কী লিখি কেন লিখি
রফিকুর রশীদ
রফিকুর রশীদ
জন্ম : ১লা জানুয়ারি ১৯৫৮
শুরুটা করতে চাই একটা গল্প দিয়ে।
কেউ হয়তো বলতেই পারেন-- এই তো গল্পকারের স্বভাব। লেখার একটা ছল-ছুতো পেলেই হলো, কথার পিঠে কথা সাজিয়ে শুরু হয়ে যাবে গল্পের বুনন। নকশিকাঁথা বোনার মতো করে এরপর লতিয়ে লতিয়ে চলতে থাকবে আল্পনা। না, আমি সেটা করতে চাই না। তখন আবার ধান ভানতে শিবের গীত গাইবার অভিযোগ উঠতে পারে। আমি যে গল্প দিয়ে এই রচনাটি শুরু করতে চেয়েছি, সেই গল্প সবারই জানা। মোটেই আমার বানানো নয়। এক স্কুল-ইন্সপেক্টরকে নিয়ে গল্প। তিনি গেছেন এক স্কুল পরিদর্শনে। কোনো এক ক্লাসরুমে ঢুকে প্রথমেই জেনে নিলেন-- ওই ক্লাসে চলছে ইতিহাসের পাঠ। টিচার ইতিহাস পড়াচ্ছেন। ছাত্রদের লেখাপড়ার মান যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে ইন্সপেক্টর সাহেব প্রশ্ন করেন, বলো দেখি সোমনাথ মন্দির কে ভেঙেছে?
ছাত্রদের মুখে কথা নেই। পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, উত্তর নেই। টিচারেরও মুখ শুকিয়ে আমচুর। তিনি ছাত্রদের উৎসাহিত করেন, বল্ না, যে কেউ একজন বল।
নাহ্! সবাই নিরুত্তর। ইন্সপেক্টর সাহেব এগিয়ে এসে জানতে চান, এ ক্লাসের ফার্স্টবয় কে?
উঠে দাঁড়ায় একজন। অভয় দেবার জন্যে টিচার এগিয়ে আসেন তার দিকে। ইন্সপেক্টর সাহেব কাছে এসে তার কাঁধে হাত রেখে গভীর মমতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, তুমি বলো তো বাবা-- কে ভেঙেছে সোমনাথ মন্দির?
ছেলেটি ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক সেদিক তাকিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফ্যালে। ইন্সপেক্টর সান্ত¡না দেন, উৎসাহ যোগান, অভয় দেন। ছেলেটি শেষে মুখ মুছে ঘোষণা করে, আমি ভাঙিনি স্যার।
ইন্সপেক্টর সাহেব বিস্ময়ে হতবাক। ফার্স্টবয়কে আর কী বলবেন! তার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে ক্লাসটিচারের মুখের দিকে তাকান। এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে টিচার তাঁর নির্দোষ ছাত্রটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন,
জি স্যার। খুব ভালো ছেলে স্যার। ফার্স্টবয়। মারামারি ভাঙাভাঙির মধ্যে তো ওর যাবার কথা নয়। তবু কিনা মন্দির বলে কথা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান...
আমার গল্প শেষ।
ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দির কে ভেঙেছিল সে কথা নিশ্চয় ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। আমি ভাবি ওই ফার্স্টবয় ছাত্রটির কথা। কেমন অকপটে এবং নির্দোষ ভঙিতে সে বলেছিল ‘আমি ভাঙিনি স্যার!’ ‘কেন লিখি’-- এ প্রশ্নের উত্তরে সেই ছাত্রটির মতো করে আমি কি আদৌ বলতে পারব-- আমি লিখিনি! সেই ছাত্রটির পক্ষে তার টিচারও কী চমৎকার যুক্তি তুলে ধরেন,-- সে ভালো ছেলে, মন্দির ভাঙতেই পারে না। আমি যদি জোর করে বলেও বসি-- ‘লিখিনি’, আমার পক্ষে কে দাঁড়াবে! ইতিমধ্যে আমার লেখা নানান পদের পঞ্চাশটিরও অধিক বই ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়ে গেছে, এর বাইরে বিভিন্ন কাগজেও অনেক লেখা ছাপা হয়েই চলেছে; এখন হুট করে ‘আমি লিখিনি’ বললে চলবে কেন? তাহলে যে আবার ‘ঠাকুর ঘরে কেরে, আমি কলা খাইনি’ গল্পের মতো দশা হবে যাবে! আমার বিশ্বাস, এ গল্প আপনারা সবাই খুব ভালোই জানেন। না, আমি আর সেই গল্প ফাঁদতে চাই না। বরং অকপটে স্বীকার করি-- আমি লিখি। সেই কবে কলেজজীবন থেকে লিখে চলেছি। গল্প লিখি উপন্যাস লিখি। বড়দের ছোটদের সকলের জন্যে লিখি। ছড়া এবং কিশোর কবিতার নেশা ছাড়তে পারিনি, সে সবও লিখি। প্রশ্নটা হচ্ছে-- ‘কেন লিখি?’
