কী লিখি কেন লিখি
মনি হায়দার
জন্ম : ১লা মে ১৯৬৮
আমার একটা প্রিয় গল্প ‘পাশবিক পাশা খেলায়’ শুরুর কয়েকটি লাইন দিয়ে আমার আমাকে উন্মোচন করতে চাই।
‘অভয়, তোকে একটা গল্প শোনাই।
গল্পটা অনেক দিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। যেভাবে নির্মেঘ আকাশে, নিদাঘ দুপুরে আকশের সীমাহীন চূড়োয় চক্রাকারে উড়ে বেড়ায় ভুবন চিল, ঠিক সে রকমভাবে একটি গল্প ঘুরছে আমার মাথায়। কখনো লাটিমের মতো। কখনো অসীম নদীতে সাঁতার কাটার মতো, কখনো আম কুড়াতে গিয়ে একটি মেয়ের হাসিতে কেয়ার কাঁটা বাগানে হারিয়ে যাবার মতো, কখনো গল্পটি কারোটির মেঝেতে সেলাই হচ্ছে সুই সুতা আর কাঁথার মতো। এ এক আজব ব্যাপার না?
শুরুতেই জানতে চাচ্ছিস কিভাবে মগজের কোটরে ঠাঁই পেয়েছিল গল্পটা? এ কথা বলা খুব কঠিনই একটু আমার জন্য। আসলে গল্প অনেকটা চালচুলোহীন একটি বিরান বাড়ির মতো। বিরান বাড়িতে কেউ একদিন বাস করতো কি নাযেমন বোঝা যায় না, ঠাহর করা যায় কি যায় না, তেমন একটি ত্রিশংকু পরিস্থিতিতে আবছাভাবে একটি গল্পের কাঠামো এসে ধরা দেয় করোটির ভেতরে। তারপর সেই কাঠামোর ওপর শব্দের-কল্পনার-ইজেল চালিয়ে রূপসী একটি গল্প তৈরি হয়ে যায়।’
আমার ধারণা গল্পের শুরু এইভাবে হয় একজন গল্পকারের চৈতন্যে। গল্প আসলে কী? আমারতো মনে হয় গল্পের অপর নাম প্রাণ। মানুষের প্রাণ। পাখিদের প্রাণ। শুয়োরের প্রাণ। কৈ মাছের প্রাণ। সবুজ বৃক্ষের প্রাণ। চলমান নদীর প্রাণ। চকচকে চাকুর প্রাণ। সদ্য ফোটা ফুলের প্রাণ। প্রথম রজমুক্ত কন্যার প্রাণ। প্রথম চুম্বনের প্রাণ। মোটকথা―গল্প ছাড়া কোনো জীবন আছে, আমার প্রতীতে নেই। গল্প আছে, পৃথিবী আছে। গল্প যেদিন ফুরিয়ে যাবে, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, সে দিন পৃথিবীরও আয়ু বা প্রাণ ফুরিয়ে যাবে। এই অফুরন্ত গল্পের মাঝে আমার বেঁচে থাকা। আমাদের বেঁচে থাকা। গল্প আমার প্রেম বিরহ। গল্প আমার উল্লাস। গল্প আমার আত্মহত্যার প্রাণ।
খুব শৈশবে, এক ট্রাঙ্ক বই আমার গল্পকার হয়ে ওঠার পেছনে দায়ী।
যতদূর মনে পড়ে, আমি সিক্সে বা সেভেনে পড়ি তখন এই ট্রাঙ্কটি আবিষ্কার করি আমাদের দক্ষিণমুখী কাঠের দোতলা বাড়ির দোতলায় কোঠার খাটের নিচে। কেনা কী কৌতূহলে আমি ট্রাঙ্কটি খুলতে গিয়েছিলামজানি না। কিন্তু খোলার পর দেখলাম ট্রাঙ্কটি বইয়ে ঠাসা। আমি শৈশব থেকে নিজের সঙ্গে কথা বলি। হরেক রকম কথা। কখনো নিজেকে আকাশের নায়ক ভাবি, কখনো জলের তলের দানব তিমি ভাবি। কখনো কল্পিক প্রতিপক্ষের সবাইকে মেরে তক্তা বানিয়ে নিজেকে মহানায়ক ভাবি। আমাদের বাড়ির চারপাশের বনজঙ্গলে হাঁটি আর লাঠি দিয়ে লতাপাতা ঝোপঝাড় পিটিয়ে পিটিয়ে নিজেকে পরাক্রমশালী নায়ক বানাই। সেই সময় এই বইগুলো আমাকে