিকঠাক আছে। ঘুম থেকে শুরু করে বাকি সব কাজকর্ম ঠিকই আছে, শুধু লেখালেখির কাজটাই প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। কবিতা কিংবা সাহিত্যচর্চা একটি মানুষকে জীবনে তেমন কিছুই দেয়নি।দিতে পারেনি। দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে একটা মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। সুখ ও অন্ধকারের মধ্য দিয়ে চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। আমাদের চারিদিক ভালো নয়। মানুষ অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কর্মহীন মানুষেরা তাদের প্রাপ্তির জন্য মানবিক আবেদন করছেন রাষ্ট্র শক্তির কাছে। খেটে খাওয়া মানুষ কাজ পাচ্ছেন না। মানুষের সাথে মানুষের সামগ্রিক যোগাযোগ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে। কেমন এক দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা! ক্রমাগত স্বজনদের হারিয়ে কেমন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। দুঃখ জানাবার ভাষা ভুলে যাচ্ছি। এই যে ভুলে যাচ্ছি ক্রমাগত অনেক কিছুই তাতে কারো কিছু যাচ্ছে আসছে না। কেমন একটা অসহায়ত্ব প্রতিদিন জড়িয়ে ধরে আছে, আর আমরা তার নাগপাশ থেকে মুক্তি চাইতে চাইতে এগিয়ে যাচ্ছি অনাকাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের দিকে। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কিছু লেখা সম্ভব হচ্ছে না। কবিতার পঙক্তিগুলো, গল্পের বাক্যগুলো মাথার ভেতর এসে শুধু ঘুরপাক খায় প্রকৃত অবয়বে প্রকাশ করতে অপারগ হচ্ছি। ভেতরে ভেতরে এক চরম অসুখ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। হয়তো এই ভাবনাকে হতাশা বলা যেতে পারে। ব্যর্থতাও বলা যেতে পারে। যাই বলা হোক না কেন এতদূর এতদিন পর স্পষ্ট অনুভূত হল কোনো সৃষ্টিশীল মানুষ, মানুষের অসহায়ত্ব দেখে, দুঃখ-যন্ত্রণার কথা ভেবে কখনোই সুস্থ থাকতে পারেন না।সেই অর্থে অসুস্থ আমিও। সেই অর্থে আমি অপারগ কিছু লিখতে। যদিও কেউ বাধ্য করেনি লিখতেই হবে। এই যে না লিখতে পারা, এই যে অসহায়ত্ব তাই তো অসুখ। পৃথিবীর অসংখ্য এমন অসুস্থ মানুষের প্রতিনিধি আমিই।
0 মন্তব্যসমূহ