কী লিখি কেন লিখি
অনু ইসলাম
কী লিখি কেন লিখি
অনু ইসলাম
কবি-সম্পাদক
ছেলেবেলায় দেখেছি, বাড়িতে আব্বার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি এবং মেজু ভাই সুমন ইসলামের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিলো৷ আব্বার এবং মেজু ভাইয়ের লাইব্রেরিতে ছিলো অসংখ্য বই। আব্বার লাইব্রেরিতে দেখতাম বিভিন্ন ধরনের বই৷ তারমধ্যে পাঠ্যশ্রেণির বিভিন্ন ক্লাসের বাংলা ও ইংরেজির বিভিন্ন গ্রামার বই, বিভিন্ন সাবজেক্টের নোটবুক এবং গল্প, উপন্যাসের বেশ কিছু বই ছিল দেখেছি৷ গল্প, উপন্যাসের বাইরে যেসব বইগুলি ছিলো সেসব বই মূলত আমাদের পড়াশোনার জন্য তিনি সংগ্রহ করতেন৷ পড়াশোনার হাতেখড়ি আব্বার কাছ থেকেই পেয়েছি আমরা ছয় ভাইবোন৷ শৈশব থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া আব্বার কাছেই করেছি৷ আব্বা ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী৷ বিদ্যুৎ বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে শেষ সময়ে অবসরে গিয়েছিলেন৷ পেশাগতভাবে আব্বা ছিলেন সৎ এবং আন্তরিকভাবে সহজাত মানুষ৷ এই নিয়ে তার সুনামও রয়েছে৷ আব্বা অফ ডে গুলোতে সকাল হলে গান শুনতেন রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, জগজিৎ সিং, কিশোর কুমার ও লতা মঙ্গেশকারসহ জনপ্রিয় শিল্পীদের৷ মাঝে মধ্যে আব্বা সিনেমা দেখতেন বাড়ি থাকলে৷ আমরাও আব্বার সাথে বসে সিনেমা দেখতাম৷ নায়ক উত্তম কুমার এবং নায়িকা সুচিত্রা সেন ছিল আব্বার প্রিয় চলচ্চিত্র জুটি৷ এছাড়া আব্বা পুরনো দিনের সিনেমা দেখতে ভালোবাসতেন৷ এভাবে প্রচুর সিনেমা আব্বার সাথে বসে দেখেছি৷ অন্যদিকে মেজু ভাইয়ের লাইব্রেরিতে ছিলো অসংখ্য কবিতার বই, গল্প ও উপন্যাসের বই৷ এতসব সংগৃহীত বই এবং এরূপ আবহাওয়া নিজেদের বাড়ির মধ্যে থাকা একটা শৈশশ-কৈশোর সময়কালকে নাড়া দিয়ে উঠবে যেকোনো মানুষকে এমনটি হয়তো বাস্তবিক৷ আমার লেখালেখির ক্ষেত্রটি এরূপ আবহাওয়ার মধ্য দিয়েই অবচেতনে শুরু হয়ে গিয়েছিলো৷ আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠি৷ তখন মেজু ভাই সুমন ইসলামের প্রথম কবিতাগ্রন্থ 'সুমিত্রা' প্রকাশ পেয়েছিলো৷ সুমন ভাই তখন বেশ পরিচিত হয়ে উঠছিলেন লেখালেখির জগতে৷ আমার দেখা প্রথম কবি আমার ভাই সুমন ইসলাম৷ সুমন ভাই কবিতাচর্চার পাশাপাশি গনমাধ্যমেও কাজ করছেন তখন থেকেই৷ বেশ কয়েকবছর পরে তার প্রথম উপন্যাস 'অপচ্ছায়া' প্রকাশিত হয়৷ 'আঙ্গিনা' নামে তিনি একটি ছোটকাগজও সম্পাদনা করতেন৷ আমি তখন সবেমাত্র ডায়েরির পাতায় কবিতা লেখা শুরু করি৷ পাঠ্যবইয়ের কবিতার পাশাপাশি সুমন ভাইয়ের লাইব্রেরিতে সংগৃহীত থাকা কবিতার বই বের করে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম৷ কখনো তার টেবিলে রাখা কবিতার বই নিয়ে কবিতাপাঠে মগ্ন হতাম৷ নতুন কোনো কবিতা লিখলে