মানতেই হবে এই প্রশ্নটা যত সহজ, উত্তর কিন্তু মোটেই তত সহজ নয়, এমনকি সংক্ষিপ্তও হবার নয়। হ্যাঁ, খুব সংক্ষেপে যদি বলতেই হয়, তাহলে বলা যায়-- আনন্দের জন্যে লিখি লিখে আমি আনন্দ পাই। আমার আনন্দেই আমি লিখি। সে সব পড়ে কেউ আনন্দ পেতেও পারেন, নাও পারেন। অন্যের আনন্দের কথা ভেবে লিখতে শিখিনি। তবে হ্যাঁ, নিজের আনন্দের মধ্যে দিয়ে যা লিখি তা পড়ে যখন অন্যেও আনন্দিত হন বলে জানতে পারি, তখন খুব ভালো লাগে, আনন্দের নতুন মাত্রার সন্ধান পাই।
আমার এ আনন্দযাত্রার সূচনা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে। স্কুল নেই, লেখাপড়া নেই, খেলাধুলাও নেই বললেই চলে। (বাড়ির বাইরে খেলতে গেলে পাকিস্তানি মিলিটারির চোখে পড়ার সম্ভাবনা), সাংসারিক কাজকর্মে তেমন মনোযোগ নেই; তাহলে সময় কাটে কী করে? শব্দ-শব্দ খেলা শিখি তখন থেকেই। পাথরের গায়ে পাথর ঠোকার মতোই আমি শব্দের সঙ্গে শব্দের ধাক্কা দিয়ে মজা পাই। ‘যায়’ শব্দের সঙ্গে ‘হায়’ শব্দের মিল খুঁজি। ছুটছে-ফুটছে, গর্ব-খর্ব, দৃষ্টি-সৃষ্টি... এই রকম আর কি! তখন স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশেষ পুঁথিপাঠ হতো। শুনে খুব মজা পেতাম। আমারও ইচ্ছে হতো-- ওই রকম করে শব্দের মিল দিয়ে কবিতা লেখার। সেই চেষ্টাও চলেছে গোপনে গোপনে। এই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের কবিতার অনুকরণেরও চেষ্টা চলে বিস্তর এ-সব করে তো তখন আনন্দই পেয়েছি। আবার তখনকার সেই অক্ষম কাব্যপ্রয়াস সলজ্জ ভঙ্গিতে কারো সামনে মেলে ধরেও বিমল আনন্দ পেয়েছি। তাই আমি অকুণ্ঠচিত্তে বলি-- আনন্দের জন্যেই আমার যতো লেখালেখি। মানবসেবা, সমাজসংস্কার, দেশোদ্ধার বা এরকম মহৎ কোনো ব্রতট্রত আমার লেখালেখির গোড়াতে ছিল বলে তো মনেই পড়ে না।
আমার স্বল্পশিক্ষিতা মায়ের খুব বই পড়ার অভ্যাস। আমাদের গ্রামে তার সেই পাঠক্ষুধা মেটানোর উপায় কী! ছাত্রজীবনে আমাদের স্কুল এবং কলেজ লাইব্রেরি থেকে আমি অনেক বই এনেছি আমার মায়ের আগ্রহেই। বলা যায় মায়ের জন্য আনা-নেয়া করতে করতে আমারও পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়তে শেখা। রাত জেগে জেগে শরৎ-বিভূতি পড়ে চোখের জল ফেলা। মানিক-তারাশংকর পড়েছি আরো পরে। এসব পড়তে পড়তেই সমাজের অন্যায় অবিচার কুসংস্কার নির্যাতন নিপীড়নের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, এতসব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেও অনমনীয় দৃঢ়তায় মানুষের মাথা উঁচু করা প্রত্যয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে; এই পাঠের মধ্য দিয়েই আমি আমার চারপাশের মানুষ এবং সমাজকে নতুন করে দেখতে শিখি। মানুষে মানুষে সম্পর্কের দৃশ্যাতীত সুতোগুলো চিনতে শিখি তারও পরে। বলা যায় বই পড়তে পড়তেই আমি শিখেছি মানুষ পড়তে, সমাজ পড়তে। এরই মাঝে লেখালেখিতে আমার বাঁক বদল ঘটেছে। আমি গল্প লেখায় ঝুকে পড়েছি। কার গল্প, কিসের গল্প? কেবলই কল্পনার রং তুলিতে কাহিনী