কী লিখি কেন লিখি
ইউসুফ রেজা
কী লিখি কেন লিখি
ইউসুফ রেজা
ছড়াকার। সদস্য, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, ঢাকা
বিদ্যালয়ের নিচের ক্লাশে থাকতেই আমার কবিতা লেখার শুরু। বালক বয়সে কোনো এক দুপুরে শুয়ে ছিলাম। বাসায় মধ্যান্হের পর ঘুমানোর নিয়ম ছিল। একদিন আমাকে জাগিয়ে রাখলো কবিতার দেবী। ঘুম না এসে চলে এলো সেই কবিতা। যা আমাকে আজীবন তার দাস বানিয়ে ছাড়লো। এরকমই একটা লেখা মাসিক শিশু পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ডাকযোগে পাঠিয়ে দিলাম। পরের মাসেই লেখাটি মুদ্রিত আকারে ছাপা হওয়ায় আজন্ম কলমের ক্রীতদাস থাকা আরও পোক্ত হয়ে গেল। আব্বা চাটগাঁ থেকে মাদারিপুর এলে সংসারের অন্য পাঁচটা দ্রব্যের সাথে শিশু,নবারুন এসব ছোটদের কাগজও নিয়ে আসতেন। শহরের পাবলিক লাইব্রেরির বই থেকেও আমার বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে।
ক্লাশ ফোর ফাইভে থাকতেই পাঠাগারের দায়িত্বে ছিলেন আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলতাফ স্যার। কলেজ জীবনের আগ পর্যন্ত নানা রকম শৃঙ্খলার মধ্যে বাধা থাকতে হয়। এজন্য আমার অনেক লেখা বাঁধাই করা খাতার পাতাতেই আটকে থাকলো। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাহিত্য সাময়িকীতে লিখে ও সম্পাদনা করে তা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। এ সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়েছি। দৈনিক আজাদীর সাহিত্য সম্পাদকের বাসায় হাতে হাতে একদিন একটা কবিতা দিয়ে এলাম। পরের সপ্তাহেই ছেপে দিলো সাহিত্য পাতায়। এরপর যে লেখাই দিই তিনি আদর করে ছেপে দেন। তার আগে অচীরা পাঠচক্রে গিয়ে নিজের কবিতা পাঠ করে ও অন্যের লেখা শুনে লেখার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। শিশুসহিত্যিক রহীম শাহ'র সঙ্গে এখানেই পরিচয় হয়। এ সময় থেকে দৈনিক পূর্বকোণেও লিখতে থাকি। এরপর ছোট কাগজ বহ্নির সাথে যুক্ত হলাম। নিজেরা বোসব্রাদার্সের আড্ডা নামে একটা সাহিত্যের আড্ডাও শুরু করলাম। কবি হোসাইন কবির ও কবি জিললুর রহমান কে পাই এ সমস্ত আড্ডায়।
১৯৮৮ সালে আমার প্রথম ছড়ার বই ‘দাহন বেলার ছড়া’ বেরিয়ে গেল। বহ্নি সম্পাদক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী এই চক্রান্তের মূল হোতা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়ে কবি হওয়ার স্বপ্ন আরও উসকে দিলো লেখালেখির ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেনের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যেসব মেয়েদের ভালো লাগতো তাদের কাছেও আমার ঋণ। তাদের নাম উল্লেখ করে এখন আর বিব্রত করার মানে হয় না। কিন্তু প্রেমিকা তো আর আমাকে লিখতে বলে না। আমি লিখি কারণ এর মাধ্যমে আমি নিজেকে প্রকাশ করি। আমার বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি আমি কবিতার মাধ্যমে লিখে রাখি। কবিতা লিখতে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসার আনন্দ আছে। বেদনাও আছে।
আমার প্রেমিকাদের চেয়ে বেশি কষ্ট দেয় আমার লেখা। লেখার অনুষঙ্গ ও চরিত্রগুলি ইতালিয় উপন্যাসিক ইমবার্তো ইকো যাকে বলেছেন শয়তান। যারা আমার চারপাশে ছোট ছোট শয়তানি শুরু করে। কেউ কান টানে । কেউ নাক মোচড়ায়। যতক্ষণ পর্যন্ত না ওদের লিখে ফেলি। ১৯৯০ সালে ঢাকা থেকে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বের হয়। বইয়ের নাম হাসপাতালে হরতাল। ছড়া ও কবিতা লিখতেই আমি সাচ্ছন্দ বঝধ করি। আদিকবির জিজ্ঞাসা ছিল কি লিখবো। কিভাবে লিখবো। নারদ বিশ্বের প্রথম কবি বাল্মীকিকে বলেছিলেন তুমি যা লিখবে সেটাই সত্য। সেটাই ইতিহাস। উল্টো করে বলি আমি যা সত্য সেটাই যদি লিখতে চাই।
সত্য বলার বিপদ আছে। বিশেষ করে প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যে। অকপটে সত্য জানালে লেখক হুমায়ুন আজাদের ভাগ্যই অধিকাংশ সমাজে অবধারিত। এমনকি তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলাও হতে পারে। ছড়া ও কবিতা লেখা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু কোন কিছুই লেখা হবে না যদি তার মধ্যে নান্দনিক প্রেরণা না থাকে।