বন্ধুদের পরে শোনাতাম৷ তখন থেকেই রাত জেগে কবিতা লেখার অভ্যাসে পেয়ে বসেছিলো৷ এভাবেই কবিতার প্রতি অদৃশ্য এক টান তৈরি হয়ে ওঠে। কিন্তু বাধা হলো মেট্টিক পরীক্ষা৷ পরীক্ষার জন্য কবিতালেখা বন্ধ রাখতে হলো৷ পরীক্ষা শেষে অবসর সময়৷ শুরু হলো আবার নতুন করে কবিতা পড়া, কবিতা লেখা৷ কলেজে ভর্তি হলাম৷ মাঝে-মধ্যে কবিতা লিখতাম৷ কোনো একদিন দুপুরে সুমন ভাই আমার পড়ার টেবিলে গেলে সেখানে খাতায় একটি কবিতা দেখতে পান আমার৷ কবিতাটি তিনি পড়ে কিছু কিছু জায়গায় সংশোধন করে রাখেন৷ পরে আমাকে ডেকে বলেন এই লেখাটা ঠিক করে দিয়েছি তুই আবার ফ্রেস করে লিখে রাখিস৷ তখন একধরনের ভালোলাগা অনুভব হলো নিজের ভেতর৷ ২০০১ সনের মার্চ মাসের সময়ে সম্ভবত আমার এক স্কুল ও কলেজ জীবনের বন্ধু ডালিম রহমান কলেজ থেকে নিজেই সে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করবে বলে লেখা আহবান করলো৷ আমার কাছেও লেখা চাইলো৷ আমি তখন ডালিমকে একটি কবিতা দিয়েছিলাম৷ ডালিম সেই কবিতাটি প্রকাশ করেছিলো৷ যতদূর মনে পড়ে, কবিতাটি স্বাধীনতা বিষয়ক একটি কবিতা ছিলো৷ সেই কবিতা বা সাহিত্য পত্রিকাটি আমার কাছে সংগ্রহে নেই৷ ওই কবিতাটি আমার প্রথম প্রকাশিত কবিতা ছিলো৷ ডালিমকে একবার বলে ছিলাম৷ সেও আমাকে কখনো পত্রিকাটি দিতে পারেনি৷ ২০০৭ সনের দিকে সেসময়ে এলাকায় সুমন ভাইয়ের উদ্যোগে দেয়ালিকা করা হতো সেখানে অনেকের সাথে আমারও কবিতা ছাপানো হতো৷ সুমন ভাই তার আঙ্গিনায় আমার কবিতা ছাপালেন৷ শহর থেকে দুই একটি ভাজপত্র প্রকাশিত হতো সেখানেও আমার কবিতা দিতেন সুমন ভাই৷ দৈনিক একটি পত্রিকার সাংগঠনিক বিভাগে তখন কবিতা পাঠাতাম সেখানে আমার সাতটি কবিতা প্রকাশিত হয়৷ এভাবে প্রকাশিত হতে থাকে আমার বেশকিছু কবিতা৷ তখন ২০০৮ সনের আগস্ট মাসের দিকে হবে। একদিন আমার বাল্যবন্ধু আওলাদ হোসেন ৷ আওলাদ এখন একজন নজরুল সংগীত শিল্পী৷ আওলাদ আমাকে সাহস জোগালো যে বড় বড় পত্রিকায় লেখা পাঠাও৷ বন্ধু আওলাদের উৎসাহে একদিন কবিতা পাঠালাম কুরিয়ার সার্ভিস করে দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমার 'অভিনব কিছু সংবাদ' শিরোনামের কবিতাটি প্রকাশিত হয়৷ কবিতা প্রকাশিত হয়েছে তা আমি সারাদিনেও জানি না৷ পত্রিকা দেখা হয়নি বলে৷ সুমন ভাই ,বিকেলবেলা বাড়িতে এলে তিনি আমাকে বলেন লেখা পাঠিয়েছিলি কোনো পত্রিকায়? বললাম, হ্যাঁ পাঠিয়েছিলাম৷ আমার হাতে পত্রিকা দিয়ে বললেন, কবিতা তো ভালোই হয়েছে৷ সাহিত্য সম্পাদকের সেল নাম্বার দিলো ৷ বললো সাহিত্য সম্পাদকের নাম চন্দন চৌধুরী ( বর্তামনে বেহুলাবাংলা প্রকাশনীর মালিক) ফোন দিয়ে পরিচয় দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাও৷ চন্দন চৌধুরীর নামের সাথে পরিচিত এবং তার কবিতার সাথেও পরিচিত ছিলাম বিভিন্ন সাময়িকীতে এবং ছোটকাগজেও তার কবিতা পড়েছি৷ তিনিই যে সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন সেটা জানা ছিলো না৷ সুমন ভাইয়ের দেয়া সেই নাম্বারটিতে ফোন দিলাম৷ অপর প্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ হলো৷ আমি পরিচয় দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানালাম৷ তিনি আমাকে কবিতা পাঠাবেন বললেন৷ জ্বি পাঠাবো৷ ভালো থাকবেন বলে কথা শেষ করে দিয়েছিলাম৷ আমার কবিতা প্রকাশের কথা কবি বন্ধু মো. জুনায়েদ আর নাজমুল আরেফীন সজীবকে জানালাম৷ আমরা তখন একসাথে কবিতার আড্ডা দিই৷ সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি নিজেদের মতো করে৷ কখনো সিনিয়রদের সাথে আড্ডায় মিলিত হই৷ তবে সিনিয়রদের আড্ডায় সাহিত্য আড্ডার চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের সমালোচনা হতো তুলনামূলক বেশি৷ এরূপ বিষয়গুলোতে আমার তেমন আগ্রহ নেই ৷ কিন্তু সাহিত্যের কথা হলে মনযোগ দিতাম ষোলআনা৷ আমার প্রকাশিত কবিতা দেখে একজন সিনিয়র (নাম ভবিষতের জন্য লিপিকৃত থাকলো) সেই পত্রিকাটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো এসব ছোটখাট পত্রিকায় কবিতা লেখো কেন!? সজীব তখন পত্রিকাটি হাতে নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলো৷ মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে উঠলো৷ সজীবের প্রতিবাদে নিজেকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়ে সবাই কথা বলে চলে আসলাম৷ বাইরে এসে সজীব, জুনায়েদ, আতাউর রানা আমাকে সাত্বনা দিলো৷ স্থানীয় আরেক কবির ( নাম ভবিষতের জন্য লিপিকৃত থাকলো) কবিতাও সেদিন একই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো৷ সন্ধ্যায় তাকেও ফোন করে বলেছি৷ কিন্তু তিনি আমার কবিতা দেখেছেন কিনা সেটা আর বলেননি আমাকে৷ আমি অবশ্য তারপরে এসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাই নি৷ কয়েকদিন পর যিনি আমার কবিতা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তিনিও সেই একই পত্রিকায় বিদেশী সাহিত্যের কোন এক লেখককের লেখা নিয়ে আলোচনা লিখেছেন! যাদের সাথে চলাচল তাদের এরূপ আচরণে মর্মাহত হতে থাকলাম কিছুটা৷ তাদের দ্বিমুখী নীতি সম্মুখে এলো৷ অর্নাস তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন হঠাৎ করেই বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে উঠি৷ এজন্য লেখক বন্ধুরা এবং সিনিয়র কেউ কেউ বলেছে অনুর লেখালেখি শেষ৷ কিছু আর হবে না৷ এসব কথা যখন জুনায়েদের মুখে শুনেছি তখনও মর্মাহত হতে হয়েছে৷ অথচ তখনও আমি নিয়মিত পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছি৷ এসব কথা যখন গুঞ্জন ছড়াচ্ছে কিছুদিন পরে একই পত্রিকায় আমার লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হলো৷ এরপর একে একে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী এবং বিভিন্ন ছোটকাগজ, বাংলা একাডেমির মাসিক পত্রিকা উত্তরাধিকার, নতুনধারায় এবং পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য দৈনিকেও আমার কবিতা আর প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে৷ তবে দৈনিক সংবাদ এবং দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় নিয়মিত আমার প্রবন্ধ আর কবিতা প্রকাশের ফলশ্রুশ্রতিতে পাঠকসমাজেও পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে থাকে৷ কবি ওবায়েদ আকাশ এবং কবি ও কথাশিল্পী সালাম সালেহ উদ্দিন এই দুজনের কাছে আমি ঋণী ৷ মূলত নিজেকে সবসময় চেষ্টা করেছি লেখালেখির মধ্যে নিয়োজিত রাখতে৷ কিন্তু তাদেরকে কখনো সম্মান দেয়া ছাড়া অসম্মান করিনি৷ হয়তো একসাথে হাঁটতে বা আড্ডা দিতে গিয়ে তাদের কাছে কোনোভাবে ঋণী হয়ে আছি! অসম্মান করে তো আর ঋণ পরিশোধ করা যায় না৷ বরং ভালোবাসাই দিতে চেয়েছি কিংবা দিতে চাই৷ এভাবেই চলমান হতে থাকে আমার সাহিত্যচর্চার যাত্রা৷ দুইবার কবিতার পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে ছিলাম৷ কিন্তু যখনই ফাইনাল করতে চেয়েছি তখনই মন সায় দেয়নি বই প্রকাশের৷ তুচ্ছ মনে হয়েছে সেসব কবিতা৷ তিনবারের সময়ে যখন ফাইনাল পাণ্ডুলিপি তৈরি করি তখন সুমন ভাইকে দেখালাম এবং ইতিহাস গবেষক ও কবি গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল তাকেও দেখালাম৷ আমি কয়েকটি নাম বাছাই করলাম৷ শহরের কাচারীঘাট হাজীর মিষ্টির দোকানে বসে উজ্জ্বল মামা আর আমি প্রথম কবিতা বইয়ের নাম 'জল কেটে যায় হাত স্পর্শে' ফাইনাল করে সুমন ভাইকে জানালাম৷ সুমন ভাইও সম্মতি দিলেন৷ এবার বই প্রকাশের পালা৷ তরুণদের বই প্রকাশ করে এমন একটি খোঁজ নিয়ে গেলাম ঢাকাতে সেই প্রকাশনীর কাছে৷ প্রকাশকের কথা শুনে আমার ভালো লাগে নি৷ চলে এলাম৷ চলে আসার প্রসঙ্গে নানান কথা আছে আপাতত তোলা থাকলো৷ একদিন কবি মাসুদ অর্ণব ভাইয়ের সাথে আলোচনা করলাম৷ তিনি কবি প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করে দেখতে বললেন৷ কোনো এক বিকেলবেলা হাজির হলাম পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাটাবন কবি প্রকাশনীর দোকানে৷ প্রকাশক কবি সজল আহমেদ৷ কথা বলে পাণ্ডুলিপি দিয়ে এলাম৷ কাজ চলতে থাকলো... ২০১৫ সনে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হলো আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থ 'জল কেটে যায় হাত স্পর্শে৷' আমার প্রথমবই আব্বা দেখে যেতে পারেন নি৷ ২০১২ সনের ২১ এপ্রিল আব্বার মৃত্যু হয়৷ বেদনাবোধ আছে আব্বার এমন হঠাৎ চলে যাওয়ায়৷ আমার বইয়ের ব্ল্যাব লিখেছিলেন নব্বই দশক সময়পর্বের অন্যতম কবি ও প্রাবন্ধিক বীরেন মুখার্জী৷ আমার প্রথম বইয়ের সূত্র ধরেই কবি বীরেন মুখার্জীর সাথে সরাসরি পরিচয়, ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা এবং শ্রদ্ধাভাজন হয়ে উঠেন তিনি আমার৷ বীরেন দার সাথে সম্পর্কের জায়গাটি এমন সাহিত্যের আলোচনা ছাড়াও ব্যক্তিগত আলোচনা এবং সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় যেকোনো বিষয় পর্যালোচনামূলক আলোচনা ও মত বিনিময় করতে পারি নির্দিদ্বায়৷ বীরেন মুখার্জী দাদার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছেও আমি ঋণী৷ আমার পরবর্তী বই প্রকাশিত হয় প্রবন্ধের৷ প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ 'কবিতায় রাষ্ট্রীয় চিন্তা ও অন্যান্য প্রবন্ধ' (২০১৬) সেটি প্রকাশিত হয় বীরেন দার সম্পাদিত ছোটকাগজ দৃষ্টি থেকে৷ দৃষ্টি কে তিনি প্রকাশনা শিল্পেও রূপ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেন তরুণ কবিদের প্রকাশনা এবং মানসম্মত বই প্রকাশের জন্য৷ কবি প্রকাশনীর বই বাদে এযাবৎ আমার প্রকাশিত অন্যান্য বইসমূহ দৃষ্টি প্রকাশনী থেকেই প্রকাশিত হয়েছে৷ প্রকাশিত অন্যান্য কবিতাগ্রন্থগুলো হলো রজতমুদ্রা(২০১৭) ধানরঙের ঘ্রাণ (২০১৯) বিকল্প শয্যায় ফুটে আছি (২০২০) সম্পাদনাগ্রন্থ সম্মিলন (২০১৭)৷ সাহিত্যের জন্য কবিতার জন্য সাংগঠনিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷ কবি পরিষদ মুন্সীগঞ্জ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে কাজ করছি এবং সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা পটভূমির সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও সম্পাদনার কাজ করে যাচ্ছি৷ পটভূমির প্রকাশক ও সম্পাদক সুমন ইসলাম৷ লেখালেখির শুরুটা কবিতা দিয়ে হলেও সাহিত্যের মূলস্রোতে কবিতা-প্রবন্ধ নিয়ে যুগলভাবেই হেঁটে চলেছি৷ মাঝে-মধ্যে ছোটগল্প লেখার চেষ্টা করেছি কিন্তু সেভাবে অগ্রসর হতে পারি নি৷ কবিতাকেই ধ্যান-জ্ঞান করেছি৷ জীবন অভিজ্ঞতা এবং কবিতার ধারাবাহিক পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে আহরিত যে বোধ নিজের মধ্যে নির্মিত হয়েছে তার বাইরে গিয়ে কখনো কিছু লিখিনি৷ কেননা কবিতার মধ্য দিয়ে আমি আমার সময়কাল এবং জীবনবোধ উন্মোচিত করাকে প্রয়াস খুঁজেছি সবসময়৷ কবিতাকে আমি যেভাবে বিবেচনা করি সেভাবে বলতে গেলে কবিতা ঐতিহ্যগত-ভাবে আমার কাছে ব্যক্তি অনুভবরে নিজস্ব প্রজ্জ্বলন। ব্যক্তির সৃজনী অনুভব ঠুনকো নয়, গভীর আত্ম-উপলব্দির নির্ণায়ক।আত্ম-উপলব্দি সৃজনশীল ব্যক্তির মনন এবং তার সমগ্র চিন্তাজুড়ে অদৃশ্য এক পৃথিবী নির্মাণ করে। সেই পৃথিবী, কবিতাপৃথিবী। কবিতাপৃথিবী নির্মাণের জন্য দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্প, প্রতীক, উমপা কিংবা উপ্রেক্ষা সর্বপোরি জীবনবোধ ও ভালোবাসার কাছে ছুটে গিয়েছি। এভাবেই কবিতাপৃথিবী নির্মাণ করতে চেয়েছি। অন্যভাবে, কবিতাকে মনে হয় সেতো জীবনের এক একটি রহস্যের ধারণকৃত