কী লিখি কেন লিখি
ফরিদ আহমদ দুলাল
জন্ম : ১৮ই মে ১৯৫৬
একদিন লেখক হয়ে উঠবো, এমন পরিকল্পনা নিয়ে তো আর লেখালেখি শুরু করিনি। কখন যে লেখক হবার স্বপ্ন বুকের মধ্যে চেপে বসলো তার হদিস খুঁজে বের করা বোধকরি আজ খুই কঠিন। যদ্দুর মনে করতে পারি, লেখালেখির শুরু হয়েছিলো ষাটের দশকে। ষাটের শেষার্ধে যুগপৎ বেশকিছু ঘটনা ঘটে যায় জীবনে; সেসব ঘটনার কোনো কোনোটি আমাকে হয়তো লেখক হতে প্রাণিত করেছিলো। প্রথমত, ষাটের দশকে আমার পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আমার পাঠাভ্যাসের সূচনা। পাঠাভ্যাস সূচনা হয়েছিলো শহিদুল্লাহ কায়সার-এর ‘সংশপ্তক’ উপন্যাস দিয়ে, খুব কাছাকাছি শুরু হয় নীহাররঞ্জন গুপ্তের ‘কালোভ্রমর’ উপন্যাসটি। কালোভ্রমর পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছিলো, আমিও তো লিখতে পারি! দ্বিতীয়ত ১৯৬৭-৬৮ সালে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ নামে একটা বই স্কুলে পাঠ্য করা হয়েছিলো, ছাত্রসমাজ যার প্রতিবাদে পথে নেমে এসেছিলো; সেদিন পথে-মিছিলে নামতে গিয়ে আমি ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে যাই, আমার সহপাঠি-বন্ধু আখতার হোসেন আমাকে টেনে নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভ্য করে দেয়, এবং রাতারাতি মৃত্যুঞ্জয় স্কুল শাখার প্রচার সম্পাদক বানিয়ে দেয়; এর বছর খানেক পর ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সম্মেলনে মিছিল নিয়ে যোগ দিতে যাই। মতিয়া-মেনন তখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছেন, আমাদের সম্মেলনে মতিয়া চৌধুরী এলেন। এসময় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে নিয়মিত পড়তে হতো; আমার পাঠাভ্যাসে যোগ হলো পাকিস্তান কাউন্সিলের লাইব্রেরিতে গিয়ে নিয়মিত পড়ালেখা। বাসায় যখন সবাই জানলো, আমি নিয়মিত পড়তে যাচ্ছি লাইব্রেরিতে, বড়রা তখন আমার গতিবিধির উপর নানান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে দিলো। তৃতীয়ত, একই সময়ে ‘দস্যু মোহন-বাকের’ জাতীয় কিছু রগড়করা বই আমার পাঠসীমায় চলে আসে এবং পাঠাগারে যাবার অবাধ সুযোগে সিনেমা দেখার অভ্যাসটাও গড়ে ওঠে। কী একটা সিনেমা দেখে সেই সিনেমার কাহিনি অবলম্বনে আমরা একটা নাটক লিখে ফেলি। নাটকটি লিখেছিলাম আমি আর আমার বন্ধু রতন। যেদিন নাটকটি লিখেছিলাম সেদিনই তা মঞ্চায়নও করেছিলাম। রতন ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলো আলবদর বাহিনির হাতে। আল বদর বাহিনি রতনকে ধরে নিয়ে যায়, বেশ ক’দিন জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় আটকে রাখে; তারপর আর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ১০ই ডিসেম্বরের পর রতনের শার্ট আর একপাটি চটি পাওয়া গিয়েছিলো ডাকবাংলোর বারান্দায়। চতুর্থত, ১৯৬৭-৬৮ তে-ই আমাদের এক পড়শির বাড়িতে প্রজাপতির মতো চঞ্চল একটি মেয়ে বেড়াতে এলো। ইতোমধ্যেই রাজনীতি করে সিনেমা দেখে আর দস্যু মোহন-বাকের পড়ে কিছুটা পেকে গেছি; প্রজাপতির মতো চঞ্চল মেয়েটিকে মনে মনে ভালোবাসতে শুরু করলাম। ওর জন্য বুকের ভেতর কেমন যেন করতে থাকলো; একদিন তাকে নিয়ে কিছু একটা লিখে ওর আত্মীয়ের ঘরে ছুড়ে দিয়েছিলাম; লেখাটা নিয়ে সামান্য কথা হলেও প্রমাণের অভাবে বিরোধ বেশিদূর এগোয়নি; কিন্তু আমার অন্তর্দাহ চলতে থাকে মেয়েটির জন্য। ওর উদ্দেশে কবিতা মতন কিছু লিখে লিখে তোষকের নিচে রেখে দিতাম। হয়তো এভাবেই লেখালেখির শুরু।
স্বাধীনতার পর মনে হলো রতনের দেয়া দায়িত্ব আমাকে নাটক লেখাচ্ছে। বাহাত্তর-পঁচাত্তর বেশ কটি নাটক লিখে ফেললাম, মুক্তি, অত্যাচারের চরম সীমায়, মানুষ নয়--টাকা ইত্যাদি। নিজের লেখা নাটকের বাইরেও কল্যাণ মিত্র, প্রসাদ বিশ্বাস, হাবিবুর রহমান, ইন্দু সাহা, ফয়েজ আহমদ প্রমুখের নাটক মঞ্চায়ন শুরু হলো; তারপর আব্দুল্লাহ আল মামুন, কাজী জাকির হোসেন, আনোয়ার তালুকদার, মমতাজ উদ্দিন আহমদ, রবিউল আলম, জিয়া হায়দার, মামুনুর রশিদ এবং শেখ আকরাম আলী প্রমুখ নাট্যকারের নাটক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ১৯৭৫-এ জীবনে বিপর্যয় ঘটলো দুভাবে, একদিকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা- এবং সামরিক শাসন বুকের উপর বুলডোজার চালালো, অন্যদিকে বুকের ভেতর পুষে রাখা প্রিয়তমা প্রজাপতি বালিকাটি খোয়া গেল জীবন থেকে। যে কবিতা এতোদিন তোষকের নিচে লুকিয়ে থাকতো, তারা এবার প্রকাশ্য হলো। এবার যুগপৎ নাটক এবং কাব্যচর্চা চললো।
নাটক আর কবিতার মধ্যে সুনির্দিষ্ট একটা ফারাক আমি নিজে নিজেই আবিষ্কার করলাম, নাটক আঁটঘাট বেঁধে রচনা করা হয়; কে আমার পক্ষ কে প্রতিপক্ষ, আগেই তা চিহ্নিত করা হয় নাটকে এবং পরিকল্পিতভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রয়াস থাকে; কিন্তু কবিতা ঠিক তেমন নয়, পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে কবিতা লেখা যায় না; কবিতা কখন যেন লেখা হয়ে যায়। সে বিবেচনায় নাটক রচনায় শারীরিক এবং মানসিক কিছু ক্লেশ থাকলেও কবিতায় যতটা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ততটা নয়। এর পর নাটক এবং কবিতার হাত ধরে চলতে চলতে এক সময় নাটক থেকে কিছুটা দূরে এবং কবিতার কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। সাহিত্যে পথচলার নানা বাঁক ঘুরে একসময় গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের সম্পৃক্ততা এমন এক আবহের সৃষ্টি করেছে, যে আমি চাইলেই আজ আর কাউকে অস্বীকার করতে পারি না। আমি দূরে থাকতে চাইলেও নাটক আমাকে দূরে থাকতে দেয় না; আমার লেখা নাটকগুলোই আমাকে স্বজন বলে ডেকে ওঠে; আমার প্রেয়সী প্রজাপতি আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করে তোলে। লেখা হয়ে যায়--
