কী লিখি কেন লিখি ফারুক মাহমুদ

কী লিখি কেন লিখি 
ফারুক মাহমুদ

ফারুক মাহমুদ
জন্ম : ১৭ই জুলাই ১৯৫২

কেন লেখেন, এ ধরনের প্রশ্ন একজন লেখককে বহুবারই শুনতে হয়। পাঠক বা সাধারণের কৌতূহল থাকতে পারে অন্য কিছু না হয়ে তিনি লেখক হলেন কেন? লেখক হওয়াটা কি তার জন্য অনিবার্য ছিল? অন্য কিছু কি হতে পারতেন না? মানুষ তো কত কিছু হয়! কথাটা সত্য। মানুষ অনেক কিছু হয়। অন্যকোনো প্রাণী কোনোকিছু হয় না। ধরা যাক সিংহের কথা। একটি সিংহ-শাবক জন্মের পর থেকেই আস্তে আস্তে সিংহ হয়ে ওঠে। সব প্রাণীর বেলায় একই কথা খাটে। মানুষই অন্যরকম প্রাণী। একটা কিছু হয়ে ওঠে। সবাই কি হয়ে ওঠে! না সে-ও নয়। অনেকেই কোনোকিছু হতে পারে না। এ-কথাটাও বোধকরি ঠিক বলা হল না। মানুষ শেষপর্যন্ত একটা কিছু হয়ে ওঠে। কারোর হয়ে ওঠা ছোট, কারোর বড়। যাদের হয়ে ওঠা ছোট, তারা পরিচিত হয় ছোট পরিসরে, কাছের মানুষের কাছে। আর যাদের হয়ে ওঠা একটু বড়, নিজেদের গণ্ডির বাইরে তাদের পরিচিত স্থান লাভ করে। অনেক সময় স্থান এবং কাল অতিক্রম করাও সম্ভব হয়। রাষ্ট্রে, সমাজে, অতীতে, সমকালে এমন অনেক অগণিত উদাহরণ পাওয়া যায়। সৃষ্টিশীল মানুষের হয়ে ওঠা কারো কারো মনে আগ্রহের জন্ম দিয়ে থাকে। লেখালেখি যারা করেন, সৃষ্টিশীল মানুষের অংশ হওয়ায় তাদের কাজ নিয়েও কৌতূহল জন্মে।
কেন লেখেন, এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হননি, খুব কম লেখকই আছেন। আমিও হয়েছি, একবার নয়, বহুবার। কী জবাব দিয়েছি, একই জবাব কি দিয়েছি! না, তা দিইনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি পাল্টেছে, জবাব পাল্টেছে। তবে মূল উত্তর খুব একটা বদলায়নি।
যারা প্রশ্ন করেন, কেন লেখেন? বিনীত হয়ে তাদের কি একটা প্রশ্ন করতে পারি, কেন লিখব না? লিখতে যখন পারি (ছাই-ভস্ম যা-ই হোক), তখন লিখব না কেন?
লিখে আনন্দ পাই, সে জন্য লিখি। যখন লিখতে পারি না, লেখালেখি হয় না, খুব কষ্ট হয়। গ্লানিগন্ধে ডুবে যাই। নিঃসঙ্গ লাগে, নিঃস্ব মনে হয় নিজেকে। অনেক ‘থাকার’ মধ্যেও ‘না-থাকায়’ তলিয়ে যেতে থাকি। না লিখে যে পারি না। অক্ষর থেকে অক্ষরে যাইÑকী যে আনন্দ! এর কোনো তুলনা হয় না।
একবার রেনে রিলকে তার এক কবি হতে-চাওয়া ভক্তের চিঠির জবাবে লিখলেনÑকারো যদি মনো হয় লেখা ছাড়াই সে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারবে, তাহলে তার লেখালেখি না করলেও চলবে। কথা সত্য। না-লিখে কত মানুষ বেঁচে আছে। কিন্তু যিনি লেখক! না-লিখে কি লেখকের বেঁচে থাকা সম্ভব? সম্ভব নয়। প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা যায়, মন নিয়ে নয়। একজন লেখালেখি করেন, তাই তিনি লেখক। তাকে তো লিখতেই হয়। কেন লিখতে শুরু করেছিলাম, কখন, কীভাবেÑও-সব প্রায় মুছে-যাওয়া স্মৃতি। স্কুলের ছোট ক্লাশে যখন পড়ি, বাংলা পড়াতেন মজুমদার স্যার। দাড়ি-চুলে মোগল বাদশাহদের মতো দেখতে। তিনি ছিলেন লেখক। দৈনিক পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতো। একজন লেখক দেখার এটাই আমার প্রথম স্মৃতি। অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম মজুমদার স্যারের লেখালেখি দেখে। 
স্যার লিখতেন স্বাস্থ্য-বিষয়ক প্রবন্ধ। কম পরিশ্রমে ছোট লেখা লিখব। এ জন্য ‘কবিতা’ নামক কিছু লেখার চেষ্টা। সেই থেকে শুরু।
এখনো লেগে আছি।
বেঁচে থাকার জন্য লিখছি। একদিন মরে যাব, সে জন্য লিখছি। 


মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি-র ১৮তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৩) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