কী লিখি কেন লিখি বিমল গুহ

কী লিখি কেন লিখি 

বিমল গুহ
জন্ম : ২৭শে অক্টোবর ১৯৫২
মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। প্রত্যেক মানুষ। স্বপ্নের গহনে যা যা রূপ চোখের সামনে প্রতিভাত হয়, তা ছবির মতো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত। এই স্বপ্নের কথা অন্যকে জানানোর জন্য উদ্গ্রীব থাকে সবাই। স্বপ্নের কিছু রূপ মনে থেকে যায়, আর কিছু বিস্মৃতির অতলে পড়ে থাকে। এই-যে কিছু রূপ থেকে যায় তা মনের ক্যামেরায় ছবির মতো তোলা থাকে। যদি বাস্তবের মতো সব ছবি ক্যামেরাবন্দী করা যেতো, সবই দেখানো যেতো অন্যকে। এই দেখানোর মধ্যেই মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা নিহিত। মানুষ যা’ ভাবেÑ মনে তার একটা রূপকল্প তৈরি হয়। তা যদি মানুষের কল্যাণে আসে তাকে যেমন মানুষের গোচরে আনার তাগিদ থাকে, তেমনি যা মানুষকে আনন্দ দিতে পারে, মানুষের কল্পনাকে শাণিত করতে পারে এবং সর্বোপরি মানুষের আগ্রহকে জাগাতে পারেÑ মানুষ লেখার মাধ্যমে তা অন্যকে জানাতে চায়। যিনি তা পারেন; তা না-করা পর্যন্ত তার মনে কোনও স্বস্তি থাকে না। মানুষ সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে তখনই। এই স্বপ্নকে মনে লালন করতে করতে এক সময় তা প্রকাশের তাগিদ আসে। এই এক দিক।
অন্যদিকেÑ মানুষের মধ্যে আরেক মানুষ বাস করে। সে-মানুষ শয়নে স্বপনে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, অভিভূত হয়ে পড়ে যখন প্রকৃতির অপরূপ শোভা তার মনকে জাগিয়ে রাখে, বিমোহিত করে! এই মানুষটি প্রতিনিয়ত যা দেখে তার রূপমাধুর্য তাঁকে পাগল করে তোলে, তার বর্ণনা বলে বা লিখে শেষ করার নয়। অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন লিখেও শেষ করার নয়। তাই লেখক লিখেই চলেন। আমরা এ কথা অনেকের মুখে শুনেছি যে, তিনি যা লিখতে চান তা এখনো লিখে উঠতে পারেননি বলেই তাঁর ক্লান্তিহীন যাত্রা চলছে তো চলছেই। এ কথা শুনে অনেককে তা হেসে উড়িয়ে দিতেও আমরা দেখি! কিন্তু আমি তার মর্মার্থ আমার মতো করে বুঝি বলেই এর অবতারণা করলাম। হ্যাঁ, আমি তা মানি। আমার এই উপলব্ধির বিষয়টি আমার বন্ধুদের কাছে, স্বজনদের কাছে, সাধারণের কাছে জানাতে চাই। মন খুলে আমার অনুভূতিটা শেয়ার করতে চাই, আনন্দ-বেদনার বিষয়টা জানান দিতে চাইÑ আমি তাই লিখি। এতেই আমার আনন্দ, মনের তৃপ্তি। 
মানুষ জন্মগতভাবে সৌন্দর্যপিপাসু। যখন মানুষের বুদ্ধি হয়েছে বিবেক জাগ্রত হয়েছে, তখন থেকেই সে তার কথা জানাতে চেয়েছে। গুহাবাসী মানুষের জীবনাচরণ আমাদের সেই ধারণা দেয়। দেয়ালের গায়ে তাদের নানা আঁকিবুঁকির মধ্যে থেকে তা অনুমেয়। এতদিন মনের ফ্রেমে যে দৃশ্যাবলি ধারণ করতো, ক্যামেরা আবিস্কারের পর মানুষ ছবি তোলার জন্য আরো ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ক্যামেরায় তোলা ছবি পূর্ণাঙ্গ ছবি হয় না। কারণ ক্যামেরায় ছবি ওঠে যা দেখা যায় তার একটা রূপ, একটা দিক। কিন্তু মানুষের চোখ তার চেয়ে অনেক বেশি দেখে এবং তা মনের ফ্রেমে ধরে রাখতে পারে। এই ছবি আঁকার জন্য কেউ তুলি হাতে নেয়। যিনি তুলি দিয়ে ছবি আঁকেন তাঁর ছবি পূর্ণাঙ্গের কাছাকাছি, কারণ তিনি তাঁর দেখা সব রূপকে সম্ভব মতো তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। তাঁর দেখা রূপ যেভাবে তাঁর মনে ছায়া ফেলে, তার সম্ভাব্য সম্পূর্ণরূপ তিনি তাঁর ক্যানভাসে তুলে ধরতে চান। তাই এই ছবির সাথে ক্যামেরার ছবির অনেক ফারাক হয়। এই ছবিতে শিল্পীর কল্পনা ও বাস্তবের মিশেল থাকে। এই ছবি বা চিত্র বিবেচিত হয় সৃষ্টিশীল কাজ হিসেবে। অনেক ক্ষেত্রেই তা এ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্পের রূপ নেয়। 
আর একজনের হাতে ওঠে কলম। তিনি লেখক। তিনি তাঁর দেখা রূপ এবং কল্পনার রূপকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে তুলতে পারেন তাঁর লেখায়। জীবন, জগৎ ও সমাজের সকল অনুভবের সার্থক রূপকার এই লেখক। তাঁর অঙ্কিত এই রূপ পূর্ণাঙ্গের আরো কাছাকাছি হয়। এই লেখার কাজÑ দেখা, না-দেখা ও কল্পনার জগতের ছবি তোলার মতই। এই আনন্দ অনির্বচনীয়। যিনি লেখার জগতে একবার প্রবেশ করেছেন, এই অনির্বচনীয় আনন্দ একবার পেয়েছেনÑ তাঁর না-লিখে থাকার আর কোন উপায় নেই। জীবনের ছবি আঁকার আনন্দ থেকে যেমন লিখতে বসি, লেখাকে জন্মের-দায়িত্ব মনে করি বলেও লিখি; আমিও আমার দেখা-জগৎ ও জীবনের অভিজ্ঞতা মানুষকে জানাতে চাই বলেই লিখি। 













অরণি’র ১৮তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৩) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