কল্পনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশে পাতালেকোথায় না নিয়েছিলো? ট্রাঙ্কের মধ্যে আমি পেয়েছিলামমীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু, নজিবুর রহমান সাহিত্যরতেœর আনোয়ারা, প্রেমের সমাধী, কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের অনেকগুলো বই, রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজের অনেকগুলো বই, বিশ্বখ্যাত ফরাসী গল্পকার ও উপন্যাসিক আলবার্তো মোরাবিয়ার রোমের রূপসী। বইগুলো পাঠ করতে করতে আমি কল্পনার এক অবিশ্বাস্য জগৎ আবিষ্কার করে ফেললাম। মনে হলো আমি দুর্ধর্ষ মাসুদ রানা, আমি দস্যু বনহুর, আমি কুয়াশা, আমিই রোমের রূপসীর সেই নায়ক, যে প্রতারণা করে তার প্রেমিকাকে মালিকের বাড়িতে এনে শারীরিকভাবে মিলিত হয়।
ইতিমধ্যে আমি জেনে গেছি আত্মরমনের সেই তা থৈ থৈ সুর-আহ, কী গোপন আর অনিবর্চনীয় রতিসুখ! পাশের বাড়ির একটি মেয়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে গোপন কারখানা। আমি রানা সিরিজের স্বর্ণমৃগ পড়ি আর রানা যখন নায়িকা মায়া ওয়াংয়ের সঙ্গে রমনে লিপ্ত হয়, আমিও সঙ্গে সঙ্গে আত্মরতিতে নিবেদিত হই দোতলার কোঠায়। গোপনে অলৌকিক সুখে আমি হারিয়ে যাওয়ার জন্য সময় খুঁজতে থাকি। যখনই সময় পাইউঠে যাই দোতলায়, ছোট্ট কোঠায়, পড়ি বই, হারিয়ে যাই দূরের কোনো গহীনে। সেই শৈশবে আমি আরও পড়েছি বাংলা কথাসাহিত্যের মহাপুরুষ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রহীন, প-িতমশায় আর শ্রীকান্তের প্রথম খ-। শ্রীকান্তের প্রথম খ-ের নতুন দা’র ঘটনাটা কতোবার যে পড়েছি, তার শেষ নেই। এখনও চোখ বুঝে আমি দেখতে পাইনতুন দা সেই ভয়াবহ শীতের রাতে নদীতে গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। আর তীরে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করিতেছে...। অদূরে কালো কি যেন চকচক করছে। নতুন দা’র পাম্পসু।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’ পাঠ করে কেঁদেছি হাজারবার। আহা! জয়নাল এজিদের কারাগার থেকে পালিয়ে গেছে, কাসেমের বিয়ে হচ্ছে, বিয়ের পরই চলে যাবে যুদ্ধে, হোসেন কারবালার যুদ্ধে পরাজিত, তার বুকের উপর সীমার, হানিফা ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে, পাহাড় তাকে ঘিরে ফেলেছে, সেই পাহাড়ের মধ্যে হানিফা এখনও ঘোড়া ছুটিয়ে চলছেপাহাড়ের গায়ে কান পাতলে ঘোড়ার ছুটে চলার শব্দ এখনও শোনা যায়পাঠ করি আর কাঁদি। কিন্তু সমস্যা হলোবড়দের কাছে এইসব পাঠ মানেবখে যাওয়া। সুতরাং নিষিদ্ধ হলো এই পাঠ। কিন্তু নিষিদ্ধ হলে তো চলবে না, আমার মন অস্থি যে প্রবেশ করেছে কল্পনার ট্যানেলে। পেয়েছি মায়ার কাঠি আর জীয়ন কাঠির দেশে যাবার সাঁকো। আমাকে যত বাধাই দেয়া হোকআমি মানবো কেনো?
