কী লিখি কেন লিখি এম আবদুল আলীম

কী লিখি কেন লিখি
এম আবদুল আলীম


কী লিখি,কেন লিখি
এম আবদুল আলীম

প্রপিতামহ ইশারত আলী মৃধা ছিলেন আষাঢ়ে গল্পের রাজা; পাশের বাড়ির ভোমর কামারের দহলিজে বসতো তাঁর গল্পের আসর; মারতেন হাতি-ঘোড়া, রাজা-উজির! পিতামহের ঝুলিতেও ছিলো নানা কেচ্ছা-কাহিনি; সন্ধ্যা হলেই বাড়ির আঙিনায় মাদুর পেতে বসে সেসব শোনাতেন। পল্লিচিকিৎসক পিতার পুঁথিপাঠের সুর এখনো কানে বাজে! জঙ্গনামা, সোনাভান, ইউসুফ-জোলেখা প্রভৃতি পুঁথি পড়তে পড়তে রাত গভীর হয়ে প্রদীপের তেল ফুরিয়ে গেলে সুরের তাল ঠিক রেখে বলতেন : ‘শোনো শোনো শোনো চাচি কেতাব পড়া শোনো।/বাত্তিতে ত্যাল নাই চাচি ত্যান ভর‌্যা আনো ॥’Ñএ কথা শুনে দাওয়ায় উপস্থিত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার হাসির ঝঙ্কারে রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যেতো। আর আমার শিশুমন কল্পনার পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে চলে যেতো কারবালার প্রান্তর কিংবা ফোরাত নদীর পারে। ছোট্টবেলার খেলার সাথীদের কথা মনে পড়ে। খেলতে খেলতে তাদের সঙ্গে আওড়াতাম ‘ইচিং বিচিং ছিচিং ছা,/প্রজাপতি উড়ে যা।’ শুধু কি তাই? তাদের সঙ্গে টো টো করে বেড়াতাম; খুঁজতাম পাখির বাসা, ধরতাম ফড়িং, উড়াতাম ঘুড়ি আর কাটতাম সাঁতার। পারিবারিক এবং পারিপার্শি^ক এমন আবহে আমার চেতনায় সাহিত্যের বীজ বোপিত হয় সেই শৈশবেই।
     আব্বার সংগ্রহে থাকা বিচিত্র ধরনের বই পড়ে এবং স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে সাহিত্যের বিচিত্র ভুবনে অবগাহনের সুযোগ ঘটে। বিভিন্ন সময় অংশগ্রহণ করেছি রচনা-প্রতিযোগিতায়। লেখালেখির জগতে প্রবেশ এভাবেইু। কলেজে পড়ার সময় ইংরেজির শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেন মুকুল যে সাহিত্যবোধ উস্কে দিয়েছিলেন; বিশ^বিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে ¯œাতক (সম্মান), ¯œাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়ে তা বিস্তৃত হয়। ঐ সময় সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির সান্নিধ্য যেমন পাই, তেমনি পুরনো-নতুন অনেক পত্র-পত্রিকা পাঠের সুযোগ লাভ করি। গবেষণায় হাতেখড়ি ¯œাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণাপত্র রচনার সুবাদে; এবং সেটা ঘটেছিল কবি অনীক মাহমুদ এবং ফোকলোরবিদ ড. আবদুল খালেকের মাধ্যমে। পাবনা অঞ্চলের নিভৃত পল্লিতে ঘুরে ঘুরে ফোকলোরের বিচিত্র উপাদান সংগ্রহ করে রচনা করি ‘পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি’ নামক গবেষণাপত্র, যা ২০০৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, আমার প্রথম বই সেটিই। মতিহারের সবুজ চত্বরে সাহিত্য-আড্ডায় প্রায়ই মিলিত হতাম কাহ্নপা সাহিত্যচক্রের আসরে, যার মধ্যমণি থাকতেন কবি-গবেষক অনীক মাহমুদ; আমার লেখালেখিতে আসার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরক তিনিই। পত্রিকার পাতায় প্রথম লিখি ২০০২ সালে; সেটা ছিল একটি পুস্তক-আলোচনা, প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদের ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে। লোকসংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার হাতেখড়ি ঘটলেও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করেছিলাম ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যের প্রধান পাঁচ কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা নিয়ে; যা পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। 