আকাশেরও নিজস্ব সীমানা-প্রাচীর আছে দেখো
দৃশ্যমান যেটুকু তোমার স্মৃতির পর্দায় তুলে রেখো,
বাতাসের আছে নিজস্ব গতির সীমা
চাঁদের লাবণ্য ধরে চন্দ্রকলা ভাদ্রের পূর্ণিমা;
দিগন্ত ছাপিয়ে দ্যাখো নিজস্ব উড়াল আছে পাখিদের জানা
দিনে যদিওবা দেখে সবকিছু রাতে রাতকানা।
মাছেদের অবাধ সাঁতারে চলে যতো জলকেলি
জলে ও ডাঙায় মাছের শিকার অবিরাম জাল ফেলি।
বৃক্ষেরা সবুজে ফেরে ঝরা পাতার বেদনা ভুলে
অভিমান শেষে নিঃসঙ্গ শাখা-পল্লব ভরে দেয় ফুলে ফুলে,
সকীর্ণ গোপাট কতদূর গেছে জানে না গরুর পাল
গোধূলিতে ফিরে অপেক্ষায় থাকে সকালের হাল;
প্রণয়ে ঘটুক যতো মতিভ্রম যতো বিচ্ছেদ সহ¯্রবার
প্রথম প্রেমের কাছে আত্মসমর্পণ-- ফিরে আসা বারবার।
(প্রথম প্রেমের কাছে)
চার দশকের অধিক সময় সাহিত্যসাধনা করার পর যখন ‘কবিতা কেন লিখি, কবিতায় কী লিখি, নাটক কেন লিখি-এসব সাহিত্য গবেষণা কী দিতে পারে বিপর্যস্ত এই জীবনে’ ইত্যাদি প্রশ্ন আসে; তখন ‘কেন লিখি’র উত্তরে নিজের কাছ থেকে একটাই উত্তর পাই-‘না লিখে বাঁচতে পারি না, তাই বাঁচার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে লিখি।’ বাঁচাটা যেহেতু একান্তই নিজস্ব ব্যাপার তাই কেউ পড়লেও লিখি--কেউ না পড়লেও লিখি, কেউ ছাপলেও লিখি কেউ না ছাপলেও লিখি; কেউ গ্রাহ্য করলেও লিখি, সবাই অগ্রাহ্য করলেও লিখি। আর ‘কবিতায় কী লিখি’ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গভীর সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকি। উত্তাল সমুদ্রের গভীরে আমাদের জন্য কতো বিচিত্র-বিস্ময় লুকিয়ে আছে তা যেমন বলতে পারি না, তেমনি কবিতায় কী লিখি সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে হাঁপিয়ে উঠি। এমন তো হয়ই, দু-চার পাঁচদিন, দু-চার পাঁচ সপ্তাহ অথবা দু-চার পাঁচ মাস কবিতা লেখা হচ্ছে না; তাতে কিন্তু চিন্তা থেকে কবিতা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে না, বরং কবিতার জন্য গভীর এক বেদনাবোধ বুকের ভেতর গুমড়ে কেঁদে মরে। তখন হয়তো গদ্য লিখি। এভাবেই লেখাটা হয়ে দাঁড়ায় প্রাত্যহিকতার অংশ; কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে সাহিত্য-ভাবনা বিষয়ে, তখন অতটা সহজে পার পেয়ে যেতে পারি না। সাহিত্য-ভাবনার মধ্যে নিজের কাব্যের বিষয়-মেজাজ-উপস্থাপনশৈলী-দায়বদ্ধতা সব সামনে এসে দাঁড়ায়; নিজের নাটক-গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন কবিতার অতীত, কবিতার ভবিষ্যৎ--কবিতার নির্মিতি--কবিতার প্রকরণ--কবিতায় সংযম-পরিমিতিবোধ--কবি এবং কবিতার আকাক্সক্ষা সবাই ভিড় করে দাঁড়ায়, বিবেচনায় নিতে হয় সবাইকে। সাহিত্যকর্মী হিসেবে নিজেকে যেহেতু সমাজের সচেতন-প্রাগ্রসর একজন হিসেবে দাবি করি, নিজেকে যেহেতু সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে দেখতে চাই, সঙ্গত কারণেই সমাজ-পরিপার্শ্ব-রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি-সমকাল-বিশ্বপ্রেক্ষাপট সব বিবেচনায় রেখে কথা বলতে হয়। তখন কবিতা-সাহিত্য হয়ে দাঁড়ায় সচেতন নির্মিতি। ভাবনার প্রধান অংশ হয়ে যায় কবিতা। স্বতঃস্ফূর্ত প্রস্রবন ধারাটির সাথে যোগ হয় কবির সচেতন প্রয়াস। জীবনের যে কোনো আবেগ-- যে কোনো মুহূর্ত কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে বটে, কিন্তু তার সাথে যুক্ত হয় নিজের পরিকল্পনাটিও। আমি আমাকে, আমার পরিপার্শ্বকে-সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্রকে কীভাবে দেখতে চাই, সে আকাক্সক্ষার কথা কবিতার শরীরে জুড়ে দিতে চাই; কিন্তু মাথায় রাখতে হয় আমার নিজস্ব বিবেচনাটি জুড়ে দিতে গিয়ে কবিতার শিল্পটি যেন সীমাবদ্ধ না হয়ে পড়ে। আমি তো জানি নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপনাই পাঠকের বিবেচনা পায়। আমার নিজের বেদনাবোধটি পাঠক কেন পড়বেন? প্রেয়সীর সাথে যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে আন্তঃনগরে চেপে আমি একদিকে প্রেয়সী ভিন্ন সড়কে ভিন্ন গন্তব্যে ফিরে যাই তখন সেটি একান্তই আমার কষ্ট: ‘ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে, ক্রমশ দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে আমাদের,/ হুইসেল বাজার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়েছে বিষণœতা/... ..খিলগাঁও রেলক্রসিং ফ্লাইওভার জানাচ্ছে শুভেচ্ছা/ যেন তোমার চুলের গন্ধ এইমাত্র হেঁটে গেছে/ গোরানের দিকে-- সিপাহীবাগের পথে,/.....রাতে তোমার গাড়িও ছেড়ে গেলে দূরত্ব বাড়বে আরো/ তুমি ফেলে যাবে কাচপুরব্রিজ ব্যস্ত নগরের পথ’ ইত্যাদি। কিন্তু যখন এক-ই কবিতায় বলা হয়-- ‘এভাবেই প্রতিদিন ট্রেন-বাস-লঞ্চে প্রিয়জন সরে যায় দূরে/ দৃশ্যের আড়ালে যায় প্রিয় দৃশ্যাবলী/ তবু বিশ্বাস অটুট থাকে যদি, থাকে অবিচল আস্থা,/ পৃথিবীর সড়কেরা একদিন দূরত্ব দেয়াল ভেঙে/ মিলনের মোহনায় আমাদের পৌঁছে দেবে।’ তখন কবিতাটি নৈর্ব্যক্তিক চারিত্র্য পেয়ে যায়। কবিতা যতটা নিজের জন্য ততটাই পাঠকের জন্যে, এটি অস্বীকার করবো কীভাবে। তাইতো প্রতিটি কবিতাকে পাঠকের পাঠসীমানায় পৌঁছে দেবার নানান কসরত আমাকেই করতে হয়। আর কবিতাকে যদি পাঠকের পাঠবিবেচনায় পৌঁছাতে হয়, তখন পাঠকের পাঠপ্রস্তুতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে বিপর্যয়ের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিতে পারি না। সমস্যা হচ্ছে আমাদের পাঠকের কাব্যপাঠসীমানা প্রথমত পাঠ্যবই, বিদগ্ধ পাঠক হয়তো আরও কিছু পড়েন, কিন্তু সাধারণ শিক্ষিত পাঠক পাঠ্যসূচিকেই আদর্শ ভাবতে আগ্রহী। সে বিবেচনায় কবিতাকে