এই ফাঁকে বলে রাখি, বইগুলো ছিলো আমার বড় ভাইয়ের। তাকে আমরা দাদা ডাকি। শৈশবে তিনি আমার নায়ক ছিলেন। তার শরীরে রঙ সাদা লাল। মাথায় ছিল বাবড়ি দোলানো ঘন চুল। হাঁটেন একটু শরীর দুলিয়ে দৃঢ় পায়ে। দাদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। দাদা এক সময়ে বাংলাদেশ বেতারে চাকরি করতেন। কবিতা লিখতেন। গান লিখতেন। কিন্তু এখন দাদা একজন ব্যবসায়ী। আর আমি? আমি আজ বাংলা গল্পের বিরান মাঠে একজন খেলোয়াড়।
আমি আমাদের বাড়ির পূর্ব পাশে আমজুর মায়ের ছোট্ট কুঁড়েঘরে আশ্রয় নিলাম। সেখানে চুরি করে বই নিয়ে যেতাম, পাঠ করতাম। রণজিৎ ঠাকুরের একটি উপন্যাস‘কুষ্টিয়া’ পড়তাম আর কাঁদতাম। কুঠিয়ার নায়ক কলম রায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কলম রায় উপন্যাসিক। সে ভালোবাসে বনানী চৌধুরীকে। বনানী চৌধুরী ডাক্তারী পড়ে। হঠাৎ কলম রায় কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়। তার শরীর পচে গেছে। জনপ্রিয় উপন্যাসিক নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। কেউ তাকে খুঁজে পায় না। বনানী চৌধুরীর কাছেও যায় না। কারণ বনানী ভালোবাসে কলম রায়কে। একজন কুষ্ঠ রোগীকে নয়। ইতিমধ্যে কলম রায়ের নতুন উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। লোকে পাঠ করছে। একটি ট্রেনে কলম রায় কাশী যাচ্ছে, সেখানেই তার মরবার ইচ্ছে। সারা শরীর তার চাদরে ঢাকা। সেই কামরায় বনানী চৌধুরীও। সে পাঠ করছে কলম রায়ের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস। এতোকাছে― তবু কতো দূরে। কৈশোরের কচি মন-উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনাকে সত্য মনে করেছি। ফলে কলম রায়ের জন্য কষ্টে বুক ফেটে কান্না আসছে। পরবর্তীকালে ঢাকায় এসে আমি রণজিৎ ঠাকুরের বই খুঁজেছি, পাইনি। তার সম্পর্কে কেউ কিছু বলতেও পারেনি।
যশোরের বেজপাড়ার বেদুইন সামাদের উপন্যাস ‘ধূমনগরী’ পাঠ করে আমি সেই শৈশবে শিল্পায়নের রাজনীতির পাঠ নিতে পেরেছি। আমি এখনও মনে করিÑ বেদুইন সামাদের ‘ধূমনগরী’ আমাদের সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস। পড়েছি আকবর হোসেনের কী পাইনি, মোহমুক্তি, অবাঞ্ছিত উপন্যাস। যদিও সেই ট্রাঙ্কের মধ্যে জসীম উদ্দীনের সোজন বাদিয়ার ঘাটও পেয়েছি, সুন্দর করে ছবিসহ ছাপা, পড়েছিও― কিন্তু কবিতার জগৎ আমাকে আকর্ষণ করেনি।
সেই এক ট্রাঙ্ক বই আমাকে আজ এখানে, গল্প উপত্যাকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমি আমার বড় ভাই রুহল আমিনের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি ঐসব মূল্যবান বই না কিনলে, ট্রাঙ্কে না রাখলে আমি আমাকে কী আজ বাংলা সাহিত্যের বিশাল মাঠে একজন খেলোয়াড় হিসেবে খুঁজে পেতাম? নিশ্চয়ই না। আজ বাংলা সাহিত্যের একজন গল্পকার হয়ে ওঠার পেছনে কেবল সেই ট্রাঙ্ক বইÑ ই না, আরও অনেকগুলো কারণ কাজ করেছিল, আমার ধারণা। প্রকৃতির উদার আকাশও আমাকে গল্পের কাছে নিয়ে গেছে― আমার ধারণা। সেই উদার প্রকৃতির একটি হচ্ছে আমার বাড়ির কাছ দিয়ে যাওয়া বিশাল কচা নদী। বিশাল চওড়া নদী। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। স্রোতও তীব্র। ভাঙ্গন আরও তীব্র আরও ভয়ংকর। আমাদের বাড়ির দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরের হাই স্কুলে পড়ার সময়ে স্কুল পালাতাম। স্কুল পালিয়ে আমি কচা নদীর তীরে, তীরে বলতে একেবারে তীরেই কয়েকটি কেয়া ঝোপের আড়ালে বসে থাকতাম। বরিশালের পিরোজপুরের ভা-ারিয়া উপজেলার বোথলা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কচা নদীর পানি ভাটার সময়ে পানি নেমে যেতো তীর থেকে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ হাত নিচে। জোয়ারের সময়ে পানি আবার ফুসে উঠতো মাঠ ছোঁয়ায়, অনেক সময়ে মাটি অতিক্রম করে পানি উঠতো কূলে, রাস্তায়। তো, বসে থাকতাম কচানদীর তীরে? সেদিন মনে হতো স্কুল পালানোর জন্য বসে থাকতাম মানুষের চক্ষুর আড়ালে। কিন্তু আজ আমার মনে হয়Ñ আমি নদীর অথৈ জলের সঙ্গে, জোয়ার ভাটার সঙ্গে কথা বলার জন্য বসে থাকতাম। আমার এখন মনে হয়Ñ নদীর সঙ্গে আমি, আমার সঙ্গে নদী কথা কইতো। সেই কথাই আজ আমি শব্দে বাক্যে আর অনুভবের তীব্র স্বরে ব্যক্ত করিÑ গল্পে, গল্পের আখ্যানে।
আমি জীবনে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এই নীতিদীর্ঘ জীবনে সব কী গল্পে বলতে পেরেছি? মোটেই না। আমার মনে হয়Ñ গত পঞ্চাশ বছরে যে জীবনের পারাপার ফেলে এসেছি, সে জীবনের শূন্যভাগও আমি আমার এ পর্যন্ত গল্পে তুলে আনতে পারিনি। হয়তো কোনো গল্পকারের পক্ষে সম্ভবও নয়। জীবনের অনেক গল্পই থেকে যায় জীবনের বাইরে। লেখারও বাইরে।
একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, জীবনে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পাইলট হওয়ার ইচ্ছে আমার কোনোকালেই ছিল না, এমন কী শৈশবের সেই নির্বোধকালেও নয়। এক ট্রাঙ্ক বই, বইয়ের চরিত্র, আখ্যান আমাকে তাদের সঙ্গে ধাবিত করে চলেছিল। সেইসব চরিত্রের সঙ্গে আমি এখনও ধাবমান লাঙ্গল কাঁধে ধূলি ধূসরিত মাঠে হেঁটে চলেছি একা একা। বলছিলামÑ শৈশবে আমি একজন গল্পকারই হতে চেয়েছিলাম। একজন লেখকই হতে চেয়েছিলাম। আর কোনো কিচ্ছু হতে চাইনি। আমার পারিবারিক নাম মনিরুল ইসলাম, আমার মনে হলো এই নামটি লেখক নাম নয়, ঠিক আমার উপযুক্ত নাম নয়। আমি নবম শ্রেণিতে বোর্ডে নাম রেজিস্ট্রেশন করার সময়ে আমার নাম রাখিÑমনি হায়দার। তখন, আজ থেকে ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগে অজ পাড়াগাঁয়ের একটি ছেলে, যে ছেলে তখন পর্যন্ত টেলিভিশন দেখেনি, ফোনের ব্যবহার জানতো না, তিনটি কী চারটি সিনেমা দেখেছে, সেই ছেলে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কম