প্রতিচ্ছবি। যা পারিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্র, বহিঃবিশ্ব, প্রেম, প্রকৃতি এবং সমকালীন ভাবনা ও ব্যক্তিগত নৈঃশব্দ্য প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে কবিতাপৃথিবীর ক্যানভাসে দৃশ্যমান করতে চেযেছি। জীবন অভিজ্ঞতার ওপর যে দায়; মূলত সে দায়মুক্তির সংলাপই হচ্ছে কবিতা যাকে যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রতিচ্ছবি রূপে আখ্যায়িত করা যায়। যেখানে একটা সুন্দর স্বচ্ছ আয়না থাকে, সেই আয়নায় ক্ষণে ক্ষণেই যাপিত জীবন এসে ধরা দেয়। কবিতা এমনই এক দর্পন বিশেষ। ভাবতে ভালো লাগে যে, একসময় যারা আমার কবিতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো বা গ্রহণ করতে পারেনি তারাই পরবর্তী সময়ে আমাকে কবি বলে সম্মোধন করা শুরু করেছিলো৷ যদিও ভালোবেসে এরূপ অন্যেরাও কবি বলে ডাকে৷ কবিতা লিখতে এসে মানুষের স্নেহ, মমতা কিংবা যতটুকু সম্মান অর্জিত হয়েছে অতটুকুই লেখক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ৷ কবি সানাউল হক খান, মুনীর সিরাজ, আলমগীর রেজা চৌধুরী, দুখু বাঙাল এবং কবি ও গবেষক তপন বাগচী এদের সান্নিধ্য ও ভালোবাসার কাছে আবদ্ধ হয়ে আছি৷ বাহ্যিকভাবে পদক-পুরস্কারও পেয়েছি কবিতার জন্য তারও গভীর মূল্য রয়েছে জানি৷ অনুপ্রাণিত বোধ করি মানুষের দেয়া এরূপ সম্মানকে৷ কিন্তু কবিতা তো অস্তিত্বে মিশে রয়েছে৷ কবিতা ছাড়া জীবনে তেমন কিছুকেই অপরিহার্য বিবেচনাবোধ করিনি৷ উপলব্ধি করি কবিতার জন্যই হয়তো চাকুরি নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে পারি নি কিংবা সেই পথে হাঁটি নি৷ তবুও সংসার যাপনের জন্য পেশার প্রয়োজনীয়তা আছে৷ ততটুকু করে যাচ্ছি দিনযাপনের প্রয়োজনীয়তায়৷ প্রতিদিন নিয়ম করে অল্প সময় হলেও কবিতার মধ্যে ডুবে থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি৷ কবিতা তো অক্সিজেন আমার কাছে৷ সারাদিন কর্মব্যস্ততা শেষে অক্সিজেন নিই৷ কবিতা লিখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের কাব্যবোধ ও ভাষাকে ভেঙে ভেঙে নতুনভাবে বিনির্মাণ করার চেষ্টা করেছি নিজেকে, এখনো করছি৷ ভবিষতেও করতে চাই৷ পরিশেষে, আমৃত্যু যেন কবিতাচর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারি এতটুকু চাওয়া৷ কবিতার প্রতি একটা অদৃশ্য অনুভব, অদৃশ্য পৃথিবী অবলোকন করার প্রত্যয় নিয়ে জেগে থাকি এখনো। যদিও সব সময় কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না৷ কবিতা লিখতে এখন কেনো যেন একধরনের সংকোচ হয়৷ আদৌ কি কবিতা লিখতে পেরেছি কোনো! কবিতা তো অধরা কোনোকিছু তাকে কি ধরতে পারবো? এই অতৃপ্তি নিয়েই কবিতার সাথে সংগোপনে নিজেকে রেখে যেতে চাই৷ ছুটে যেতে চাই কবিতার কাছে বারবার জীবন অনুসন্ধানে। ধন্যবাদ৷
১১-৬-২০২১ খ্রি.৷
0 মন্তব্যসমূহ