বোধগম্যপর্যায়ে রাখার পাশাপাশি কবিতায় প্রচলিত কাব্যপ্রকরণ চর্চারও আবশ্যিকতা থাকে। কবিতার ক্ষেত্রে কবির দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করতে পারি না। কবির দায়বদ্ধতা তার দেশের কাছে, মানুষের কাছে, প্রকৃতির কাছে-প্রতিটি বৃক্ষ-লতাগুল্ম-নদী-সমুদ্র-পাহাড়-অরণ্য সবার কাছে। আরো কটি পঙ্ক্তি উদ্ধার করছি-- ‘মুনাফাপ্রবণ বিশ্বে নিত্য এগিয়ে যাবার দৌড়/ দরিদ্রের প্রার্থনায় বাঁচা যদি আসে অনন্য সুবর্ণ ভোর।/ সঞ্চয় লক্ষ্মীরভা- মুষ্টির সামান্য চাল মাত্র/ উদয়াস্ত ঘুরে ক্লান্ত তবু হাতে শূন্য ভিক্ষাপাত্র/ মানবিকতার মাথা মাড়িয়ে যাদের সম্মুখে এগিয়ে থাকা/ সুযোগ সন্ধানী যত স্বার্থান্ধ ঘোরায় আপন রথের চাকা/ সময়নিষ্ঠ মানুষ অপেক্ষার চাবুকে রক্তাক্ত হয় জানি/ অসঙ্গতি অশিষ্টতা নিয়ে অবিরাম অনর্থক টানাটানি।’ অপ্রস্তুত পাঠক যখন পঙ্ক্তিগুলো ধারণা থেকে বুঝতে চান তখন যে স্বাদ তিনি আস্বাদন করেন, যখন প্রতিটি পঙ্ক্তি-প্রতিটি শব্দের ব্যাখ্যা অনুভব করে কবিতার সাথে এতাত্ম হয়ে যান তখন নিশ্চয়ই স্বতন্ত্র স্বাদ অনুভব করেন; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পাঠকের কাছে অতটা প্রস্তুতি নেবার সময় কোথায়, যখন জীবন-জীবিকার প্রশ্নে বৃহত্তর পাঠকসমাজ ‘সাজেশন এবং নোটবই’-নির্ভর বিদ্যায় অভ্যস্ত, তখন কবিতা তার কাছে বিস্বাদ ঠেকবে তাতে অবাক হবার কী আছে? এ যেন কবিতার সাথে পাঠকের বিভেদ-দেয়াল; এ দেয়ালের স্থিতি-বিস্তৃতি এতটাই, যা কবিকে প্রায়শ দিশেহারা করে দেয়। সাধারণের কবিতা না পড়েও দিন কেটে যায়। কবিতা পড়লে তার কোথায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটে তা যেমন তিনি বুঝতে চান না, না পড়লে যাপিত জীবনের কোথায় শূন্যতা দেখা দেয় তা নিয়েও মাথা ব্যথা থাকে না। সব মাথা ব্যথা যেন কবির একার প্রসঙ্গ হয়ে যায়। নিষ্ঠ কবির একান্ত এ কষ্টটি সাধারণ কেন, অসাধারণ পাঠকও সহজে বুঝতে চান না। তার উপর আছে কবিতাকে মহিমান্বিত করে তোলার সংগ্রাম।
প্রচলিত প্রকরণ ভাঙার অধিকার কবির নিশ্চয়ই থাকে, তবে তা অর্জন করে নিতে হয় অনুশীলন-পাঠ ও চর্চায়। প্রকরণ সম্পর্কে ধারণা যাঁর স্বচ্ছ নয়, তিনি প্রকরণ ভেঙে নতুন ধারণা উপস্থাপনের অধিকার সংরক্ষণ করেন না, প্রকরণ ভাঙার অধিকার সংরক্ষণ করেন তিনি, যিনি প্রকরণ সম্পর্কীত সম্যক জ্ঞান ধারণ করেন। কবি কিছুতেই তাঁর এ দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। কালোত্তীর্ণ হতে কবিকে যেমন বাণীস্বত্বের অধিকারী হতে হয়, তেমনি বিষয়বৈচিত্র্যেরও অধিকারী হতে হয়। কবি রঙ্গলাল সেনকে বাংলা কবিতার পাঠক কতটুকুইবা জানেন, কিন্তু তাঁর অমর পঙ্ক্তি--‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্ব শৃঙ্খল কে পরিবে পায় হে কে পরিবে পায়!’ বাঙালিমাত্রে জানেন এর বাণীস্বত্ব ও প্রাসঙ্গিকতার জন্য। বাংলা কবিতার কালোত্তীর্ণ আরও কিছু পঙ্ক্তি স্মরণে আনলে এ কথার যথার্থতা উপলব্ধি করা সহজ হবে। কাব্যভাবনায় কবিকে এমনি অসংখ্য অনুষঙ্গকে বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন পড়ে।