সাহস ও নির্মিতির ব্যাপার নয়। আর নামের সঙ্গে হায়দার যুক্ত হওয়ার পেছনে অলক্ষ্যে ভূমিকা রেখেছিলেন বিশিষ্ট কবি, নাট্যব্যক্তিত্ব জিয়া হায়দার। কারণÑ তখন হাতের কাছে যে সব পত্রিকা পেতাম, সেইসব পত্রিকায় তার প্রচুর লেখা দেখতাম। দুটি শব্দের নামের মধ্যে একটি আধুনিকত্ব লুকিয়ে ছিল, যা আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু তখনতো আমার মতো একজন একদম পাড়াগাঁয়ের বালকের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, জিয়া হায়দারেরা সাত ভাই। যদিওÑ সব ভাইদের সঙ্গে এখন আমার একটি চমৎকার সম্পর্ক। বিশেষ করে মাকিদ, জাহিদ আর আরিফ হায়দারের সঙ্গে।
আমি কী প্রথমে গল্পকার হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম? না, আমি শৈশবে কবিতা লিখে খাতা ভরে ফেলতাম। অনেক কয়েকটি খাতায় কবিতা লেখার পর মনে হলো, না কবিতা আমার হচ্ছে না। শব্দের সঙ্গে আমার ভাবনার অনুরণন হচ্ছে না, আমার ভাবনার সঙ্গে খেলছে না শব্দ বা বাক্য। আমার মনে হলোÑ আমি গল্প লিখতে পারি। আমি যে দোতলায় বড় ভাইয়ের বইয়ের ট্রাঙ্ক আবিষ্কার করেছিলাম, সেখানে যত বই পাঠ করেছি, তার সবই ছিলো গদ্য, নিরেট গদ্য। আমি কবিতার খাতা সরিয়ে রেখে গল্প লিখতে শুরু করলাম। আমার প্রথম গল্পটির আখ্যান এখনও মনে আছে। শিশুদের জন্য লিখেছিলাম, নামও মনে আছে। গল্পটির নাম দিয়েছিলামÑ ‘ছাই’। সেই সময়ের প্রলেতারিয়েত ভাবনার প্রকাশ ছিলো গল্পটিতে।
১৯৮১ সালে এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে আমি ঢাকা চলে আসি। ঢাকায় আমার কোনো আত্মীয় নেই, আমরা তখন পারিবারিকভাবে খুব বিপর্যস্ত। কারণÑ বাবা মারা গেছেন। দাদার চাকরি নেই। আমাদের গ্রামের জমি নিলামে উঠেছে। সব মিলিয়ে ত্রাহি এক অবস্থা। আমি একটি রাজনৈতিক দলের লেজুর ধরে ঢাকায় আসি এবং সেই রাজনৈতিক দলের অফিসে আশ্রয় নিই। করি পিয়নের কাজ। ভেতরে ভেতরে ভাবি-লেখা কিভাবে লেখা যায়? অবসরে লিখি গল্প। আমি শুরুতেই ছোটদের জন্য লিখতে শুরু করি। আমার প্রথম গল্প ছাপা হয় দৈনিক বাংলার বাণীর ছোটদের আসর শাপলা কুঁড়ির পাতায়। শাপলা কুঁড়ির পাতা দেখতেন ওয়াহিদ রশিদ বলে সজ্জন একজন ভদ্রলোক। পাতায় তাঁর নাম থাকতো-গল্পবুড়ো। তিনি আমার লেখা খুব পছন্দ করতেন। অনেক লেখা তিনি ছেপেছেন। বাংলার বাণীর অফিসে পাতাকে ঘিরে বসতো সাহিত্য পাঠের আসর। আমি নিয়মিত যেতে শুরু করলাম। সেখানে পরিচয় হলোÑঅনেক বন্ধুর সঙ্গে। খবর পেলামÑসংবাদের খেলাঘরের পাতার ও আসরের। সেখানেও নিয়মিত যেতে শুরু করলাম। তৈরি হতে থাকলো আমর লেখার জগৎ। আমার গল্পের জগৎ। ইতিমধ্যে আমি রাজনৈতিক দলের অফিস ত্যাগ করলাম। রামপুরার উলন রোডের মসজিদ ম্যাচে আশ্রয় নিলাম। বাংলাদেশ বেতারে বিশিষ্ট ছড়াকার খালেক বিন জয়েনউদ্দীনের সহায়তায় দু একটি অনুষ্ঠান করলাম। সেখানে দেখা হলো বেতারের একজন কর্মকর্তা