বিন্যাস বা চরিত্র-চিত্রণ? নাহ! বেশ কিছু লিখে ফেলার পর পেছনে তাকিয়ে দেখি-- আমার গল্পের পাত্রপাত্রীরা কেউ আমার অচেনা নয়। সবাই আমার চারপাশের মানুষ। এই সমাজের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতার মধ্যে তারা যে সংগ্রামমুখর জীবনযাপন করে, তা আমার খুব চেনা খুব জানা। শক্ত করে আঁটঘাট বেঁধে পরিকল্পনার ছক ফেলে আমি তাদের জীবনের ছবি যে আমার গল্পে তুলে আনতে চেয়েছি, তেমন ভাবলে ভুল হবে। আমি লিখেছি, লিখছি আমার আনন্দে; আমার চারপাশের চেনাজানা মানুষেরা তাদের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, ঈর্ষা-অসূয়াসহ অবলীলায় উঠে আসে আমার লেখায়। আমার গল্পের কোনো চরিত্রকেই তাদের স্বভাববিরুদ্ধ কৃত্রিম পরিণতির দিকে পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দিয়েছি বলে মনে পড়ে না। এর মধ্যে সমাজমনস্কতা কোথায়, লেখকের সামাজিক দায় কোথায়? বরং আমি তো দেখি আমার সৃজন-আনন্দের যজ্ঞাগ্নি জ্বালিয়ে রাখতেই এইসব চেনাজানা চরিত্রগুলো আমার কলমের ডগায় স্বেচ্ছায় এসে আত্মাহুতি দেয়। লিখতে বসে আনন্দ পিয়াসী লেখকের কীইবা করার থাকে-- লেখা ছাড়া!
১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে একবার খুব জব্দ হয়েছিলাম প্রায় পিতৃবয়সী এক বন্ধুর কাছে। তিনি মফস্বলে বসে সাহিত্যচর্চা করেন, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের অসাধারণ সংগঠক, অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। পরে জেনেছি তিনি রাজনীতিও করেন, সাম্যবাদের রাজনীতি। সেই রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ সংগঠন নয়, প্রকাশ্য তৎপরতায় বাধা নেই; সামান্য মাইনের সরকারি চাকরি করার সুবাদে তিনি অপ্রকাশ্যে দলীয় আদর্শপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকেন। সেই অর্থে তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ ততটা দৃশ্যমান নয়। আমি তখন চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজে কর্মরত। চুয়াডাঙ্গার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে সেসময় বেশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ি। পত্রপত্রিকায় আমার বেশ দু’চারটি গল্প বেরুচ্ছে। সে গল্প যে কোন পাঠক পড়েন আমার জানা নেই, জানার কথাও নয়। অথচ আমার সেই বয়স্ক বন্ধুটি এক বিকেলে আমাকে সহসা চেপে ধরে জানতে চান-- এসব কী লিখছেন গল্পে? যাদের আনন্দ-বেদনা অবমাননার কথা কিংবা প্রতিবাদের কথা গল্পে ফুটিয়ে তোলেন, তাদের আপনি কতটা চেনেন?
আমি প্রবল প্রত্যয়ে ঘোষণা করি-- খুব চিনি। নিবিড়ভাবে চিনি। এদের সঙ্গেই আমার নিত্যদিনের বসবাস। আমার গল্পে তাই এদের জীবনের ছবিই ফুটে ওঠে অনায়াসে।
এমন দীর্ঘ উত্তর শুনেও আশ মেটে না আমার বন্ধুটির। আবারও প্রশ্ন করেন,
চেনেন, মানছি না হয়। এইসব বঞ্চিত লাঞ্ছিত গরিব দুঃখী মানুষদের নিয়ে গল্প লিখে কী লাভ? কেন লেখেন সাধারণ মানুষের অনাড়ম্বর জীবনের গল্প?