    সৃজন ও মননশীলতার বিচিত্র ভুবনে অবগাহনের সুযোগ ঘটলেও আমি থিতু হই মননশীলতা তথা প্রবন্ধ-গবেষণার জগতে। সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তৃত পঠন-পাঠন এবং গভীর অনুসন্ধিৎসায় ডুবে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়া এবং উল্লাপাড়া বিজ্ঞান কলেজ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, ঢাকা কলেজ ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা এবং ঢাকায় বসবাসসূত্রে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-জগতের নবীন-প্রবীণ অনেক মানুষের সান্নিধ্য-সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, মযহারুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, পবিত্র সরকার, আবদুল খালেক, হাসান আজিজুল হক, আহমদ রফিক, বদরুদ্দীন উমর, ওমর আলী, নূহ-উল-আলম লেনিন, বিশ^জিৎ ঘোষ, রফিকউল্লাহ খান, আকতার কামাল, গোলাম মুরশিদ, শামসুজ্জামান খান, আলী আনোয়ার, হায়াৎ মামুদ, কামাল লোহানী, মজিরউদ্দীন মিয়া, জুলফিকার মতিন, আবুল হাসনাত, অনীক মাহমুদ, আবুল আহসান চৌধুরী, পি এম সফিকুল ইসলাম, আবুল হাসান চৌধুরী, স্বরোচিষ সরকার, সুজিত সরকার, মহীবুল আজিজ, মাহবুবুল হক, কামাল চৌধুরী, বিশ^জিৎ ঘোষ, গিয়াস শামীম, সৈয়দ আজিজুল হক, সফিকুন্নবী সামাদী, শহীদ ইকবাল, শিমুল মাহমুদ, আবু দায়েন, অনিরুদ্ধ কাহালী, তারিক মনজুর, মোহাম্মদ আজম, তুহিন ওয়াদুদ, সরোয়ার মুর্শেদ, শামীম রেজা, শামীম সিদ্দিকী, তপন বাগচী, সাজ্জাদ আরেফিন, সাইমন জাকারিয়া, আমিনুর রহমান সুলতান, সাইদ হাসান দারা, নুরুন্নাহার মুক্তা, রকিবুল হাসান, ওবায়েদ আকাশ, সোহেল হাসান গালিব, মামুন সিদ্দিকী, বাকীবিল্লাহ বিকুল, জি. এম. মনিরুজ্জামান, আশরাফ পিন্টু, চন্দন অনোয়ার, হারুন পাশা, তাশরিক-ই হাবিব, বিপ্লব হুমায়ুন, তানভীর দুলাল, রহমান রাজু, সোলায়মান সুমন, সাঈদ অনাম, জ্যোৎ¯œা লিপি, নূর সালমা, কুমার দীপ, সৈকত এম আরেফিন, সজল সমুদ্র, সুমন শামস, পিয়াস মজিদসহ সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং মননীল-জগতের নবীন-প্রবীণ অগণিত মানুষের সান্নিধ্য-সংস্পর্শ লাভের সুযোগ ঘটে। নিজেকে যতদূর সম্ভব প্রস্তুত করেই লেখালেখির জগতে এসেছি। শূন্য দশকের শুরু থেকে রুদ্র, ধ্রুবসহ বিভিন্ন লিটলম্যাগ; দৈনিক সংবাদ, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সমকাল, দৈনিক কালের কণ্ঠসহ জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতা; মেঘবাহন, কালি ও কলম, পথরেখা, উত্তরণ, ফোকলোরসহ মাসিক ও ষাণ¥াষিক নানাপত্রিকা এবং বিভিন্ন গবেষণা-জার্নালে নিয়মিত লিখে চলেছি। বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন অভিজাত প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন পঁচিশের অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ‘সাহিত্য পত্রিকা’, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ‘সাহিত্যিকী’, আইবিএস জার্নাল, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় অনেক গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকা সম্পাদনার অভিজ্ঞতা প্রথম হয় ২০০৩ সালের ১৫ আগস্ট, এবং সেটা হয় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের মুখপত্র ‘কৃষ্ণপ্রহর’ সম্পাদার মাধ্যমে। পরে কালবৈশাখী, রুদ্র, উদ্ভাবন, সাহিত্য গবেষণাপত্র, প্রভাতফেরি, সাঁথিয়ার কণ্ঠ, গৌরীগ্রাম বার্তা প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। 