আবদুল হালিমের সঙ্গে। যিনি আমার আত্মীয়ও বটে। তিনি আমাকে বেতারে নো ওর্য়াক নো পেমেন্ট ভিত্তিতে মাসে সাড়ে সাতশত টাকার একটি কাজ জুটিয়ে দিলেন। আরও একটি কাজ দিলেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ হোমিও চিকিৎসক। তাঁর ছিলো হোমিওপ্যাথি বিষয়ক একটি পত্রিকাÑ‘হোমিও দর্পণ’। আমাকে নিযুক্ত করা হলো ‘হোমিও দর্পণে’র বিজ্ঞাপন ম্যানেজার। রেডিওর সম্মানজনক কাজটি টিকিয়ে রাখার জন্য ‘হোমিও দর্পণে’র বিজ্ঞাপন ম্যানেজারের কাজটিও আমাকে করতে হতো। বলে রাখা ভালো আবদুল হালিমের সোর্স দিয়েই আমি বিজ্ঞাপন কালেকশন করতাম। কারণÑ হোমিও বিষয়ক পত্রিকায় কেনো যেচে বিজ্ঞাপন দিতে যাবে? এবং সে কাজ করতে গিয়ে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছি। জীবনের কোনো কিছুই ফেলনা নয়, সবই একদিন আকর হয়ে দেখা দেয়।
বাংলাদেশ বেতারে চুক্তিভিত্তিক কাজ করতে শুরু করি ১৯৮৬ সালে। আর ১৯৮৯ সালে বেতারের স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে নিয়োগ পাই। বেতারের স্টাফ আর্টিস্টের চাকরির বিষয়ে আর একদিন বলবো। সে আর এক মর্মন্তুদ কান্নার ইতিহাস। আপতত খাওয়া থাকার সমস্যা মিটলো। এবার গল্পের রাজ্যে এগিয়ে যাবার পালা। লিখতে শুরু করলাম ছোটদের পাশাপাশি বড়দের জন্যও গল্প। আমার যতদূর মনে পড়েÑ বড়দের পাতায় আমার প্রথম গল্প ছাপা হয় সেই বাংলার বাণীর সাহিত্য পাতায়, তখন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি সোহরাব হাসান। সোহবার ভাই এখন প্রথম আলোর বড় পদে আছেন। যিনি আমার বড় ভাই রুহুল আমিন যার এক ট্রাঙ্ক বই পাঠ করে আমি আমাকে সাহিত্যের পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি, সেই ভাইয়ের ক্লাশফ্রেন্ড সোহবার হাসান। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছেÑ সোহরাব ভাইয়ের বাড়ি আমাদের ভা-ারিয়ায়। দাদা একদিন সোহরাব ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। গল্পটি এখন আমার কাছে নেই। তবে গল্পটির আখ্যান মনে আছেÑ‘এক ফেরিঅলা রাস্তায় যৌন দুর্বলতার ঔষধ বিক্রি করে কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখে তার নিজেরই বউ চলে গেছে। কারণÑস্ত্রীকে তৃপ্তি দেয়ার ক্ষমতা তার নেই।’
খুব মোটা দাগে এই হচ্ছে আমার গল্পের পৃথিবী। গল্পের পথে চলতে চলতে আমি অনেক মানুষের অদম্য ভালোবাসা পেয়েছি। অনেকের অন্যায় আচরণের শিকারও হয়েছি। ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র সম্পাদক মীজানুর রহমানের পরম স্নেহ, ‘রূপম’ গল্প পত্রিকার সম্পাদক আনওয়ার আহমদের বিশেষ ভালোবাসা গল্প পথের একজন নগণ্য যাত্রী হিসেবে আজীবন মনে রাখবো। যারা আমাকে অবজ্ঞা করছেন, তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। কারণ, তাদের অবজ্ঞা আমাকে আরও শাণিত করেছে, আমাকে আরও প্রতিজ্ঞবদ্ধ করেছে, আমাকে গল্পপথের