ভারি কঠিন প্রশ্ন। আমার কাছে সহজ উত্তর-- ওদের আমি চিনি বলেই ওদের কথা লিখি। কিন্তু আমার বন্ধুটি এই সহজ জবাবে যে সন্তুষ্ট হবার পাত্র নন। কী মতলব যে তাঁর মগজে লুকানো আছে কে জানে! তিনি চান আঁটি ভেঙে শাস নিতে। কেন লেখেন ওদের কথা? ওদের দারিদ্র-দৈন্যের কথা, শোষণ বঞ্চনার কথা, লড়াই সংগ্রামের কথা নিয়ে গল্প লিখে কি ওদের জীবনযাত্রার কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন? কারা পড়ে আপনার গল্প, ওরা কি পড়ে?
এই রকম শতেক প্রশ্ন আমার বন্ধুর। উত্তর গুছিয়ে উঠতে গিয়ে আমার মধ্যবিত্তসুলভ সীমাবদ্ধতার কারণে কোথাও কোথাও হোঁচট খাই, ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ি, সভয়ে নিজেকেই শুধাই-- আমার গল্পকে আমি কি আদৌ সমাজ বদলের হাতিয়ার করে তুলতে চেয়েছি কখনো? আমার বন্ধু বলেন, তার জন্যে চাই শ্রেণিসংগ্রামের গল্প। ভেতরে ভেতরে নিজেকে শ্রেণিহীন করে তুলতে হবে, শোষিত শ্রেণির পক্ষে দাঁড়াতে হবে। শুধু গল্প লিখেই নয়, বাস্তবের মাঠে নেমে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে!
বাবক্ষা! ভারি শক্তকথা মনে হয়। কিন্তু আমার বন্ধুটির ব্যক্তিত্বের মধ্যে বেশ জাদুকরী ক্ষমতা আছে মানতেই হয়। কথার পিঠে কথা বলতে বলতে শুনতে শুনতে একসময় আমি কাবু হয়ে পড়ি এবং কবুল করতেই হয়-- অনেকটা মোহগ্রস্থ হয়ে পড়ি। এ সময় রুশ লেখকদের গল্প উপন্যাস নতুন করে ভালো লাগতে শুরু করে। কী যে এক নেশার ঘোরে রাতের পর রাত পাতা উল্টিয়ে পড়ে যাই চেখব, টলস্টয়, অস্ত্রভোস্কি, মাকারেঙ্কো এবং অতি অবশ্যই ম্যা´িম গোর্কি। এসব পাঠের কোনো প্রভাব আমার কোনো গল্পে কখনো পড়েছি কিনা ভেবে দেখিনি, তবে এই লেখকেরা জীবনকে চিনতে শিখিয়েছেন সূক্ষ্ম পরিমাপে এ কথা মানতেই হবে।
তো সে যাই হোক, আমার কলমযোদ্ধা হয়ে ওঠার ইচ্ছের মুখে লাগাম পরিয়ে প্রিয় বন্ধুটি যুক্তির জালে জড়িয়ে আমাকে সমাজ বদলের সৈনিক হিসাবে গড়ে তোলার জন্যে উঠে পড়ে লাগলেন। ঠেলে নামিয়ে দিলেন রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে। কৃষক ক্ষেতমজুরের সঙ্গে সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে অবহেলিত উপেক্ষিত এই শ্রেণিটির সঙ্গে আমার পরিচয় আরো ঘনিষ্ঠ হয়। তাদের আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করে আমি সত্যিই উত্তেজিত হই, আনন্দিত হই। দেখি গল্প লেখার আনন্দের চেয়ে এ আনন্দ মোটেই কম নয়। কিন্তু বছর পাঁচেকের মধ্যে আমার মোহভঙ্গ ঘটে। নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বটা টের পাই-- শ্রেণিচ্যুতি ঘটানো মোটেই সহজ নয়। এই উপলব্ধির পর থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সক্রিয়তা হারিয়ে ফেলি, তবে সাম্যবাদী চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা এবং আস্থা কিন্তু একটুও হারাইনি। মানুষের মুক্তির এ লড়াই থেকে সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে, এমন করে ভাবিনি কখনো। হোঁচট খেয়ে টের পেয়েছি, এ পথটা আমার নয়। তাই পথ বদলেছি, তবে লক্ষ্য বদলায়নি। শ্রমজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামের সঙ্গেই আমি, সানন্দে আছি।