চারদশকের অধিককাল সাহিত্যচর্চার পর যখন নিজেকে বাস্তবানুগ ভাবছি, তখন একথাটিও ভাবনায় কড়া নাড়ছে, আমার কবিতা-আমার সাহিত্য আমার অনুপস্থিতিতে কে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করবে? সেখানেই চাই পরম্পরা। সে পরম্পরা আইনগত উত্তরাধিকার নয় বরং কাব্যিক উত্তরাধিকার। যে উত্তরাধিকার তৈরি করতে হবে আমাকেই আগামী প্রজন্মের জন্য আবশ্যিক কবিতা রচনার মাধ্যমে। যে প্রচেষ্টা আমার সাম্প্রতিক কাব্যভাবনার প্রধানতম অনুষঙ্গও বটে। আর পরম্পরা কেবল কবির পরম্পরা হলে চলবে না, কবিতারও পরম্পরা তৈরি হওয়া চাই। এ দুয়ের সঠিক সমন্বয়ই পারে কবিতা এবং কবির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে। কবিতার সংগঠন কবি এবং উত্তীর্ণ কবিতার জন্ম দিতে পারে না জানি; কবিতার সংগঠন কি কবিতা এবং কবির পরম্পরা তৈরিতে অবদান রাখতে পারে? এসব জটিল বিষয় সাম্প্রতিক ভাবনাগুলোকে বুকের ভেতর তোলপাড় করে যায় কখনো একান্ত মুহূর্তে। মানুষের সৃষ্টিশীল কলাসমূহের মধ্যে কবিতাই যে শ্রেষ্ঠ তা কেবল পুঁথিতে, কেবল প-িতদের তত্ত্ব আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এ সত্যের স্বীকৃতি থাকতে হবে নীতিনির্ধারণ পর্যায়েও। এসব ভাবনা কখনো কবিতাকে সংক্ষুব্ধ করে তোলে; তখন নিজের অজান্তেই কবিতা থেকে কিছুটা দূরে সরে যাই, এবং অতঃপর আবার কবিতার সাথে ঘনিষ্ঠ হবার সীমাহীন কসরত। কবিকে তাই কখনো গ্রিক পুরাণের অভিশপ্ত বীর ‘সিসিফাস’ বলে মনে হয়, যার দায়িত্ব পাথরের বিশাল চাঁইটাকে ঠেলে চূড়ায় তোলা, আর যার নিয়তি চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছাতেই চাঁইটি অনিবার্যভাবেই নিচে গড়িয়ে পড়া। সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ততার এই সংগ্রামই আমার সংগ্রাম।
আসলে লেখক হয়ে ওঠার তেমন কোনো গল্প আমার নেই, আবার লেখক হয়ে ওঠা গেল কী-না সে সংশয় সারাক্ষণ বুকের ভেতর তোলপাড় করে তুলছে, যা নিয়ে আমার সংগ্রামও সারাক্ষণ প্রবহমান; এই তো লেখক হবার গল্প, লেখক হয়ে উঠতে না পারার অভিমান। সব কিছুর পর লিখি; না লিখলে অসুস্থ হয়ে যাই, না লিখলে মনে হয় প্রাণ ফুরিয়ে যাচ্ছে--মৃত্যুর দিকে হেঁটে যাচ্ছি, অগত্যা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই লিখে চলি অবিরাম, ছাইপাশ যাই হোক লিখে রাখি মনের আনন্দে--গভীর বেদনায়।
=============
কবি মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ২১তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৫) প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