বৃটিশ শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল বলতেন সব লেখকের ই নিজের পছন্দের শব্দ থাকে। থাকে পছন্দের বাক্যগঠন ছাপার ধরন। এমনকি মার্জিনের পুরুত্বের দিকেও খেয়াল রাখতে হয়। শুধু পাঠকের কথা বা নগদ মূল্যের কথা বিবেচনায় রেখে লেখা সম্ভব নয়। লিখতে গিয়ে লেখকরা খুব কমই অর্থের কথা ভেবে থাকেন। ঢাকা চট্রগ্রামের অধিকাংশ জাতীয় পত্রিকাতেই আমি লিখেছি। বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও টরৈন্টোর বাংলা পত্রিকাতেও প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছে আমার। একবার নিউইয়র্কের সবগুলো বাংলা পত্রিকার একুশে সংখ্যায় মাতৃভাষা নিয়ে আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি লিখখেছি দৈনিক আজাদী ও সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকায়। আর নিজের ও বন্ধুদের সম্পাদিত ছোট কাগজ গুলোতে। ছড়া কবিতা ও অনুবাদ মিলে চৌদ্দ টি গ্রন্থ বেরিয়েছে আমার। বাংলাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত অ্যালেন গিন্সবার্গ ও তার কবিতা আমার শ্রেষ্ঠ কাজ হিসাবে অনেকেই দেখেন।
গল্প নাটক বা কলাম লেখার তুলনায় কবিতা লিখে অর্থ খুব সামান্যই পাওয়া যায়। অর্থ বিবেচনায় রাখলে কথা সাহিত্যে মনোযোগ দেয়াই শ্রেয়। উর্দু লেখক সাদত হাসান মান্টো বলতেন লেখা যতই নান্দনিক হোক লেখককে তো দিনশেষে রুটিও খেতে হয়। সব পত্রিকাতেই কবিতার চেয়ে সংবাদ ও কলামের মূল্য অনেক বেশি। অধিকাংশ স্থানে কবিতার কদর নাই। বেশির ভাগ পত্রিকায় কবিতা ছাপেও না। কেউ কেউ ছাপালেও সপ্তাহে একদিন শুধু এক কোনায়। তাদের ধারনা কবিতার পাঠক নেই। কবিতা লিখতে কম শ্রম লাগে। মূল্য তো শ্রমের উপরেই নির্ভরশীল। কুড়ি লাইনের গদ্য লেখার চেয়ে দুই লাইনের কবিতা লেখা অধিক শ্রমসাধ্য। কবিতা কখনোই প্রথম পাতায় ছাপা হয় না। রাজপুত্র অথবা রাষ্ট্রপতির কবিতা হলে সেটা ভিন্ন ব্যপার। পত্রিকার সংবাদ পড়া হয়ে গেলে ফেলে দেয়া যায়। কবিতা পূণর্পাঠের জন্য সংরক্ষণ করতেই হয়। অথচ সংবাদে সত্য থাকে না সত্য থাকে কবিতায়। একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লেখক এভাবেই বলতেন। লেটিন আমেরিকান উপন্যাসিক মার্কেজ অবশ্য কথাটা ভিন্ন ভাবে বলেছেন। তিনি লিখেছেন সংবাদ পত্রে বা ননফিকশনে সত্য কথা থাকে না। সত্য কথা থাকে ফিকশন রাইটিং এ। কবিতা লিখি কারণ আমার মন এতেই সাড়া দেয়। এটাই লিখতে শিখেছি। জনপ্রিয় উপন্যাসিক হয়ে গদ্য লিখে ধনী হওয়ার স্বপ্নও কখনো দেখিনি। কবিতা লিখতে ভালো লাগে এজন্যই কবিতা লিখছি। শিশুতোষ ছড়া লিখেও আনন্দ পাই। অন্যভাষার কবিতা পড়ে আনন্দ পেলে সাধ্যে কুলালে তা অনুবাদ করে বাংলা ভাষার পাঠকদের আনন্দ দিতে চাই। নিকারাগুর কবি ডেইজি জামোরার কবিতা এভাবেই এখন অনুবাদ করছি। আমি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে লেখার প্রশিক্ষন নিইনি। আমার ধারণা অধিকাংশ লেখকই তাই। আমি কবিতা লিখি কারণ আল মাহমুদের ভাষায় বলতে হয় । লেখায় আমার এক ধরনের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। লিখতে পারি আমি কিছু জানি বলে। ছন্দে গন্ধে আপ্লুত মানুষ আমি।
আমি প্রকৃত অর্থে লেখা শিখেছি গ্রন্থ থেকে। রেলের টাইমটেবিলও শিক্ষণীয় বই। ছন্দ শিখেছি কবিতা লেখা শুরুর অনেক পরে। আব্দুল কাদির ও প্রবোধচন্দ্র সেনের ছন্দ বিষয়ক বইগুলো পাঠ করে। কিন্তূ শুধু বই পড়েই তো লেখক হওয়া যায় না। ছন্দ ও অলংকার শাস্ত্র জানলেই কবিতা লেখা সম্ভব না। শব্দের গন্ধে আপ্লুত না হলে কবিতা লেখা হয় না। অর্থ ও পুরস্কারের কথা মাথায় না নিয়ে লিখলেও কিছু তো পেয়েছি। কিন্তূ তা উল্লেখযোগ্য নয়। আমার কবিতার বন্ধু পাঠকের মতামত আমার কাছে তারচেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। কবিতা লিখে পেয়েছি আপনাদের ভালোবাসা। পরিনত জীবনের রবীন্দ্রনাথের মতো বলতে হয় দিনশেষে ভালোবাসাই টিকে থাকে। এই ভালোবাসা আরও পেতে চাই। এ জন্যই যতদিন বেঁচে আছি লিখে যাবো। এজন্যই লিখি।
0 মন্তব্যসমূহ