ভাবতে ভালো লাগে ‘জীবনসংগ্রাম’ মানে কী? অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে জীবনব্যাপী যে লড়াই, তাকেই বলে জীবনসংগ্রাম? মানবিক মুক্তি কি আরো বড় কিছু নয়? লড়াই সংগ্রামের রক্তপাত দৃশ্যমান, কিন্তু এর বাইরেও তো দৃশ্যাতীত রক্তক্ষরণ থাকতে পারে! মানবিক অনুভূতিগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হলে, লাঞ্ছিত হলে, সেই অবমাননার পরিণাম কত যে ভয়াবহ হতে পারে সে কি মানুষের ভেতরের মানুষকে না দেখতে পেলে টের পাওয়া যায়! তাই দৃশ্যমানতার অধিক মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, অভিমানের বাঁকাজলের গতিবিধি, প্রেম ও বিরহের সহস্রমুখী অগ্ন্যুৎপাতের দৃশ্য-- কাগজের পাতায় এইসব কাটাকাটি খেলা খেলতে আমি বেশ আনন্দ পাই। আর এ কথা তো আমি গোড়াতেই কবুল করেছি-- আনন্দের জন্যেই আমি লিখি।
পাঠকের কাছেও আমার প্রত্যাশা বেশি কিছূ নয়। আনন্দের জন্যেই পড়বেন আমার লেখা। আনন্দ না পেলে কেন পড়বেন, কিসের দায়? তবে হ্যাঁ, আমার বিবেচনায় সেই আনন্দেরও নানান রকমফের আছে। মাত্রাভেদ আছে। আনন্দ কি কেবল সস্তা সুড়সুড়ির মধ্যে নিহিত থাকে? নাকি কাতুকুতু দিয়ে লোক-হাসানোতেই সব আনন্দ? আমি তা মোটেই মনে করি না। সস্তা জনপ্রিয়তার প্রতিও আমার কোনো মোহ নেই। আমি চোখের জলেও আনন্দ খুঁজি, মানবিক ঈর্ষা-অসূয়াপ্রসূত মানবিক টানাপোড়েনের মধ্যে আনন্দ অন্বেষণ করি, বিপন্ন মানুষের উঠে দাঁড়াবার লড়াইয়ের মধ্যেও আনন্দপতাকা উড়তে দেখি। এই সব আনন্দবোধের কোনো একটি দিকও যদি আমার গল্প-উপন্যাসের চরিত্র বেয়ে পাঠক-চিত্তে সামান্য একটুখানি সঞ্চারিত হয় তাতেই আমার বিমল আনন্দ, পরম তৃপ্তি এবং সার্থকতা। এই আনন্দের জন্যেই আমার লেখালেখি।
রচনাটি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে জেনেও আর একটি বিষয়ে দু’কথা বলতে চাই। প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ। বয়ঃস্বল্পতার কারণে আমি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারিনি। এ গ্লানি আমৃত্যু বহন করতে হবে জানি। আংশিক হলেও নানা উপায়ে আমি এই অমোচনীয় গ্লানি লাঘবের পথ খুঁজি। কী পথ সেটা? রাজনীতির কাদাপাঁকে নেমে মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত লক্ষ্য পূরণে আত্মনিয়োগ করব? ইতিমধ্যে বেশ বুঝেছি ও পথ আমার নয়। আমার আছে লেখালেখি, আছে কাগজকলম। এই ফ্রন্টেই আমার যুদ্ধ। এটাই আমার চেনাজানা ফ্রন্ট। আমার বহু গল্প-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের অনির্বাণ চেতনার কথা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি এবং আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। গল্প-উপন্যাসের বাইরেও ইতিহাস নিয়ে আমার কিছু লেখালেখি আছে। আছে ‘মেহেরপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ এবং ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর’ নামে দু’টি আকরগ্রন্থ। পরে বাঙালি জাতির গৌরবময় অর্জন ও ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের কিশোর পাঠকদের পরিচিত করে তোলার দায়বোধ থেকে লিখেছি আরো দু’টি বই: ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : কিশোর ইতিহাস’ এবং ‘আমাদের ভাষা আন্দোলন : কিশোর ইতিহাস’। হ্যাঁ, এগুলি আমার দায়বোধের রচনা। একই সঙ্গে আনন্দেরও। প্রিয় প্রসঙ্গে ঘাঁটাঘাঁটি করে, তৃণমূল পর্যায়ে হাঁটাহাঁটি করে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, তারপর ইতিহাসের ফুলে ফুলে মালা গাঁথা-- এ কি কম আনন্দের! আমার সব লেখা আমি আনন্দের জন্যে এবং আনন্দের সঙ্গেই লিখে চলেছি। আর আমার লেখা যদি কিছু পাঠককেও আনন্দিত করে, সে আমার পরম পুরস্কার।
========
কবি মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ১৯তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৪) প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