যোদ্ধায় পরিণত করেছে। আমি কোনো কিছুকেই ভয় পাই না। আমি বলতে পছন্দ করিÑ আমি পথের মানুষ। পথই আমর ঠিকানা। পথই আমার বন্ধু। আর সে কারণেই আমি ২০০২ সালে জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘এক ঝাঁক মানুষের মুখ’ গল্পগ্রন্থের ফ্লাপে লিখিÑ ‘গ্রামীণ এক নামগোত্রহীন পরিবারে আমার জন্ম’। আর গল্পে আখ্যান পথ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া। সুতরাং আমি আর গল্প এক ও অভিন্ন অকৃত্রিম সত্তা।
বেলা বয়ে যায়। যাচ্ছে। সেই বেলার সঙ্গে আমিও যাই, যাচ্ছি। আমার এখন ছোট গল্প বিষয়ে চৌদ্দটি বই। গত কয়েক বছরে বই মেলায় আমার একটি করে ছোটগল্পের বই বের হয়। প্রায় দুশ গল্প লিখেছি। দুশো গল্প লেখার পরও বুঝতে পারি, আমি আমার শ্রেষ্ঠ গল্পটি লিখতে পারিনি। প্রতিটি গল্প লেখার আগে যে রকম প্রস্তুুতি নেই, সেইভাবে লিখতে শুরু করি এবং লেখা শেষ হওয়ার পর চেতনার শিখা জানিয়ে দেয়, না হয়নি। যেভাবে চেয়েছিলে গল্পের আখ্যান শব্দের বুননে আঁকতে, সেভাবে পারোনি। একটা প্রবল অতৃপ্তি আমাকে নাড়া দেয়। আমাকে কেবল? মনে হয় না। পৃথিবীর সকল ভাষার গল্পকারকেই নাড়া নেয় অতৃপ্তির এই কুহক!
গল্পের পাশাপাশি ইদানিং উপন্যাসের প্রতি টান অনুভব করছি। গত তিন চার বছরে বেশ কয়েকটা উপন্যাস লিখেছি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের উপর একটা উপন্যাস ‘কিংবদন্তীর ভাগিরথী’ লিখে তৃপ্তি পেয়েছি। কারণ, তিন চার বছরের প্রস্তুতি নিয়ে উপন্যাসটা লিখেছি, একাত্তরের সত্যঘটনাকে কেন্দ্র করে। ভাগীরথি পিরোজপুর মহাকুমা সদরের এক নারী। সেই ভাগীরথিকে পাকিস্তানী আর্মী ধরে আনে ক্যাম্পে। দিন রাত চালায় পাশবিক নির্যাতন। এবং একজন পাকিস্তানী নি¤œ পর্যায়ের অফিসার ভাগীরথিকে নিজের আয়ত্তে রাখে। সেই অফিসারকে বুঝিয়ে ভাগীরথি নিজের চার বছরের ছেলেকে দেখতে গ্রামে যেতে শুরু করে। এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরী হয়। ভাগীরথি আগাম আক্রমণের তথ্য জানায় মুক্তিযোদ্ধাদের। ফলে, মুক্তিযোদ্ধাদের এ্যামবুশে দখলদার পাকিস্তানী আর্মীরা মারা যায়। ঘটনাটা টের পেয়ে পাকিন্তানী আর্মীরা ভাগীরথিকে গাড়ির পিছনে বেঁধে টেনে টেনে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার উপন্যাস ‘কিংবদন্তীর ভাগীরথি’। বেহুলাবাংলা থেকে প্রকাশিত ‘কিংবদন্তীর ভাগীরথি’ উপন্যাস মেলার শেষ দিকে এলেও পাঠকেরা বিপুল আগ্রহে গ্রহণ করেছেন।
বছর তিনেক আগে এক সাক্ষাৎকারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, লেখেন কেনো?
আমি উত্তর দিয়েছিলাম, লেখা ছাড়া আর কিছু পারি না যে! সুতরাং আমাকে বেঁচে থাকতে হলে লিখতেই হবে। যেদিন লিখতে পারবো না, সেদিন বাঁচবো না।
অরণি’র ২৪তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৯) প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