    সাহিত্যের ছাত্র এবং শিক্ষক হলেও আমার ঝোঁক ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিকে; বিশেষ করে বাঙালির জাতীয় জীবনের গৌরবময় অধ্যায় ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও সংগ্রাম আমার গবেষণাণার কেন্দ্রবিন্দু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলঅম, বন্দে আলী মিয়া, শহীদ কাদরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এম এ ওয়াদুদ, তাজউদ্দীন আহমদ, অনিসুজ্জামান প্রমুখকে নিয়ে আলাদা আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছি। এখন মগ্ন থাকি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় সন্ধান তথা ঘরে ফেরার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ঘটনা রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস-অনুসন্ধানে। হাতে নিয়েছি ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ রচনার দুরূহ কাজ, যার প্রথম খ- প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালে। ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’, ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন’, ‘ছাত্রলীগ ও ভাষা-আন্দোলন’, ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’, ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা-আন্দোলন’ নামে গ্রন্থ যেমন রচনা করেছি; তেমনি ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস’ নামে সহ¯্রাধিক পৃষ্ঠার বৃহৎ-কলেবর গ্রন্থ রচনা করেছি। ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’ গ্রন্থের জন্য ২০১৪ সালে লাভ করি ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’। এর চেয়েও বড় কথা প্রকাশক, সমালোচক এবং পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছি বিস্তর। ওসমান গনি, জসিম উদ্দিনের মতো প্রকাশকের আনুকূল্য পাওয়া আমার জন্য পরম সৌভাগ্য বৈকি। অনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, আবদুল খালেক, শামসুজ্জামান খান, আহমদ রফিক, কামাল লোহানী, আবু তাহের মজুমদারের মতো বিগদ্ধজনের মূল্যায়ন আমাকে পঠন-পাঠন ও লেখালেখিতে গভীর মনোযোগী ও দায়বদ্ধ হতে প্রেরণা যুগিয়েছে। আমার ‘ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ’ গ্রন্থ পাঠ করে হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন, ‘মনোনিবেশ কতটা একাগ্র ও মনোমুগ্ধকারী হলে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করা যায়, আমি তা কল্পনা করতে পারি না। অনেকেরই তৃতীয় নয়ন খুলে দেবে এই বইটি।’ ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ সম্পর্কে মূল্যায়ন করে আহমদ রফিক লিখেছেন : ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ নামক ধ্রুপদী চরিত্রের গ্রন্থ রচনা করে ড. এম আবদুল আলীম কেবল ভাষাসংগ্রামীদের কাছেই নয়, বাঙালি মাত্র সকলের কাছেই ধন্যবাদার্য হয়ে রইলেন।’ একজন লেখক ও গবেষকের জন্যে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। আজীবন পঠন-পাঠন এবং লেখালেখিতে মগ্ন থাকতে চাই; পড়া পড়া পড়া এবং লেখার মধ্যেই খুঁজতে চাই মানবজন্মের পরম প্রাপ্তি এবং চরম সার্থকতা!  

ড. এম আবদুল আলীম
গবেষক-প্রাবন্ধিক; 
সাবেক ডিন, কলা অনুষদ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